×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৮ জুন ২০২১ ই-পেপার

‘যে দুর্দশার মধ্যে আমরা এসে পড়লাম, সেটা ঘটার সত্যিই কোনও দরকার ছিল না।’ অতিমারির ভারত সম্পর্কে বললেন অমর্ত্য সেন

অভাব সুচিন্তা ও সমদৃষ্টির, সাক্ষাৎকারে বললেন অমর্ত্য সেন

০৮ জুন ২০২১ ০৫:৩৮
উৎকণ্ঠা: দেশের রাজধানীতে হাসপাতালের সামনে কোভিড আক্রান্তের স্বজনরা। দিল্লি, মে ২০২১।

উৎকণ্ঠা: দেশের রাজধানীতে হাসপাতালের সামনে কোভিড আক্রান্তের স্বজনরা। দিল্লি, মে ২০২১।
পিটিআই।

প্রশ্ন: কোভিড-১৯ অতিমারিতে ভারতের অগণিত মানুষ বিপর্যস্ত। অথচ একটা সুসভ্য, সুব্যবস্থিত ও সুসংহত স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা চালু থাকলে এমন মহামারির মোকাবিলাও অনেক সুষ্ঠু ভাবে করা যায়, সেটা নানা দেশ ও ভারতের কিছু রাজ্য দেখিয়েছে। আমরা কি বলতে পারি, এই বিপর্যয় যতটা শিবকীর্তি, তার চেয়ে অনেক বেশি আমাদের নিজকীর্তি?

অমর্ত্য সেন: আমার মনে হয়, দুটো জিনিসে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার খুবই অবহেলা করেছে। এক, আমাদের জীবনযাত্রায় স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার যে খুব বড় ভূমিকা আছে, সেটা উপেক্ষা করা। এবং এমন নয় যে এ বিষয়ে কিছু ভাবা হয়নি। যখন এই নিয়ে তর্কাতর্কি হয়েছে— আমাকেও এই নিয়ে কিছু ঝগড়া করতে হয়েছে সরকারি পক্ষের কিছু লোকের সঙ্গে, তাঁদের সমগোত্রীয় কিছু অর্থনীতিবিদের সঙ্গেও— তাঁরা বলেছেন, এগুলো নিয়ে এখন চিন্তার কোনও কারণ নেই, লোকের টাকা হলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, এ-সব হবে। এই ধারণাটার মধ্যে চিন্তার যে প্রচণ্ড অভাব, সেটা শুধু সাধারণ লোকের স্বাস্থ্যকে দুর্দশার মধ্যে বন্দি রাখে না, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বড় সমস্যা ঘটলে আমাদের তা মোকাবিলা করার ক্ষমতা অত্যন্ত কমে যায়।

এই ব্যাপারটা নানা ভাবে কাজ করে। এক তো, সাধারণ ডাক্তারখানা, যেখানে লোকে গিয়ে সাহায্য নিতে পারেন, সেগুলো চলে না। কিন্তু তা ছাড়াও, স্বাস্থ্য নিয়ে লোকে যদি আলোচনা করেন, তবে সমস্যায় পড়লে কী করা যায় সে বিষয়ে তাঁরা ফলপ্রসূ ভাবে চিন্তা করতে পারেন। ভারতের যে সব অঞ্চলে স্বাস্থ্যের ব্যবস্থা তুলনায় ভাল, যেমন কেরল, সেখানে এটা দেখা যায়। এক বার ইন্ডিয়ান ইকনমিক অ্যাসোসিয়েশনের মিটিং হচ্ছিল কেরলে, আমি ছিলাম বোধহয় কোভালমে, সেখান থেকে গাড়ি করে যখন যাচ্ছি, আমার একটু কাশি এবং শারীরিক যাতনা যাচ্ছিল, তার জন্যে কিছু ওষুধ কিনতে হল। ওষুধ পাওয়া গেল একটি মুদির দোকানে। দোকানদার জিজ্ঞাসা করলেন, আমি যে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধটা নিলাম, তাতে আমার কোনও অ্যালার্জি আছে কি না, সেটা কি আমি জানি। এর থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার বোঝা যায়— ওঁদের মধ্যে অসুখবিসুখ, ওষুধ ও অসুখ প্রতিরোধের মতো বিষয়ে আলোচনা হয়। সেটার খুবই দরকার, বিশেষ করে এমন মহামারির সময়। লোককে সব কিছু বেটে খাইয়ে দিতে হবে এমন না, তাঁরা নিজেরাও যাতে অনেকটা ভাবতে পারেন সেটা দরকারি।

Advertisement



আর একটা দিক হচ্ছে, শুধু যাঁরা অবস্থাপন্ন তাঁদের নিয়ে চিন্তাভাবনা করা, অন্যদের অবহেলা করা। তখন এমন একটা কর্মসূচি লোকের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয় যাতে গরিব লোকেদের প্রতি নজর একেবারেই নেই। যখন প্রথম যাত্রায় লকডাউন করা হল, চার ঘণ্টার নোটিসে, তখন ভাবাই হল না, যাঁদের খেটে খেতে হয়, তাঁরা কাজ কোথা থেকে পাবেন, মাইনে কোথা থেকে পাবেন, তাঁদের খাবারদাবার কোথা থেকে আসবে, এবং তাঁরা ওষুধপত্রই বা কী ভাবে কিনবেন।

এখন, নানা দিক থেকে এই সব ঘাটতির ফলে আমরা এমন একটা জায়গায় পৌঁছলাম যেখানে সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্যে কী করা দরকার তা নিয়ে কোনও চিন্তা নেই, উদ্বেগ নেই। মুখোশের সাহায্যে অথবা ভ্যাকসিন জাতীয় কোনও ওষুধের সাহায্যে সংক্রমণ আটকানোর ব্যবস্থা করা গেলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, লোকের কাজকর্ম, এগুলো চলতে পারে। অথচ সেটা একেবারেই ঠিক ভাবে করা হল না। এর মধ্যে এক দিকে আছে স্বাস্থ্য বিষয়ে চিন্তার অভাব, আর এক দিকে, অর্থনৈতিক, সামাজিক বিচারে সব লোকের প্রতি সমদৃষ্টির অভাব। এর একটা পরিণাম তো স্পষ্টই দেখা যায়। ভারতবর্ষ অন্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি ভ্যাকসিন তৈরি করে, অথচ ভ্যাকসিনের ঘাটতি আমাদের দেশে প্রচণ্ড রকম।

প্র: ভ্যাকসিন নিয়েও আমাদের দেশে যা হচ্ছে তা পৃথিবীতে বিরল। ভ্যাকসিন যে লোককে কিনতে হচ্ছে এটা শুনে আমাদের বিদেশি বন্ধুরা অবাক…

: এটাতে আমরা চিন্তার একটা প্রচণ্ড রকম গন্ডগোল দেখতে পাই। যে রকম অর্থনীতিই আমরা ভাবি না কেন... সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতিতে তো বলা হবেই যে এই জিনিসগুলো সবাইকেই বিনা পয়সায় দেওয়া হোক। কিন্তু রক্ষণশীল মেনস্ট্রিম অর্থনীতিতেও এটা পরিষ্কার, যে জিনিসগুলোর ব্যবহারে শুধু নিজের নয়, অন্যদেরও উপকার হয় সেগুলো বিনা পয়সায় দেওয়ার পক্ষে যুক্তি জোরালো। ভ্যাকসিন এর খুব ভাল দৃষ্টান্ত, কারণ যিনি ভ্যাকসিন নিচ্ছেন তাঁর কিছুটা উপকার নিশ্চয়ই হচ্ছে, কিন্তু আরও বড় কথা হল, এ ছাড়া সমাজের সবাইকে বাঁচানো সম্ভব নয়। এমন নয় যে আমেরিকা খুব সমাজতান্ত্রিক দেশ হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের কাছেও এটা খুবই স্পষ্ট যে ভ্যাকসিনগুলো বিনা পয়সায় দেওয়া দরকার।

অথচ ভারতবর্ষে কেন্দ্রীয় সরকার ধরে নিয়েছেন যে, ভ্যাকসিন কিনতে পাওয়া যাচ্ছে, পকেটে টাকা থাকলেই লোকে কিনতে পারবে, এটাই তো খুব আনন্দের কথা। এর মধ্যে যে বিরাট ভুল আছে, এটা কর্তাব্যক্তিদের চোখে পড়ছে না। এই প্রশ্নটা তুলে ভাল হয়েছে, কারণ আমি নানা বিদেশি কাগজে ভারতবর্ষের যে সমালোচনা দেখেছি, তার মধ্যে পয়সা দিয়ে ভ্যাকসিন কেনার সমালোচনাটা খুব দেখিনি। কিন্তু এ নিয়ে গলা খুলে, যাকে আওয়াজ দেওয়া বলে, তার খুব প্রয়োজন আছে। যে ভাবেই হোক, লোককে বিনা পয়সায় ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যবস্থা করতেই হবে। এই নিশ্চয়তাটা খুবই জরুরি। পিএমকেয়ার্স ফান্ড থেকেও সবার আগে বিনা পয়সায় লোককে ভ্যাকসিন দেওয়া দরকার।

প্র: অর্থাৎ সামাজিক ব্যবস্থাটা জরুরি?

: স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় থেকে আমরা বলে আসছি, একে অন্যকে সাহায্য করার জন্যে আমাদের সামাজিক ব্যবস্থা দরকার, কিন্তু যখন আমাদের হাতে ক্ষমতা এল তখনও খুবই নড়বড়ে ব্যবস্থা হল। বর্তমান সরকারের আমলে তো ব্যবস্থাটা আরও অনেক বেশি পঙ্গু হয়ে গেল, ভাঙা পড়ল। এর পিছনে এক দিকে আছে আমাদের মূর্খতা। এখানে সামাজিক মূর্খতার কথা বলছি— কী ভাবে রোজগার করা যায়, কী করে টাকা বাড়ানো যায়, সে-সব ব্যাপারে অনেক লোকের খুবই বুদ্ধি আছে, কিন্তু সেই বুদ্ধিটা সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে কাজে লাগানো হয়নি। অন্য দিকে, অনৈক্য বা অসমতার প্রতি আমাদের বহুদিন ধরে অনীহার অভাব, সেটারও বড় ভূমিকা আছে। তাই, যে দুর্দশার মধ্যে আমরা এসে পড়লাম, সেটা ঘটার সত্যিই কোনও দরকার ছিল না।

প্র: বিপর্যয়ের মধ্যেই নানা দেশে, এই দেশেও, আর্থিক বৈষম্য আরও বাড়ছে। অথচ অতিমারির অভিজ্ঞতা বলছে, এ ভাবে চলতে পারে না, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবন ও জীবিকার স্বার্থকে সবার আগে রেখে নীতি রচনা জরুরি। বিপর্যয়ের ধাক্কায় কি সেই পরিবর্তন আসতে পারে?

: এটা খুবই বড় প্রশ্ন। এর উত্তরে এখানে এইটুকু বলা যায় যে, সমস্যা সমাধানের নতুন ব্যবস্থাপনা দিয়ে সামাজিক উন্নতি ঘটানো তখনই সম্ভব, যখন দেশের সব লোককে তার মধ্যে ধরবার চেষ্টা হয়। যেমন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বিলেতে ভীষণ খাদ্যাভাবের ভয় দেখা দিয়েছিল। দেশের সরকার এ নিয়ে খুবই চিন্তিত হলেন— তাঁরা এমন একটা অবস্থা চাননি যেখানে কিছু লোক না খেতে পেয়ে মারা যাবে বা অসুস্থ হবে। এই সময়েই ভারতে অবশ্য এ রকমটাই ঘটছিল— বেঙ্গল ফ্যামিনে ত্রিশ লক্ষ লোক মারা গেলেন। ইংরেজরা ভারতবর্ষকে বাঁচাতে কিছু না করলেও নিজেদের দেশে তাঁরা ঠিক করলেন যে, যুদ্ধের সময় রেশনিং চলবে, কন্ট্রোল চলবে। রেশনিং এবং কন্ট্রোল ভারতেও ঢোকানো হয়েছিল, কিন্তু সেটা শুধু যাতে যুদ্ধের সময় কলকাতায় অশান্তি না হয় তার জন্য, ফলে রেশন কার্ড পাওয়ার অধিকার ছিল শুধু কলকাতার লোকেদের। এবং তাঁদের খুব কম দামে খাবার দিতে গিয়ে ব্রিটিশ সরকার ঠিক করলেন, গ্রামাঞ্চল থেকে, যতই দাম পড়ুক, খাবার কিনে তাতে ভর্তুকি দিয়ে, সস্তায় কলকাতায় খাবার দিতে হবে। তার ফলে কলকাতার লোকেরা খাদ্যের ব্যাপারে আগের থেকে বেশি নিরাপত্তা পেলেন, অন্য দিকে গ্রামাঞ্চলে চালের দাম অত্যন্ত বেড়ে গেল, যাঁদের রোজগার ততটা বাড়েনি বা একেবারেই বাড়েনি তাঁরা মারা পড়লেন।

ইংল্যান্ডে এমনটা যাতে না হয়, তা নিয়ে সবাই চিন্তিত ছিলেন। তখন দেশ চালাচ্ছিলেন ওয়র ক্যাবিনেট। সেখানে কনজ়ার্ভেটিভরা ছিলেন, যেমন চার্চিল, তেমনই ছিলেন অ্যানুরিন বেভান, ছিলেন স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস-এর মতো বামপন্থী লিবারালরাও। সরকার সিদ্ধান্ত নিলেন, সবাইকে রেশন কার্ড দেওয়া হবে, সস্তায় খাবার দেওয়া হবে। তার ফলে, যুদ্ধের সময় যখন খাবারের মোট জোগান সবচেয়ে কম হল, তখন ইংল্যান্ডের গরিব লোকেরা জীবনে প্রথম বার ভরপেট খাবার সুযোগ পেলেন। এর ফলে স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন দেখা দিল। যুদ্ধের আগের দশকে ইংল্যান্ডের মানুষের গড় পরমায়ু বেড়েছিল এক থেকে দেড় বছর, যুদ্ধের দশকে সেটা বাড়ল ছয় থেকে সাত বছর। এর কিছু বছর বাদে, আমি তখন প্রেসিডেন্সি কলেজে ছাত্র, এ নিয়ে খুব আলোচনা চলছিল। ইংল্যান্ড থেকে যাঁরা আমাদের সঙ্গে ডিবেট করতে এসেছিলেন, যেমন ব্রায়ান এব্‌ল্ স্মিথ, তাঁদের মাথায় তখন ঘুরছে যে যুদ্ধের শিক্ষাটা কী পাওয়া গেল। শিক্ষাটা পাওয়া গেল এই যে, রেশনিং আর কন্ট্রোল দিয়ে সবাইকে সমচক্ষে দেখার মধ্যে স্বাস্থ্যের উন্নতির বড় সম্ভাবনা আছে। তার থেকে ইংল্যান্ডে এনএইচএস— ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস-এর জন্ম। ১৯৪৮ সালে, যুদ্ধের ঠিক পরে, অ্যানুরিন বেভান ম্যাঞ্চেস্টারে পার্ক হসপিটাল-এর উদ্বোধন করলেন। ক্রমশ ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস এবং ওয়েলফেয়ার স্টেট-এর দিকে ইংল্যান্ড এগিয়ে গেল। সে দিকে ক্রমশ গেল ফ্রান্স, ইটালি, জার্মানি, ইত্যাদি।

এতে বোঝা যায়, খাদ্যাভাবের ফলে যে সমস্যা আসতে পারত, তা এড়িয়ে অন্য ব্যবস্থার প্রচেষ্টা করা হল, যার ফলে লোকের খুব উপকার হল। এবং ওঁরা আবিষ্কার করলেন যে রাষ্ট্রের একটা বড় ভূমিকা দরকার। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে সরকারি যে ব্যবস্থা তৈরি হল— সেটা আজও পাকা, এনএইচএস তো এখনও চলছে— যুদ্ধের আগে সেটা একেবারেই ছিল না। নতুন সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় আগের সমস্যাগুলোরও অনেকটা সুরাহা হল। কিন্তু তা সম্ভব হয়েছিল এ-কারণেই যে, সরকার যাঁরা চালাচ্ছিলেন তাঁদের মধ্যে সমতা-মুখী চিন্তা জোরদার ছিল। তাঁরা অনেকেই মেনে নিলেন যে, সমস্যার সমাধানে সামাজিক ব্যবস্থার বড় ভূমিকা আছে।

এই নিয়ে ইউরোপে অনেক দিন ধরেই আলোচনা চলেছে। মার্ক্স তাঁর শেষ লেখা, ক্রিটিক অব দ্য গোথা প্রোগ্রাম-এ বলছেন, সকলের জন্য সমতার ব্যবস্থা এখনই করা যাবে না, সেটা করতে হবে ভবিষ্যতে। কিন্তু গোথা প্রোগ্রামে যে বলা হয়েছিল, লোককে উৎপাদনশীলতা অনুযায়ী টাকা দিলে আর কিছু ভাবার দরকার নেই— মার্ক্স বললেন যে সেটা ভুল। তাঁর মত ছিল, ‘প্রত্যেকের কাছ থেকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী নেওয়া আর প্রত্যেককে তার প্রয়োজন অনুযায়ী দেওয়া’— এই নীতি এখনই কার্যকর করে ফেলা সম্ভব না হলেও সেই লক্ষ্যে এগোনোর জন্য কী করা যায় তা নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। এই চিন্তাগুলো ইউরোপের লোকের মাথায় ছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তাঁরা কথাটা তুললেন যে, এখন রাষ্ট্রের সাহায্যে, সামাজিক সুব্যবস্থার সাহায্যে, সমতার দিকে নজর রেখে এগোনোর একটা চেষ্টা করা যায়। ইংল্যান্ডে এবং ইউরোপের অন্য নানা দেশে যুদ্ধের পরে সামাজিক ব্যবস্থাগুলোয় বড় রকম পরিবর্তন এল। সমস্যাগুলো সমাধানের যে প্রচেষ্টা হয়েছিল— অসমতাকে বাড়তে না দিয়ে বরং কমানোর প্রচেষ্টা এবং সমাজের সাহায্য নিয়ে ব্যক্তিগত অর্থনীতির ঘাটতি পূরণ করার প্রচেষ্টা— এই পরিবর্তনে সেগুলোর বড় ভূমিকা ছিল।

