Advertisement
২৩ জুলাই ২০২৪
Editorial News

দায়িত্বজ্ঞানহীন দায় ঠেলাঠেলি

চাপান-উতোরকে যে পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে, তাকে রাজনীতি না বলাই ভাল। রাজনীতি সম্ভবত এত অবুঝ নয়। তাই দলবাজি শব্দই যথাযথ এ প্রসঙ্গে।

ফাইল চিত্র

ফাইল চিত্র

অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ১৮ জুলাই ২০১৮ ০০:৪৭
Share: Save:

স্থান-কাল-পাত্র সম্পর্কে সম্যক উপলব্ধি থাকলে বা তার তাৎপর্য বোঝা গেলে এমনটা হত না। খুব বড় বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গিয়েছে। মেদিনীপুরে প্রধানমন্ত্রীর সভাস্থলে যে ঘটনা ঘটেছে, তা কতটা মারাত্মক রূপ নিয়ে নিতে পারত, অনেকেই সম্ভবত ঠিক মতো বুঝতে পারেননি এখনও। বুঝতে পারলে এই অবকাশ থেকে দলবাজিকে অন্তত দূরে রাখতেন।

চাপান-উতোরকে যে পথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে, তাকে রাজনীতি না বলাই ভাল। রাজনীতি সম্ভবত এত অবুঝ নয়। তাই দলবাজি শব্দই যথাযথ এ প্রসঙ্গে।

স্থান— প্রধানমন্ত্রীর জনসভাস্থল। কাল— প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ। পাত্র— প্রধানমন্ত্রী নিজে এবং তাঁর মঞ্চের সামনে সমবেত জনতা। কী ঘটল? জনতার জন্য নির্মিত তিনটে ছাউনির একটা সভা চলাকালীন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল। সভা শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরে আরও একটা ভেঙে পড়ল। মাঠের পাঁচিলের একাংশও ভেঙে পড়ল।

গোটাটা সভা চলাকালীন ঘটতেই পারত। ঘটলে কী হত, সে বিতর্কে না যাওয়াই শ্রেয়। যা ঘটেছে, তাতেও যে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠার সমূহ সম্ভাবনা ছিল, সে কথা বোঝার জন্য গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না।

৯০ জনের মতো জখম, তাঁদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অধিকাংশই স্থানীয় হাসপাতালে বা নার্সিং হোমে চিকিৎসার পরে ছাড়া পেয়েছেন। এক জন সঙ্কটজনক, তাঁর চিকিৎসা করাতে হচ্ছে কলকাতার হাসপাতালে।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

এর চেয়েও খারাপ কিছু যে ঘটে যায়নি, হাহাকার যে তৈরি হয়নি, তা ইতিবাচক। কিন্তু বিষয়টিকে নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ নিজের নিজের গাফিলতি অন্যের উপরে চাপাতে যে ভাবে উদগ্র, তা বড়ই নেতিবাচক।

আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর দফতর ‘কড়া কথা’ শুনিয়েছে? বাবুল-দিলীপ প্রকাশ্য বচসা ঘিরে জল্পনা তুঙ্গে

দুর্ঘটনার পরে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, তিনি উদ্বিগ্ন। ঘোষণা করেছিলেন, জখমদের চিকিৎসায় রাজ্য সরকার সব রকমের সহযোগিতা করবে। এর বাইরে আর তেমন কিছু বলতে রাজি হননি তিনি। এই অবস্থান প্রশাসক সুলভই। কিন্তু দলবাজি তাতে থেমে থাকেনি। কথার টানাপড়েন শুরু হয়ে গিয়েছে বিস্তর।

আরও পড়ুন: ছাউনি ভাঙার তদন্তে এল কেন্দ্র, রাজ্যের তোপে উদ্যোক্তারা, বিজেপি বলছে ষড়যন্ত্র

ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কাঠামোয় ত্রুটি ছিল। রাজ্য প্রশাসন তার ভিত্তিতে বলছে, উদ্যোক্তাদের ত্রুটি। উদ্যোক্তারা বলছেন, ত্রুটি তো রাজ্যেরও, ব্যবস্থাপনা ঠিক মতো পরখ না করেই ছাড়পত্র দিল কেন প্রশাসন? রাজ্যের শাসক শিবির বলছে, দায় নিতে হবে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসপিজি-কে। রাজ্যের এক মন্ত্রীর প্রশ্ন, ওঁদের সভায় কী হয়েছে, আমরা কী ভাবে জানব? দেশের শাসক দল বলছে, দর্শকাসনের নিরাপত্তার দায়িত্ব পুলিশের হাতে ছিল, কিন্তু সভার সময় পর্যাপ্ত পুলিশ ছিল না। দুর্ঘটনার পরে এসপিজি-র তরফ থেকে পুলিশ সুপারকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি বলে শোনা যাচ্ছে।

এই আচরণ কি আদ্যন্ত অসংবেদনশীল নয়? বিপর্যয় আরও ব্যাপক চেহারা নিয়ে নিলে এই কথাগুলো বলার অবকাশ কি কোনও পক্ষের থাকত? নাকি তখনও এই রকম ঠেলাঠেলিই চলত?

নরেন্দ্র মোদীর সভাস্থলে যাঁরা সমবেত হয়েছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই এ রাষ্ট্রের নাগরিক। রাষ্ট্রের সর্বপ্রথম কর্তব্য প্রত্যেক নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বিজেপিপন্থী নাগরিক, নাকি তৃণমূলপন্থী জনতা— বিপর্যয়ের ক্ষণে এই প্রশ্ন উঠতেই পারে না। মনে রাখা দরকার, এই নাগরিকদের জন্যই ভারত বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র, এই নাগরিকরাই ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি, এই নাগরিকরাই আসলে রাষ্ট্র, নাগরিককে বাদ দিয়ে রাষ্ট্র রাষ্ট্রই নয়। কর্তব্যে কারও লজ্জাজনক গাফিলতির জেরে বহু নাগরিক বিপন্ন হয়ে পড়েছিলেন। দায়বদ্ধ প্রতিটি পক্ষের উচিত লজ্জিত ও সঙ্কুচিত বোধ করা। কিন্তু লজ্জা এবং বিস্ময় বাড়ানো হচ্ছে। সবাই দায় অস্বীকার করতে উদগ্রীব হয়ে পড়ছেন। শুধু দলবাজিও বোধ হয় না, বোধেরও অভাবও ধরা পড়ে।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE