রোমান হরফে বাংলা কিশোর গ্রন্থাবলি প্রকাশের ব্যাপারে আলোক রায় এবং নিখিল গুপ্তের পত্র দুটির (‘হোক না রোমান’ এবং ‘আর এসএমএস?’, সম্পাদক সমীপেষু, ৭-২) বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করা গেল না। মাতৃভাষার স্বাদ পাওয়া উচিত শৈশব থেকেই এবং ভাষার নিজস্ব হরফে। ভাষাবিদদের মতে, যে কোনও ভাষার আত্মপরিচয় তার হরফ বা লিপিতে। বর্তমানে এক শ্রেণির বাঙালি মা-বাবা অবশ্য, সন্তান যদি বাংলা বলায় সড়গড় না হয়, কিংবা ইংরাজি বা হিন্দি অ্যাকসেন্টে বাংলা উচ্চারণ করে, তা হলে এক ধরনের শ্লাঘা অনুভব করেন। সন্তানের বাংলাচর্চায় এঁদের না আছে উৎসাহ না আছে উদ্যোগ— কোনও রকমে বাংলা বিষয়টিতে পাশ করে গেলে এঁরা যেন হাঁপ ছেড়ে বাচেন। এই সব অভিভাবকদের মনোবাসনা পূর্ণ করতে সম্ভবত
এ-বারের কলকাতা বইমেলায় প্রকাশ করতে হয়েছে রোমান হরফে বাংলাভাষার ‘সহজপাঠ’ ১ম ও ২য় ভাগ, যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘হাসিখুশি’, সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’, যেগুলির ওঁরা নামকরণ করেছেন ‘বেংলিশ বুকস’।
এ বাঙালির পক্ষে অত্যন্ত লজ্জার। ‘বড় বেদনার মত বেজেছে’ এই আশঙ্কা, যে, বিভিন্ন ভাবে আক্রান্ত ও অবহেলিত বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পক্ষে এ কোনও নতুন সর্বনাশের ইঙ্গিত নয় তো? অদৃষ্টের পরিহাস, আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে এক বিদেশি, উইলিয়ম কেরি, ছাপাখানা স্থাপন করেছিলেন শ্রীরামপুরে, বাংলাভাষায় সংবাদপত্র ও বাংলা পুস্তক মুদ্রণের জন্য, আর আমরা, পরের রঙে রং মেলাতে ব্যস্ত এ-বঙ্গের আত্মবিস্মৃত বাঙালিরা, বাংলা লিপির সঙ্গে পরিচিত হয়ে বাংলা ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন না করে, শিশুকে রোমান হরফে কোনও রকমে দায়সারা ভাবে বাংলা শিশুসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত করতে ব্যগ্র।

শান্তনু রায়  কলকাতা-৪৭

 

সুনীতিবাবু স্বয়ং

রোমান হরফে বাংলা লেখার কথায় মনে পড়ে গেল, সুগত সিংহ একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন আনন্দবাজারের রবিবাসরীয়তে, বছর তিনেক আগে (‘সুনীতিকুমার ও sms’)। তাতে স্পষ্ট লেখা ছিল, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় শুধু বাংলা নয়, সমস্ত ভারতীয় ভাষাই রোমান হরফে লেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন স্বাধীনতারও আগে। প্রবন্ধটি থেকে উদ্ধৃত করি: ‘তিরিশের দশকে আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় সমস্ত ভারতীয় বর্ণমালা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। বলেন, বাংলা, মরাঠি, ওড়িয়া, অহমিয়া, হিন্দি, তেলুগু, তামিল, মালয়ালম, উর্দু ইত্যাদি সব লেখা হোক রোমান বা ইংরেজি হরফে। তাঁর যুক্তিগুলো বেশ ধারালো। এই সব বর্ণমালা প্যাঁচালো এবং জটিল। তুলনায়, ইংরেজি হরফ অনেক সরল। ... তায় ব্যঞ্জনের পর স্বরবর্ণ বা ব্যঞ্জনবর্ণ এলে আর এক প্রস্থ নতুন বর্ণের চেহারা এসে হাজির হয়। ...ব্যঞ্জনের ওপর ব্যঞ্জন, তার ওপর আবার ব্যঞ্জন চড়লে তো সোনায় সোহাগা...

‘ভাষাচার্য হিসেব করেছিলেন, শিশু প্রথম বাংলা বর্ণ চেনা থেকে মোটামুটি পড়তে-লিখতে শেখে দু’বছর সময়ে। ইংরেজির ক্ষেত্রে সময়টা মাত্র তিন মাস। কারণ ২৬টা লেটারের বাইরে ইংরেজিতে যুক্তবর্ণের আর কোনও হিজিবিজি নেই। বাংলায় সেখানে প্রায় ৪০০ অক্ষরের দরকার হয়। তার সঙ্গে বানানের জটিলতা জুড়ে যে বিভীষিকার সৃষ্টি হয়, তা ভাষাটাকে মেরে ফেলার পক্ষে যথেষ্ট। আচার্য ইংরেজি হরফে বাংলা পাঠ্যবই ছেপে সুন্দরবনের কিছু প্রাইমারি স্কুলে পড়াতে শুরু করেন। ফল নিয়ে লিখেছিলেন, '...the boys and girls were able to read their mother-tongue in this Roman-Bengali much quicker than the ordinary children learning it through the Bengali alphabets.' (আ রোমান অ্যালফবেট ফর ইন্ডিয়া— সুনীতি কুমার চ্যাটার্জি, জার্নাল অব দ্য ডিপার্টমেন্ট অব লেটার্স, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৩৫)।...

‘এ ব্যাপারে ভাষাচার্যের মূল প্রেরণা ছিলেন কামাল পাশা। ১৯২৮ সালে তিনি তুরস্কে সরকারি ফরমান জারি করে গায়ের জোরে রোমান হরফ চালু করেন। ভৌগোলিক অবস্থানের ফলে তুরস্ক চিরকালই এশীয় ও ইউরোপীয় সংস্কৃতির মিলনস্থল। কামাল পাশা বুঝেছিলেন, এই মিলনমেলাকে আরও উন্মুক্ত করে দেওয়া দরকার। এ প্রসঙ্গে  ভাষাচার্য লিখেছিলেন, ‘বঙ্গদেশের এক লব্ধপ্রতিষ্ঠ ও সর্বজন-সমাদৃত লেখক— একাধারে তিনি বৈজ্ঞানিক ও আভিধানিক এবং রস-রচয়িতা— তিনি আমায় বলিয়াছিলেন যে, যদি তাঁহার হাতে কামাল পাশার মতো ক্ষমতা থাকিত, তাহা হইলে আইন করিয়া দেশে বাংলা ভাষায় তিনি রোমান অক্ষর প্রচলন করাইতেন।’ (ভারতে রোমক লিপি, সাংস্কৃতিকী, ২য় খণ্ড, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, বাক সাহিত্য, ১৩৭২)। যে তিনটি বিশেষণ প্রয়োগ করা হয়েছে তাতে বুঝতে পারি, ওই ব্যক্তি রাজশেখর বসু ছাড়া আর কেউ নন। এ নিয়ে দেশদ্রোহিতা এবং বাংলাবিদ্বেষের অভিযোগ আসতে পারে বলে সুনীতিকুমার সতর্ক ছিলেন, সমস্ত দায় নিজের কাঁধে নিয়ে, রাজশেখর বসুর নামটা পর্যন্ত উল্লেখ করেননি।’

সুগতবাবুর এই প্রবন্ধ থেকে আমরা জানতে পারি, এই ভাবনা নতুন নয়, এবং ইংরেজিয়ানা-আক্রান্ত কিছু অর্বাচীন মানুষেরও নয়। বর‌ং এমন কিছু প্রণম্য বাঙালি এ নিয়ে ভেবেছেন, এবং রোমক হরফে বাংলা লেখা সমর্থন করেছেন, যাঁরা সারা জীবন ভাষা নিয়ে চর্চা করেছেন ও সে বিষয়ে যাঁদের যোগ্যতা ও প্রতিভা সর্বস্বীকৃত। তাই যখন আমাদের সহজ বুদ্ধি ও তাৎক্ষণিক আবেগ নিয়ে আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে পড়ব, তখন এঁদের কথা মনে করে, অন্য দিকের যুক্তিটাকেও যেন মূল্য দিই।

সুশান্ত বসু  কলকাতা-৬৮

 

সুভাষবাবুও

স্মৃতি যদি একান্তই বিশ্বাসঘাতকতা না করে, তবে সাঁওতালি হরফ প্রসঙ্গে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় রোমান হরফের পক্ষে মতদান করেছিলেন। বাংলায় দু’একটা রোমান হরফের দ্বারা বই প্রকাশিত হলে, ক্ষতি কী?

উপাসক কর্মকার  বিরাটি

 

মিলেমিশে

একুশে ফেব্রুয়ারি কাছাকাছি এলেই সোনার পাথরবাটির মতো হঠাৎ বিশুদ্ধ বাংলার জন্য উথলে ওঠে আমাদের আবেগ। মনে পড়ে যায় রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষার স্বাধিকারের ইতিহাস। চার দিকের হালচাল দেখে সভা-সমিতিতে সম্মিলিত হাহাকার ওঠে এ-ভাষার অন্তর্জলি যাত্রা সমাগত, এই আশঙ্কায়। অথচ মনে রাখি না যে, এই ‘গেল গেল’ রব ওঠা কিন্তু আজকের ব্যাপার নয়, সেই আঠারো শতকে যখন ভারতচন্দ্র ‘যাবনী মিশাল’ ভাষা ব্যবহার করতে শুরু করেছিলেন, তখন থেকেই। তার পরে ওই একই অভিযোগ উঠেছিল নজরুলকে নিয়ে। রামপ্রসাদের গানেও ইংরেজি শব্দ আছে, ভাবা যায়! তাতে কি বাংলার ক্ষতি হয়েছে?

রকের ভাষা, কম্পিউটারের ভাষা, আঞ্চলিক ভাষা, পেশা এবং অপরাধ জগতের বিচিত্র ভাষা ব্যবহার করছেন এ-কালের বহু লেখক। অপরিচিত বলে প্রথমে দ্বিধা আসে ঠিকই, তবে ব্যবহার করতে করতেই এক দিন তা নিজের হয়ে উঠবে। এ-ভাবেই যুগ যুগ ধরে
বাংলা ভাষা ধনী হয়েছে অন্যের সম্পদ ভোগ করে। ভাল কথায় আমরা তার নাম দিয়েছি আত্তীকরণ। আমাদের শব্দভাণ্ডার নেড়েচেড়ে দেখলে অবাক হতে হয়, কোন ভাষার শব্দ নেই সেখানে!

বাংলা বলে যা জানি, তার কত শতাংশ বাংলা? বিশুদ্ধ বাংলা ছাড়া কথা কইব না, এমন পণ করে বসে থাকলে কিন্তু বাংলারই ক্ষতি।
বিশুদ্ধ বাংলা পাব কোথায়? মিলেমিশেই তো আমাদের জন্ম; আমাদের ভাষা-সংস্কৃতিও তাই। পরের ধন আপন করছি আমরা হাজার বছর ধরে। সেই আগ্রাসী চিত্ত জেগে থাকুক ভাষার জন্যও। তবেই মুক্তি মিলবে হাহাকার থেকে।

প্রবীর সরকার  দেশবন্ধু রোড, পুরুলিয়া

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।

ই-মেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়