সত্তর বৎসর বয়সি স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক সমাজ একটি ‘গুণ’ পুরা মাত্রায় রপ্ত করিয়াছে। পদে পদে সংকীর্ণতা দেখাইবার গুণ। প্রমাণ: এই দেশে কেহ কোনও কথা বলিলে, তিনি ‘কী’ বলিতেছেন বিবেচনার আগে খেয়াল করা হয়, তিনি ‘কে’, তাঁহার পরিচয় কী। পরিচয়ের উপর ভিত্তি করিয়া এই বার বক্তব্যটিকে শুনিবার ও হনন করিবার পালা শুরু হয়। এই প্রবণতা বাড়িয়া যায় যখন প্রান্তিক পরিচয়ের কোনও নাগরিক কিছু বলেন। ও, তিনি দলিত? তিনি মুসলিম? তবে তো তাঁহার বক্তব্য নির্ঘাত হীন উদ্দেশ্য দ্বারা প্রণোদিত। সাম্প্রতিক ভারত এই প্রবণতাকে সহসা অনেক উপরে উঠাইয়া লইয়া গেল। দেশের উচ্চতম রাজনৈতিক সভায়, যাহার নাম জাতীয় সংসদ, সেখানে এই প্রবণতার প্রবল বহর দেখাইলেন কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চতম আসনটিতে আসীন নেতা, যাঁহার নাম প্রধানমন্ত্রী। আর যাঁহার বিরুদ্ধে ইহা উৎক্ষিপ্ত হইল, তিনিও দেশের উচ্চতম পদগুলির একটির ধারক: উপরাষ্ট্রপতি। সব মিলাইয়া এক ক্লিন্নতম গহ্বরে নামিল ভারতীয় রাজনীতি, ঠিক সত্তরতম জন্মবার্ষিকীটির আগে। কেবল মুসলিম বলিয়া পদ ছাড়িবার আগে শেষ দিনে উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি যে অপমান হজম করিলেন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তাঁহাকে যে বিকৃত ব্যঙ্গে বিদ্ধ করিলেন, আনসারির উত্তরাধিকারী, পরবর্তী উপরাষ্ট্রপতি বেঙ্কাইয়া নাইডু যে ভাবে আনসারির বিরুদ্ধে দেশকে অপমান করার প্রকাশ্য অভিযোগ তুলিলেন— দেখিয়া শুনিয়া যে কোনও বোধসম্পন্ন নাগরিকের মাথা হেঁট হইবে। ইহা কোনও ব্যক্তি বা পদের অসম্মান নয়, ইহা সমগ্র জাতি বা রাষ্ট্রকে ধূলায় লুটাইবার ব্যবস্থা। জাতীয়তাবাদের উদগ্র কারবারিরা তাহা বুঝিতেছেন কি?  

অথচ আনসারির যে কথায় ক্ষুব্ধ হইয়া মোদীর তীব্র বঙ্গোক্তি, সেই কথাটি কিছু অশ্রুতপূর্ব নহে। আনসারি এ কথা আগেও বলিয়াছেন। সদ্য-প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিও একই কথা বলিয়া বিদায় লইয়াছেন। দেশের মাটিতে কান পাতিলে সর্বত্র ইহা শোনা যাইবে। যে কোনও বোধসম্পন্ন নাগরিক এই বক্তব্যের সারাংশের সঙ্গে একমত হইবেন। এমনকী বিজেপি ওগ আরএসএস-এর মুখপাত্ররাও আনসারির মূল বক্তব্য স্বীকার করিবেন যে, ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে এই মুহূর্তে অনিশ্চয়তার বোধ ছড়াইয়া পড়িতেছে। শেষ দলের কেবল একটিই বিশেষত্ব। তাঁহারা এই ঘটনায় জয়লাভের আনন্দ পাইবেন, কেননা তাঁহারা ইহাই চাহিয়াছিলেন। প্রসঙ্গত, মোদীর তির্যক মন্তব্যে মনোবলের ডোজ পাইয়া সোশ্যাল মিডিয়ার তৎপর ট্রোল-বাহিনী যখন প্রাক্তন উপরাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে বিষোদ্গারে মাতিল, তাঁহাদের অনেকেই স্পষ্ট বলিলেন, মুসলিমদের অনিশ্চয়তায় রাখিবার জন্যই তো তাঁহাদের রাজনীতি! বলিলেন, ভারতীয় মুসলিমরা ইহা সহ্য করিতে না পারিলে অন্য কোনও ‘নিশ্চিত’ ভূমিতে চলিয়া যান!

আনসারির মতো মর্যাদাপূর্ণ ও সর্বার্থে যোগ্য জনসংশাসকের যদি এই আক্রমণ সহ্য করিতে হয়, তাহাই বস্তুত প্রমাণ করে, সংখ্যালঘু জনসাধারণ কী দশায় আছেন। গোটা দেশের সামনে দশ বৎসরের উপরাষ্ট্রপতি আনসারি শুনিলেন যে তিনি বিশ্বের মুসলিম দেশগুলিতেই স্বচ্ছন্দ, তাই সেখানেই কাজ করিয়াছেন, আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতেই উপাচার্য থাকিয়াছেন, এবং তাঁহার পূর্বপুরুষরা খিলাফত আন্দোলনের মাধ্যমেই জাতীয় রাজনীতিতে পা দিয়াছেন। নরেন্দ্র মোদী দলীয় রাজনীতির ব্যাকরণটি ভারি উত্তম বোঝেন, ফলে আনসারির অন্যান্য গুণ, দক্ষতা, ক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা বাদ দিয়া মাত্র এই কয়টি তথ্য বলিলেই যে দেশজোড়া বিজেপি-আরএসএস সমাজ একটি তাৎক্ষণিক অর্থ পাইয়া যাইবে, তিনি বিলক্ষণ জানেন। আবারও তিনি সফল। দেশের সম্মান বিসর্জন দিয়া বিজেপির স্বার্থসিদ্ধিতে। জাতীয়তার নামে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্বের ধ্বজা তুলিতে।