টিভির পাশাপাশি, আজকাল দোকানেও তাদের দেখতে পাওয়া যায়। দিব্য হাসিখুশি চেহারার, চোখমুখ আঁকা, প্লাস্টিকের এক দল ইঞ্জিন। ওদের নাম ‘থমাস অ্যান্ড হিজ় ফ্রেন্ডস’। রেভারেন্ড উইলবাট আউড্রি-র রেল-রূপকথার চরিত্র এরা। তবে পুরোটাই রূপকথা নয়। এক সময়ে সত্যই রেলইঞ্জিনদের নানা বিচিত্র নাম হত। থমাস ও তার বন্ধুদের মতো সেই বিচিত্র নামের ইঞ্জিনদের খোঁজখবর নিতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি। সারা পৃথিবী জুড়ে তখন রেলের স্বর্ণযুগ। নতুন পরিবহণের মাধ্যম হিসেবে নানা জায়গায় রেললাইন বসছে। ইংল্যান্ডে শুরু হলেও, দ্রুত অন্যান্য দেশেও রেললাইন বসতে শুরু করেছে। পৃথিবীর নানা প্রান্তের রেলপথের জন্য বানানো হচ্ছে নিত্যনতুন রেলইঞ্জিন। সেগুলিকে রং ও নামের মাধ্যমে স্বতন্ত্র চরিত্রদানের চেষ্টাও শুরু হয়েছিল সে সময়ে। তা সে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ‘ফ্লাইং’ বা ‘গ্রেট বেয়ার’ হোক কিংবা ভারতের ‘ফেয়ারি কুইন’। 

উপমহাদেশে এই রেল-রোমান্টিকতার শুরু ‘সাহেব’, ‘সিন্ধ’ ও ‘সুলতান’দের হাত ধরে। ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল। মুম্বই থেকে থানে পর্যন্ত ২১ মাইল পথে সে দিন প্রথম বারের জন্য চলতে শুরু করেছিল রেল। ঐতিহাসিক সেই রেলপথে চলত এই তিন ইঞ্জিন। ভলক্যান ফাউন্ড্রির এই তিন ইঞ্জিনের নামকরণে ভারতীয় সমাজব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি ছিল। কিন্তু তার পরে যত সময় এগিয়েছে, রাজানুগ্রহ লাভের আশায়, ভারতের চুক্তিভিত্তিক রেল-ব্যবস্থায় তত দিনে জাঁকিয়ে বসেছে ‘লর্ড মিন্টো’, ‘লর্ড এলগিন’ বা ‘লর্ড হার্ডিঞ্জ’-এর মতো কর্তা ব্যক্তিদের নামের রেলইঞ্জিন। তবে সেই বাজারেও শিকে ছিঁড়ে ছিল এক বাঙালির। তিনি রামগতি মুখোপাধ্যায়। ১৮৬৫ সালের কথা। পূর্ব ভারতের নলহাটি-আজিমগঞ্জ লুপলাইন সে বছরেই ব্রডগেজ হল। আর ছোট লাইনের স্মৃতি হিসেবে তার শেষ জেনারেল ম্যানেজারের নাম ধরা থাকল ফ্রান্স থেকে আসা নতুন ইঞ্জিনের নামে।

রামগতিকে বাদ দিলেও, নামকরণের অভিনবত্বে বরাবরই এগিয়ে ছিল বাংলা। উনবিংশ শতকের সত্তরের দশকে যখন অন্য রেল সংস্থাগুলি সাহেবদের নামে ইঞ্জিনের নামকরণ করতে ব্যস্ত, তখন ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ভারতকে নতুন করে শেখাতে লাগল ইংরেজি বর্ণমালার পাঠ। ‘এ’ ফর ‘অ্যান্ট’, ‘বি’ ফর ‘বিইজ’, ‘সি’ ফর ‘ক্রিকেট’, ‘ডি’ ফর ডিয়ার’। প্রাণী জগতের নামে রেল ইঞ্জিনের নামকরণের এই রেওয়াজ শুরুর দিকে অনুসরণ করেছিল পূর্ব–মধ্য রেলওয়ে, উত্তর-পশ্চিম রেলওয়ে ও বেঙ্গল-নাগপুরের মতো একাধিক রেল সংস্থাও। অবশ্য প্রাণীজগৎ ছাড়াও, সে কালের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেল ইঞ্জিনের নামকরণে উঠে এসেছিল ‘সপ্তর্ষিমণ্ডল’, ‘কালপুরুষ’-এর মতো জ্যোতিষ্কমণ্ডলী অথবা ‘অ্যাটলাস’, ‘হারকিউলিস’, ‘স্যামসন’-এর মতো অতিমানব চরিত্রও। 

তবে ভারতের রেলইঞ্জিনের নামকরণে সত্যিকারের বদল এসেছিল বিশ শতকের গোড়ার দিকে। চিরাচরিত প্রথা ছেড়ে ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তখন গুরুত্ব দিতে শুরু করেছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তারা। ঐতিহাসিক নথি ঘেঁটে জানা যায়, ১৯০৯-১০ সাল নাগাদ মাদ্রাজ রেল কোম্পানি তাদের ১১টি প্যাসেঞ্জার লোকো ইঞ্জিনের নাম রেখেছিল ‘গঙ্গা’, ‘নর্মদা’, ‘গোদাবরী’, ‘কৃষ্ণা’-র মতো ভারতীয় নদীর নামে। আবার ‘বোম্বে-বরোদা’ এবং ‘মধ্য ভারতীয় রেল’-এর ওয়াই-বি ক্লাস লোকো ইঞ্জিনের নাম ছিল ‘সিটি অব অজমেঢ়’, ‘সিটি অব দিল্লি’ ইত্যাদি। ‘গ্রেট পেনিনসুলার রেল কোম্পানি’র ইঞ্জিনগুলির ‘আগ্রা’, ‘ঝাঁসি’, ‘কানপুর’-এর মতো নামের মাধ্যমে সেই সময় ফুটে উঠেছিল ভারতের মধ্যযুগে নগরায়ণের ধারাটি। 

