Advertisement
১৬ জুলাই ২০২৪
প্রবন্ধ ১

এ দেশ তোমার নয়

হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা এত দিন ধরে যা চেয়ে এসেছেন, আমরাও এখন তেমনটাই চাইতে আরম্ভ করেছি। সেখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ। অমিতাভ গুপ্ত।প্রত্যেক ক্রিয়ার যে সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছেই, এই কথাটি এত দিনে আমরা আত্মস্থ করে ফেলেছি। অতএব ইন্টারনেটে শিবজি আর বাল ঠাকরের ছবি মর্ফ করলে প্রতিক্রিয়া হবে। ‘হিন্দু রাষ্ট্র সেনা’ নামের এক সংগঠন এই দফায় প্রতিক্রিয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল।

শেষ আপডেট: ০৮ জুন ২০১৪ ০০:০০
Share: Save:

প্রত্যেক ক্রিয়ার যে সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছেই, এই কথাটি এত দিনে আমরা আত্মস্থ করে ফেলেছি। অতএব ইন্টারনেটে শিবজি আর বাল ঠাকরের ছবি মর্ফ করলে প্রতিক্রিয়া হবে। ‘হিন্দু রাষ্ট্র সেনা’ নামের এক সংগঠন এই দফায় প্রতিক্রিয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল। পুণের মহসিন সাদিক শেখ সেই প্রতিক্রিয়ায় নিহত।

শিবজি আর ঠাকরের ছবি দুটো ২৪ বছরের মহসিন মর্ফ করেছিলেন কি না, হিন্দু রাষ্ট্র সেনারা নিশ্চয়ই জানতেন না। তাঁদের জানার দরকারও নেই। সংগঠনের একটা ফেসবুক পেজ আছে। সেখানে গুজরাত দাঙ্গার পরে পরেই করা কোনও এক নীলকান্তের উক্তি রয়েছে: ‘দ্বিতীয় বার আর হবে না (কী? গণহত্যা?)। মুসলমানদের বুঝতেই হবে, হিন্দুরা তাদের দেশে কোনও রকম সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বরদাস্ত করবে না। যত ক্ষণ না এ রকম কিছু (অর্থাত্‌, গুজরাত গণহত্যা) করা হচ্ছে, তত ক্ষণ মুসলমানরা শান্তির মাহাত্ম্য বুঝবে না।’ ‘শান্তির মাহাত্ম্য’ বোঝানোর জন্য মসজিদ-ফেরত মুসলমান যুবককে পিটিয়ে মারতেই হয়।

প্রশ্নটা হিন্দু রাষ্ট্র সেনাকে নিয়ে নয়। উগ্র হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি নিয়েও নয়। সেই রাজনীতির চেহারা যে বিলক্ষণ এই রকমই, তা বুঝতে মহসিন শেখের নিহত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার দরকার ছিল না। প্রশ্ন হল এই হিংস্রতার ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে। কোনও এক বা একাধিক ব্যক্তি বাল ঠাকরের ছবি বিকৃত করেছে, শুধু এই কারণেই মসজিদ-ফেরত এক মুসলমান যুবককে, কেবলমাত্র তাঁর মুসলমান পরিচয়ের কারণেই, পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়, দাঙ্গার সময় নয়, শান্তির সময়ে এই কথাটি ভারত খুব বেশি দিন আগেও জানত না। উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা আগে অন্য রকম ছিল বলে নয়, আমাদের মনগুলো অন্য রকম ছিল বলেই, হয়তো। সংখ্যালঘু বলেই কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়, এই কথাটা আমরা কিছু দিন আগেও এত স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারতাম না। সংখ্যাগরিষ্ঠের এই দাদাগিরিকে দিব্য গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে ফেলেছি আমরা।

কলকাতার কাগজগুলোতে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে তেমন খবর বেরোয়নি। কিন্তু যাঁরা টেলিভিশনে ন্যাশনাল মিডিয়ায় খবর দেখছেন, তাঁরা হইহই করে আপত্তি করবেন। কোথায় গ্রহণযোগ্য হয়েছে এই হত্যাকাণ্ড? সবাই একবাক্যে নিন্দা করছে না হিন্দু রাষ্ট্র সেনার? গ্রেফতার করা হয়নি ১৭ জনকে? তা হলে?

তা হলেও কিছু থেকে যায় বইকী। ‘ওদেরই বা ওই সব ছবি মর্ফ করার কী দরকার ছিল’, এই কথাটা যদি কানে না-ও আসে, তবুও শুনবেন, মূল হইচই হচ্ছে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে। একটা আধুনিক শহরে এক জন যুবককে পিটিয়ে মেরে ফেলা যায় এই কথাটায় বিলক্ষণ ধাক্কা লেগেছে আমাদের। অত্যন্ত জরুরি ধাক্কা। কিন্তু, যাঁকে মেরে ফেলা হল, তাঁর পরিচয়টা কিছু কম জরুরি নয়। মহসিন শেখ এক জন মুসলমান এবং মুসলমান বলেই তিনি মারা গেলেন। কোনও অজুহাতেই যে এক জন মুসলমানকে এ ভাবে মেরে ফেলা যায় না ‘মুসলমান’ শব্দটায় জোর দিচ্ছি, মেরে ফেলায় নয় এই কথাটা আমরা বলছি কি?

বলছি না। এবং, এখানেই এই হত্যার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। আমাদের যতটুকু আপত্তি, তা হত্যা নিয়ে, নিহতের পরিচয় নিয়ে নয়। মুসলমানদের সার্বিক নিরাপত্তাকে আমরা কতখানি গুরুত্ব দেব, সেটা আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়। রাজনীতির প্রশ্ন। সমাজের প্রশ্ন। সংখ্যার হিসেবে ভারতে এই প্রশ্নের উত্তর ঠিক করার জোর নিঃসন্দেহে হিন্দুদের। সেই সংখ্যাগরিষ্ঠদেরই স্থির করতে হবে, মুসলমানদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি কতখানি গুরুত্ব পাবে তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হবে কি না। এক জন মুসলমানেরও নাগরিক অধিকার লঙ্ঘিত হলে দেশ জুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের যাবতীয় উন্নতি, ভাল থাকা, মূল্যহীন হয়ে যাবে কি? সেই নিরাপত্তার সঙ্গে আর কিছুর যোগ নেই। মুসলমানরা আক্রান্ত হলে প্রতি-আক্রমণে আমার ঘরেও আগুন লাগবে কি না, অথবা মাঝেমধ্যেই দাঙ্গা হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতে আসতে ভয় পাবেন কি না, এই সব হিসেবনিকেশ করে নয়, শুধুমাত্র মুসলমানদের সম-নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার জন্যই তাদের নিরাপত্তা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত করার দায়িত্ব ভারতের সমাজের।

ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কী সিদ্ধান্ত করলেন, তা নিয়ে আর সংশয়ের অবকাশ নেই। দৃশ্যতই, গুজরাত গণহত্যার ইতিহাসের চেয়ে তাঁদের কাছে অনেক বেশি আকর্ষক আর্থিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি। সেই উন্নয়ন কবে, কোন পথে আসবে, আপাতত সেই প্রশ্নে যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু, ‘উন্নয়ন’ হলে, গোটা দেশ ক্রমে শাংহাই হয়ে উঠলে ২০০২ সালের গুজরাতের দুঃস্বপ্নও আর ফিরে আসবে না, মুসলমানদের আলাদা নিরাপত্তার প্রয়োজন হবে না, এটা অনেকেরই বিশ্বাস। ভারত তাই ‘অতীতের দাসত্ব’ ছেড়ে উন্নয়নের ভবিষ্যত্‌কে বেছে নিয়েছে। এবং সেই কারণেই মহসিন শেখের ‘মুসলমান’ পরিচয়ের চেয়ে অনেক বেশি উঠছে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন।

উন্নয়ন হলেই মুসলমানদের আর আলাদা করে নিরাপত্তার দরকার হবে না, এই যুক্তি অবশ্য ধোপে টেকে না। মহসিন শেখ পেশায় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী ছিলেন। অর্থাত্‌, আজকের ভারত যে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখছে, মহসিন তার একেবারে কেন্দ্রস্থলে ছিলেন। উন্নয়ন কিন্তু তাঁকে বাঁচাতে পারেনি। বরং সংশয় হচ্ছে, মহসিন শেখ যদি পেশায় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী না হয়ে অন্য কিছু আরও একটু মুসলমান-সুলভ হতেন, তাঁকে নিয়ে কথা আরও কম হত। তাঁর এই আধুনিক পেশাগত পরিচয় তাঁকে খানিকটা হলেও ‘পিপ্‌ল লাইক আস’ করে ফেলেছে। ‘আস’ মানে সেই আমরা, যারা টেলিভিশনের পর্দাতেই হোক বা ফেসবুকের দেওয়ালে, নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারি। তাঁর মৃত্যুটা শুধু এক জন মুসলমানের মৃত্যু নয়, এক তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর, এক ‘আধুনিক’ যুবকেরও মৃত্যু। তাঁর এই পরিচয়টুকু বাদ দিলে যা পড়ে থাকে, সেটা একেবারে নিখাদ ‘অপর’ অন্য কেউ, যার সঙ্গে আমাদের, সংখ্যাগরিষ্ঠের, কোনও সংযোগ নেই। মুসলমানরা অন্তত একশো বছর ধরে এই দেশে ‘অপর’-ই। কিন্তু, কিছু বছর আগেও, প্রকাশ্যে সেটা স্বীকার করতে আমাদের খানিক লজ্জা করত। খানিক খোঁচালে তবে দেখা যেত মনোজগতে সেই ‘আমরা-ওরা’র বিভাজন। রাজনীতি এসে সেই আব্রুটুকুও টেনে নিয়ে গিয়েছে এখন। না হলে, পুণের হিন্দু রাষ্ট্র সেনা যে কাণ্ড ঘটিয়েছে, তার নিন্দায় আমরা আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন টেনে আনতাম না। বলতাম, ভারতের মাটিতে এক জন মুসলমানের ওপর অত্যাচারও সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। আমাদের দেশে মুসলমানদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করতে পারা আমাদের জাতীয় লজ্জা। পঁচিশ হাজারি সেনসেক্সে সেই লজ্জা ঢাকবে না।

আমরা বলিনি। লজ্জা মনে করি না বলেই বলিনি। মুসলমানদের ‘অপরত্ব’-কে স্বীকার করেও তাদের সহনাগরিক ভাবার মতো ধৈর্য নেই বলেই। মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষা করা সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রধানতম দায়িত্ব বলে ভাবি না বলেই আমাদের রাষ্ট্রচিন্তায় তা গুরুত্ব পায় না। বরং, আমরা ভেবে নিয়েছি, ‘ওরাও একটু মানিয়েগুছিয়ে থাকলেই তো পারে’। আসলে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা এত দিন ধরে যা চেয়ে এসেছেন, আমরাও এখন তেমনটাই চাইতে আরম্ভ করেছি। সেখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

অন্য বিষয়গুলি:

post editorial amitava gupta
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE