Advertisement
১৩ জুলাই ২০২৪

অ-পূর্ব

ভারতীয় রাজনীতির মানসজগৎটিও মুগ্ধ করিবার মতো। কংগ্রেস বিধায়কদের বিজেপি পনেরো কোটির লোভ দেখাইয়া খুব গর্হিত কাজ করিতেছে, সন্দেহ নাই।

শেষ আপডেট: ০২ অগস্ট ২০১৭ ০০:১০
Share: Save:

ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এমন ঘটনা প্রথম বার। রাজ্যসভার একটি মাত্র আসনের নির্বাচন লইয়া গোটা দেশ এতখানি সরগরম। একটি আসনকে বাঁচাইবার জন্য আপাতত গুজরাতের ৪৪ জন বিধায়ককে কংগ্রেস গুজরাত হইতে নিরাপদ দূরত্বে রাখিতে বেঙ্গালুরু উড়াইয়া লইয়া যাওয়া হইয়াছে। কু-লোকে বলিতেছে, বিধায়কদের জোর করিয়া লইয়া যাওয়া হইয়াছে। কংগ্রেস দলের সু-লোকগণ অবশ্যই বলিতেছেন, না না, বিধায়করা সকলেই সানন্দে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত ভাবে বেঙ্গালুরুর রিসর্টে লুকাইতে আসিয়াছেন। রাজ্যসভার আসনটি হারাইবার ঝুঁকি লওয়া কেন একেবারেই অসম্ভব, তাহা সহজেই বোধগম্য— আসনটি আহমদ পটেলের, যিনি কি না সর্বভারতীয় কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সনিয়া গাঁধীর উপদেষ্টা। কিন্তু আসনটি নিশ্চিত করিবার যে পদ্ধতি গ্রহণ করা হইয়াছে, তাহা ঘটনাবহুল ভারতীয় ইতিহাসের প্রেক্ষিতেও অভূতপূর্ব বলিতে হয়। এই ভাবে এত জন বিধায়ককে অন্য রাজ্যে লুকাইয়া রাখিবার দৃষ্টান্তটি এক কথায় চমকপ্রদ। খুব কাছাকাছি যাইবার উপায়ও ছিল না, হাতের কাছে ওই একটি রাজ্যই কংগ্রেস শাসিত কি না। তাই কর্নাটকের উদ্দেশ্যেই বিমান ধরিতে হইয়াছে। গুজরাত বা অন্য কোনও বিজেপি-অধীন রাজ্য বিধায়কদের জন্য নিরাপদ ছিল না, ‘পোচিং’ আটকানো যাইত না। দল ভাঙিয়া আসিলে বিজেপি প্রতি বিধায়ককে যে পনেরো কোটি টাকা মাথাপিছু পুরস্কারের আশ্বাস দিয়াছিল, সেই প্রলোভন আটকানোর মনোবল কিংবা আদর্শ কিংবা নীতিপরায়ণতা কি বিধায়করা পাইতেন না। ভারতীয় গণতন্ত্র কেবল বিচিত্র নহে, নব নব উদ্ভাবনে মনোমুগ্ধকরও বটে।

ভারতীয় রাজনীতির মানসজগৎটিও মুগ্ধ করিবার মতো। কংগ্রেস বিধায়কদের বিজেপি পনেরো কোটির লোভ দেখাইয়া খুব গর্হিত কাজ করিতেছে, সন্দেহ নাই। কিন্তু ঘোড়া কেনাবেচার খেলা যেহেতু বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিয়মিত ভাবেই খেলিয়া থাকে, বিষয়টিকে বিজেপির বিশিষ্ট দোষ বলিয়া দেখা মুশকিল। কেন্দ্রীয় শাসক দলের হাতে অনেক টাকা আছে, এবং তাহা খরচ করিয়া তাহারা দেশের সর্বত্র বিরোধী শিবিরে ভাঙন ধরাইতে বদ্ধপরিকর, ইহা ছাড়া বেশি কিছু বলিবার নাই। কিন্তু কংগ্রেস বিষয়ে দুই-একটি কথা না বলিলেই নয়। বিধায়কদের টাকা দিলেই তাঁহারা সোনামুখ করিয়া প্রলুব্ধ হইয়া পড়িবেন, ইহাই বা কেমন দল-মত-আদর্শ? নিজেদের যে প্রভূত পরাজয় এই ঘটনায় মিশিয়া আছে, তাহা কংগ্রেস নেতৃত্ব বুঝিতেছেন কি? বুঝিতেছেন কি, যে এই আদর্শহীনতা ও সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণেই গোটা দেশে তাঁহারা উটপাখির মতো দুর্লভ প্রজাতি হইয়া পড়িতেছেন? বিজেপির নৈতিকতার কথা থাকুক, সংশ্লিষ্ট বিধায়কদেরও কি কোনও নৈতিক দায়িত্ব নাই?

বিশেষত যে বিধায়করা তাঁহাদের নিজস্ব নির্বাচনী কেন্দ্রের বিপদের দিনেও রাজ্য ছাড়িয়া পলায়ন করেন, তাঁহাদের কি আদৌ বিধায়ক হইবার যোগ্যতা আছে? গুজরাত এই মুহূর্তে ভয়ানক ভাবে বন্যাকবলিত। এবং বিভিন্ন বন্যাদুর্গত অঞ্চলের নেতারা এখন বেঙ্গালুরুর রিসর্টে চর্ব্য-চুষ্যে ব্যস্ত। হেতু ও লক্ষ্য যাহাই হউক না কেন, রাজনীতির দিক দিয়াও কি তাঁহাদের এই ব্যবহার সুবিবেচনাপ্রসূত? রাজ্যসভায় না হয় তাঁহাদের প্রার্থীকে বাঁচাইতে পারিলেন, গুজরাতের আগামী বিধানসভা নির্বাচনে কি ইহারা নিজেদের বাঁচাইতে পারিবেন? এখন সম্ভবত তাঁহাদের দলও সমস্যাটি বুঝিয়াছে, তাই প্রাণপণ কুযুক্তি দিতেছে যে বন্যা বিপর্যয় সামলানো রাজ্য সরকারের কাজ, বিধায়করা কতটুকু করিবেন ইত্যাদি। বিধায়কদের প্রধান কাজটি আসলে কী, সত্তর বৎসরের অভিজ্ঞতাও কংগ্রেস দলকে তাহা শিখাইতে পারে নাই। তাঁহারা কেবল শিখিয়াছেন, নির্বাচন হইলেই আসন নিশ্চিত করা।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE