চয়েস বেসড ক্রেডিট সিস্টেম (সিবিসিএস) চালু হওয়ার পরে বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কলেজে পড়াশোনার পদ্ধতিতে আমূল বদল এসেছে। তার দোসর হয়ে এসেছে বেশ কিছু সমস্যাও। সদ্য শেষ হয়েছে স্নাতক স্তরের দ্বিতীয় সেমেস্টার পরীক্ষা। কয়েকটি কলেজের বেশ কিছু পড়ুয়া সেই পরীক্ষায় বসতে পারেননি। এই নিয়ে চাপানউতোরও চলছে।

কেন ওই পড়ুয়ারা পরীক্ষায় বসতে পারলেন না? কলেজ দাবি করছে, তাঁরা সেমেস্টারের মাঝে আভ্যন্তরীণ পরীক্ষা দেননি। ওই পরীক্ষা না দিলে সেমেস্টারের ফাইনাল পরীক্ষায় বসা যায় না। এ দিকে, পড়ুয়ারা বলছেন, তাঁরা পরীক্ষা দিয়েছেন। কলেজই বিশ্ববিদ্যালয়ে নম্বর পাঠায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ও দাবি করেছে, জেলার কলেজগুলিকে বারবার বলা হয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আভ্যন্তরীণ পরীক্ষা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পোর্টালে পড়ুয়াদের নম্বর আপলো়ড করে দিতে। কার্যক্ষেত্রে সেটায় বিস্তর খামতি থেকে গিয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, বছর শেষের পরীক্ষা থেকে হঠাৎ ছ’মাসের কোর্সে অভ্যস্ত হতে গিয়ে হোঁচট খাচ্ছে কলেজগুলি।

কী এই সিবিসিএস? কী এর সমস্যা? লাভের দিকগুলিই বা কী?

বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তারা জানাচ্ছেন, এক কথায় সিবিসিএস হল মিশ্র পাঠের পদ্ধতি। বিজ্ঞান বিভাগের পড়ুয়ারা চাইলে কলা বা বাণিজ্য বিভাগের বিষয় রাখতে পারবেন নিজেদের কোর্সে। আবার কলা বা বাণিজ্য বিভাগের পড়ুয়ারাও চাইলে নিজের ইচ্ছে মতো বিজ্ঞান বিভাগের বিষয় কোর্সের নিতে পারবেন।

বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সিবিসিএস এবং সেমেস্টার পদ্ধতিতে পড়াশোনা চালু হয়েছে একই সঙ্গে। ২০১৭ সালে। আগে তিন বছরের পাঠ্যক্রমে বছর শেষে পরীক্ষা হত। এখন পরীক্ষা হয় ছ’মাস অন্তর। অনার্সের ক্ষেত্রে পাঠ্যক্রমের তিনটি ভাগ থাকে। প্রথমটি কোর পেপার। তাতে অনার্সের বিষয় পড়ানো হয়। আগে অনার্সের সঙ্গে পাস কোর্সের বিষয়ও পড়তে হত। ভর্তির সময়েই পড়ুয়া বিষয় বেছে নিতেন। বাকি সময়ে সেটাই পড়তে হতো। বদলানোর সুযোগ ছিল না।

এখন সুযোগ থাকছে। অনার্সের সঙ্গে পড়তে হচ্ছে ইলেক্টিভ কোর্স। অনার্সের সঙ্গে পড়ুয়ারা দু’টি ইলেক্টিভ কোর্স পড়ছেন। একটি ডিসিপ্লিন স্পেসিফিক ইলেক্টিভ। পড়ুয়া যে বিষয়ে অনার্স পড়ছেন, তার সঙ্গে সাযুয্য রেখে কোর্স ঠিক হয়। বিজ্ঞানের ছাত্ররা বিজ্ঞানের কোনও বিষয় নেন। বাণিজ্যের ছাত্ররা বাণিজ্যের বিষয়।

অন্য কোর্সটির নাম জেনেরিক ইলেক্টিভ। এ ক্ষেত্রে পড়ুয়া ইচ্ছামতো বিষয় বেছে নেওয়ার সুযোগ পান। বিজ্ঞানের ছাত্র চাইলে ইতিহাস বা দর্শন পড়তে পারেন। কলা বিভাগের ছাত্র চাইলে পড়তে পারেন রসায়নও।

এখানটাতেই গোড়ার মুশকিল দেখা দিয়েছে। কলেজের শিক্ষকদের একাংশের মতে, উচ্চশিক্ষার ভোল বদলে দেওয়ার মতো আধুনিক পদ্ধতি এটি। কিন্তু প্রশ্নটা হল, রুটিন করা হবে কী করে?

খাতড়া কলেজের অধ্যক্ষ পার্থসারথী হাটির প্রশ্ন, “পদার্থবিদ্যায় অনার্স নেওয়া এক ছাত্রের ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে ইতিহাস রয়েছে। দু’টি বিষয়ই পৃথক বিভাগের। একই সময়ে ওই দু’টি বিষয়ের ক্লাস হলে ছাত্র ইতিহাসের ক্লাসে যাবেন না পদার্থবিদ্যার?” বাঁকুড়া খ্রিস্টান কলেজের অধ্যক্ষ ফটিকবরণ মণ্ডল বলেন, “রসায়ন নেওয়ার দিকে সমস্ত বিভাগের পড়ুয়াদেরই ঝোঁক থাকছে। কিন্তু ক্লাসরুমে ছাত্রছাত্রী বসানোর পরিকাঠামো সীমিত। বাকিদের বসাবো কোথায়?”

বাঁকুড়া সারদামণি গার্লস কলেজের অধ্যক্ষ সিদ্ধার্থ গুপ্ত বলছেন, “জেলার কলেজগুলিতে ক্লাসরুম ও শিক্ষক দুই-ই সীমিত। সিবিসিএসের পড়ুয়াদের যে সুযোগ সুবিধা প্রাপ্য তা এই সিমিত পরিকাঠামোর মধ্যে দেওয়া সম্ভব নয়। এই পদ্ধতি চালু করার আগে আরও কিছুটা সময় নেওয়া দরকার ছিল বলেই মনে করি।” কলেজের অধ্যক্ষদের অনেকেই বলছেন কর্মী সমস্যার কথাও।

জেলার কলেজের অধ্যক্ষদের একাংশের দাবি, সিবিসিএস চালু করার মতো পরিকাঠামো তাঁদের নেই। খাতায় কলমে বলা হচ্ছে, পড়ুয়ারা ইচ্ছেমতো বিষয় কোর্সে রাখার অনেকটাই সুযোগ পাবেন। কার্যক্ষেত্রে পরিকাঠামো সেটাকে বেশ কিছুটা সীমাবদ্ধ করে দিচ্ছে। প্রথম কথা হল, অনেক কলেজেই অনেক বিষয় নেই। যদি বা থাকে, শিক্ষক এবং ক্লাসঘর প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। কোর্স পিছু সপ্তাহে অনেকগুলি ক্লাসও নিতে হয়। সব মিলিয়ে তাল সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে অধিকাংশ কলেজ।

বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দেবনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য বলেন, “পরিকাঠামো সঙ্গে সাযুয্য রেখেই পুরোটা হচ্ছে। পড়ুয়ারা কোন ঐচ্ছিক বিষয় পড়ার সুযোগ পাবেন তা নির্ধারণ করার অধিকার কলেজগুলিকে দেওয়া হয়েছে।’’

কিন্তু কার্যক্ষেত্রে বিষয় বেছে নেওয়ার সুযোগ অনেকটা কমিয়ে আনতে হচ্ছে বাধ্য হচ্ছে কলেজগুলি। যেমন, ধরা যাক ইতিহাসের কোনও পড়ুয়া জেনেরিক ইলেক্টিভ হিসাবে পদার্থবিদ্যা পড়তে চান। কিন্তু কলেজের রুটিনে দু’টি ক্লাস একই সময়ে। সে ক্ষেত্রে ওই পড়ুয়া পদার্থবিদ্যা নিতে পারবেন না।

এই হিসাবে সিবিসিএসের মূল উদ্দেশ্য আসলে হোঁচট খাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।