Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৫ অগস্ট ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

সম্পাদক সমীপেষু: খণ্ডিত আলো

অনেক ইতিহাসবিদ উনিশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন, রাজা রামমোহন রায়ের ব্যর্থতার দিকগুলি সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেছেন।

০২ জুন ২০২২ ০৫:০১
Save
Something isn't right! Please refresh.
Popup Close

অমিত দাসের ‘বিদেশেও তিনি আইকন’ (২২-৫) প্রবন্ধ প্রসঙ্গে এই চিঠি। রাজা রামমোহন রায় ছিলেন উনিশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণের অন্যতম পুরোধা। সতীদাহ প্রথা রদ করা থেকে শুরু করে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা— আমাদের আধুনিকতার সূচনাই হয়েছিল তাঁর হাতে। তার পর বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ প্রমুখ তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টায় সেই পথকে আরও প্রসারিত করেছেন। কিন্তু পরবর্তী কালে অনেক ইতিহাসবিদ উনিশ শতকের এই নবজাগরণকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন, তার ব্যর্থতার দিকগুলি সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেছেন।

আজ প্রায় সকলেই মেনে নিয়েছেন, উনিশ শতকের চেতনার উন্মেষ বা জ্ঞানচর্চার প্রসার কেবল উচ্চবর্ণের কিছু বিত্তশালী হিন্দু পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। মুসলমান, দলিত বা নিম্নবর্গের মানুষ এই দীপ্তি থেকে শত যোজন দূরে ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই নবজাগরণ ছিল পুরুষশাসিত। কলকাতার বাইরেই বা তা কত দূর বিস্তার লাভ করেছিল? এর পিছনে অনেকগুলি কারণ চিহ্নিত করা হয়। ১৮৩৫-এ মেকলে সাহেব কর্তৃক নতুন শিক্ষানীতিতে মাতৃভাষার চেয়ে ইংরেজিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, আবার সাধু-চলিত দ্বৈত, গুরুচণ্ডালী দোষ প্রভৃতির মাধ্যমে এক শ্রেণির মানুষকে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। বলা বাহুল্য, হিন্দু সমাজে প্রচলিত বর্ণাশ্রম প্রথা আলোকায়নের প্রসারে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। যে গোঁড়ামি ও ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতার বিরুদ্ধে রামমোহনের আজীবন লড়াই, তা তাঁর জন্মের আড়াইশো বছর পরেও বিদ্যমান। সাম্প্রদায়িক হিংসা থেকে শুরু করে উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান, এবং তাকে ঘিরে এক দল উন্মত্ত জনতার উচ্ছ্বাস আমাদের ‘আলোকপ্রাপ্তি’-র ধারণাকে কি কাঠগড়ায় দাঁড় করায় না? রামমোহনের আন্তর্জাতিকতা যে ভাবে আজকের এই কূপমণ্ডূকতায় পর্যবসিত হয়েছে, তাতে মনে হয় গোড়ায় গলদ রয়ে গিয়েছিল!

সৌরনীল ঘোষ, দুর্গাপুর, পশ্চিম বর্ধমান

Advertisement

সেই যুগপুরুষ

ক্লাস সিক্সে বাংলা পাঠ্যপুস্তকে রাজা রামমোহনের উপর একটি প্রবন্ধ পড়ে জেনেছিলাম, তিনি একটা গোটা পাঁঠার মাংস আর দশ-বারোটা নারকেল একা খেতে পারতেন, আর চান করার আগে ভাল করে তেল মালিশ করার পর অনেক ক্ষণ ধরে জলের মধ্যে সংস্কৃত শ্লোক উচ্চারণ করতেন। তিনি ভারতে সংবাদপত্র তথা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জনক। অমিত দাসের প্রবন্ধ পড়ে জানতে পারলাম, তিনি শুধু ভারতেই নয়, আমেরিকা আর ইংল্যান্ডেও দাসপ্রথা ও সতীদাহ প্রথা বিলোপের আন্দোলনকারীদের আদর্শ ছিলেন। সেই সঙ্গে অর্ঘ্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রবন্ধ, ‘সমস্ত মানবজাতিই একটি পরিবার’ (রবিবাসরীয়, ২২-৫) পড়ে আরও অনেক অজানা বিষয় জানলাম। গর্বিত যে, আমি রাজা রামমোহন রায়ের দেশের নাগরিক।

