সবই পুঁজির খেলা 

রাহুল গাঁধী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাঁরা ক্ষমতায় এলে দেশের পাঁচ কোটি পরিবারকে বছরে ৭২ হাজার টাকা দেওয়া হবে। এটা তাঁর নিজের ভাবনা, না কি ভারতের পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য দাওয়াই? আজ পর্যন্ত যত অর্থনৈতিক পলিসি ঘোষিত হয়েছে, তা শুধুই শোষক শ্রেণির সুবিধার্থে। তা জিএসটি হোক, বা নোট বাতিল, বা এফডিআই। মূল কথা, কোনও রাজনৈতিক পার্টি আর্থিক নীতি ঠিক করে না, ঠিক করে বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং তাদের পক্ষে থাকা অর্থনীতিবিদ। বিরোধী থাকাকালীন যে জিএসটি বিল-এ বিজেপির আপত্তি ছিল, নিজেদের আমলে সেটাই চালু হয়ে গেল। আমরা যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই, রাহুলের ঘোষণা পালিত হবে, অর্থাৎ ভারতের ২০% মানুষ, যাঁরা প্রান্তিক, তাঁরা মাসিক ছ’হাজার টাকা কোনও শ্রম না করেই পাবেন— তা হলেও সেটা বিশ্লেষণ করা দরকার।

১৯২৯-এ পুঁজিবাদী দুনিয়ায় চরম অর্থনৈতিক মন্দায় জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে পুঁজিবাদী শোষণকে অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য এবং মানুষের মধ্যে বিশ্বাস জোগানোর জন্য অর্থনীতিবিদ কেন্‌স নিয়ে এলেন ‘অটোনমাস ইনভেসমেন্ট পলিসি’। বিভিন্ন দেশের সরকার, জনগণের স্বার্থে, আয়ের প্রত্যাশা না করে প্রয়োগ করল, যাতে জনগণ এই ব্যবস্থার পর আস্থা না হারান। সর্বোপরি, শোষণ মেনে নেন। 

এই মুহূর্তে বিশ্ব জুড়ে এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য জনগণকে নানা রকম উপঢৌকন দেওয়ার কাজ চলছে। যেমন, আমাদের রাজ্যে কন্যাশ্রী, যুবশ্রী, সাইকেল দেওয়ার প্রকল্প। এ রাজ্যের প্রকল্প সুইডেনে গিয়ে প্রাইজ় আনছে। এর অর্থ: বিশ্বের পুঁজিবাদী শোষকরা তাদের অত্যাচারে নিষ্পেষিত জনগণের ক্ষোভ থেকে বাঁচতে নানা উপঢৌকন দেওয়ার পদ্ধতিকে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। রাহুলজির প্রকল্পও এর একটি অঙ্গ ছাড়া আর কিছুই না। 

মানুষ বেঁচে থাকার জন্য চান কাজ। আর কাজ দিতে পারে কারখানা। বাজারের সঙ্কটের দরুন কারখানার উৎপন্ন দ্রব্য বিক্রি না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাই পুঁজিপতিরা কারখানা তৈরি করতে রাজি নয়। তাই তাদের সংগৃহীত জমে থাকা পুঁজি লাভজনক ক্ষেত্রগুলোতে বিনিয়োগ করার ব্যবস্থা আজ সরকারকেই করে দিতে হচ্ছে, অর্থাৎ জনগণের টাকায় সরকার তাদের পছন্দমতো ক্রেতা হয়ে উঠছে। তাই চকচকে রাস্তা, যুদ্ধাস্ত্র, নানা রকমের বাড়ি তৈরি, সাইকেল বিলি— সমস্ত কিছুই আঞ্চলিক, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পুঁজির স্বার্থে নানা রকমের পদক্ষেপ। অর্থাৎ মুনাফা লোটার ব্যবস্থা ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনি-আমি সকলেই এই মুনাফা সৃষ্টির জাঁতাকলে পিষে যাচ্ছি এবং তকতকে রাস্তা দেখে বাহবা দিচ্ছি!  

মাসিক ৬০০০ টাকা পেলেও গরিবের জীবনযাত্রার কোনও পরিবর্তন ঘটবে না, বরং আগের থেকেও আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে, বর্তমান জীবনযাত্রা বজায় রাখার জন্য। কারণ আর্থিক আয় বৃদ্ধি মানুষের ভাল থাকার নিদর্শন নয়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, অর্থাৎ তাঁর প্রকৃত আয় বাড়ল কি না, তার উপরই নির্ভর করে, তিনি কতটা ভাল আছেন। মানুষের আর্থিক আয় বাড়লেও, যদি জিনিসপত্রের দাম তার থেকেও বেশি হারে বাড়ে, তা হলে তাঁর জীবনযাত্রার মান আরও নামতে থাকে। ধরা যাক, এক ব্যক্তির আয় মাসিক ১০০ টাকা এবং চালের বাজার-মূল্য ১০ টাকা। তা হলে তিনি ১০ কেজি চাল কিনতে সক্ষম। এ বার যদি তাঁর আয় দ্বিগুণ অর্থাৎ ২০০ টাকা হয়, এবং বাজারে চালের মূল্য যদি ২৫ টাকা হয়, তিনি মাত্র ৮ কেজি চাল কিনতে পারবেন। তা হলে দেখা গেল, আর্থিক আয় দ্বিগুণ হওয়া সত্ত্বেও তিনি আগের তুলনায় কম পরিমাণ জিনিস কিনতে পারছেন। অর্থাৎ তাঁর প্রকৃত আয় কমে গেল। 

