অশোককুমার সরকার, গৌরকিশোর ঘোষ, বরুণ সেনগুপ্ত, জ্যোতির্ময় দত্ত বা কুলদীপ নায়ার অথবা স্টেটসম্যানের প্রাক্তন সম্পাদক সি আর ইরানি-সহ অতীতের নাম করা সাংবাদিক ও সম্পাদকরা আজ সংবাদপত্রের জগতে উধাও বা বিরল। এঁদের নীতি ছিল, কপালে যা থাকে থাক, মনের কথা লিখব এবং প্রকাশ করব শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে। আজকের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। আজ শাসকই শেষ কথা এবং শাসকের কথা না শুনলে সংবাদপত্রের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যায়।

১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা জারি হওয়ার পরই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় আনন্দবাজার পত্রিকার তদানীন্তন সম্পাদক অশোককুমার সরকারকে অনুরোধ করেন, প্রতি সপ্তাহে রাজ্য রাজনীতি সম্পর্কে বরুণ সেনগুপ্তের যে লেখা প্রকাশিত হয়, তা যেন কিছু দিন বন্ধ থাকে। সঙ্গে এ-ও অনুরোধ করেন যে, কিছু দিনের জন্য যেন দেশ পত্রিকায় গৌরকিশোর ঘোষের ব্যঙ্গাত্মক রচনাগুলি ছাপা না হয়।

উত্তরে অশোকবাবু সিদ্ধার্থ রায়কে বিনীতভাবে বলেছিলেন, যে সব দিনে তিনি বরুণ সেনগুপ্তের লেখা বন্ধ রাখবেন, সেই সব দিনে আনন্দবাজার পত্রিকার প্রকাশনাও বন্ধ রাখতে হবে। তা না হলে পাঠকের কাছে বরুণবাবুর ‘কলম’ না ছাপার জবাবদিহি করতে হবে, যা তাঁর জানা নেই। গৌরকিশোরের লেখা সম্পর্কেও একই জবাব দিয়েছিলেন অশোকবাবু। জরুরি অবস্থা চলাকালীন শাসকের কথা না শুনলে কী পরিণতি হতে পারে তা জেনেই অশোকবাবু সিদ্ধার্থবাবুকে এই উত্তর দিয়েছিলেন। অবশ্য এই ঘটনার দু’-একদিনের মধ্যেই গৌরকিশোর ঘোষ, বরুণ সেনগুপ্ত ও জ্যোতির্ময় দত্তকে তৎকালীন রাজ্য সরকার মিসা আইনে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়। এই সাংবাদিকরা অনেক দিন জেলে আটক ছিলেন। পরে অবশ্য জনমতের চাপে রাজ্য সরকার নিজের ভাবমূর্তি বজায় রাখতে এঁদের মুক্তি দেয়। তবে এই সাংবাদিকরা মুক্তি পাওয়ার জন্য কখনওই রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমা চাননি।

জরুরি অবস্থা চলার সময় সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হওয়ার আগে ‘সেন্সরশিপ’ বজায় ছিল। ১৯৭৬ সালে কেন্দ্রের ইন্দিরা গাঁধীর সরকার ৪২তম সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব জনসাধারণের কাছে পেশ করার জন্য ও তাঁদের বক্তব্য জানার জন্য বিভিন্ন সংবাদপত্রে তা প্রকাশ করে। বেশিরভাগ সংবাদপত্র কোনও মতামত ব্যক্ত না করলেও স্টেটসম্যান ও আনন্দবাজার পত্রিকা সেই সময় দিনের পর দিন ৪২তম সংবিধান সম্পর্কে সমালোচনামূলক লেখা প্রকাশ করতে থাকে বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীর ‘কলম’-এর মাধ্যমে। পশ্চিমবঙ্গেরই কয়েক জন কংগ্রেস নেতা সে সময় দিল্লিতে নালিশ জানান এবং দাবি তোলেন যে, এই ধরনের সমালোচনামূলক লেখা প্রকাশ বন্ধ করতে আনন্দবাজারকে বাধ্য করা হোক। সেই অনুযায়ী কেন্দ্রীয়  সরকারের তরফ থেকে আনন্দবাজারকে অনুরোধও জানানো হয়। কিন্তু সেই বিধিনিষেধ কানে না তুলে সংবিধানের ৪২তম সংশোধন সম্পর্কে আরও বিশদ নিবন্ধ আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে।

আরও পড়ুন, রবীন্দ্রনাথের সময় ফেসবুক থাকলে এত গান লিখতে পারতেন তো?

জরুরি অবস্থা উঠে যাওয়ার পরেও রাষ্ট্রের সমালোচনার ধারা বহাল রাখে আনন্দবাজার। সুদীর্ঘ কাল বামফ্রন্টের শাসনে ছিল পশ্চিমবঙ্গ। সে সময়ে বামফ্রন্টের প্রায় প্রতিটি ভুল পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা দেখা গিয়েছে আনন্দবাজারে। তার জেরে বামফ্রন্ট সরকারের পক্ষ থেকে নানা প্রতিকূলতা তৈরি করা হয়েছিল আনন্দবাজারের সামনে, কিন্তু লেখা থামানো যায়নি।

আজকের শাসকগোষ্ঠী, কেন্দ্রের হোক বা রাজ্যের, আশা করে যে সংবাদপত্রের ভূমিকা হবে ‘Decent’ অর্থাৎ সরকারের পক্ষে ‘অমায়িক’। আজকের শাসকরা মনে করেন যে, সংবাদমাধ্যমে ‘Dissent’ অর্থাৎ ভিন্নমতের কোনও স্থান নেই।

সংবাদপত্র এই বাধার সম্মুখীন হওয়ায় শিক্ষিত মানুষ আজকাল প্রতিবাদের ভাষা খুঁজতে সোশ্যাল মিডিয়ার আশ্রয় নিচ্ছেন। অশিক্ষার ছাপ সমৃদ্ধ এবং আপাদমস্তক মিথ্যার উপর ভর করে লেখা অজস্র গুজব সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখা যায়। সে সবের অধিকাংশই উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে ছড়ানো হয় আসলে। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় পাওয়া ‘তথ্যাদি’ ও ‘তত্ত্বাদি’ যাচাই করে নেওয়া খুব জরুরি। কিন্তু তা সত্ত্বেও স্বীকার করতেই হবে যে, গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ এবং বাক্‌স্বাধীনতা হরণের এই জমানায় সোশ্যাল মিডিয়ার অস্তিত্ব বা জোরালো উপস্থিতি খুব জরুরি।

আরও পড়ুন, ভাল লাগে স্বপ্নের মায়াজাল বুনতে? নাকি রিসেন্ট পোস্টের লাইক গুনতে?

যাঁরা প্রতিবাদের ভাষা শুনতে চান বা প্রতিবাদী লেখা পড়তে চান,তাঁরা ভীষণ ভাবে সোশ্যাল মিডিয়াকে আঁকড়ে ধরেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার এই গ্রহণযোগ্যতার জন্যই বড় বড় সংবাদপত্রগুলিও এই মিডিয়াকে হাতিয়ার করছে। যার ফলে দিন দিন সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব বাড়ছে। সংবাদপত্রের সীমিত পরিসরে পাঠক যা কিছু পান, তার থেকে অনেক বেশি খবর সোশ্যাল মিডিয়াতে পাওয়া যায়।

বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফসল হল সোশ্যাল মিডিয়া। কারও ভাল লাগুক বা না লাগুক, বিজ্ঞানের এই অগ্রগতিকে আমরা আটকাতে পারব না। আগামী দিনে প্রথাগত সংবাদমাধ্যমকে সোশ্যাল মিডিয়া কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে, সেটাই দেখার।

অলঙ্করণ: তিয়াসা দাস।