×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১০ মে ২০২১ ই-পেপার

প্রবন্ধ ২

তবু তিনি ইতিহাসের শিকার হয়ে গেলেন

পবিত্র সরকার
১৬ জুলাই ২০১৫ ০০:১৪

বিশ শতকের বাংলা নাট্যকলার ইতিহাসে ট্র্যাজিক নায়কের বিপজ্জনক প্রথম শিরোপা যদি শিশিরকুমার ভাদুড়ির প্রাপ্য হয়, তা হলে ওই শিরোপার দ্বিতীয় দাবিদার সম্ভবত বিজন ভট্টাচার্য। তাঁর যে ছবিগুলি আমাদের সামনে আসে, তার মধ্যে থেকে একটি বিষাদের ছায়া যেন কিছুতেই সরে যেতে চায় না। তাঁর এই ম্লান মূর্তিটি কে এমন চিরস্থায়ী করে নির্মাণ করেছে? তিনি নিজে, না তাঁর জীবন ও সময়— সেটাই প্রশ্ন।

অথচ এমন নয় যে, তিনি খুব বিষণ্ণ ও মুষড়ে-পড়া মানুষ ছিলেন। মাঝে মাঝেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, তাঁর পারিবারিক জীবনের বৃত্তান্ত জানা সত্ত্বেও তখন এ কথা খুব একটা মনে হয়নি, আবার খুব কাছে থেকে সংক্ষেপে যতটুকু দেখার সুযোগ হয়েছে, তাতে দেখেছি তিনি বেদম মজাদার লোক ছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে, এমনকী আমাদের সঙ্গেও, প্রচুর অকথা-কুকথা বলতেন, মনের কথা খোলাখুলি বলতেও তাঁর দ্বিধাসংকোচের বালাই ছিল না। যাঁদের গুরুগম্ভীর মহত্ত্বের চেহারা ছিল, সে চেহারা যতই সংগত ও বৈধ হোক, তার প্রতি হুল্লোড়পূর্ণ অসম্ভ্রম প্রকাশে তিনি বিশেষ উল্লাস বোধ করতেন। কখনও গানে, কখনও ছড়ায়, কখনও নিতান্ত লৌকিক রসালাপে তিনি নিজেকে বিচ্ছুরিত করতেন, ফলে তাঁর সঙ্গ সব সময় আনন্দময় ছিল— সে আনন্দ ততটা ‘বিশুদ্ধ’ না হলেও। আমাদের এখনও মনে আছে, ১৯৬৭-তে হায়দরাবাদে বটুকদার সঙ্গে মিলে তাঁদের দ্বৈতসংগীত— ‘সখী, তোমার জন্যে একটা ম্যাও ধরে এনিচি— নর্দমা থেকে তুলে, ধুয়ে মুছে, সাজিয়ে গুছিয়ে একটা সুন্দর ম্যা-অ্যা-অ্যা-অ্যাও ধরে এনিচি।’ ‘ম্যাও’ কথাটার ওই বিস্তারে তাঁর অসাধারণ সুরেলা গলার গিটকিরি ছিল শোনবার মতো। এ গানটি কোন সামাজিক এলাকার গান, তা গাইবার ধরন থেকেই স্পষ্ট হয়ে যেত।

তবু বলব, শিশিরকুমার যদি গত শতকের প্রথম অর্ধশতকের ট্র্যাজিক নায়ক হয়ে থাকেন, বিজন ভট্টাচার্য দ্বিতীয় অর্ধশতকে নিজের ট্র্যাজেডিকে উৎকীর্ণ করেন। খুবই শক্তিশালী অভিনেতা ছিলেন বিজন ভট্টাচার্য, কিন্তু নাটক বা ফিলমে অভিনয়ে তাঁর যে অভিমুখ তৈরি হয়েছিল, তাও আমাদের মন থেকে তাঁর ট্র্যাজিক ছবিটি মুছে দিতে পারেনি।

Advertisement

তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ নাটক ‘নবান্ন’ (১৯৪৪) বাংলা নাটকের ইতিহাসকে নতুন করে লিখেছিল, অথচ এখন তাঁর নাটক কদাচিৎ অভিনীত হয়। শুধু তা-ই নয়, তাঁর নিজের দল ক্যালকাটা থিয়েটারের (১৯৫১) বাইরে, যাকে এখন গ্রুপ থিয়েটার বলা হয় তার সবচেয়ে সফল প্রযোজনাগুলির মধ্যে বিজনদার কোনও নাটকের নাম করা যাবে না, এমনকী গণনাট্য সঙ্ঘও ‘নবান্ন’-র পরে তাঁর অন্য নাটক নিয়ে বেশি উৎসাহ দেখায়নি। এ বিষয়ে শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের প্রধান নাটককারদের মধ্যে বিজন ভট্টাচার্যই সম্ভবত সবচেয়ে অবহেলিত। তাঁর অনুজ নাটককারদের রচনা অন্য অনেক দল গ্রহণ করেছে— উৎপল দত্ত, বাদল সরকার, মনোজ মিত্র, মোহিত চট্টোপাধ্যায়— তাঁরা অন্য বহু দলকে নাটক-রসদ জুগিয়েছেন, এখনও তাঁদের নাটক অনেক দলের দ্বারা অভিনীত হতে দেখি। অথচ যাঁর নাটক নিয়ে বাংলা নাটকের ইতিহাস পেশাদার রঙ্গমঞ্চ থেকে নিজেকে উপড়ে নিয়েছিল, এবং পেশাদার রঙ্গমঞ্চকে তার পরবর্তী নির্মাণের ক্ষেত্রে এক রকম অপ্রাসঙ্গিক করে তুলেছিল, সেই বিজন ভট্টাচার্যের পরেকার সৃষ্টিগুলি মূলত তাঁরই একার প্রযোজনা হয়ে রইল। তাও সবগুলি নয়, নিজের কয়েকটি নির্বাচিত নাটকই তিনি নিজে ক্যালকাটা থিয়েটারের এবং পরে কবচকুণ্ডলের (১৯৭০) হয়ে প্রযোজনা করে যেতে পেরেছিলেন। তারও মধ্যে একটি-দুটির বেশি একাধিক বার প্রযোজনা করতে পারেননি। একাধিক নাটক— যেমন ‘জননেতা’, ‘জতুগৃহ’, ‘অবরোধ’ তো প্রযোজিতই হয়নি। বিস্ময়ের কথা এই যে, নাকি বাংলা নাট্য-সংগঠনের ইতিহাসে এটা খুব বিস্ময়ের কথা নয়ও যে, কোনও এক বিচিত্র বিচ্ছেদ-রসায়নে তাঁর নিজের হাতে তৈরি নাট্যদল ক্যালকাটা থিয়েটারও তাঁকে ছাড়তে হয়।

আমরা জানি, পরে বহুরূপীতে ‘নবান্ন’ প্রযোজনা করেছিলেন কুমার রায়, এবং এখনও কোথাও কোথাও বিজন ভট্টাচার্যের নাটক অভিনীত হয়। এই সে-দিন ‘মরা চাঁদ’-এর একটি মঞ্চ পরিকল্পনার ছবি দেখলাম ফেসবুকে— বেশ ভাল একটি নির্মাণের ছবি। কিন্তু এও তো সত্য যে, বহুরূপীর ওই বিচ্ছিন্ন প্রযোজনাটির বাইরে কলকাতার কোনও বড় নাট্যদল বিজনদার কোনও নাটক প্রযোজনায় এগিয়ে আসেনি।

সেটা কি এই জন্য যে, যে সব নাটক সময়ের সঙ্গে খুব বেশি জুড়ে থাকে, সময় বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলিও শ্যাওলা-সমাকীর্ণ হয়ে যায়? বহুরূপীতে তাঁর ‘নবান্ন’-এর পুনরুজ্জীবন ওই নাটকে কোনও নতুন মাত্রা যোগ করতে পারেনি, মনে হয়েছিল এ নেহাতই পুনরুজ্জীবন। ‘নবান্ন’-এর কাছাকাছি বিষয় নিয়ে বিজন ভট্টাচার্য আরও নাটক লিখেছিলেন, যার মধ্যে ‘দেবীগর্জন’ (১৯৬৬) এবং ‘গর্ভবতী জননী’ (১৯৬৯)— যেগুলিতে ‘নবান্ন’ থেকে তিনি আর একটু এগিয়ে কপিবুক সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা জুড়তে চেয়েছিলেন বলে মনে হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পঞ্চাশের মন্বন্তরে তিরিশ লক্ষ লোক অনাহারে মরেছিল দেখে ক্রুদ্ধ বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন: ‘ওরা কেড়ে খায়নি কেন?’ ‘নবান্ন’-তে কেড়ে খাওয়ার ঘটনা ছিল না, সেখানে শহরে আত্মজনদের অজস্র মৃতদেহ ফেলে গ্রামে ফিরে আসা চাষিদের ‘জয়’ হয়েছে নিছকই প্রকৃতির দাক্ষিণ্যে— সে বারে ভাল বৃষ্টি হওয়ায় ফসল ভাল হয়েছিল। এ এক ধরনের নিয়তিবাদও বলা যায়, কিংবা deux ex machina. কিন্তু ‘দেবীগর্জন’ বা ‘গর্ভবতী জননী’তে বিজন উপসংহারকে নিয়তির হাতে ছেড়ে রাখেননি, সেখানে যাকে শ্রেণিসংঘর্ষ বলে তা দেখানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও এই নাটকগুলি কেবল ইতিহাস হয়ে রইল কেন? সে কি তেভাগার স্মৃতি ও বামপন্থী আন্দোলনের তীব্রতা কমে গেল বলে? এমন তো হতেই পারে যে শ্রেণিসংঘর্ষের আখ্যান কখনও কখনও রূপক বা মেটাফর হয়ে যায়, যেমন হয়েছে গোর্কির ‘মা’ বা আইজেন্‌স্টাইনের ‘ব্যাট্‌লশিপ পোটেমকিন’। তখন তা নিজের ঘটনাবস্তু ছাড়িয়ে সময়ান্তরে নানা পুনরাবৃত্ত অর্থ পেতে থাকে। বিজন ভট্টাচার্যের ওই নাটকগুলি তা হয়ে উঠল না কেন? তার জন্য কি নতুন শ্রেণিসংঘাতের ইতিহাস বা পটভূমি নির্মাণ করতে হবে?

তাঁর রচিত নাটকের তালিকা খুব দীর্ঘ নয়। ‘সংসদ বাংলা নাট্য অভিধান’ অনুযায়ী সেই তালিকা: ‘আগুন’ (একাঙ্ক, ১৯৪৩), জবানবন্দী (১৯৪৩), ‘নবান্ন’ (১৯৪৪), ‘মরা চাঁদ’ (১৯৪৮, প্রথমে একাঙ্ক, ১৯৬০-এ পূর্ণায়িত), ‘অবরোধ’ (১৯৪৭), ‘জতুগৃহ’ (১৯৫১), ‘গোত্রান্তর’ (রচনা ১৯৪৭, ১৯৫৬-৫৭), ‘ছায়াপথ’ (১৯৬১), ‘দেবীগর্জন’ (১৯৬৬), ‘কৃষ্ণপক্ষ’ (১৯৬৬), ‘গর্ভবতী জননী’ (১৯৬৯-৭১), ‘আজ বসন্ত’ (১৯৭০), ‘সোনার বাংলা’ (১৯৭১), ‘চলো সাগরে’ (১৯৭২)। রবীন্দ্রনাথের গল্পের নাট্যরূপও দিয়েছিলেন তিনি, আর আকাশবাণীর জন্য লিখেছিলেন গীতিনাট্য ‘জীয়নকন্যা’ (১৯৪৮)। মৃত্যুর ছ’বছর আগে তাঁর নাট্যরচনার সমাপ্তি ঘটে।

অথচ নাটককার হিসেবে তাঁর কলমে শক্তি কম ছিল না। তাঁর অভিজ্ঞতা-পরিধি ছিল বিশাল, উচ্চমধ্যবিত্ত জীবন থেকে গ্রামীণ চাষি বেদে শ্রমিকদের জীবন পর্যন্ত— সকলের মুখের বাগ্‌ভঙ্গিটি তিনি অনায়াসে তুলে আনতে পারতেন। দু’একটি ক্ষেত্রে অনাবশ্যক অতিনাটকীয়তার আক্রমণ তিনি এড়াতে পারেননি (যেমন প্রভঞ্জন যখন সরদারকে দিয়ে কর্জের টিপছাপ নেয় সেই দৃশ্যটি), কিংবা উচ্চবিত্ত চরিত্রের বেলায় কিছু আরোপিত কৃত্রিম নাটকীয়তা তাঁকে নির্মাণ করতে হয়েছে। তবু স্বাভাবিক নাটকীয় সংলাপ রচনায় ছিল তাঁর প্রবল নিপুণতা। ‘গোত্রান্তর’-এ উদ্‌বাস্তু হরেন্দ্র মাস্টারের বস্তির প্রাথমিক স্কুল থেকে সব ছাত্ররা চলে যাচ্ছে, মোক্তার অভয়ও তার ভাইপোকে টাউন স্কুলে ভর্তি করেছে। তাকে রাস্তা দিয়ে যেতে দেখে হরেন্দ্র মাস্টার তাকে ডাক দেয়, ‘অভয়বাবু নাকি, আর ও অভয়বাবু, এই যে... অভয়বাবু দাঁড়িয়ে বলে, ‘কিছু বলছেন?’ তখন হরেন্দ্র মাস্টার বলে, ‘শোনেন তো বলি’।

এই ‘শোনেন তো বলি’ সংলাপটি বুঝিয়ে দেয়, এই নাটককারের কলম একটি চরিত্রের রক্তমাংসের মূর্তি তার ভাষার মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে জানত। আর জানত গান, পল্লির মানুষের গলার স্বতোৎসারিত গান, যা তার সংলাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফুটে বেরোতে চায়। তাঁর ওই গীতিরচনার সম্ভাবনাটি খুব বেশি নাটকে
তিনি ব্যবহার করলেন না দেখে একটু অতৃপ্তিও জেগে থাকে।

এত বিচিত্র সম্বল নিয়েও মানুষটি ইতিহাসের শিকার হয়ে গেলেন, এই যা দুঃখ। নাটককারের, বিশেষত বিজন ভট্টাচার্যের মতো দীক্ষিত নাটককারের উপায়ও ছিল না এই সংকট এড়ানোর, ইতিহাসের কণ্ঠস্বর হয়ে না-ওঠার, আবার তারই জন্য তাঁকে হয়তো ইতিহাস কিছুটা নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছে, পরেকার সময়ের ব্যবহারের জন্য রেখে দেয়নি।

ইতিহাসের এই আক্রোশ থেকে তাঁকে উদ্ধার করবে কে?

Advertisement