‘‘গাