Advertisement
১৭ জুন ২০২৪
প্রবন্ধ ৩

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিরোধী ঐক্য চাইছেন

প্রশ্ন উঠতে পারে, বাম দলগুলো বা কংগ্রেস তাদের পুরনো অবস্থানে ফিরে যাবে না, এমন নিশ্চয়তা কি আছে? উত্তর: ইতিহাস এ ভাবেই এগোয়।প্রা য় অর্ধদশক আগেকার কথা। একটি সাঁওতাল গ্রামে সভা বসেছে, এক জনের গরু অপর এক জনের ফসল নষ্ট করা নিয়ে বিবাদ। মীমাংসার জন্য আদিবাসী সমাজের প্রধান সভা ডেকেছেন। গ্রামের সব পরিবার থেকেই কেউ না কেউ এসেছেন।

শিক্ষা? নিরুপম সেন ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সিঙ্গুর, ১৬ জানুয়ারি। ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।

শিক্ষা? নিরুপম সেন ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সিঙ্গুর, ১৬ জানুয়ারি। ছবি: দেবস্মিতা ভট্টাচার্য।

সন্তোষ রাণা
শেষ আপডেট: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০০:০০
Share: Save:

প্রা য় অর্ধদশক আগেকার কথা। একটি সাঁওতাল গ্রামে সভা বসেছে, এক জনের গরু অপর এক জনের ফসল নষ্ট করা নিয়ে বিবাদ। মীমাংসার জন্য আদিবাসী সমাজের প্রধান সভা ডেকেছেন। গ্রামের সব পরিবার থেকেই কেউ না কেউ এসেছেন। সন্ধ্যাবেলা ‘গালমারাও’ বা আলোচনা শুরু হল। বাদী, বিবাদী এবং উপস্থিত অন্যরাও বললেন। আলোচনায় ভিন্ন ভিন্ন মত বেরিয়ে এল। প্রধান আর এক দফা আলোচনা শুরু করলেন। রাত প্রায় শেষ, কিন্তু গ্রামের অধিকাংশ লোক মতৈক্যে পৌঁছলেও দু’এক জনের ভিন্ন মত। রায়দান স্থগিত, পরের সন্ধ্যায় আবার আলোচনা শুরু হল। রাতভর আলোচনার পর অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত সহ সবাই মতৈক্যে পৌঁছলেন।

এটি গণতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি আদর্শ ব্যবস্থা। এখানে এমনকী শতকরা নব্বই ভাগের মতও বাকি মাত্র দশ ভাগের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। এই আদর্শ ব্যবস্থাকে অনুশীলন করেই আদিবাসী সমাজ হাজার হাজার বছর ধরে নিজের সংহতি বজায় রেখেছে। একটি গ্রামের ক্ষেত্রে যে আদর্শ পদ্ধতি অনুশীলন করা সম্ভব, একটি বৃহৎ জনপদে, যেমন দশ কোটি মানুষের একটি রাজ্য বা ১২০ কোটি মানুষের একটি দেশে, সেই আদর্শ রীতি অনুশীলন করার অনেক বাস্তব সমস্যা রয়েছে। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত ভাবধারা থেকে আধুনিক গণতন্ত্রের অনেক কিছু শেখার আছে। অথচ আমাদের সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা উত্তরোত্তর এর বিপরীত পন্থা অবলম্বন করছে।

লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল কেন্দ্রীয় সরকার গঠন এবং বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দল রাজ্য সরকার চালায়। এখন শাসক দল তাদের নীতি ও আদর্শ অনুযায়ী বাকি সকলকে চলতে বাধ্য করতে চাইছে, এতে গণতন্ত্রের মূল ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শাসক দল মনে করে যে, গোমাংস খাওয়া পাপ, অতএব বাকি সবাইকে তা মেনে নিতে হবে। কেউ তার বিরুদ্ধে কথা বললে তাকে দমন বা হত্যা পর্যন্ত করা হচ্ছে। শাসক দলের নেত্রী মনে করেন যে, নীল-সাদা রংটাই সবচেয়ে ভাল, সুতরাং সবাইকে তা মানতে হবে। যে মানবে সে পুরস্কৃত হবে, যে মানবে না সে বঞ্চিত হবে।

শাসক দল যদি এমনকী শতকরা ৬০-৭০ ভাগ মানুষের সমর্থন পেয়েও সরকার গঠন করে থাকে, তা হলেও এই পদ্ধতিতে শাসন অ-গণতান্ত্রিক। শতকরা ৩০-৪০ ভাগ মানুষের জীবনশৈলী, অভ্যাস ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই একটি গণতান্ত্রিক কাঠামো টিকে থাকতে পারে এবং বিকশিত হতে পারে। সমাজের সমস্যা অনেক: ক্ষুধা, দারিদ্র, স্বাস্থ্যহীনতা, অশিক্ষা বেকারত্ব। কেবলমাত্র সম্পূর্ণ সমাজের সৃষ্টিশীলতা দিয়েই এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। সেই সৃষ্টিশীলতার বিকাশ একমাত্র একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশেই সম্ভব। তার আদর্শ অনুশীলনের ছবি আমরা আদিবাসী সমাজের মধ্যে দেখি। বাস্তবটাকে সেই আদর্শের অন্তঃসারের অনুগামী হতে হবে।

সারা দেশে যে দলটি গত লোকসভা নির্বাচনে ৩১ শতাংশ ভোট পেয়েছে, সে যদি বাকি ৬৯ শতাংশের ওপর তার মত চাপিয়ে দিতে চায়, তা হলেই তা চরম অসহিষ্ণুতার জন্ম দেয়। পশ্চিমবঙ্গে যে দলটি শাসন চালাচ্ছে, সেটা এখনও পর্যন্ত সর্বোচ্চ যে ভোট পেয়েছে, তা ৪০ শতাংশেরও কম। সেই দলের নেত্রী গণতন্ত্রকে প্রসারিত করার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসেই তিনি ঘোষণা করেন যে, বিরোধীদের আগামী দশ বছর মুখে কুলুপ এঁটে থাকতে হবে। বিরোধী দলগুলির কর্মীদের ঘরছাড়া করা হল, তাদের অফিসগুলি দখল করে নেওয়া হল এবং পুলিশ-প্রশাসনকে দলের একটি সম্প্রসারিত অঙ্গে পরিণত করা হল। পঞ্চায়েত ও পুরসভার নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করে সেগুলির দখল নেওয়া হল। আজকের পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষে স্বাভাবিক কাজকর্ম করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিকে ভয়ংকর না বলে উপায় নেই।

আমাদের দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা এমনই যে, কোনও দল শতকরা ৩০ ভাগ বা ৪০ ভাগ ভোট পেয়েই সংসদে বা বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন দখল করতে পারে। এই পরিস্থিতিতে শতকরা ৩০ ভাগ বা ৪০ ভাগ ভোট পাওয়া শাসক দল যদি অসহিষ্ণুতা দেখায় ও স্বৈরতন্ত্রী আচরণ শুরু করে, তখন জনসাধারণের মধ্যে এই শাসনের পরিবর্তন চাওয়ার চাহিদা বাড়ে। জনসাধারণের মধ্যে তীব্র ভাবে ফুটে ওঠা সেই চাহিদাই বিরোধী দলগুলিকে একটা বোঝাপড়ায় আসতে বাধ্য করে। ১৯৭৭ সালে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যখন মতাদর্শগত ভাবে আলাদা অবস্থানে থাকা দলগুলি একজোট হতে বাধ্য হয়েছিল এবং ইন্দিরা গাঁধীর পরাজয় ঘটেছিল। আপাতদৃশ্যে এটা ভিন্ন দলের জোট হলেও, কথিত এই জোটের মধ্যে একটি সামাজিক চাহিদার প্রতিফলন ঘটেছিল। ২০১৬ সালে বিহার নির্বাচনেও এটা দেখা গেছে। দেশজোড়া অসহিষ্ণুতার প্রেক্ষাপটে বিজেপি-বিরোধী দলগুলি একটা বোঝাপড়া করে এবং বিজেপি পরাজিত হয়।

আজকের পশ্চিমবঙ্গে অনুরূপ এক পরিস্থিতি উদ্ভব হয়েছে। ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার বজায় রাখার জন্য রাজ্যের বেশির ভাগ মানুষ চাইছেন বিরোধী দলগুলির মধ্যে একটা বোঝাপড়া। বিজেপির দেশজোড়া ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষিতে এ রাজ্যে বাম ও বর্তমান কংগ্রেসের পক্ষে তাদের সঙ্গে কোনও বোঝাপড়ায় আসা সম্ভব নয়। কিন্তু কংগ্রেস ও বামেদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল শাসনে যে মানুষেরা মুখ খুলতে পারছেন না বা প্রতিবাদ করতে পারছেন না, তোলাবাজ, মস্তান ও সিন্ডিকেট-রাজের হাতে যাঁরা প্রতিদিন নির্যাতিত হচ্ছেন, সেই মানুষেরা এই রকম একটা বোঝাপড়া চাইছেন। এটাই গণতন্ত্রের সামাজিক চাহিদা। এই দুই দলের রাজ্য স্তরের নেতাদের মুখে এই ধরনের জোটের পক্ষে যে কথা শোনা যাচ্ছে, সেটা এই চাহিদারই প্রতিফলন। এখন কংগ্রেস ও বামপন্থী দলগুলো যদি জনসাধারণের এই চাহিদাকে মর্যাদা দেয়, রাজ্যে শাসনের পরিবর্তন ঘটবে অথবা বিধানসভায় অন্তত শক্তিশালী বিরোধী পক্ষের উপস্থিতি সুনিশ্চিত হবে। গণতন্ত্রের পক্ষে দুটোই মঙ্গলজনক। গণতন্ত্রের স্বার্থে মানুষ এটাও চায় যে, বামপন্থী দলগুলো তাদের মনোভাব ও কর্মপদ্ধতির কিছু পরিবর্তন ঘটাবে। বামফ্রন্ট রাজত্বের শেষের দিকে, বিশেষত শেষ দশ বছরে গণতন্ত্রের প্রশ্নে মানুষের অভিজ্ঞতা ভাল নয়। প্রথম দশ বছরে যে জমির মালিকানা ও পঞ্চায়েত প্রশ্নে যে পরিবর্তনগুলি ঘটেছিল, তাতে মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। জনসক্রিয়তার ফলে কর্মসূচিগুলো কিছুটা সাফল্য পেয়েছিল। বিপরীতে, শেষ দশ বছরে পরিবর্তনগুলো করা হল আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, প্রশাসনিক ও দলীয় ক্ষমতার জোরে।

প্রশ্ন উঠবে, বাম দলগুলো বা কংগ্রেস তাদের পুরনো অবস্থানে ফিরে যাবে না, এমন নিশ্চয়তা কি আছে? উত্তর: ইতিহাস এ ভাবেই এগোয়। জনগণ তাদের যে শাস্তি দিয়েছে, সেই শাস্তিভোগ থেকে তারা যদি শিক্ষা নেয় এবং গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হয়, তা হলে তারা থাকবে, না হলে ইতিহাসের পাদটীকা হয়ে যাবে, কিন্তু তারা শিক্ষা নেবে না। এই আশঙ্কা থেকে স্বৈরশাসনকে বরদাস্ত করা চলে না।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE