গণনাট্য সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৩ সালে, বোম্বাই (এখন মুম্বই) শহরে। সেই হিসেবে ২০১৮ সালে তার ৭৫ বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু গণনাট্য নামক সংগঠন আর গণনাট্য আন্দোলন— দুটোকে যদি কিঞ্চিৎ আলাদা করে দেখি, তা হলে কিছুটা দীর্ঘতর কালপর্বের কথা ভাবতে হয়; আন্দোলনের ব্যাপ্তিও অনেকটা বেড়ে যায়। তার নানা রূপ, বহু উত্তরাধিকারের মানচিত্র সন্ধান করা যায়। রাষ্ট্র বা কালচার ইন্ডাস্ট্রি-র বাইরে সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞের এত বড় সংগঠিত আয়োজন উপমহাদেশে আধুনিক যুগে আর হয়েছে বলে জানা যায় না। একে বিংশ শতাব্দীর এক নবজাগরণের মুহূর্ত হিসেবে দেখা অসঙ্গত নয়, যার অভিঘাত দূরবর্তী শিল্পসাহিত্যেও এসে পড়েছে। মুহূর্তটিকে অন্তত ত্রিশের দশকে টেনে নেওয়া যায়। সেটা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মোড়বদলের সময়, এ দেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন তথা সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রসার লাভের সময় (যার প্রভাব জাতীয় কংগ্রেসের ভিতরেও পড়েছিল), দুনিয়া জুড়ে ফ্যাসিস্ত ক্ষমতার উত্থান আর তার বিরুদ্ধে প্রগতিবাদী শিল্প-সাহিত্যের প্রতিরোধ গড়ে ওঠার সময়। হিটলারের উত্থান, মুসোলিনির আবিসিনিয়া আক্রমণ, স্পেনের গৃহযুদ্ধ বিশ্বযুদ্ধের জমি তৈরি করছিল। স্পেনে যে ভাবে লেখক শিল্পীরা রিপাবলিকানদের হয়ে লড়াই করতে নামলেন, প্রাণ দিলেন, তা এক নতুন আন্তর্জাতীয়তার বোধ তৈরি করল। ওই দশকেই আমাদের সাহিত্যে মডার্নিজ়ম বা আধুনিকতাবাদের প্রকল্প দানা বাঁধছিল। ১৯৩৬-এ লখনউতে ‘প্রগতি লেখক সঙ্ঘ’ প্রতিষ্ঠিত হয়, বুদ্ধদেব বসু বা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো ‘পরিচয়’ গোষ্ঠীর মডার্নিস্টরা তাতে শামিল হন। সেই সঙ্গে এলেন দেশের প্রথম সারির লেখক বুদ্ধিজীবীদের এক বিরাট অংশ। রবীন্দ্রনাথ, প্রেম চন্দ, সরোজিনী নায়ডুর সমর্থন নিয়ে সাজ্জাদ জাহির, হীরেন মুখোপাধ্যায়, মুলক রাজ আনন্দ প্রমুখের নেতৃত্বে  আরব্ধ উদ্যোগে আন্তর্জাতিকতায় এক দিকে মিশে ছিল সমাজতান্ত্রিক আবেগ, অন্য দিকে রিয়ালিস্ট বা বাস্তববাদী শিল্প-আদর্শ। মডার্নিজ়ম নয়, বরং এক অর্থে তার বিরোধী, প্রাচীনতর এক আর্টের পরিকল্প। 

একে গণনাট্য আন্দোলনের মুখবন্ধ বলে মনে করা হয়। এই সময় ওয়াই সি আই (১৯৪০), ফ্যাসিস্ত-বিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘের (১৯৪২) মতো নানা সংগঠন তৈরি হতে থাকে, যেখানে সাহিত্য ছাড়াও অন্যান্য মাধ্যমের শিল্পীরা যোগ দেন। ১৯৪৩-এ পৌঁছনোর আগে দুটো ঘটনা প্রগতি সাহিত্য আন্দোলনকে বৃহত্তর কর্মকাণ্ডে প্রসারিত করে: বিশ্বযুদ্ধ তথা নাত্সি জার্মানির সোভিয়েট ইউনিয়ন আক্রমণ এবং বাংলার মন্বন্তর। দু’টিরই প্রতিক্রিয়ায় বৃহৎ মানবতার কাছে আবেদন রাখা হয়েছিল, টেনে আনা গিয়েছিল বাংলা অসম অন্ধ্র মালাবার কর্নাটক যুক্তপ্রদেশ মহারাষ্ট্র পঞ্জাবের অজস্র শিল্পীকে। অন্য দিকে এই পর্বেই কমিউনিস্ট পার্টি পশ্চাৎপট থেকে আরও প্রকাশ্য সংগঠকের ভূমিকায় চলে আসে। গণনাট্য সঙ্ঘে রবিশঙ্কর, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বা খাজা আহমদ আব্বাসের মতো অনেকে সংলগ্ন হন যাঁরা ঠিক রাজনীতির মানুষ ছিলেন না। অনেকে মানেন যে পার্টির নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করে নানা স্বরের সঙ্গতি রচনার কাজটা তৎকালীন পার্টি সম্পাদক পি সি জোশীর উদারনীতির কারণেই অনেকখানি সম্ভব হয়েছিল। ‘জনযুদ্ধ’ নীতি গ্রহণ করে বেকায়দায় পড়া পার্টি ফ্যাসিবাদ-বিরোধী বৃহৎ ফ্রন্ট, দুর্ভিক্ষপীড়িতদের জন্যে ‘পিপলস রিলিফ কমিটি’র মতো সংগঠনে কাজ করে অনেকটা শক্তি সঞ্চয় করতে পেরেছিল। প্রথম পর্যায়ে গণনাট্যেরও প্রধান কাজ ছিল এই দুটো, সে কাজের অঙ্গ হিসেবে এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক উদ্দীপনা সৃষ্টি করা গিয়েছিল। এই সৃষ্টিশীলতার প্রথম উৎসার যাঁদের হাত ধরে ঘটল তাঁদের মধ্যে বিজন ভট্টাচার্য, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র বা আলি সর্দার জাফরি, বলরাজ সাহনী, ফয়েজ় আহমেদ ফয়েজ়ের মতো নাগরিক শিল্পীরাই শুধু নন, রমেশ শীল, দশরথলাল বা আন্না ভাউ সাঠের মতো বহু লোকশিল্পীও ছিলেন।  

পি সি জোশীর উপরে লেখা একটি সাম্প্রতিক প্রবন্ধে ঐতিহাসিক সুমিত সরকার বলেছেন, ‘ভুখা হৈ বঙ্গাল’ আওয়াজ তুলে গণনাট্যের দল যখন গ্রাম শহর চষে চাঁদা তুলেছে তারই মধ্য দিয়ে শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা ও কমিউনিস্ট কর্মীরা, দেশের মানুষের বাস্তব জীবন প্রত্যক্ষ করেছেন, শ্রেণি-অসাম্য, সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের সঙ্গে সরাসরি পরিচয় হয়েছে তাঁদের। এই পর্বে, এবং একের পর এক সম্মেলনে নানা আঞ্চলিক রীতির পারস্পরিক বিনিময়ের ফলে, সঙ্গীত নাটক নৃত্যের বিষয়বস্তু শুধু নয়, আঙ্গিক বদলে যেতে থাকে। বিষয় না আঙ্গিক, কোনটা প্রধান, তা নিয়ে বামপন্থীরা বহু দিন মূলত নিষ্ফল এক তর্ক করেছেন। ত্রিশের দশক থেকে ওই আন্দোলনের বৃত্তে রচিত দলিল বা প্রবন্ধে এই তর্কের নজির মিলবে। এই সূত্রে আমরা রিয়ালিজ়মের প্রশ্নে ফিরে যেতে পারি, গণনাট্যের উত্তরাধিকারের প্রশ্নে যেটা জরুরি। বিষয়বস্তু শ্রেণিবিভক্ত সমাজের স্বরূপ বিবৃত করবে, এটা হয়ে উঠেছিল বাস্তববাদের দাবি। কিন্তু ব্যাপারটা শুধু শ্রেণি-বাস্তবতার প্রশ্নে সীমিত ছিল না, জাতীয় স্বাতন্ত্র্য তথা জাতীয়তাবাদী আবেগের সঙ্গেও জড়িয়ে গিয়েছিল। বহু দেশেই বাস্তববাদ জাতীয়তাবাদের সঙ্গে এমন সম্বন্ধ স্থাপন করেছে, এবং সামাজিক দায়িত্ব হয়ে দেখা দিয়েছে। সুধী প্রধান তিন খণ্ডে যে দলিল ও নিবন্ধ সঙ্কলন করেছেন তাতে প্রাসঙ্গিক বহু উদাহরণ রয়েছে। 

এর সঙ্গে আন্তর্জাতিকতার অঙ্গীকারের বিরোধ দেখেননি সে দিনের লেখকেরা। পরে সলিল চৌধুরীর গানের উপর লিখতে গিয়ে হেমাঙ্গ বিশ্বাস লেখেন: “স্বাদেশিকতার ধারা যেখানে সর্বহারার আন্তর্জাতিকতার মহাসাগরে গিয়ে মিলেছে সেই মোহনায় গণসঙ্গীতের জন্ম।” ফ্যাসিবাদ বিরোধিতার সঙ্কল্পে আন্তর্জাতিকতাবাদ এসেছে সভ্যতার সঙ্কট মোকাবিলার পন্থা হিসেবে। ওই সময়ের লেখায় বার বার ‘সভ্যতা’র সম্ভাব্য বিনাশ ও তার প্রতিরোধের কথা এসেছে। ঐতিহাসিক ভাবে এই মানবতাবাদের সঙ্গেও বাস্তববাদী শিল্প আদর্শের সম্বন্ধ রয়েছে। এ ঠিক সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ নয়। কিন্তু এ সব ফারাক করবার সুযোগ তখন মেলেনি। 

ত্রিশের দশকে সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী লিখেছেন, বাংলা সাহিত্য রোমান্টিসিজ়ম থেকে বেরিয়ে সমাজ-বাস্তবতার দর্পণ হয়ে উঠছে, কয়েক বছর বাদে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ‘জবানবন্দী’ নাটকে সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের উন্মেষ দেখেছিলেন। সোভিয়েট সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের (১৯৩৪) মতো কোনও দমনমূলক রীতি চাপিয়ে দেওয়া হয়নি বলেই গণনাট্যে বহুমুখী বিচিত্র শিল্পের সম্ভার সৃষ্টি করা গিয়েছিল। বিজন ভট্টাচার্যের নাটক, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস বা ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র বাস্তববাদের সরল যুক্তি ও শৃঙ্খলা মেনে চলেনি। গণনাট্য আরও ঘোষণা করেছিল, জাতীয় শিল্পের ঐতিহ্যগুলিকে, বিশেষ করে লোকশিল্পের পুনরুজ্জীবন ও এক নতুন জনপ্রিয় সংস্কৃতি নির্মাণ হবে অন্যতম লক্ষ্য। পুনরুজ্জীবন যে পিছু হাঁটা নয়, আধুনিকতার অনুঘটক, তার একটা নজির পাব গানে, যেখানে শাস্ত্রীয় আর লৌকিক উপাদান নতুন স্বরসঙ্গতির আঙ্গিকে প্রবেশ করে এক উত্তাল কালপর্বের উপযুক্ত বাচন তৈরির হাতিয়ার হয়ে ওঠে। সুরে না হোক, কথায় সঠিক রাজনীতির প্রতিফলন ঘটছে কি না, সেটা অবশ্য এ ক্ষেত্রেও নেতৃত্বের কাছে বড় প্রশ্ন ছিল। হেমাঙ্গ বিশ্বাস লিখেছেন, তাঁর গানে সঙ্কটের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু ‘ওয়ে আউট’ বাতলানো হয়নি, সে জন্যে সমালোচনা শুনেছেন। সলিল চৌধুরী লিখেছেন, গানের মধ্যে ‘হায় বিধি বড়ই দারুণ/ পোড়া মাটি কেঁদে মরে ফসল ফলে না’— এ কথা ‘প্রতিবিপ্লবী’ গণ্য হয়েছিল, কারণ বিধি ব্যাপারটা বিপ্লবীদের জন্যে নয়! ১৯৪৮-এর ঠিক পরের পর্যায়ে এই সব নিষেধ ধ্বংসাত্মক রূপ ধারণ করে; ফলে ক্রমশ সঙ্ঘ ছেড়ে অনেকে চলে যেতে থাকেন। কিন্তু সংগঠন থেকে সরে গেলেও গণনাট্যের সৃজনশীলতা তাঁদের কাজে বহমান ছিল। তার বহু প্রমাণের মধ্যে রয়েছে পঞ্চাশের দশকের গান, সাহিত্য ও চলচ্চিত্র। 

শিল্পীরা কিন্তু অনেক সময় বাস্তবতার প্রত্যক্ষ টানে, এমনকী তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সংবেদনার দাবিতে সৃষ্টি করেছেন। জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র লিখেছেন ‘নবজীবনের গান’ লেখার কাহিনি: ১৯৪৩-এ রাস্তায় তিনি দেখেছিলেন মা মরে পড়ে আছে; তার স্তন ধরে টানছে আর হেঁচকি তুলে কাঁদছে এক শিশু। “আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম— না না না”! সে দিনই ঘোরের মধ্যে গান লিখেছিলেন: “না না না।/ মানব না মানব না।/ কোটি মৃত্যুরে কিনে নেব প্রাণপণে।’’ সলিল লিখেছেন ১৯৪৬-এর রেল ধর্মঘটের প্রস্তুতি মিটিংয়ে গিয়ে বীরেশ মিশ্রর বক্তৃতাগুলোকেই সুর দিয়ে গান বানাতেন মুখে মুখে। যে দিন ধর্মঘট শুরু হল, সেই দিন পাঁচ লক্ষ মানুষের জমায়েতে তিনি নতুন গান গাইলেন, ‘‘ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে।’’ গানের চরণে সরাসরি ঘোষণা শোনা গেল: ‘‘আজ হরতাল, আজ চাকা বন্‌ধ!’’ রাজপথের জনজোয়ার নতুন বাচন আর আঙ্গিক তৈরি করেছে একই সময়ে লেখা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চিহ্ন’ উপন্যাসে। পরিচিত বাস্তববাদী উপস্থাপনের নিয়মে একে ফেলা যায় না। গান বা কাহিনি এখানে রীতির সীমা অতিক্রম করেছে। 

এ-ও বলতে হয়, এখানে আমাদের নিজস্ব মডার্নিজ়মেরও সঙ্কেত রয়েছে। ত্রিশ-চল্লিশের তাত্ত্বিক চিন্তায় এই সম্ভাবনাগুলোর আলোচনা খুব একটা পাব না। সত্তরের দশকে পলিটিকাল আর্ট বিষয়ে তর্কপট ওই গণনাট্য যুগ থেকেই ধার করা হয়, সাবেকি বাস্তববাদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল শিল্প-বিচারের প্রধান মানদণ্ড। কিন্তু আজ গণনাট্যকে স্মরণ করে আমরা ত্রিশ-চল্লিশের ঘোষিত শিল্পাদর্শে ফেরার চেষ্টা করলে তা ব্যর্থ হবে। একটা ভরসার কথা অবশ্য এই যে, আজ আর ফরমান জারি করার মতো দলীয় কর্তৃত্ব বিশেষ নেই। সরকারি দমননীতির বিরুদ্ধে বিকল্প যে পার্টির খবরদারি নয়, এটা মনে হয় অনেকে এখন জানেন।

 

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্ম স্টাডিজ় 

বিভাগের শিক্ষক