আমাদের দেশ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর, মূলধনও প্রচুর, শ্রমের অভাব নেই। তবুও কেন কারখানা গড়ে ওঠে না, মানুষ কাজ পান না? যত দিন এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা চলবে, তত দিন ভোট আসবে, মানুষ প্রতিশ্রুতি শুনবেন এবং ঠকবেন। জিতবে এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য ম্যানেজারের ভূমিকা পালনকারী রাজনৈতিক দলগুলি।

গৌতম দাস

মালদহ

ত্রাণহীন পরিহাস

ত্রিদিবেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘বৃদ্ধি হচ্ছে, zানতি পারো না’ (৪-৫) লেখাটি প্রসঙ্গে দু’চারটি কথা। ভারত আজ আর্থ-সামাজিক আর রাজনৈতিক সঙ্কটের মুখোমুখি। ’৮০-’৯০-এর দশক থেকে বাম-ব্যবস্থা আর তার রাজনীতির পরাজয় আর তার শূন্যস্থান পূরণে বিশ্বপুঁজির (finance capital) বিকট বিশ্বায়নের পর থেকে, জাতিরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সনাতন ধারণা পাল্টে গিয়েছে। সনাতন জাতিরাষ্ট্রও বিশ্বপুঁজির চাহিদামতো নিজেকে পাল্টে নিচ্ছে। আর তার সঙ্গে সারা পৃথিবী জুড়েই চলছে, চরম দক্ষিণপন্থী ফ্যাসিবাদী আস্ফালন। সঙ্গে অবাধ কর্পোরেট লুট। জাতীয় সম্পদ আর প্রকৃতির সীমাহীন লুণ্ঠনই আজ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। উন্নয়ন আর জিডিপি-র আড়ালে মুষ্টিমেয়-র মুনাফা আর সম্পদ বৃদ্ধিই আজ অর্থনীতির গতিপথ। এই মুনাফা-চালিত সমাজে সাধারণের অর্জিত অধিকার পদদলিত। দারিদ্র আর কর্মহীনতার অস্বীকৃতিই আজ তার অস্তিত্বহীনতা প্রমাণ করে। পণ্যায়িত বিশ্বে তাই রাজনীতিও পণ্য। তাই গণমুখী রাজনীতির যে ধারা আপাত হলেও সর্বদলেই এত দিন চর্চিত ছিল, বিলীয়মান। এমতাবস্থায় ধর্ম, ফ্যাসিবাদ, ঘৃণা আর বিভেদের রাজনীতি ছাড়া কোনও দলের আর উপায়ও নেই! রাজনীতির এ এক পরিত্রাণহীন পরিহাস! পোলিশ অর্থনীতিবিদ Michal Kalecki এটাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন "partnership of big business with fascist upstarts" বলে।       

অনিন্দ্য ঘোষ

কলকাতা-৩৩

কিছুটা পারি

ত্রিদিবেশবাবুকে বলি, কে বলল আমরা zানতে পারি না? এক সমীক্ষা অনুযায়ী, আর আট বছর বাদে ভারতে মিলিয়নেয়ারের (১০ লক্ষ টাকা যাদের আছে) সংখ্যা দু’গুণ বেড়ে হবে ১০ লক্ষ। সিবিডিটি’র তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে ৬৮% ক্রোড়পতি বেড়ে হয়েছে ৮১,৩৪৪ জন। উল্টো পথও আছে। গত পাঁচ বছরে ব্যাঙ্কে স্বেচ্ছা-ঋণ খেলাপির সংখ্যা ৫,০৯০ থেকে দু’গুণ বেড়ে হয়েছে ১১,০০০। ঋণ খেলাপের অঙ্ক তিন গুণ বেড়ে হয়েছে ১,২১,৭০০ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে ধনী ঋণ খেলাপিদের ৫.৫ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ মকুব হয়ে গিয়েছে। আর এই ফাঁকে ভারতে প্রায় ১৩৪ কোটি মানুষের মধ্যে ৮১,৩৪৪ জন কোটিপতি। এ ছাড়া, লোকসভা নির্বাচন উপলক্ষে ৫৪৩টি আসনে বেশ কিছু প্রার্থীর সম্পদের পরিমাণ জানা যাচ্ছে। অনেকেই কোটিপতি। এই তথ্য ইন্টারনেট, সংবাদপত্রের মাধ্যমে খুবই সুলভ। এর বাইরে কালো অর্থনীতির অন্তত তিন গুণ হিসেব আছে, যা জানা কুবেরের বাবার অসাধ্যি।          

হ্যাঁ, যা জানতে পারছি না, এই ঋণ খেলাপি কারা? তথ্যের অধিকার সংক্রান্ত আইনে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক, শীর্ষ আদালতে এত দৌড়ঝাঁপ সত্ত্বেও গণতন্ত্র এই জায়গায় তথ্য দিতে পারছে না। আর তাই অঙ্ক মিলছে না। সোজা পথে আয় সব কি সৎ পথে হয়েছে? এত অর্থ এল কোথা থেকে? আর উল্টো পথে, এই খেলাপ হওয়া বিশাল টাকা কোথায় গিয়েছে? সেটাও কি সৎ পথে গিয়েছে? অঙ্কের সূত্র গিলছি, কিন্তু খেতে পারছি না।

লেখকের মতে, ‘‘কয়েকটা অতি বৃহৎ ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধি মানেই দেশের উন্নতি নয়।’’ ঠিকই, অথচ এই উন্নতিই প্রচার পাচ্ছে। দেশ আজ ১৩৪ কোটি মানুষের মধ্যে ৮১,৩৪৪ জন, অর্থাৎ ০.০০৬০% মানুষের। বাকি মানুষ অপ্রয়োজনীয়, অতিরিক্ত? না, তাদের শ্রম, মেধা শোষণ করেই তো ওই কোটিপতিদের এত সম্পদ। 

শুভ্রাংশু কুমার রায়

ফটকগোড়া, হুগলি