রাজনৈতিক আনুকূল্যে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখাপড়া বস্তুটি যাহাতে পরিণত হইয়াছে, তাহার নাম খুঁজিয়া পাওয়া দুষ্কর। কলেজে যখন পড়িবার দায় নাই, পরীক্ষা দেওয়ার দায়ই বা থাকিবে কেন? এ-দিকে, পরীক্ষায় পাশ না করিলে ডিগ্রি মিলিবে না। অতএব, টুকিয়া পাশ করাই দস্তুর। সব ছাত্রছাত্রীই পরীক্ষায় টোকে, এমন কথা বলিবার কারণ নাই। কিন্তু, ঝুড়িতে একটি পচা ফলও থাকিলে বাকি ফলগুলিও শেষ অবধি পচিয়া যায়। কিছু ছাত্রও যদি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করে, পরীক্ষা বস্তুটিই তাহাতে অর্থহীন হইয়া যায়। যাহারা টুকিতেছে, তাহাদেরও যেমন মূল্যায়ন হয় না, আর যাহারা সেই অন্যায় পথে হাঁটে নাই, তাহাদেরও পরিশ্রমের মর্যাদা থাকে না। তদুপরি, অসৎ ছাত্রদের ঠেকাইতে না পারিলে পরের দফায় আরও কিছু ছাত্র— ব্যবস্থাটি ন্যায্য হইলে যাহারা টুকিত না— তাহারাও টোকাটুকির পথে হাঁটিবে। বস্তুত, তাহাই ঘটিতেছে। পরীক্ষা ক্রমেই প্রহসনে পরিণত হইতেছে। ঠেকাইবার উপায় কী? মঙ্গলগ্রহ হইতে কেহ পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকাইলে বলিত, পর্যবেক্ষকরা কড়া হইলেই টোকাটুকি থামে। রাজ্যের শিক্ষকরা বলিবেন, অত সহজ নহে। টুকিতে বাধা দিলে ছাত্ররা যদি চড়াও হয়, তখন বাঁচাইবে কে? পরীক্ষাব্যবস্থার শুদ্ধতা রক্ষা করিতে প্রাণের ঝুঁকি লওয়া যে বুদ্ধিমানের কাজ নহে, রাজ্যের শিক্ষকরা বিলক্ষণ জানেন।

বারাসত রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নড়িয়া বসিয়াছেন। জানাইয়াছেন, অতঃপর পর্যবেক্ষকদের ছবিসহ টোকাটুকির রিপোর্ট জমা করিতে হইবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে প্রমাণ থাকিলে অসৎ ছাত্রদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে। প্রশ্ন হইল, যে পর্যবেক্ষক টোকাটুকিতে বাধা দেওয়ার সাহস পান না, তিনি ছবিই বা তুলিবেন কোন ভরসায়? কড়া হইবার সদিচ্ছাটি, অতএব, মাঠে মারা যাইবে বলিয়াই আশঙ্কা হয়। ছবি তুলিবার দায়িত্বটি এমন কাহারও উপর ন্যস্ত করা বিধেয়, ছাত্ররা যাঁহার উপর চড়াও হওয়ার সাহস পাইবে না। পশ্চিমবঙ্গে পুলিশ দিয়াও সেই কাজটি হইবে বলিয়া ভরসা হয় না। পরীক্ষার হলে ছবি তুলিবার জন্য বোধহয় আধাসেনা ডাকিতে হইবে! তাহার তুলনায় সহজতর ক্লোজড সার্কিট টিভি-র উপর ভরসা করা। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরে সিসিটিভি-র নজরদারি লইয়া একটি আপত্তি উঠিবে, অনুমান করা চলে। সত্য, ছাত্রছাত্রীদের পরিসরটিকে সর্বক্ষণের নজরদারির আওতায় আনিলে তাহাদের স্বাধীনতার ক্ষতি। কিন্তু, স্বাধীনতার অপব্যবহার ঠেকাইবার দায়িত্বটি প্রশাসনকে লইতেই হয়। এবং, শুধুমাত্র ক্লাসরুমের পরিসরে ক্যামেরা বসিলে অবাধ বিচরণের অধিকার সম্পূর্ণ ক্ষুণ্ণ হইবে, এমন দাবিও সম্ভবত কেহ করিবেন না। অবশ্য, শুধু ছবি তুলিলেই হইবে না। অপরাধীদের চিহ্নিত করিয়া দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হইবে। কেহ লেখাপড়া শিখিবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত একান্ত ভাবেই তাহার। কিন্তু, শিক্ষাব্যবস্থাটিকেই যদি কেহ ঘাঁটিয়া দিতে চায়, তাহাকে ঠেকাইবার দায়িত্ব প্রশাসনের। বিশ্ববিদ্যালয় এক বার কড়া হইলেই এই বেআদবির প্রবণতা কমিবে। তাহার জন্য অবশ্য রাজনৈতিক সদিচ্ছারও প্রয়োজন। ‘ছোট ছেলেদের ছোট ভুল’ বলিয়া ক্ষমাসুন্দর চক্ষে তাকাইলে কোনও নজরদারিতেই পরিস্থিতি বদলাইবার নহে।