হি‌ংসায় উন্মত্ত পৃথ্বীর কথা লিখিয়াছিলেন রবীন্দ্রনাথ। নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্বে দীর্ণ সেই পৃথিবীর পথ ঘোর কুটিল, তাহার মনের গতি লোভজটিল। ১৯২৭ সালের বুদ্ধজন্মোৎসব উপলক্ষে লিখিত সেই কবিতার বয়স শতাব্দী পূর্ণ হইতে চলিয়াছে, উন্মত্ত হিংসার দাপট অপ্রতিহত। দূরের পৃথিবী দূরস্থান, কাছের পৃথিবীতেও হিংসার দানবেরা ক্রমাগত উঠিয়া আসিতেছে অন্তহীন দ্বন্দ্বের কুম্ভীপাক হইতে— ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, যে ক্ষমতার লালসায় ওতপ্রোত সম্পৃক্ত রহিয়াছে অর্থের লিপ্সা, লুণ্ঠনের লোভ, খুচরো দুর্নীতির তস্করবৃত্তি হইতে বালি-খাদান, গরু-পাচার, জমি-বাড়ি-নির্মাণের সিন্ডিকেট-ডাকাতির অলিখিত ছাড়পত্রের দখলদারি। পশ্চিমবঙ্গ এখন রক্ততিলকে লাঞ্ছিত। নির্বাচনী মরসুমের রাজনৈতিক হিংসায় এ-কালে বঙ্গভূমি সারা দেশে কেবল অগ্রণী নহে, অনন্য। কিন্তু এখন তো নির্বাচন সম্পন্ন, তাহার ফলাফল প্রকাশিত, দিল্লির দরবারে নূতন সরকার অধিষ্ঠিত, দেশ ভালমন্দ মিলাইয়া নবপর্যায়ে যাত্রা শুরু করিয়াছে। অথচ এই রাজ্যে দলীয় রাজনীতির হানাহানি চলিতেছে অবিরাম। সেই রাজনীতির রেষারেষিই বঙ্গীয় হিংসা এবং অশান্তির চালিকাশক্তি।

রণক্ষেত্রে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী ভারতীয় জনতা পার্টি দুই প্রধান— কার্যত অ-তৃতীয়— প্রতিপক্ষ। দুই দল মিলিয়া লোকসভা নির্বাচনে চোদ্দো আনা ভোট দখল করিয়াছে। হানাহানির ক্ষেত্রে তাহাদের সম্মিলিত বখরা সম্ভবত পনেরো আনারও বেশি। বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রমাগত বোমা ও গুলি ছুটিতেছে, আগুন জ্বলিতেছে, লাশ পড়িতেছে, দুই দলই দাবি করিতেছে তাহারা আক্রান্ত। কোথায় কাহার দাবি কয় আনা সত্য, তাহার হিসাব কষা প্রায়শই সুকঠিন। বিশেষত, এক দল হইতে অন্য দলে যাতায়াতের পথটি যখন এমনই সুগম যে, তাহা দেখিলে ভজনলালও লজ্জা পাইতেন। একই দলের একাধিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের সম্ভাবনাও কম নহে। কিন্তু যে দলের যে গোষ্ঠীর রক্তই ঝরুক না কেন, তাহা হইতে উৎপন্ন হইয়া চলে আরও বহু রক্তক্ষয়ের দানবীয় শক্তি। এই রক্তবীজের চারণভূমিতে নিরন্তর আবর্তিত হইয়া চলে ঘাতপ্রত্যাঘাতের দুষ্টচক্র। এবং সেই চাকা ঘুরাইয়া যে যাহার স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা চালাইতে থাকে। কোনও এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী বা সমর্থক আক্রান্ত হইলে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা সেখানে উপস্থিত হন, বিজেপির কেহ আক্রমণের শিকার হইলে বিজেপি নেতারা সেখানে দৌড়ন। দলসর্বস্ব ক্ষুদ্র রাজনীতির ধারা পশ্চিমবঙ্গে সমানে বহিতেছে।

ক্ষুদ্র রাজনীতির প্ররোচনা বহুমাত্রিক। প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করিয়া বিজেপি যখন উত্তেজনাপ্রবণ এলাকায় বিজয় মিছিল বাহির করে, তখন প্ররোচনার অভিযোগ উড়াইয়া দেওয়া চলে না। কিন্তু অন্য দিকে, বিজয় মিছিলের বিরুদ্ধে প্রশাসনের এমন নির্দেশ দিবার পিছনেও যে শাসক দলের ক্ষুদ্রস্বার্থের ভূমিকা প্রবল, তেমন সংশয়ও অতি স্বাভাবিক। ঠিক তেমনই, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক যে ভাবে আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করিয়া রাজ্যকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠাইয়া ‘পরামর্শ’ দিতে ব্যস্ত হইয়া পড়িতেছে এবং প্রধানমন্ত্রী তড়িঘড়ি রাজ্যপালকে বৈঠকে ডাকিতেছেন, তাহাতে রাজনৈতিক অভিসন্ধির ছায়া ঘনঘোর। কিন্তু কেন্দ্রের সতর্কবাণীর জবাবে রাজ্য সরকার এবং শাসক দল যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিংসা ও অস্থিরতার তাণ্ডবকে কার্যত ছোট ছোট ঘটনা বলিয়া উড়াইয়া দিতে ব্যস্ত, তাহাও সত্যের দাবি পূরণ করে না। কেন্দ্র ও রাজ্য, শাসক দল ও বিরোধী শিবির, সমস্ত পক্ষের নায়কদেরই এখন একটিই কর্তব্য: রাজ্যের স্বার্থে হাতাহাতি বন্ধ করিয়া হাতে হাত ধরা। হিংসায় উন্মত্ত পশ্চিমবঙ্গের প্রয়োজন শান্তির পক্ষে সর্বদলীয় ঐকমত্য। কিন্তু বাস্তব অবস্থা এই প্রয়োজনের সম্পূর্ণ বিপরীত। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে— হিংসার পক্ষে।