ইঞ্জিনের নাম দেওয়ায় কোনও অংশে পিছিয়ে ছিল না ন্যারোগেজ রেলপথগুলিও। ক্যালেন্ডারে তখন ১৮৮০ সাল। হিমালয়ের কোল ঘেঁষে জন্ম নিচ্ছে ভারতবর্ষের অন্যতম জনপ্রিয় দার্জিলিং হিমালয়ান লুপ রেলওয়ে। সেই কাজের জন্য আমদানি করা ‘বি’ শ্রেণির ইঞ্জিনগুলির নামকরণ করা হয়েছিল ‘টাইনি’ ও ‘বেবি সিভক’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘টাইনি’ আজ হারিয়ে গিয়েছে। তবে ‘বেবি সিভক’ এখনও সসম্মানে দাঁড়িয়ে রয়েছে ‘নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন’-এ। এর পরেও যত দিন গিয়েছে, পাহাড়ের আঁকে বাঁকে চলতে থাকা ইঞ্জিনগুলির ‘হিমালয়ান বার্ড’, ‘মেঘদূত’, ‘গ্রিন হিল’-এর মতো নামকরণ হয়েছে। নামের মধ্যে দিয়ে আরও বেশি জীবন্ত হয়ে উঠেছে হিমালয়ের নৈসর্গিক শোভা। গ্বালিয়র রেলপথেও একই ভাবে দেখা গিয়েছে ‘চিতল’ বা ‘চিল্কারা’-র মতো হরিণের প্রজাতির নামে রেল ইঞ্জিনের নামকরণের প্রবণতা। ওড়িশার গজপতি রাজবংশের ‘পারালাখিমেঢ়ি লাইট রেলওয়ে’ আবার তার জন্মলগ্ন থেকেই ছিল আদ্যন্ত পৌরাণিক। বেঙ্গল-নাগপুর রেলপথের অন্তর্গত সেই চল্লিশ মাইলের রেলপথে স্থান পেয়েছিল ‘সীতা’, ‘রাম’, ‘পরশুরাম’-এর মতো পৌরাণিক চরিত্রের নামবিশিষ্ট রেল ইঞ্জিনেরা। ১৯০৩ সাল থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে তাদের লোকো ইঞ্জিনের নামকরণে উঠে এসেছিল জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রার নাম। 

স্বাধীনতা পরে, ভারতবর্ষের রেল ইতিহাসে অন্যতম কৃতিত্ব হল ‘চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ ওয়ার্কস’। প্রথম পূর্ণাঙ্গ রেলইঞ্জিন তৈরির এই ভারতীয় কারখানা ইঞ্জিন তৈরি থেকে শুরু করে ইঞ্জিনের নামকরণ— সবেতেই মুন্সীয়ানার ছাপ রেখেছিল। ১৯৫০ সালে সেখানেই নির্মিত হয়েছিল প্রথম ভারতীয় ব্রডগেজ রেলইঞ্জিন ‘ডব্লুজি ৮৪০১’। চিত্তরঞ্জন দাসের নামে যার নামকরণ হয়েছিল ‘দেশবন্ধু’। এর পর একে একে ‘বিবেকানন্দ’, ‘লোকমান্য’ (প্রথম বৈদ্যুতিক রেলইঞ্জিন) ‘বল্লভ’, ‘জওহর’-এর মতো নামকরণের মাধ্যমে এই কারখানা, ইঞ্জিনের নামকরণে তুলে নিয়ে এসেছিল ভারতের প্রায় সব স্মরণীয় মানুষের কথা। এমনকি, ১৯৭০-এ তৈরি হওয়া ভারতের শেষ বাষ্পীয় ইঞ্জিনেরও আঁতুড়ঘর এই চিত্তরঞ্জন। ইংল্যান্ডের ‘ইভিনিং স্টার’-এর অনুকরণে তার নাম রাখা হয়েছিল ‘অন্তিম সিতারা’।

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারতীয় রেলে এখন বিদ্যুৎ চালিত ইঞ্জিনের ভিড়। নামের বদলে বিশ্বের এই বৃহত্তম রেল ব্যবস্থায় ইঞ্জিনকে চিহ্নিত করতে প্রচলিত হয়েছে অক্ষর আর সংখ্যা নির্ভর শ্রেণি বিন্যাসের ধারা। তবুও কোথাও যেন স্মৃতিকাতরতা রয়েই গিয়েছে। চেষ্টা করলেও আর দেখতে পাওয়া যাবে না, দুর্গাপুর স্টেশনে ঠাঁই পাওয়া ‘ইন্দ্রাণী’ অথবা আসানসোলের ‘তিলোত্তমা’দের বাঁকুড়–দামোদর বা বর্ধমান-কাটোয়া লাইন ধরে দৌড়। শুনতে পাওয়া যাবে না, ‘রামগতি আসছে, রামগতি আসছে’ বলে কুলিদের সেই চিৎকার।

ঋণস্বীকার: জয়দীপ দত্ত ও হর্ষ বর্ধন, ইন্ডিয়ান স্টিম রেলওয়ে সোসাইটি

লেখক বিজয়পুর পলসোনা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক