Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৫ জুলাই ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

চৈতন্যের ইতিহাসে সংবেদনশীলতা আর লগ্নতার নিরন্তর খোঁজ

এক অনন্য মেধাজীবী

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত বঙ্গের বাখরগঞ্জ বরিশাল এলাকার সিদ্ধকাঠি গ্রামে গুহ-বকসীদের খাস তালুকদার বংশে রণজিৎ গুহ-র জন্ম।

গৌতম ভদ্র
২৩ মে ২০২২ ০৪:৩৮
Save
Something isn't right! Please refresh.
দিগ্‌দর্শক: আনন্দ পুরস্কার গ্রহণের পর বক্তৃতা দিচ্ছেন রণজিৎ গুহ, ১৪১৫ বঙ্গাব্দ (২০০৯ সাল)

দিগ্‌দর্শক: আনন্দ পুরস্কার গ্রহণের পর বক্তৃতা দিচ্ছেন রণজিৎ গুহ, ১৪১৫ বঙ্গাব্দ (২০০৯ সাল)

Popup Close

তরবো(অ)পি হি জীবন্তি জীবন্তি মৃগপক্ষিণঃ।

স জীবতি মনো যস্য মননেন হি জীবতি।।

— যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ

Advertisement

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত বঙ্গের বাখরগঞ্জ বরিশাল এলাকার সিদ্ধকাঠি গ্রামে গুহ-বকসীদের খাস তালুকদার বংশে রণজিৎ গুহ-র জন্ম। গ্রামের নামে অনুষঙ্গে জড়িত বৌদ্ধতন্ত্র, গ্রাম সমাজ একেবারে আধা-সামন্ততান্ত্রিক। তবে বংশে ঠাকুরদা পণ্ডিত ও শিক্ষক, বাবা পেশায় আইনজীবী। একশো বছর পরেই অস্ট্রিয়াবাসী, অথচ আদ্যন্ত বাঙালি বলে গর্বিত রণজিৎ গুহ-র স্মৃতিতে সেই কুলজি-চিহ্ন মুছে যায়নি। তাঁর সাম্প্রতিকতম রচনায় শৈশবের কালকেই তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে ‘ফর্মেটিভ পিরিয়ড’ বলেছেন। ‘বরিশালনামা’ তো নানা স্মরণীয় বাঙালের কথাকীর্তিতে সমুজ্জ্বল। কিন্তু রণজিৎ গুহ-র তুলনায় অন্য কারও জীবন, চরিত্র ও রচনা এত বিতর্কিত, এত রঙ্গিবিরঙ্গি নয়, দেশ-বিদেশে, ব্যক্তি ও সমূহের বহুধা সম্পর্কের টানাপড়েনে ছড়িয়ে পড়েনি। শতায়ুজীবীর প্রতি এই শ্রদ্ধার্ঘ্যটি তাঁর জীবনী নয়; তাঁর বিশাল চিন্তনকর্মের পর্যালোচনা দূর অস্ত্। এই নিবেদনটি কেবল এক অনন্য মেধাজীবীর অনুসন্ধিৎসার অভিমুখ, বাঁকবদল ও তাঁর ত্রি-পর্বী লেখালিখির পরিচয়ের রৈখিক খসড়ামাত্র।

সিদ্ধকাঠির এক খাটুলি পরিবারের নগা রণজিৎ গুহ-র শৈশব সুহৃদ, আবার ওই সব পরিবারের বয়স্করাই বাড়ির প্রজা, হয় দলিত, নয় মুসলমান। এই মনিব-প্রজা দ্বন্দ্বের (উভয়ার্থে) বোধটি যৌবনের ইতিহাসচর্চায়, ও কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্যরূপে দেশ-বিদেশে কাজ করার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়। তারই প্রকাশ দেখি ঔপনিবেশিক বাংলার প্রথম ভূমি আইন চিন্তার উপর তাঁর লেখা বোধি-উজ্জ্বল সন্দর্ভটিতে, যার নাম আ রুল অব প্রপার্টি ফর বেঙ্গল: অ্যান এসে অন দি আইডিয়া অব পার্মানেন্ট সেটলমেন্ট (প্যারিস ১৯৬৩/ নিউ দিল্লি ১৯৮২)। নানা কায়েমি স্বার্থের বিরোধ কথা ও ধন লুট করার সরল ইতিবৃত্তের বাইরে তিনি দেখালেন কোম্পানির আমলাদের নানা তর্কের মধ্যে কী ভাবে ফিজ়িয়োক্রেসি বা প্রাকৃত ধনবাদী ভূমিতত্ত্ব বাংলায় বিনিয়োগনিষ্ঠ, উন্নতিকামী অথচ বশংবদ ভূম্যধিকারী সম্প্রদায় গড়তে চেয়েছিল। অথচ বাস্তবে জন্ম নিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের খাজনাগৃধ্নু, নানা স্তরে বিভক্ত, জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগীর দল। উপনিবেশে প্রবুদ্ধ ইউরোপীয় জ্ঞানের এ-হেন আকারপ্রাপ্তিকে রণজিৎ গুহ বলেছেন ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপর্যাস’ বা ‘এপিস্টেমোলজিক্যাল ভায়োলেন্স’; তাঁর প্রাকৃত লব্জে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এক ‘ত্রিশঙ্কুর জগৎ’ তৈরি করল— উন্নতির ইচ্ছা ও জ্ঞানফল উল্টোমুখী হতে চলল। দ্বিতীয়ত, তাঁর সন্দর্ভে স্পষ্ট যে সাম্রাজ্যের যুগে জ্ঞানতত্ত্বের নির্মিতিতে ইউরোপীয় চিন্তাভাবনার জগৎ ও ঔপনিবেশিক শাসন থেকে পাওয়া জ্ঞানধারণা একেবারে জড়াপট্টি, ইতরেতর সম্বন্ধে আবদ্ধ। আজ এ কথাটা সবাই জানে ও মানে। কিন্তু সে দিন জ্ঞানতত্ত্বের এই ইতিহাসচিন্তার পথিকৃৎ ছিলেন রণজিৎ গুহই।

এই সন্দর্ভের অনুষঙ্গে লেখা হয়েছিল এক রাশ প্রবন্ধ, যেমন মেদিনীপুরের লবণ শিল্পে মলঙ্গী তথা লবণ উৎপাদকদের প্রতিরোধ আন্দোলনের বিশ্লেষণী ইতিবৃত্ত থেকে স্থানীয় আর্কাইভস ব্যবহার করে বর্ধমান জেলার আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বিবরণী। স্বদেশের ইতিবৃত্তে ঔপনিবেশিক শাসনের অভিঘাতের আদি স্পন্দনগুলি রণজিৎ স্পর্শ করার চেষ্টা করেছিলেন। জ্ঞানতাত্ত্বিক আলোচনায় তিনি দৈশিক ও কালিক অভিজ্ঞতার সতত উপস্থিতিকে কোনও দিন ভোলেননি।

লিখনশৈলীর জন্য প্রশংসিত হলেও আ রুল অব প্রপার্টি প্রথাসম্মত ইতিহাস আলোচক ও দরবারি মার্ক্সবাদীদের কাছে আদৃত হয়নি। ঘটনার প্রবাহে ১৯৫৯-এ ইংল্যান্ডে ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স-এ অধ্যাপনার কাজে রত হওয়ার পরও রণজিৎ গুহ থাকবন্দি ঔপনিবেশিক সমাজে শাসকের সর্বেশ্বরতার ক্ষমতাসীমা ও বিন্যাস নিয়ে ভাবনা থামাননি, সেই ভাবনাসূত্রে স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের গণতন্ত্রে চিন্তার পরিসরে ঔপনিবেশিকতার দায়ভারের সজীব অস্তিত্বকে দাগাতে শুরু করেছিলেন। ইতিহাস-চিন্তায় বাঁক নেওয়ার সেই প্রস্তুতি-পর্বের স্ফুরণ দেখা যায় ১৯৭০-এর দশকের ফ্রন্টিয়ার-এর মতো রাজনৈতিক পত্রিকায় লেখা তিনটি প্রবন্ধে। যেমন, উদারনৈতিক সংস্কারচিন্তা ও সদিচ্ছায় আবদ্ধ নীলদর্পণ-এর মতো নাটকে বিদ্রোহী চৈতন্যের ‘ভদ্রস্থ’ উপস্থাপনের সমালোচনা, গণতন্ত্রের সুভদ্র সংস্কৃতিতে নির্মম পুলিশি অত্যাচারের তীক্ষ্ণ ব্যাখ্যা আর জেলে আটক মেরি টাইটলার-এর দেখা ভারতীয় সমাজে জারিত সন্ত্রাসের বিবরণীর এক মর্মস্পর্শী বিশ্লেষণ।

১৯৭০-৭১ সালে গান্ধীর গণ-আন্দোলনের স্বরূপ-সন্ধানে গবেষণা করতে ভারতে এসে নকশালবাড়ির রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তাঁর গবেষণার অভিমুখ পাল্টে গেল। সৃজনশীল ইতিহাসচর্চার দ্বিতীয় পর্বে তাঁর ক্রিয়াকর্ম দু’টি শাখায় প্রসারিত হল। প্রথমত, কয়েক জন অতি-তরুণ গবেষককে জড়ো করে তিনি ‘নিম্নবর্গ ইতিহাসচর্চা’-র ধারা প্রবর্তন করলেন। উদ্দেশ্য— ভারতে চালু আধুনিক ইতিহাসবিদ্যার আদিকল্পের বিরুদ্ধে নতুন এক আদিকল্পের অনুসন্ধান করা। ১৯৮০ সালে তাঁর বহুচর্চিত ও বিতর্কিত ইংরেজি ম্যানিফেস্টো ও বাংলা প্রবন্ধে বলা হল যে, আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চার কেন্দ্রে আছে রাষ্ট্রিকতা, সেই ইতিহাসবিদ্যা আসলে ‘বকলমে’ লেখা রাষ্ট্রশক্তির ইতিকথা, ইংরেজ শাসনজাত প্রগতি ও সভ্যতার পক্ষে নানা ধাঁচের বৃত্তান্ত। অন্য পক্ষে, সমালোচনাত্মক জাতীয়তাবাদী, এমনকি মার্ক্সবাদী ইতিহাসচর্চাও পর্যবসিত হয়েছে দেশজ উচ্চবর্গের আদর্শবাদের মহিমাগাথায় ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সাফল্যের নান্দীপাঠে। এই দ্বিবিধ উচ্চবর্ণকেন্দ্রিক ইতিহাসচর্চায় নিম্নবর্গের ক্রিয়াকাণ্ডের বৃত্তান্ত যে গরহাজির, তা কিন্তু একদম নয়। কিন্তু সেই বৃত্তান্ত উচ্চবর্গীয় উদ্যোগ আখ্যানের অনুপর্ব মাত্র, কালু ডোমরা চিরকাল যেন প্রভুর জন্য প্রাণদান করে।

এই ধারণার বিরুদ্ধে ‘নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা’র আদিকল্প ভারতীয় রাজনীতির জগৎকে দু’টি বর্গের রাজনীতিক্ষেত্রে বিভক্ত করল। দমনকারী ও দমিতের ক্ষমতার বৈপরীত্যের নানা সূত্র ধরে কর্ম ও মানসজগতে নিম্নবর্গের আনুগত্য, সহকারিতা ও প্রতিবাদের রূপগুলি তুলে ধরল। অবশ্যই উচ্চবর্গীয় ও নিম্নবর্গীয় রাজনীতি সময় বুঝে প্রতিচ্ছেদিত হতে পারে, ক্ষেত্রবিশেষে স্ব-উদ্যোগ আড়াআড়ি ও খাড়াখাড়ি সমাজের বেণিবন্ধন গড়তে পারে। সময় বুঝে ওই বন্ধনের গিঁটগুলি আলগা হয়, এমনকি খুলেও যায়। তবে দুই ক্ষেত্রের স্বাতন্ত্র্য অবশ্যধার্য। রণজিৎ গুহ প্রণোদিত ও বোধিত ‘নিম্নবর্গের চর্চা’ বলে নামাঙ্কিত নিবন্ধখণ্ডগুলিতে এই সতত সঞ্চারমাণ রাজনীতির কথন ও লেখনই তরুণ গবেষকরা সম্পন্ন করতে শুরু করলেন।

এই যৌথকর্মের সঙ্গে শ্লিষ্ট তাঁর লেখা বহুবিতর্কিত বই এলিমেন্টারি আসপেক্টস অব পেজ়্যান্ট ইনসার্জেন্সি ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া-তে (১৯৮৩) এল ভারতের কৃষক বিদ্রোহের মুহূর্তগুলি, আর তার তুলনাসূত্রে, ইউরোপের কৃষক বিদ্রোহ ও চিনের কৃষক বিদ্রোহের অভিজ্ঞতা। বিদ্রোহী চৈতন্যে জাত কর্মকাণ্ডের কাঠামোয় রণজিৎ গুহ নিম্নবর্গের প্রতিস্পর্ধী রাজনৈতিক ভাবনার সাধারণ লক্ষণগুলি চিহ্নিত করলেন। তাঁর মতে, এই চৈতন্যের সাধারণ রূপ-লক্ষণগুলি প্রকীর্ণ থাকে জীবনযাপনের নানা ক্রিয়ায়। এই রূপ-লক্ষণগুলির সংহত ও জ্বলন্ত স্ফুরণ ঘটে কৃষক উপপ্লবের নানা ছোটবড় ঢেউয়ে, সরকার-সাহুকার-জমিদারের ক্ষমতাবিন্যাসের মৌহূর্তিক বিপর্যাসে। এই বিশ্লেষণী ছকে রণজিৎ জানালেন যে, কৃষক বিদ্রোহ শুধু কার্য-কারণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ অর্থনৈতিক বা সামাজিক শাসন শোষণের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ‘প্রাক্‌-রাজনৈতিক ভাবনা’র প্রকাশ নয়। বরং চরিত্রে তা আদ্যন্ত রাজনৈতিক— সার্বিক ক্ষমতাবিন্যাসকে উল্টে দেওয়ার ঈপ্সা থেকে জাত। দ্বিতীয়ত, বিদ্রোহী কৃষক সমাবেশের বা স্ব-উদ্যোগের ভিত্তি হল কোনও না কোনও সামূহিকতার বোধ। কৌম সম্বন্ধে, আঞ্চলিক সন্নিহিতি বা জাতপাত বিন্যাসে, গোষ্ঠীগত শ্রম অভ্যাসে, ধার্মিকতার ধারণায়, বা শ্রেণি-সংবিদে এই সামূহিকতার বোধ নিহিত থাকে। একাধিক সূত্রের টানে বোধটি ক্রিয়াশীল হয়, একমাত্রিকতার টানকে ছাপিয়ে যায়, সংহতির বার্তা ও অভিমুখে তার সরণ ঘটে।

রণজিৎ গুহ জানেন যে কোনও ঘটনা-বিশেষের অবয়বে ও ব্যক্তি-সংবেদনার কালিক অভিজ্ঞতায় সাধারণ লক্ষণের ঐতিহাসিকত্ব রক্ষা পায়, বিশেষের প্রেক্ষিতে ও প্রাখর্যে সাধারণ লক্ষণ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তাই বিদ্রোহী চৈতন্যের সাধারণ লাক্ষণিক কাঠামো গ্রন্থনের ফাঁকফোকরে আখ্যান নির্মাণের আদি রীতিটি তিনি ত্যাগ করেননি। এলিমেন্টারি অাসপেক্ট-এ ‘হুল’-এর চরিত্রবিচারে, ভাগনা মাঝি ও ডোমন দারোগার শোধ ও প্রতিশোধের রক্তাক্ত কাহিনি বর্ণিত হয় অনুপুঙ্খে। রাহুর পৌরাণিক কথার পার্থিব উদ্‌যাপনের মুহূর্তে, গ্রহণের ক্ষণে, বামুনদের ছুতমার্গী আচার ও শুদ্ধতা রক্ষার বিপরীতে দলিত মুসাহারদের উল্লাস ও আবাহনের বিবৃতি সামাজিক চৈতন্যের নানা স্তরের সাক্ষ্য হিসাবে হাজিরা দেয়। আবার রাঢ় অঞ্চলে অনুশাসনে দীর্ণ গ্রামসমাজে চাষির মেয়ে মৃত চন্দ্রার গর্ভপাতের মামলায় এজাহারে ধৃত নারীদের সংহতিবার্তা, বাঁচা ও বাঁচানোর আকুতির কথাকাহিনিতে দলিত গোষ্ঠী ও অবদমিত মানবীদের ঐকান্তিক অনুভূতির সহজ স্বীকৃতি আছে। এই স্বীকৃতির সূত্রেই নগা, ঢোঁড়াই বা বাঘারুদের জীবনচর্চা ও চৈতন্যের বিশ্লেষণনিষ্ঠ ইতিহাসবিদ্যা মানবিকতায় ঋদ্ধ হয়ে উঠল।

কোনও খোপে বেশি দিন আটকে থাকা চিন্তক রণজিৎ গুহের স্বভাব নয়। ১৯৯০-এর দশক থেকে আধুনিক ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ্যার সর্বেশ্বরতার প্রতিকামী চিন্তার চর্চার ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে গিয়ে তিনি হাজির হলেন সৃজনশীল ভাবনার অভিনব পরিসরে। এবং তাঁর সেই ভাবনার সেরা ফসল পাওয়া গেল বাংলা ভাষায় লেখা একাধিক মৌলিক প্রবন্ধের সঙ্কলনে, দুই খণ্ডের রচনাসংগ্রহ’তে (আনন্দ, ২০১৯)।

রণজিৎ গুহ-র মতে, মানুষ সত্তাময় জীব। এই সত্তাময়তার প্রকাশই মানুষী চৈতন্য, সেই চৈতন্যের উচ্চারণ ভাষা-ভাবনায় বিধৃত হয়। সত্তা, চৈতন্য ও ভাষা-ভাবনার ত্রিভুজে প্রকাশিত ইতিহাসবিদ্যার রূপানুসন্ধান প্রসারিত হল মানবিক অভিজ্ঞতার ভিন্ন অবয়বে, নিছক কার্য-কারণ অন্বিত যুক্তিবোধ থেকে রসগ্রাহী সাহিত্য-আলাপে। এ বারের অন্বেষায় তিনি জানালেন যে, কোনও এক অতীতকালের অভিজ্ঞতাকে বর্তমানের বোধিতে ধরা, কোনও এক গোষ্ঠীর প্রাত্যহিক খণ্ড অভ্যাসের বৈশিষ্ট্য থেকে বৃহত্তর কোনও এক সমূহের অভিজ্ঞানে উত্তরিত হওয়া হল ইতিহাসবিদ্যার ঈপ্সা। ইতিহাসবিদের চিন্তনে জাত যুক্তির বিন্যাসে ও লেখনী নিঃসৃত ভাষাসজ্জায় যাচাই করা তথ্যাবলি আকাঙ্ক্ষিত আখ্যানের আকার নেয়। সদৃশার্থে নিজস্ব ঐকান্তিক অভিজ্ঞতাও অনুভূতি-সচেতন কবি-সাহিত্যিক শব্দের ব্যঞ্জনায় ভাসিত ও প্রসারিত করে নানা দেশে ও কালে নিজের রচনাকে ভিন্ন ভিন্ন সহৃদয়ের হৃদয় সংবাদী করে তোলে।

ওয়াকিবহাল পাঠক জানেন যে, তাঁর পূর্বতন রচনায় ইউরোপীয় সমাজবিজ্ঞান থেকে আহৃত ‘ইমপ্রুভমেন্ট’, ‘লয়্যালটি’, ‘হেজেমনি’ ইত্যাদি ধারণার প্রতিপার্শ্বে তিনি দণ্ড, ধর্ম, ভক্তি ও অতিদেশ-এর মতো দেশজ জ্ঞান ও ব্যবহার কাণ্ডের ধারণাগুলিকে সমমর্যাদায় স্থান দিয়েছেন, মোকাবিলায় দুই গোত্রের ধারণার ঠাঁই নড়ে গিয়ে নতুন বিশ্লেষণী পরিসর তৈরি হয়েছে। বাংলা প্রবন্ধাবলিতে তিনি ধ্রুপদী ভারতীয় দর্শনচিন্তার নানা ভাবনাবীজকে আত্মস্থ করে গবেষণার বিচার-অভিমুখকে বিশ্বমুখী করে তুললেন; যেমন, ভবভূতির ঔপচারিক বৃত্তির সৃজনশীল প্রয়োগ তাঁর মীমাংসাকে অনন্য প্রাখর্য দিল। দার্শনিক কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্যের ঈপ্সিত ভারতীয় মননে স্বরাজসাধনার সিদ্ধপুরুষ রণজিৎ গুহ।

বাংলায় লেখা এই মৌলিক প্রবন্ধগুলির বিষয়গত ঝোঁক দ্বিমুখী। এক পক্ষে, পর্ব থেকে পর্বান্তরে সময়বোধ ও প্রকৃতিবোধের চলাচলের পথে সৃষ্টিশীল অহং-এর প্রসার ও পুষ্টির বিচার চলতে থাকে। খোঁজের সূত্র ছড়িয়ে থাকে রবীন্দ্রনাথের ‘ত্রি-গীত’-এর পাঠে, কখনও বা জীবনানন্দের সময়লগ্নতা থেকে বিভূতিভূষণের ঋতবোধের আলোচনায়, কখনও বা রবীন্দ্র-উত্তর কাব্যের তিন আধুনিক কবির কবিরূপের বিশ্লেষণে। অন্য পক্ষে, আমাদের আধুনিকতার কুলজি বিচারে তিনি সমত্ববোধ ও সামাজিক সমানুভূতির ছাপ-ছোপকে ঠাহর করার চেষ্টা করেন। তাঁর বিশ্লেষণী নজরে ধরা পড়ে, কী ভাবে রামমোহনের শাস্ত্রবিচার ও হিতবাদী দর্শনে পুষ্ট যুক্তিবোধটি দেশজ সমাজের গহনে ক্রিয়াময় দয়া-ধর্মের ছোঁয়া পায়, আর তৈরি হয় সংবেদনশীলতার নবানুভূতি।

‘আদি কবি আর প্রথম পাঠক: একটি পৌরাণিক সাক্ষাৎকারের কাহিনি’ নামে এতাবৎকাল সম্পূর্ণ অনালোচিত প্রবন্ধ বলে, রাষ্ট্রসর্বস্বতার বাইরে কাব্যকথার টানে কী ভাবে সামূহিকতার ইতিহাসবোধ জ্ঞানচেতনার ঐতিহ্যে শিকড়ের কথা। প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাই তো সভ্যতার ভিত্তি।

যা নেই ভারতে, তা নেই ভারতে। ‘শেষ তর্পণ’ বলে মহাভারতীয় আখ্যানের নিজস্ব ব্যাখ্যায় রণজিৎ দেখান যে, কুরুক্ষেত্র ছড়িয়ে আছে সব মানবজাতির ইতিহাসে। কেবল আনৃশংস্য হওয়ার সাধ নয়, অনুকম্পা ও শোচনায় মানুষের মানবিক হওয়ার শেষ ভরসাটুকু জিয়ানো থাকে।

রাজনীতি থেকে মানবনীতির এ-হেন অন্বেষার অক্ষে ‘গ্লোবাল’ ও ‘লোকাল’-এর ভেদ তুচ্ছ হয়ে পড়ে। চৈতন্যের ইতিবৃত্ত রচনার কাছে নিবেদিত এক বাঙালি মেধাজীবীর মমত্ববোধ বহুজনীন হয়ে ওঠে। নানা কাল ও নানা দেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁর বেদনাবোধ সংলগ্ন হতে চায়। সংবেদনশীলতার চর্চা ও লগ্নতার আকাঙ্ক্ষার আধারেই মেধাজীবীর দায়কে রণজিৎ গুহ অনুক্ষণ স্বীকার করেন।

ভাল থাকবেন, রণজিৎদা।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)


Something isn't right! Please refresh.

Advertisement