আমেরিকার কথা ধরা যেতে পারে। এ দেশে তো ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস নেই, কিচ্ছু নেই। এখানে কখনও ভাবাই যায়নি যে, সবাই স্টেডিয়ামে গিয়ে বিনা পয়সায় ভ্যাকসিন নিয়ে আসতে পারবে, যেমন আমরা সবাই করলাম। এটা একটা নতুন জিনিস হল। অবশ্য এখানে অনেক বিষয়েই, যেমন হাসপাতালের ব্যবস্থায়, অসমতাটা থেকে গেল। ইউরোপে যে সেটা অনেকটা কম, তার একটা বড় কারণ, সেখানে এ জন্য অনেক দিন ধরে নানা রাজনৈতিক আন্দোলন তৈরি হয়েছিল, পুরনো বামপন্থী ও মার্ক্সীয় চিন্তাধারারও একটা বড় রকমের প্রভাব ছিল।

তাই আমাদের শুধু এই আশায় বসে থাকলে চলবে না যে— সমস্যার কল্যাণে, তার থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়ে আমাদের অনেক উপকার হবেই হবে। হবে না, যদি সমাধান করতে গিয়ে আমরা সমতার দিকে নজর না দিই এবং সমাজের কর্তব্য কত দূর যেতে পারে সে বিষয়ে চিন্তা না করি। আমরা যদি এর থেকে কোনও উপকার এখনও অবধি না পেয়ে থাকি, এবং পাচ্ছি না বলেই আমার ধারণা, তার কারণ— আমরা এই দিকে চিন্তা করছি না। এর মধ্যে রাজনীতির প্রশ্নটা খুবই বড়। আমেরিকায় যে নতুন জিনিসটা আজ দেখছি, তার পিছনেও একটা বড় রকমের পরিবর্তন আছে, যাকে বলা যেতে পারে র‌্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্ট। যাঁরা পিছিয়ে রয়েছেন, কৃষ্ণবর্ণের লোকেরা, ল্যাটিন আমেরিকান লোকেরা, তাঁদের কী করে সুযোগ দেওয়া হবে, এই নিয়ে বড় রকমের চিন্তা, আলোচনা, আন্দোলন— ‘ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার’ ইত্যাদি। ভারতবর্ষে তো উল্টো হয়েছে। বামপন্থী রাজনীতি প্রায় উঠে যাওয়ার মতো অবস্থা। পশ্চিমবঙ্গে তো বামপন্থী দলগুলো একটাও সিট পেলেন না। এটা তো শুধু বামপন্থার দুঃখের কথা না, এর মধ্যে যে সামাজিক ঘাটতিটা ধরা পড়ল, সেটা তো নানা ভাবে আমাদের কষ্ট দেবে। সেটা শুধু বামপন্থীদের ঘাটতি না, সব মানুষেরই ঘাটতি। কারণ এক ধরনের চিন্তাধারা বামপন্থা দিয়ে আসে, যেটা অন্য দিক থেকে পাওয়াটা কঠিন।

প্র: চিন্তার অভাব কি এর জন্য দায়ী?

: আমাদের সমস্যাগুলোর মধ্যে কিছু এসেছে দারিদ্র থেকে, কিছু এসেছে অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাব থেকে, আর কিছু এসেছে চিন্তার বিভ্রান্তি থেকে। এ ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি বড় রকম চিন্তার বিভ্রান্তি। একটু চিন্তা করলেই লোকের এটা বোঝা উচিত যে এই সমস্যাটা আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি যুক্তির আলস্য থেকে। (চলবে)

সাক্ষাৎকার: অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায় কুমার রাণা

Advertisement