সমরেশ কুমার দাস, জালুকি, নাগাল্যান্ড

সমন্বয়বাদী

রাজা রামমোহন রায় সে কালের সমাজের অন্যায়, অবিচার, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সারা জীবন লড়াই করেছিলেন। বস্তুত, তিনি ছিলেন এমন এক মহামানব, যাঁর চেতনার আলোকে তখনকার কুসংস্কারাচ্ছন্ন ভারতবাসী যেন এক মুক্তির আলো দেখেছিল। রামমোহন তাঁর যুক্তি দিয়ে তৎকালীন সমাজে প্রচলিত সতীদাহ প্রথা, জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, গঙ্গাসাগরে সন্তান বিসর্জন দেওয়ার মতো অনৈতিক কাজ এবং সামাজিক কুসংস্কারগুলি দূর করার চেষ্টা করেছেন। শুধুমাত্র তা-ই নয়, ইংরেজি শিক্ষা এবং স্ত্রীশিক্ষার প্রবর্তনে তাঁর অবদান অসামান্য। সব ধর্মের অন্তর্নিহিত সত্য সবাইকে জানানোর জন্য নানা ভাষায় বই লিখতে শুরু করেন তিনি।

ভাবতে অবাক লাগে, সেই আমলের সমাজব্যবস্থার মধ্যে থেকেও রামমোহন এক সময় একেশ্বরবাদের দিকে ঝুঁকেছিলেন এবং হিন্দু ধর্মের পৌত্তলিকতা নিয়ে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে। হিন্দু ধর্মের আচার ও পৌত্তলিকতা নিয়ে তাঁর আপত্তির কারণে বাবা-মার সঙ্গে তাঁর তীব্র বিরোধ বাধে, এবং পিতা তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করেন। রামমোহন এক সময় সুফি দর্শনের ব্যাপারেও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৮০৪ সালে একেশ্বরবাদ নিয়ে তাঁর প্রথম বইটি প্রকাশিত হয়। ফারসি ভাষায় লেখা এই বইয়ের মুখবন্ধ ছিল আরবিতে। ব্রিস্টলের জাদুঘরে থাকা ইংরেজ শিল্পীর হাতে আঁকা তাঁর প্রতিকৃতিতে রামমোহন রায়ের পিছনে দেখা যায় একটি মন্দির এবং একটি মসজিদ। তাঁর হাতে ধরা বাইবেল ধর্মগ্রন্থ। এই ছবি তাঁর সমন্বয়বাদী মানসিকতার পরিচায়ক। একেশ্বরবাদের দিকে ঝোঁকার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, হিন্দু ধর্ম যদি তার গোঁড়ামিকে বর্জন করতে না পারে, তা হলে এই ধর্ম ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়বে।

যুক্তিবাদ, তাঁর বক্তব্যের সর্বজনীনতা, সহনশীলতা এবং সমন্বয়ের ক্ষমতা— এই চারটি ছিল হিন্দু ধর্মকে সংস্কারমুক্ত করার ক্ষেত্রে তাঁর অস্ত্র। এই চারটি গুণের সমন্বয়ে তিনি কালক্রমে এমন এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন, যাতে তাঁকে আমরা প্রথম আধুনিক ভারতীয় হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি। তাঁর যুক্তিবাদী মনই তাঁকে শেখায় কোনও সামাজিক নিয়মকে যুক্তির নিরিখে যাচাই না করে কখনও তা গ্রহণ করা উচিত নয়। রবীন্দ্রনাথ এই জন্যই তাঁকে ‘ভারত পথিক’ উপাধি দেন। ইংরেজ সরকার তাঁকে ‘রাজা’ উপাধিতে ভূষিত করে। এই পণ্ডিত, সমাজ সংস্কারক ও দেশপ্রেমী মানুষটি জ্ঞান, বুদ্ধি, যুক্তি, ব্যক্তিত্ব, সব দিক থেকে ছিলেন ভারতের নবযুগের প্রাণপুরুষ।

অমৃতাভ মণ্ডল, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ

অবিস্মরণীয়

ঋজু বসুর স্বাদু কলমে ‘মতি নন্দী নট আউট’ (পত্রিকা, ১৪-৫) শীর্ষক প্রবন্ধটির সঙ্গে আরও কিছু সংযোজনের উদ্দেশ্যে এই পত্র। বাংলা ক্রীড়া সাহিত্য এবং ক্রীড়া সাংবাদিকতার ইতিহাসে মতি নন্দী এক অবিস্মরণীয় নাম। তাঁর পূর্বে এবং পরে ক্রীড়া সাহিত্যে আরও অনেকে এসেছেন, কিন্তু তিনি আজও পাঠকমহলে স্বতন্ত্র। শোনা যায়, কোনও রকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই খেলাকে কেন্দ্র করে তাঁকে লিখতে বলা হয়েছিল উপন্যাস। আনন্দমেলা-র পুজো সংখ্যায় মতি লিখলেন ‘স্ট্রাইকার’ (১৯৭২)। তার পরের বছর ‘স্টপার’, এবং তার পর ‘অপরাজিত আনন্দ’। ১৯৭৫ সালে লিখলেন ‘কোনি’। পরবর্তী কালে তাঁর ক্ষুরধার কলম থেকে বেরিয়েছে অনেক মণিমাণিক্য। ৩৩টি উপন্যাস এবং ৬৯টি গল্পের পাশাপাশি রমাপদ চৌধুরীর অনুরোধে আনন্দবাজার পত্রিকা-র ‘রবিবাসরীয়’ বিভাগে ধারাবাহিক ভাবে লিখেছিলেন রহস্য উপন্যাস ‘ছায়া সরণিতে রোহিণী’।

ক্রীড়া সাংবাদিকতায় কেজো গদ্যের আঙ্গিকে বদল ঘটিয়ে তিনি আমদানি করেন সাহিত্যের ভাষা। তাঁর শাণিত কলম, দেখার চোখ এবং বর্ণনাশৈলী পাল্টে দিয়েছিল বাংলা সাংবাদিকতার ধ্যানধারণা। মস্কো এবং লস অ্যাঞ্জেলসে দু’টি অলিম্পিক কভার করতে যান তিনি। ভারতীয় হকি দল সে বার মস্কোতে সোনা জিতেছিল। অনেক পরে তিনি লিখেছিলেন, “শেষ সোনাটা বোধহয় আমিই এনেছি।”

অলিম্পিকেই ভারতের একটি হকি ম্যাচের রিপোর্ট করতে গিয়ে মতি শিরোনামে লেখেন, ‘ডি বক্সে যেন অষ্টমী পুজোর ভিড়’। ১৯৮০ সালের ৯ মে ফেডারেশন কাপ ফাইনালে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচ অমীমাংসিত ভাবে শেষ হওয়ার পর অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল। পর দিন আনন্দবাজার পত্রিকা-য় মতি লেখেন, “এমন পঁচিশে বৈশাখ আর যেন কখনও ফিরে না আসে।” ক্রীড়া সাহিত্য থেকে সাংবাদিকতার ঘরানায় তিনি যোগ করেছিলেন এক অনন্য মাত্রা। নিকটজনদের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, শঙ্খ ঘোষ, সমরেশ মজুমদার, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীদের মতো সাহিত্যিক ছিলেন তাঁর গুণমুগ্ধ।

সায়ন তালুকদার, কলকাতা-৯০

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তেফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ



Something isn't right! Please refresh.

Advertisement