‘ধামাল’ হল শিবের ডমরু

• উইলিয়ম ডালরিম্পল বলেছেন, পাকিস্তানের শাহবাজের দরগায় দরবেশদের ধামাল হয় (‘সংঘর্ষ তো দুই ইসলামে’, ১৯-৩)। ‘ধামাল’ অর্থে ফকির ও সুফি মুসলমান ভক্ত-সাধকদের নৃত্যগীত। ‘এই ধামাল শব্দটা এসেছে ডমরু থেকে। শিবের ডমরু।’
অনার্য ভারতবর্ষে প্রকৃতি পূজার সূত্রে বহু যুগ আগে শিবলিঙ্গ পূজার উদ্ভব। জাতপাতহীন উদার মিলনের ভাবনা আজও শিবের গাজনগুলিতে প্রকাশিত। চৈত্র মাসের শিবগাজনের সময় ভক্তরা নিজ গোত্র ত্যাগ করে শম্ভু গোত্র ধারণ করেন। এই গাজনের শেষ দিন শিব মন্দিরের অভ্যন্তরে, গম্ভীরায় প্রবেশ করে ভক্তের দল উদ্দাম নৃত্য করেন। সঙ্গে চলতে থাকে ঢাকের বাজনা ও শিবের জয়ধ্বনি। সব জাতের লোক একসঙ্গে এটি করেন। এখানে অস্পৃশ্যতার ব্যাপার নেই। একে বলে ধুমল বা ধামাল। গাজনের শুরু থেকে ধুমল শুরু হয় ঢাকির ঢাক বাজানো দিয়ে। ঢাক পেটানোকে বলে ধুমল দেওয়া। বাঁকুড়ার অতিপ্রাচীন শিব গাজনগুলিতে বংশানুক্রমিক ভাবে যাঁরা ঢাক বাজান, তাঁদের দেবোত্তর সম্পত্তি দেওয়া হয়েছে। সেই সম্পত্তি বা জমির দলিলে উল্লেখ আছে ‘ধুমলা মৌজা’। শুধুমাত্র সেই শিবের গাজনগুলিতে ‘ধামাল’ হয় এই এলাকায়, যে শিবগুলি জৈনদের প্রতিষ্ঠিত অথবা অধিকৃত।
তাই স্পষ্ট যে, শিবের ডমরু থেকে এই ধামাল এসেছে এটা ঠিক কথা। কিন্তু মধ্যবর্তী স্তরে এতে মিশেছে জৈনদের ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী ধর্ম। জৈনরা ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গে শিবস্থানে ‘ধামাল’ করতেন। পাকিস্তানেও প্রাচীন যুগে শিব পূজা হত। মহেঞ্জোদড়ো-হরপ্পা থেকে প্রাপ্ত পুরাকীর্তি তার প্রমাণ।


অরবিন্দ চট্টোপাধ্যায়, বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়

 

পুনর্বাসন কেন

• রেলের জমি দখল নিয়ে প্রকাশিত (২৫-৩) খবরের প্রেক্ষিতে বলি, কয়েক দশক ধরে স্থানীয় রাজনৈতিক মতে এই দখল চলছে। ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের কথা মাথায় রেখে গোড়াতেই রেল পর্যাপ্ত জায়গা নিয়ে রেখেছিল। এ রাজ্যে তার বেশির ভাগই দখল হয়ে গিয়েছে। প্লাটফর্মগুলোয় হাঁটাচলা করা দায় হয়ে উঠছে। স্টেশনে ট্রেন এলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সম্প্রতি এ রাজ্যে উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে একাধিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে আসতে হয়েছে রেলকে। দখলদার তুলতে গেলেই পুনর্বাসনের অবাস্তব দাবি উঠছে। গত কয়েক বছরে এই জটিলতা বহু গুণ বেড়েছে।

সস্তা জনপ্রিয়তার জেরে ‘ওরা খাবে কী’ প্রশ্ন তুলে সরকার ও দলগুলো দায় এড়িয়ে যাচ্ছে। রাজ্য যদি দখলদার উচ্ছেদে সত্যি আগ্রহী হয়, তা হলে কাজ হয়, সেটা অপারেশন সানশাইনে দেখেছি। এক দিকে জনস্ফীতি, অন্য দিকে কাজের অভাব— এ দুই সমস্যা দূর না হলে সর্বত্র দখল বাড়বে।

অশোক সেনগুপ্ত, কলকাতা-৭৫

 

সব লেখা যায় না

•প্রতিবাদ করা অবশ্যই উচিত, কিন্তু যাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, তাঁর মতো হয়ে তাঁর ভাষাতেই প্রতিবাদ করতে হবে? কবিতা এসেছে বলেই সব কিছু লেখা বোধ হয় যায় না! সোশ্যাল মিডিয়ায় যাঁরা শ্রীজাতকে বাজে ভাষায় আক্রমণ করছে, তাঁদের জেলে পোরার কথা বলে অংশুমান কর কি শ্রীজাতকেও তাঁদের সমান স্তরে আনলেন না (‘পাশে আছি তার্কিক ভারতের’, ২৪-৩)? পরিশেষে বলি, ত্রিশূল বোধ হয় শ্রীযোগীর সম্পত্তি নয়, কিন্তু সেটাকে তো লেখকই যোগীর সম্পত্তি মনে করলেন।

সুব্রতকালী রায় নিমদহ

 

‘উবাচ’ প্রয়োগ

• বহু কাল ধরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ‘উবাচ’ শব্দের প্রয়োগ দেখে আসছি। সম্প্রতি দেখলাম শাহরুখ উবাচ (২০-৩)। এই ‘উবাচ’ সংস্কৃত ক্রিয়াপদের তিঙন্ত প্রকরণের দশটি লকারের মধ্যে অন্যতম একটি লকার ‘লিট্’-এর রূপ, যা ব্রূ বা বচ্ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন হয়েছে। ‘উবাচ’ শব্দের অর্থ— বলেছিলেন। সংস্কৃত ভাষায় সেটি পরোক্ষ অতীত। ‘লিট্’-এর প্রথম পুরুষের এক বচন (ব্রূ/বচ্+লিট্+অ/ণল)। এই ‘উবাচ’ ক্রিয়াপদ হল পরোক্ষ অতীত। পাণিনির সূত্র: ‘পরোক্ষে লিট্’-(৩/২/১১৫)। সাধারণ ভাবে কিছু বলা হয়ে থাকলে তা সাধারণ অতীত। কিন্তু বহু কাল আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার ক্ষেত্রে (অনদ্যতন অতীত ঘটনার ক্ষেত্রে) এই ‘লিট্’-এর প্রয়োগ হয়। যেমন আমরা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা খুললেই দেখতে পাই, ‘ধৃতরাষ্ট্র উবাচ’, ‘সঞ্জয় উবাচ’, ‘শ্রীভগবান উবাচ’ ইত্যাদি। চণ্ডীতে দেখতে পাই ‘মার্কণ্ডেয় উবাচ’, ‘দেব্যুবাচ’ (দেবী উবাচ)। সাধারণ ভাবে ক্রিয়াপদের ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি, ‘অবদৎ’ বা ‘অব্রবীৎ’ বা ‘উক্তবান্’ বা ‘বদতি স্ম’। এ ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে ‘শাহরুখঃ অবদৎ’ অথবা ‘শাহরুখঃ উক্তবান্ অথবা শাহরুখঃ বদতি স্ম। কিন্তু ‘উবাচ’ ক্রিয়া পদ এখানে আদৌ উপযুক্ত নয়। রবীন্দ্রনাথ হয়তো পরিহাসের ছলে বলেছেন, ‘ন যযৌ ন তস্থৌ’। এই ধরনের শব্দ প্রয়োগ না করলেই বোধ হয় ভাল হয়।

পৃথ্বীশ চক্রবর্তী, কলকাতা-১৪০

 

পরিষেবা কই

•এসবিআই কর্তৃপক্ষ ১ এপ্রিল থেকে গ্রাহকের উপর বিভিন্ন মাশুল হার চালু করছেন। ব্যাঙ্কের আর্থিক ভার সামলানোর জন্য এসবিআই বিভিন্ন মাশুল হার চালু করতে যতটা সচেষ্ট, ঠিক ততটাই উদাসীন গ্রাহকদের উন্নতমানের পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে। প্রায় প্রতিটি এসবিআই শাখায় অসম্ভব ভিড় এবং সেই ভিড় সামলানোর জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামো তৈরির চেষ্টা নেই বললেই চলে। স্টেট ব্যাঙ্কের বগুলা শাখার কথাই ধরা যাক। অন্য ব্রাঞ্চে যে পরিষেবা কুড়ি মিনিটে পাওয়া যায়, সেই পরিষেবা পাওয়ার জন্য এই শাখায় ব্যাগে চিঁড়েমুড়ি নিয়ে যাওয়াই ভাল, কখন বাড়ি ফেরা যাবে, ঠিক নেই। অসম্ভব ভিড়ে এই শাখা গ্রাহকদের কাছে বিভীষিকাময় অন্তহীন সময় অপচয়ের জায়গায় পরিণত হয়েছে। এমন নয় যে, অফিসার ও কর্মচারীরা গ্রাহকদের বিষয়ে উদাসীন, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত চাপ তাঁদেরও দিশেহারা করে তোলে।

বিপ্লবকুমার ঘোষ, বগুলা, নদিয়া

 

বলতে ব্যস্ত

• বর্তমানে যা ঘটছে তাকে বলা যায় ‘অতিব্যাপ্তি’। একটি ঘটনা দ্রুত অন্য ঘটনার সঙ্গে জুড়ে গিয়ে অতীত চর্চার পরিসরকে একই সঙ্গে ভয়ঙ্কর ও বিপন্ন করে তুলছে। কোন কথার টিকে যে কোন চালে আগুন লাগায়, তা বোঝা দায় (‘পাশে আছি তার্কিক ভারতের’, ২৪-৩)। সবাই বলতে ব্যস্ত, শুনতে নয়। জনপরিসরের বিতর্কে যে যার সিদ্ধান্ত যেন আগে থেকেই ঠিক করে রাখেন। আসল কথা, ভারতীয় জনপরিসরে সহিষ্ণুতার পাশাপাশি অসহিষ্ণুতার স্রোত সমানেই বয়ে চলেছে। এ কথা মেনে নেওয়া ভাল যে, গণতন্ত্রে অসহিষ্ণুদেরও স্থান আছে। তাঁদের জন্যই সহিষ্ণুতা জোরদার হয়। নানা স্তরে অসহিষ্ণুদের বক্তব্য শুনতে হচ্ছে, অসহিষ্ণু কর্মকাণ্ড দেখতে হচ্ছে ও হবে। ধৈর্য ও মর্যাদা সহকারে সেই সব কিছুর মোকাবিলা করা দরকার, তবেই হয়তো আমাদের গণতন্ত্রে কোনও দিন সহিষ্ণুতার ‘রামরাজ্য’ প্রতিষ্ঠিত হবে।

শোভনলাল চক্রবর্তী, কলকাতা-৯৪

 

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা
সম্পাদক সমীপেষু, 
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, 
কলকাতা-৭০০০০১। 
ই-মেল: letters@abp.in