Advertisement
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২
এক দিকে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা, অন্য দিকে সত্যিকারের বাস্তব
PM Narendra Modi

স্বাধীনতার অতীত ও ভবিষ্যৎ

ইন্দিরা গান্ধীর ‘ইমার্জেন্সি’ ছিল সরাসরি ঘোষিত জরুরি অবস্থা। আজকের জরুরি অবস্থা কিন্তু তা নয়, এ হল সংবিধান-বিরুদ্ধ গুপ্ত ইমার্জেন্সি।

৭৬তম স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

৭৬তম স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

রজতকান্ত রায়
শেষ আপডেট: ১৯ অগস্ট ২০২২ ০৪:৪৯
Share: Save:

দেশের শাসক দলের কাছ থেকে নির্দেশ এসেছে, ভারতবর্ষের ইতিহাস পুনর্লিখন করতে হবে। বিশেষ করে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিবৃত্ত। দেশের ভবিষ্যৎ গড়বার পক্ষে সেটা বিশেষ জরুরি।

শুনে কিছু ভাবনা হল। কী ভাবে আবার ইতিহাস লিখতে হবে? অবশ্য সঙ্ঘ পরিবারের তরফ থেকে এ প্রস্তাব নতুন নয়। বাজপেয়ী-আডবাণী জমানায় এই প্রকল্প অনেক দূর গড়িয়েছিল। তখনও হিন্দুত্বের আলোয় স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি বিস্তৃত পুনর্মূল্যায়ন হয়েছিল। স্কুলে থাকতে আমরা শিখেছিলাম যে, জাতির জনক হলেন মহাত্মা গান্ধী, আর তাঁর দুই শিষ্য নেহরু ও পটেল প্রথম ভারত সরকারের নেতা হন, মৌলানা আজাদের সঙ্গে। এঁদের সরকারের এক বিকল্প পূর্বতন সরকার ছিল আজাদ হিন্দ সরকার, যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু, ইতিহাসের মাস্টারমশাইরা এও আমাদের শিখিয়েছিলেন। এ বার কিন্তু নতুন করে আমাদের বোঝানো হল, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম সারির নেতা হলেন বিনায়ক দামোদর সাভারকর এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, আর হিন্দুত্বের পরম্পরাগত প্রতিষ্ঠান হিন্দু মহাসভা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ, জনসঙ্ঘ ও ভারতীয় জনতা পার্টি হল আসল ন্যাশনালিজ়ম-এর প্রবক্তা। স্বীকার করব, এই ‘লেসন’ সহজে হজম হয়নি। কিন্তু সত্যিকারের পিলে চমকে গেল, যখন শিক্ষক হওয়ার পর এক জন বিজেপি নেতার মুখে শুনলাম, হরপ্পার সভ্যতা ছিল আসলে আর্য সভ্যতা, এবং আর্যরা এ দেশে জন্মে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল।

এ সব চমকের সঙ্গে ত্রিশ বছর আগেই পরিচয় হয়েছিল। এখন ভাবনা হল, হিন্দুত্ব আবার কোন নতুন মুখ নিয়ে হাজির হতে চলেছে? চমকে গিয়ে নিজেকে জিজ্ঞাসা করলাম, যা শুনছি তা ঠিক শুনছি তো? মনের মধ্যে এই আলোড়ন ঘটাল স্বাধীনতা দিবসে শাহজাহানবাদের লাল কেল্লা থেকে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (ছবি) বাণী। শেষ পর্যন্ত মোগল বাদশাহ শাহজাহানের গড়া দুর্গের প্রাকার থেকেই এক হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রীকে দেশের অতীত ও বর্তমান মিলিয়ে তাঁর ‘সঙ্কল্প’ প্রকাশ করতে হল? বক্তৃতা শুনে বিস্মিত হয়ে ভাবতে লাগলাম, কতকাংশে এ তো আমারই মনের কথা, এ কী করে মোদীর ‘মন কি বাত’ হয়? বড় লেখকরা শুনেছি দুইটি দৃশ্যমান লাইনের মধ্যে অদৃশ্য লাইন গুঁজে দেন। চর্যাপদের সিদ্ধরা নাকি একই পঙ্‌ক্তিতে একাধিক অর্থ দিয়ে রাখতেন। এও কি সেই রকম ‘সন্ধ্যাভাষা’? মোদীজিও কি সান্ধ্য অর্থ আরোপ করে শ্রোতাদের একাংশকে শোনাচ্ছেন মৌখিক বার্তা, এবং আর এক অংশের জন্য সংরক্ষিত করে রাখছেন ‘মন কি বাত’!

মোদী-প্রদত্ত সঙ্কল্পগুলি হল: ১) ভারতবর্ষের বিকাশ; ২) বড়র কাছে ছোটর দাসত্ব মোচন; ৩) ভারতীয়দের ঐতিহ্য বা উত্তরাধিকার নিয়ে গর্ব বোধ; ৪) ঐক্য ও বৈচিত্র; ৫) নাগরিকদের কর্তব্যপরায়ণতা; ৬) দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই; ৭) পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই। এ ছাড়া আরও ভাল ভাল কথা বলেছেন মোদীজি। যেমন, ভারতের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভিত্তি হল ‘ডেমোক্র্যাসি’; ভারতীয় সমাজের শক্তি হল তার বৈচিত্র; এবং ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’।

তবে কি মোদীজিকে ভুল বুঝলাম? মনে প্রশ্ন জাগল, নেতাদের বক্তৃতা কি আক্ষরিক অর্থে বুঝতে হবে? উত্তর খুঁজতে গিয়ে কিছু অনতিপুরাতন কাসুন্দি ঘাঁটতে হল। বাস্তব ক্ষেত্রে বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী ও আডবাণী উপপ্রধানমন্ত্রী হয়ে ‘লিবারাল’ হয়ে গিয়েছিলেন বলে অনেকের মনে একটা ধারণা গড়ে উঠেছিল। অন্তত সরকার গঠন করার পর তাঁরা সংবিধান মেনে চলতেন। ‘রামজন্মভূমি’-তে তাঁরা জোর করে মন্দির গড়েননি, ব্যাপারটা আদালতের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। আদালতও তার স্বাধীনতা হারায়নি। মোদী-শাহ জুটি কিন্তু আদালতের সম্মতি আদায় করে ধুমধাম করে রামমন্দির গড়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। মন্দির তৈরিও শুরু হয়েছে। সংবিধান-বিরুদ্ধ মসজিদ ভাঙার কোনও প্রতিকার হল না। গুজরাত গণহত্যাকালে প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী মোদীকে ‘রাজধর্ম’ পালনের পরামর্শ দিয়েছিলেন; কিন্তু মোদীর তখনকার কার্যক্রমে সে নির্দেশ পালনের আগ্রহ দেখা যায়নি। এখন মোদীর নব-সঙ্কল্পের মাধ্যমে সেই আগ্রহ শুধু কথায় নয়, কাজেও প্রকাশ পেয়েছে কি? সাম্প্রতিক ঘটনাবলি কি তা-ই বলছে?

কিছু কাল অতিবাহিত হয়ে গেলে ঘটনাবলির মানে হয়তো স্পষ্টতর হবে, বর্তমানে এগুলির গুপ্ত তাৎপর্য বোঝা সহজ নয়। পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ও সেন্ট্রাল বুরো অব ইনভেস্টিগেশন যথাক্রমে ফ্ল্যাটে লুকোনো টাকার স্তূপ এবং গরু পাচারের পথরেখা আবিষ্কার করে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ উদ্রেক করার কাজে হাত দিয়েছে। টাকার স্তূপের তাৎপর্য যত সহজে বোঝা যায়, টাকার স্তূপের সুচিন্তিত সুচারু প্রদর্শনীর তাৎপর্য তত সহজে বুঝতে পারা যায় না। টাকার খেলা কেন্দ্রেও চলছে, ভুলে যাব না। এবং তার পরিমাণ ও উদ্দেশ্য বৃহত্তর। শুনছি এ রাজ্যে বেআইনি টাকার স্তূপ ৫০ কোটি টাকার উপর এবং গরুব্যবসায় ২৪ কোটি টাকার মতো। তা আবিষ্কার করার জন্য ইডি ভারতের নানা স্থান থেকে ১০০ জন গোয়েন্দা পাঠিয়েছে, এক শান্তিনিকেতনেই ৫০ জন তদন্তকারী চড়াও হয়েছেন। অপরপক্ষে, কেন্দ্রে বিরোধীপক্ষ একের পর এক অন্যূন ১০০০ কোটি টাকার দুর্নীতির তদন্তের জন্য অরণ্যে রোদন করে চলেছে। একাধিক বিজেপিবিরোধী সরকার নিপাত করার জন্য সাংসদ ক্রয় করা হয়েছে বা হবে বলে শোনা যাচ্ছে। ছত্তীসগঢ়ের বিজেপি বিরোধী সরকার সরাবার উদ্দেশ্যে ভ্রাম্যমাণ গাড়িতে বাক্সবোঝাই টাকা উদ্ধার করেছে কলকাতার সিআইডি— দিল্লির ইডি বা সিবিআই নয়। মোটামুটি ধরে নেওয়া যায় যে, বিজেপির সদস্যরা (নতুন বা পুরনো যা-ই হোন না কেন) মারাত্মক তদন্তভয় থেকে মুক্ত, কিন্তু বিরোধীরা বিপন্ন। গণতন্ত্র থেকে বিরোধীপক্ষকে সরিয়ে দিতে মোদী-শাহ সরকার নির্বাচনী, আইনি বা তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানগুলির যে বিপুল ব্যবহার চালু করেছে, তা অভূতপূর্ব। জরুরি অবস্থার সময়েও (১৯৭৫-৭৭) তা দেখা যায়নি। এটা কি নরেন্দ্র মোদীর বক্তৃতা-কথিত গণতন্ত্র?

স্বাধীনতা দিবসে মোদীর বাণী বিবেচনা করতে গিয়ে মনের মধ্যে একটা গহন শঙ্কা জাগল। তা হল এই যে, আমাদের আসল বিপদ অসাধুতা নয়, এ বিপদ গভীরতর, এ বিপদ স্বাধীনতা হারানোর। এটা সোজাসুজি ঘটছে না। নগ্ন ভাবেও ঘটছে না। ঘটছে ছলে ও কৌশলে। এ খেলায় বিপক্ষের অসাধুতা প্রতিপন্ন করাটাই প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

অশনিসঙ্কেত দেখতে পাচ্ছি কি? ন্যাশনাল হেরাল্ড একটি বহু পুরনো স্বাধীনতাকামী কাগজ। সার্কুলেশন তেমন নেই, অর্থবল তুচ্ছ। এই মামলা দিয়ে ইডি আজ ঘন ঘন লম্বা সময় ধরে জেরা করছে সনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, প্রিয়ঙ্কা বঢরাকে। উদ্দেশ্য কী? মনে পড়ছে একটা চালু মশকরা। পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও অনুব্রত মণ্ডলের পর এখন ইডি হয়ে দাঁড়াবে ‘এ বার দিদি’। সব মশকরাতে হাসি পায় না। ২০০২ সালে গুজরাতের অবস্থা নিয়ে দ্য টেলিগ্রাফ-এ একটা কার্টুন বেরিয়েছিল: হিচককের ফিল্ম ডায়াল এম ফর মার্ডার অবলম্বনে গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীর ছবির তলায় ক্যাপশন ছিল ‘ডায়াল এম ফর মোদী’। দেখে হাসি পায়নি মোটেও। অবশ্য মনে আশ্বাস ছিল আমি গুজরাতে নেই, আমি মুসলমানও নই। কিন্তু এখন কি তা হতে চলেছে ‘ডায়াল এম ফর এম-ডি’? এম-ডি, অর্থাৎ মার্ডার অব ডেমোক্র্যাসি। বাঙালি হিন্দু হয়েও এ বার কি পার পাব? গণতন্ত্রের হত্যা কি আপনার, আমার, সকলের চরম ক্ষতি নয়?

ইন্দিরা গান্ধীর ‘ইমার্জেন্সি’ ছিল সরাসরি ঘোষিত জরুরি অবস্থা, লুকোছাপা ছিল না। আজকের জরুরি অবস্থা কিন্তু তা নয়, এ হল সংবিধান-বিরুদ্ধ গুপ্ত ইমার্জেন্সি। এর মূলমন্ত্র জোর নয়, এর মন্ত্র প্রতারণা। তার চেয়েও বড় বিপদ হল এই ইমার্জেন্সি শুধু রাষ্ট্রকেন্দ্রিক নয়, সমাজ-রূপান্তরও এর অন্যতম লক্ষ্য। নতুন রাষ্ট্রের সামাজিক ভিত্তি হবে এক ত্রিকোণ শক্তি— হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্থান (বাংলা, মহারাষ্ট্র ও পঞ্জাবের মধ্যবর্তী ভূখণ্ড)। গান্ধী-নেহরু-পটেল-আজাদের জাতীয়তাবাদের বদলে আসছে হিন্দুত্ববাদী সংখ্যাগুরুবাদী জাতীয়তাবাদ, যার প্রথম সারিতে সংশোধিত হিন্দু চতুঃনেতা— গান্ধী, নেতাজি, আম্বেডকর, সাভারকর।

ক্ষমতায় এসে মোদী ভারতীয় আত্মপরিচয়টি আত্মসাৎ করার প্রচেষ্টায় গান্ধীর মতো বাথরুম ঝাঁট দিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথের মতো দাড়ি পুনর্বিন্যাস করেছিলেন। এখন তিনি আর স্বচ্ছ ভারতীয় ব্যক্তিত্ব প্রচার করেন না, দাড়িও পূর্ব রূপে ফিরে গেছে। এখন চলছে সঙ্কল্পের প্রচার।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.