‘তারি লাগি সুন্দরের হাতের অমৃত’ (পত্রিকা, ১৬-৩) পড়ে কিছু সংযোজন। লেখিকা ও লিপিকার রানী চন্দের ভূমিকা রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণে শেষ হয়ে যায়নি। 

রবীন্দ্রনাথের মতো অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গেও, কথা ও লেখার সূত্রে তাঁর একটি অকপট, সহজ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তিনি অবনীন্দ্রনাথেরও স্নেহধন্যা হয়েছিলেন। ফলে, খোলাখুলি মেজাজে বলে যাওয়া অবনীন্দ্রনাথের শিল্পীমনের কথা ‘ঘরোয়া’র পরও তাঁর কলমে উঠে এসেছে, ‘জোড়াসাঁকোর ধারে’ (১৯৪৪) ও ‘শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ’ (১৯৭২) বই দু’টিতে। ১৯৪১ সালে অবনীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকো ছেড়ে বরাহনগরের গুপ্তনিবাসে চলে যাওয়ার পরও তাঁর সঙ্গে রানীর এই দীর্ঘ কথোপকথনের ধারা বয়ে চলেছে। বিষয়: সহজ ভাবে বলা ছবি নিয়ে গভীর উপলব্ধি, স্মৃতিচারণা এবং কুটুম কাটাম নির্মাণ বিষয়ে অজস্র কথা।

এই যোগাযোগ রবীন্দ্র-পরবর্তী শান্তিনিকেতনেও অক্ষুণ্ণ ছিল। রানী লিখেছেন, ১৯৪২-এর পর জেল থেকে বেরিয়ে বিশ্বভারতীর অধ্যক্ষ অবনীন্দ্রনাথের আহ্বানে শান্তিনিকেতনে ফিরে এলেন। অবনীন্দ্রনাথ চিঠিতে লিখে পাঠিয়েছিলেন, ‘‘নববর্ষে নতুন বন্ধুর জন্য বসে আছি, কবে এসে সে গল্প শুনবে আমার কাছে।’’ সেই সব গল্প শোনা তো হলই, অবনীন্দ্রনাথের নতুন চিত্রসৃষ্টির সহায়িকাও হয়ে উঠলেন। দু’জনে অনেক ছবি আঁকলেন, নামও রইল দু’জনের, অবনীন্দ্রনাথের স্বহস্তে (‘শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ’)। 

চঞ্চল বন্দ্যোপাধ্যায়,

কলকাতা-৩০

কাজের হাল

সাম্মানিকের অসম্মান’ (সম্পাদকীয়, ১২-৩) শীর্ষকে বলা হয়েছে, যেখানে অধিকাংশ রাজ্যে মিড ডে মিলের রান্নার কাজে ন্যূনতম দৈনিক মজুরি কমপক্ষে ২০০ টাকা, সেখানে এই রাজ্যে মাসে পাওয়া যায় ১০০০ টাকা, অর্থাৎ দৈনিক ৪০-৫০ টাকা। আরও বলা হয়েছে এই কাজে নিযুক্তদের কর্মী হিসাবে গণ্য করা হয় না, পাছে নিয়ম মেনে বেতন দিতে হয়! আর এই বক্তব্যের রেশ ধরে ‘শ্রমের অসম্মান’ চিঠিতে (২৩-৩) লেখা হয়েছে, কী ভাবে সরকার ‘‘স্থায়ী কাজে স্থায়ী কর্মী নিয়োগের ধারণাকে নস্যাৎ করে’’ এবং ‘‘সঙ্গে বেতন সঙ্কোচন’’ করে ‘‘আশা, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী’’ থেকে ‘‘ব্যাঙ্ক, বিমা, রেল প্রভৃতির মতো সংঘটিত ক্ষেত্রে চুক্তির ভিত্তিতে নিযুক্ত অস্থায়ী কর্মীর সংখ্যা দিনের পর দিন বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে।’’ 

আর্থিক বঞ্চনার আরও দু’একটি উদাহরণ। সরকারি হাসপাতালে চতুর্থ শ্রেণির কাজে চুক্তিতে নিযুক্তরা পাচ্ছেন ৭০০০ টাকা, স্থায়ী কর্মীদের সমান নয়। পুরসভাগুলির চার পাশ নীল-সাদা রং হয়েছে, বাসস্ট্যান্ড তৈরি হয়েছে, কোনওটা এসি, পানীয় জলের মেশিন বসেছে, ভাল কথা, কিন্তু সাফাই-কর্মীদের দৈনিক মজুরি কোথাও ১৪০ টাকা, কোথাও ১৭০ টাকা, যখন সারা ভারতে বর্তমানে চালু ন্যূনতম দৈনিক মজুরি ১৭৬ টাকা, পশ্চিমবঙ্গে ২১১ টাকা নির্ধারিত। এটা তিন বছর আগের। কিছু দিন আগে পরিবর্তিত ন্যূনতম দৈনিক মজুরি ৩৭৫ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বঞ্চনার কিছুটা তাঁদের কাছে ফিরে যাচ্ছে ভর্তুকি, অনুদানের মাধ্যমে, রেশনে দু’টাকা কিলোর চাল, গম দেওয়া হচ্ছে, সরকার বাড়ি তৈরিতে অর্থ দিচ্ছে, বিনামূল্যে শিক্ষার পাশাপাশি বই, খাতা, সাইকেল দেওয়া হচ্ছে, কন্যাশ্রী প্রকল্পে টাকা দেওয়া হচ্ছে, স্কুলে মিড ডে মিলের ব্যবস্থা হয়েছে, চিকিৎসা বিনামূল্যে করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সব সুবিধা তাঁরাও পাচ্ছেন, যাঁরা সরকারি বা বেসরকারি ক্ষেত্রে কর্মরত নন। পারিবারিক আর্থিক সামর্থ্যের বিচার না করে সবাইকে এই ভর্তুকি, অনুদান দেওয়া হচ্ছে, ফলে কর্মরতদের আর্থিক বঞ্চনা নিয়ে প্রতিবাদ হলেও, সমাজে দাগ কাটছে না। 

সমাজের একটা বড় অংশের মানুষকে সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হচ্ছে, স্বাভাবিক ভাবে ভোটের সময় ভর্তুকি, অনুদানের কথা ভেবে তাঁরা নিরপেক্ষ ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে ভয় পাচ্ছেন, সরকারে থাকা দলের ভোট-বৈতরণি পার হওয়ার কাজটা সহজতর হচ্ছে।

এখন আর কোনও দল নতুন চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে না, কেন্দ্র ও রাজ্যগুলিতে যে ২২ লক্ষ স্থায়ী পদ ফাঁকা পড়ে আছে তা পূরণের দাবিও কংগ্রেস ছাড়া কোনও দলই করছে না, অবসরপ্রাপ্তদের নিয়োগ বন্ধের কথা কেউ বলছে না, কাজের সময় কমানোর কথা কেউ বলছে না, পরিবর্তে কেউ ১০০ দিনের কাজ বাড়িয়ে ২০০ দিন করার কথা বলছে, আর কংগ্রেস থেকে বলা হচ্ছে দেশের পাঁচ কোটি গরিব পরিবারকে ‘ন্যূনতম আয় যোজনা’র (ন্যায়) মাধ্যমে মাসে ছ’হাজার টাকা দেওয়া হবে, যাতে তাঁদের পারিবারিক মাসিক আয় ন্যূনতম ১২ হাজার টাকা হয়। পারিবারিক মাসিক আয় ন্যূনতম ১২ হাজার টাকা করার পরিকল্পনা করা হলে ন্যূনতম মাসিক বেতন ১২ হাজার হবে না কেন, কেন সম-কাজে সম-বেতনের ব্যবস্থা হবে না? একমাত্র বামপন্থীরাই ন্যূনতম বেতনের (মাসে ১৮ হাজার টাকা) কথা বলছে। কংগ্রেসের প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে একাধিক বক্তব্য উঠে আসছে, সেটা স্বাভাবিক। ন্যূনতম বেতনের ব্যবস্থা করা হলে, সম-কাজে সম-বেতন পেলে, শ্রমের মূল্য সরাসরিই শ্রমিকের হাতে গেলে, সমাজের একটা বড় অংশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। তখন পাঁচ কোটি পরিবারের সংখ্যাটা স্বাভাবিক ভাবে অনেক কমে আসবে, প্রস্তাবটি চালু করা সহজতর হবে। 

বাজার অর্থনীতি শুরুর সময় অনেক কথা শোনা গিয়েছিল। বলা হয়েছিল, এক শ্রেণির মানুষের আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি হবে, সেখান থেকে অর্থ চুইয়ে নিচুতলায় নামবে, বাজারদরে সকলকে জিনিস কিনতে হবে। অথচ আরও বেশি সংখ্যক মানুষকে ভর্তুকির আওতায় আনতে হচ্ছে। এক দিকে কাজ নেই, আর কাজ থাকলেও বেতন এত কম যে দেশের একটা বড় অংশের মানুষ ৮-১০ ঘণ্টা শ্রম দিয়েও দরিদ্র থেকে যাচ্ছেন, সরকারের দেওয়া অনুদান, ভর্তুকির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে, আর কাজ হারালে (যেটা যখন-তখন হতেই পারে), তাঁরা অসহায়।

অসিত কুমার রায়

ভদ্রেশ্বর, হুগলি

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

রাজা কৃষ্ণনাথ

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার (১৮৫৭) চার বছর আগে (১৮৫৩) কাশিমবাজারের রাজা কৃষ্ণনাথ রায়-এর ইচ্ছেয়, কৃষ্ণনাথ কলেজটি অক্সফোর্ডের আদলে তৈরি হয়, সমস্ত ব্যয়ভার বহন করেন রাজা কৃষ্ণনাথ। তিনি উইল করে যান এই মর্মে যে, তাঁর সমস্ত সম্পত্তি কলেজের পরিকাঠামো ও কলেজ পরিচালনার জন্য ব্যয় হবে এবং এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয় হবে। ১৬৫ বৎসর পর তাঁর অন্তরের ইচ্ছা পূরণ হতে চলেছে। এই কলেজে এক সময় আচার্য ব্রজেন শীল, ড. হীরালাল হালদার, জ্যোতিষ মিত্র, এন কে নাগ, ই এম হুইলার প্রমুখ যশস্বী পণ্ডিতদের শিক্ষাদানে কলেজের খ্যাতি সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কবিশেখর কালিদাস রায়, বিনোদবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায়, জগদানন্দ বাজপেয়ী এবং আরও বেশ কিছু ছাত্র এই কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করে সমগ্র সমাজের মুখ উজ্জ্বল করেন। সুভাষচন্দ্র বসু (১৯৩৯), তাঁর অগ্রজ শরৎ বসু এই কলেজে আসেন (১৯৪১)। গাঁধীজিও এই কলেজে পদার্পণ করেন। উল্লেখ্য, গভর্নমেন্ট যখন এই কলেজ পরিচালনা করতে অক্ষমতা প্রকাশ করে, তখন রাজা কৃষ্ণনাথের সহধর্মিণী রানী স্বর্ণময়ী এই কলেজের ব্যয়ভার নিজে গ্রহণ করেন। এ হেন ১৬৫ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী কলেজ যখন ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ স্তরে উন্নীত হতে চলেছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে কৃষ্ণনাথের নাম যুক্ত থাকা বাঞ্ছনীয়।