Advertisement
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
Pollution

ভোটের দূষণ

বাঁশ ও কাঠের অস্থায়ী কাঠামো খুলে ফেলার পর, রাস্তায় পড়ে থাকা পেরেকে বাইক ও সাইকেল আরোহীদের বিড়ম্বনার শিকার হওয়া এ সময় অতি সাধারণ ঘটনা।

An image of Vote

—প্রতীকী চিত্র।

শেষ আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০২৩ ০৪:২০
Share: Save:

প্রশাসনিক উদারতায় ও আনুকূল্যে, বাংলার অধিকাংশ শহর এবং মফস্‌সল ও গ্রামে দুর্গাপুজো কেন্দ্রিক উৎসবের রেশ ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। সেই আবহে, ‘উৎসবের দূষণ’ (১০-১১) সম্পাদকীয় কলমে উৎসব-পরবর্তী সময়ে কলকাতা শহরের দৃশ্যদূষণের বিষয়টি চমৎকার ভাবে চিত্রিত হয়েছে। বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং, হাস্যমুখ ছবি-সহ রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের শারদীয়া ও দীপাবলির (এমনকি ছটপুজোর) শুভেচ্ছা বার্তা জ্ঞাপক ব্যানার, আলোকসজ্জার জন্য যত্রতত্র লাগানো বাঁশ ও কাঠের অস্থায়ী কাঠামোতে কংক্রিটের জঙ্গলে ভরা শহরে বেঁচে থাকা ছিটে-ফোঁটা সবুজেরা দীর্ঘ সময় অবগুণ্ঠিত হয়ে থাকে। সত্যি বলতে, এ সময় কলকাতা শহরটাকে অনেকটা আমাদের ভিড়ে ঠাসা লোকাল ট্রেনের কামরা বলে মনে হয়। যার দেওয়াল জুড়ে চুলকানির মলম, বশীকরণ, কর্মখালি, বিউটি পার্লার, ইউনানি চিকিৎসা, সন্ধান চাই, অভিনয়ের সুযোগ ইত্যাদি হরেক রকম বৈচিত্রময় বিজ্ঞাপনের কাগজ সাঁটানো থাকে। নন্দনের শহরে এমন অ-নান্দনিকতা বাঙালিয়ানার রুচিবোধকে আহত করে। এ ছাড়া বাঁশের খুঁটি পোঁতার না-বোজানো গর্তে পড়ে মানুষের পা এবং গাড়ির চাকা সকলকেই মাসুল গুনতে হয়।

বাঁশ ও কাঠের অস্থায়ী কাঠামো খুলে ফেলার পর, রাস্তায় পড়ে থাকা পেরেকে বাইক ও সাইকেল আরোহীদের বিড়ম্বনার শিকার হওয়া এ সময় অতি সাধারণ ঘটনা। বছর ঘুরলেই লোকসভার ‘ভোট উৎসব’। গ্রাম ও মফস্‌সলের গাছপালারা, রাজনৈতিক পতাকা, ফেস্টুন, ব্যানার লাগানোর পেরেকে ক্রুশ বিদ্ধ হওয়ার জন্য অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। ভোট উৎসব মিটে যাওয়ার পরেও গাছপালাদের সেই যন্ত্রণা বহন করে যেতে হবে। কারণ, রাজনৈতিক তকমাযুক্ত পতাকা-ফেস্টুন-ব্যানার খোলে এমন সাধ্য কার? তাই শুধুমাত্র প্রশাসনিক পদক্ষেপেই নয়, রাজনৈতিক স্তরে সদিচ্ছা এবং তার সুস্থ-সুন্দর কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া এই দূষণ-রোগ মুক্ত হওয়ার নয়। সবুজের উপর এই ধরনের আক্রমণ রোধকল্পে, রাজনৈতিক দলগুলোর আগামী ভোটের ইস্তাহারে পরিবেশ প্রেমের বার্তা থাকবে তো?

অরিন্দম দাস, হরিপুর, উত্তর ২৪ পরগনা

দূষিত

অমিতাভ গুপ্তের ‘দূষণের মহাপার্বণ’ (১২-১১) প্রবন্ধটি নিয়ে কিছু কথা। উৎসবমুখর দিনগুলিতে আলোকমালার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার অবশ্যম্ভাবী। ফলে এ সময় পরিবেশরক্ষা সংক্রান্ত দফতরের তৎপরতা তুঙ্গে পৌঁছয়। এ ছাড়াও পরিবেশ দূষণের আরও নানা বিষয় আছে। পাহাড়, পর্বত, বনরাজির ক্ষেত্রে অনভিপ্রেত প্রকৃতিবিরোধী কার্যক্রম চলছে কেবলমাত্র বাণিজ্যিকীকরণের জন্য। এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে। যাতায়াত সুগম করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেখানে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের রাস্তাঘাট, যাতে রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথ সুগম হয়। কিন্তু উত্তরকাশীর ভৌগোলিক দিক থেকে স্পর্শকাতর স্থানে সুড়ঙ্গ খোঁড়া অগ্রাধিকার কী করে পাচ্ছে, এর কারণ অজ্ঞাত।

পাহাড়ি এলাকার জনপদের স্বার্থে রাস্তাঘাট অবশ্যই তৈরি করতে হবে। বিভিন্ন নদনদীর উপকূলস্থ বন্যাপ্রবণ এলাকার মানুষজনের স্বার্থে বন্যা-নিরোধক প্রকল্প অবশ্যই নিতে হবে। তবে তা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তথা ভারসাম্যকে খর্ব করে নয়। পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ করার আর একটি উপায় হল পেট্রল/ডিজ়েলচালিত যানবাহনকে ধীরে ধীরে দূষণহীন প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত করা। আমাদের নদীমাতৃক দেশে নদী/সমুদ্রের সন্নিকটে নির্মাণ কাজকে নিয়ন্ত্রিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় নদী, বিশেষত সমুদ্রের জলরাশিও দূষিত হবে। যার ফলে জলচর প্রাণীদের অস্তিত্ব সঙ্কট অবধারিত। প্রবন্ধকার ঘনাদার গল্পের আদলে উৎসবের দিনগুলির শব্দদূষণের কথা উল্লেখ করেছেন। যদিও এ বার শব্দবাজির প্রকোপ খানিকটা কমলেও মাইকের গগনভেদী নিরন্তর ব্যবহার কোনও অংশে কমেনি। মেধা পাটকর, জয়া মিত্র-সহ পরিবেশবিদের মতামত কেন গ্রহণ করা হচ্ছে না, তার যুক্তিগ্রাহ্য কোনও কারণ নেই।

শুধুই উৎসবের দিনে শব্দমাত্রা মাপবে, আর বাকি সময় পরিবেশ দফতর শীতঘুমে থাকবে, এটা কি বাঞ্ছনীয়? প্রবন্ধকার বিদেশে সাইকেল লেন করার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আমাদের দেশে তা-ও অবাস্তব, কারণ রাস্তার মাঝখান ছাড়া ভাল ভাবে হাঁটারও জায়গা নেই। পরিবেশ দূষণের কী মারাত্মক প্রভাব জনস্বাস্থ্যের উপর পড়ছে, সে বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার পন্থা অবশ্যই বার করতে হবে।

সুবীর ভদ্র, কলকাতা-১৫১

ভোটমুখী

অমিতাভ গুপ্তের প্রবন্ধটি পড়ার সময় মনে হল, আমার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর অভিমত— মানুষের শুভবুদ্ধির ভরসায় নীতি নির্ধারণ করা চলে না। মানুষ দায়িত্ববান হলে ভাল, কিন্তু নীতি নির্ধারণের সময়ে ধরে নিতে হবে যে, গড়পড়তা মানুষ স্বভাবতই দেশ ও দশের মঙ্গলের কথা ভেবে নিজের কর্তব্য স্থির করেন না, এমনকি সব সময় যুক্তিসঙ্গত কাজও করেন না। মানুষ চালিত হন হরেক সাময়িক আবেগের তাড়নায়। ধরতে হবে সেই জায়গাটায়। বেশ কিছু বছর পরিবেশ-বিজ্ঞান সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি, সচেতনতা বাড়ানো হবে, শুভবুদ্ধি জাগ্রত হবে— এগুলির উপর ভরসা করলে অনেক কাজ, যা করা উচিত বলে ভাবা হয়েছে, তা করা সম্ভব হবে না। যেমন, শব্দের তীব্রতা যে মারাত্মক ক্ষতি করে, তা সচেতনতা প্রচারের মাধ্যমে বহু মানুষ জেনেছেন। তা সত্ত্বেও, ‘অন্যরা করছে কিছু হচ্ছে না, আমি একা না করলে তো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না’— এই যুক্তি দেখিয়ে আমরা রাস্তায় অযথা গাড়ির হর্ন বাজাই, বাড়িতে কোনও অনুষ্ঠানে ও পিকনিকে ডিজে বক্স বাজাই, নিষিদ্ধ শব্দবাজি কালীপুজো ছাড়াও অন্যান্য আনন্দ-উৎসবে ব্যবহার করি।

প্লাস্টিক নিয়ে এত প্রচার হয়েছে এবং হচ্ছে, তবুও বাজারে বা দোকানে গিয়ে বহু মানুষ বিক্রেতা না দিলেও নিজেরাই চেয়ে নেন প্লাস্টিক ক্যারিব্যাগ। পরিবেশ রক্ষায় গাছ অপরিহার্য জেনেও বাড়ি তৈরির সময় বাড়ির চার পাশে খালি জায়গায় গাছ না লাগিয়ে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সিমেন্ট দিয়ে জায়গাটা মুড়ে ফেলি। সুতরাং, সার্বিক ভাবে যা ‘ভাল’, তার জন্য সরকারি নীতি থাকা দরকার। এই নীতির উপর ভিত্তি করে যে আইন প্রণয়ন হবে, সেখানে আইন ভঙ্গের কারণে শাস্তি থাকা দরকার। আবার শুধুমাত্র খাতায়-কলমে আইন থাকলেই হবে না, সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য প্রশাসনের নজরদারি ও সদিচ্ছা থাকা দরকার। সরকারে থাকা মন্ত্রী ও প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি যদি পরিবেশ রক্ষার পক্ষে থাকে, তা হলে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তা মেনে চলবে বা মেনে চলতে বাধ্য থাকবে। তবে সবচেয়ে ভাল উপায় অবশ্যই বিকল্প পথের সন্ধান করা ও যাঁরা এ নিয়ে কাজ করছেন, তাঁদের উৎসাহিত করা।

কিন্তু রাজনীতি এখন পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণে ভোটমুখী রাজনীতিতে জনগণের ‘সাময়িক খুশি’তেই ভরসা করেন ভোটে দাঁড়াতে চাওয়া রাজনীতিবিদরা। তাই পরিবেশবান্ধব নীতি প্রণয়ন ও প্রয়োগে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়, আইন থাকলেও তার প্রয়োগে শিথিলতা দেখা দেয়। কখনও কখনও আইনভঙ্গকারীদের কী ভাবে রক্ষা করা যায়, তার জন্য নতুন উপায় বার করা হয়। পরিবেশ ও বিজ্ঞান সংগঠনের কর্মীদের পরিবেশ রক্ষায় প্রতিবাদ, বিকল্প পথের সন্ধান, জনমত গঠন ইত্যাদি কাজ করে যেতেই হবে আগামী প্রজন্মের কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার তাগিদে, এবং শাসক দলের মানসিকতার এক দিন পরিবর্তন হবেই— এই প্রত্যাশায়।

প্রশান্ত দাস, খলিসানি, হুগলি

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement

Share this article

CLOSE