Advertisement
২১ জুলাই ২০২৪
সম্পাদকীয় ১

পরাজেয়

পঞ্জাব ও গোয়ার পর মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অব দিল্লির পরাজয়টি সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য বলাই যায়। কারণটি সহজ। ২০১৫ সালে যে দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে ৭০টির মধ্যে ৬৭টি আসন জয় করিয়া আক্ষরিক অর্থে ভূধ্বংসী জয় লাভ করিয়াছিল।

শেষ আপডেট: ০৩ মে ২০১৭ ০০:৪২
Share: Save:

পঞ্জাব ও গোয়ার পর মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন অব দিল্লির পরাজয়টি সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য বলাই যায়। কারণটি সহজ। ২০১৫ সালে যে দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে ৭০টির মধ্যে ৬৭টি আসন জয় করিয়া আক্ষরিক অর্থে ভূধ্বংসী জয় লাভ করিয়াছিল, সেই একই দিল্লিতে মাত্র দুই বৎসর পরে ২৭০টির মধ্যে ৪৮টির বেশি আসন না পাইবার মধ্যে একটি গুরুতর রাজনৈতিক বার্তা আছে। অবশ্য ‘আপ’ নেতৃত্ব সেই বার্তা কতখানি হৃদয়ঙ্গম করিলেন বলা মুশকিল। তাঁহারা আপাতত ব্যস্ত রহিয়াছেন, ভোটের যন্ত্র, ভোটের ব্যবস্থা ইত্যাদির ত্রুটি এবং অসারতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণে। তাৎক্ষণিক উত্তেজনা স্তিমিত হইলে যদি ভাবিবার কিছু অবকাশ মিলে, তাঁহারা ভাবিয়া দেখিবেন, দিল্লির এই পরাজয় তাঁহাদের কী বলিতেছে। যে উত্তুঙ্গ প্রতিশ্রুতি লইয়া তাঁহারা ২০১৫ সালে জিতিয়া আসিয়াছিলেন, কোন ফাঁক গলিয়া সেই সকল প্রতিশ্রুতি জনসাধারণের কাছে নিছক ধোঁকা বলিয়া প্রতিপন্ন হইল, কী ভাবে তাঁহাদের প্রতি ন্যস্ত সামাজিক আস্থা শূন্যতায় পর্যবসিত হইল। ইহা কেবল তাঁহাদের পরাজয় নহে, ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ হইতেও ইহার মধ্যে একটি বিরাট শিক্ষা আছে। ব্যর্থতার কোন সীমারেখাটি পার হইলে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রদত্ত উজ্জ্বল প্রতিশ্রুতিসমূহ অর্থহীন সারহীন বুলিতে পরিণত হয়, আপ-এর গত দুই বৎসরের কাজকর্ম দেখিয়া তাহা শিখিবার আছে। আপ নেতৃত্ব সেই দিক হইতে ব্যর্থতার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

তাঁহারা বলিয়াছিলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবেন। প্রথম দিকটায় যুদ্ধের আভাসও মিলিয়াছিল। কিন্তু নেতারা যদি নিজেরাই দুর্নীতিবলয়ে নিমজ্জিত হন, তাহা হইলে যুদ্ধ কাহারই বা বিরুদ্ধে। বাছবিচারহীন প্রবেশাধিকারের কারণে দলের মধ্যে একটি বড় অংশ নিজেরাই নানা ধরনের কুকার্যে লিপ্ত। সোমনাথ ভারতীর মতো বিধায়করা জাতিবিদ্বেষী মারপিটেও কোমর বাঁধিয়া নামিলেন। ইঁহাদের দুর্নীতিবিরোধী যোদ্ধা হিসাবে মানিয়া লওয়া কঠিন, অন্যান্য দলের গুন্ডা-নেতা হইতে তাঁহারা কিছুমাত্র পৃথক, এ রকম ভাবাও কঠিন। তাঁহারা বলিয়াছিলেন, ক্ষমতায় আসিয়াই বিজলি ও পানির ব্যবস্থা করিবেন। কিন্তু বিজলি-পানির উত্তরসূরি কোনও কার্যক্রম তাঁহাদের মাথা হইতে বাহির হইল না। এই যৎসামান্যের উপর ভিত্তি করিয়া কি একটি দলের মতাদর্শ বা ভিত তৈরি হয়? জনসাধারণের চোখে ভরসাযোগ্যতা তৈরি হয়? তাঁহারা বলিয়াছিলেন, দিল্লি জয় হইয়াছে, এই বার অন্য প্রদেশে অশ্বমেধ অভিযান। মাঝখান হইতে দেখা গেল, যে একটিমাত্র ব্যক্তির উপর ভর করিয়া দিল্লির সরকার চলিতেছিল, সেই কেজরীবালও ভোটের তাড়নায় দিল্লির বাইরেই অধিকাংশ সময় কাটাইলেন। দুই কূলই গেল।

আপ-এর ব্যর্থতার শিকড় খুঁজিলে বিরোধী দলের সাফল্যের ক্রমবর্ধমান ঊর্ধ্বরেখার কথা আসিবেই। কেজরীবালের নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণটি নরেন্দ্র মোদীর সাফল্যগাথার সঙ্গে গভীর ভাবে সংযুক্ত। যে দুর্নীতিদমন ও দরিদ্রপালনের স্বপ্ন কেজরীবালের উত্থান ও আগমনের মধ্যে নিহিত ছিল, যাহা দিয়া দিল্লির প্রত্যন্ত, দরিদ্র সম্প্রদায়, বস্তিবাসী, অভিবাসী ইত্যাদির মনে তিনি আশার তরঙ্গ তুলিয়াছিলেন, সেই স্বপ্ন ইতিমধ্যে গণকল্পনায় মোদীর মুখের মধ্যে বিধৃত হইয়াছে। ইতিমধ্যে নোটবন্দি নীতির কল্যাণে ‘আমিরি হঠাও’ ধুয়াটি সফল ভাবে জনমনে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। ব্যক্তি অরবিন্দ ও ব্যক্তি নরেন্দ্র পরস্পরের প্রতিস্পর্ধী হিসাবে প্রতিভাত হইয়াছেন। প্রথম জনের অদক্ষ ইমেজ-এর বিপরীতে দ্বিতীয় জনের অনলস কর্মী ইমেজ জিতিয়া গিয়াছে। ইমেজ কী ভাবে জনমানসে তৈরি হয়, তাহা একটি গোপন রহস্য তো বটেই। কিন্তু সেই রহস্যের অন্তত একটি অংশকে জ্ঞাত তথ্য বলা যায়: নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা সকলের থাকে না।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

অন্য বিষয়গুলি:

Delhi Municipal election
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE