ছেলেটা সফল, তুখড়। মা সরস্বতীর কৃপায় সমাজের উঁচু তলায় ওঠার ছাড়পত্রধারী। বাবার চোখে ছেলে এখন প্যারিসের ‘বাবু’ সমাজের সভ্য। অথচ হতভাগ্য বাবার নিয়তি মজুর হয়ে দিনাতিপাতের। চিরটা কাল মজুরি খাটার পাপ তার সারা অঙ্গে। বয়েস পঞ্চাশ ছুঁয়েছে। ইতিমধ্যেই ঠিক মতো হাঁটতে পারছে না, যন্ত্রের দয়ায় শ্বাস চলছে, আদ্যন্ত ওষুধ নির্ভর জীবন। কী করে হল এ অবস্থা? কে করল তার এই দশা? ‘কে মারল আমার বাবাকে’, সাম্প্রতিক এক উপন্যাসে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন এদুয়ার লুই। যদিও কোনও প্রশ্নচিহ্ন রাখেননি। কারণ ‘একল নরমাল’-এর ইতিহাসের প্রাক্তন ছাত্রের কাছে উত্তরটা জলের মতো পরিষ্কার। 

অশিক্ষা, মাদকাসক্তি ও পারিবারিক হিংস্রতা শ্রমিক পরিবারের নিত্যসঙ্গী। বাবার হাতে মা, সোমত্ত ছেলের হাতে বাবার লাঞ্ছনা যেন জলভাত। এই পৃথিবীতে ‘কোনও কিছুই হিংস্র ছিল না, কারণ তোমরা একে হিংস্রতা বলতে না, বলতে জীবন। বস্তুত কিছুই বলতে না, হিংস্রতাটা স্রেফ ছিল।’ ১৯৮০, ৯০-এর দশকের ফ্রান্সের কথা। 

তার পর সন ২০০০। মজুর বাবা কারখানায় মুটের কাজ করে, ভারী-ভারী জিনিস পিঠে বইতে হয়। এক দিন পিঠে ব্যথা শুরু হল। প্রথমে পাত্তা দেয়নি। ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠল। কাজে অসমর্থ। অতএব, চাকরিটি গেল। প্রথমটায় ভেবেছিল সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সপ্তাহ গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর। আর ওই কাজে ফেরা হল না, বেকার ভাতা বাবদ ন্যূনতম মজুরির বিনিময়ে ঘরে বন্দি হয়ে যেতে হল। আর সারাদিন কর্মহীন, বাড়িতে থাকা মানেই অবধারিত অবসাদ ও মদ্যাসক্তি।  

২০০৬। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট জাক শিরাক। তাঁর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাভিয়ে ব্যারথ্রঁ ডজনখানেক ওষুধের ওপর রাষ্ট্রীয় অনুদান তুলে নিলেন। বিশেষ করে হজমের ওষুধের। এ দিকে কর্মহীন প্রৌঢ় মজুরের এমনিতে খাবার হজম হয় না। হজমের ওষুধের প্রয়োজনই তার সব থেকে বেশি। অতএব ‘জাক শিরাক ও জাভিয়ে ব্যারথ্রঁর দৌলতে তোমার পেটের দফারফা হল’, কথক— জীবন্ত লাশ— তার বাবাকে উদ্দেশ্য করে গল্পটা বলছে। 

২০০৭-এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী নিকোলা সারকোজ়ি। ‘les assistés’, কর্মহীন মজুর, যারা রাষ্ট্রের অন্ন ধ্বংস করছে, তাদের বিরুদ্ধে তিনি প্রচার শুরু করলেন। বললেন, খেটে খাওয়া মজুররা নাকি এই বসে খাওয়া কামচোরের দলকে ভাল চোখে দেখছেন না। মাল বয়ে পিঠ যার এমনিতেই নড়বড়ে, এই চোরের অপবাদে তার বাকি শিরদাঁড়াটি গেল ধসে। ২০০৯-এ সারকোজি ও তাঁর সহযোগী মারত্যাঁ ইরশ বেকার ভাতার ওপর আঘাত নামিয়ে আনলেন। বসে খাওয়া অসুস্থ মজুরদের গুঁতো দিয়ে কাজে ফিরতে প্রায় বাধ্য করলেন। কাজ মানে আংশিক সময়ের হাড়ভাঙা খাটুনি। ৭০০ ইউরোর বিনিময়ে আমাদের মজুরের জুটল অন্য এক শহরে রাস্তা ঝাঁট দেওয়ার কাজ। সারা দিন অশক্ত পিঠ নিয়ে কোমর ভেঙে ময়লা জড়ো করার কাজ। “সারকোজি আর ইরশ তোমার পিঠটা দুমড়ে দিল।”

অগস্ট ২০১৬। সমাজতান্ত্রিক ফ্রঁসোয়া ওলঁদ তখন প্রেসিডেন্ট। শ্রমমন্ত্রী এল কোমরি ও প্রধানমন্ত্রী মান্যুয়েল ভালজ-এর সাহায্যে বলবৎ করলেন নতুন শ্রম আইন। আইন মোতাবেক কর্মীকে ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে মালিক পক্ষের আইনি বাধা কমে গেল। মালিক নিজের ইচ্ছে ও প্রয়োজন মতো কর্মীকে সাপ্তাহিক ঘণ্টা বাবদ অনেক বেশি কাজ করিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেল। যে লোকটার পিঠের হাড় স্নায়ু এমনিতেই বিকল, তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝাঁটার লাঠির ওপর শরীরটাকে বাঁকিয়ে কাজ করে যেতে হল। ফলত শ্বাসকষ্ট শুরু হল। যন্ত্রের সাহায্য ছাড়া আর নিঃশ্বাস নেওয়া যাচ্ছে না। “ওলঁদ, ভালজ, এল কোমরি তোমার নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিল।” 

মে ২৭, ২০১৭। ভিড় রাস্তা। টি-শার্ট পরা দু’জন শ্রমিক রাগত মুখে প্রেসিডেন্ট মাকরঁকে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছেন। প্রেসিডেন্টের গলায় ঝরে পড়ল অবজ্ঞা। “টি-শার্ট পরে আমাকে ভয় দেখাতে আসবেন না। স্যুট পরার সব থেকে ভাল উপায় একটা চাকরির বন্দোবস্ত করা।” অর্থাৎ তুমি স্যুট পরতে পারলে না, মানে, তুমি একটি অলস, অকম্মা, অপদার্থ। সে-বছর সেপ্টেম্বরে তাঁর ঘোষিত সংস্কারের পথে বাধা হিসাবে মাকরঁ আবার সেই শ্রমিক শ্রেণির আলস্যকেই দায়ী করলেন। যারা বড় শহর থেকে দূরে থাকে বলে চাকরি জোটাতে পারেনি, জীবনের ঘাতপ্রতিঘাতে যাদের তেমন লেখাপড়া হল না, জুতসই ডিগ্রি জুটল না, কারখানায় কাজ করতে করতে যাদের মাজা ভেঙে চৌচির, মাকরঁ তাদের মধ্যে খুঁজে পেলেন কিনা আলস্য-রোগ?

অগস্ট ২০১৭। এমান্যুয়েল মাকরঁ-র সরকার ফ্রান্সের সব থেকে অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল শ্রেণির রোজগার থেকে পাঁচ ইউরো কেটে নিল। আবাসন অনুদান, যার সাহায্যে ফ্রান্সের দরিদ্রতম জনগণ প্রতি মাসে বাড়ির ভাড়া গোনে, তার ওপর এসে পড়ল কোপ। আর তার দু’তিন দিনের মাথায় সরকার ঘোষণা করল ধনকুবেরদের কর ছাড় দেওয়ার কথা। অর্থাৎ সরকার বাহাদুরের মনে হল, গরিবরা বোধ হয় বড্ড ধনী, আর ধনিকরা যথেষ্ট ধনবান নয় এই দেশে। “মাকরঁ তোমার মুখের রুটি কেড়ে নিল।” 

আসলে রাজনীতিকদের নেতিবাচক সিদ্ধান্তের ঝাপ্টা সরাসরি এসে লাগে শ্রমিকের দেহে। যেমন ইতিবাচক সিদ্ধান্তে সুবাতাসও খেলে যায় তার অঙ্গে। এক বার বাচ্চাদের ইস্কুলে যেতে উৎসাহিত করতে বই, খাতা, ব্যাগ ইত্যাদি খাতে ১০০ ইউরো ভর্তুকি বাড়ানো হয়েছিল। “তুমি এত আনন্দ পেলে, বসার ঘরে এসে হেঁকে বললে— আমরা সমুদ্রে বেড়াতে যাব। আমরা ছ’জন গাদাগাদি করে উঠে বসলাম গাড়িতে… গোটা দিনটা যেন এক উদ্‌যাপন। যাদের অনেক আছে, তাদের মধ্যে কক্ষনও দেখিনি স্রেফ এক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বশে সমুদ্রে বেড়াতে যেতে। কারণ তাদের জীবনে রাজনীতি কোনও পরিবর্তনই আনে না।” 

এদুয়ার লুইয়ের মতো অনেকের কলমেই উঠে আসছে এমিল জ়োলার পৃথিবী। ঊনবিংশ শতকের ফ্রান্সের শ্রমিক জীবনের অমানবিক দুর্দশার সেই সব ছবি। সময়ের চাকা কি আবার পিছন দিকে ঘুরছে?

এবার শুধু খবর পড়া নয়, খবর দেখাও।সাবস্ক্রাইব করুনআমাদেরYouTube Channel - এ।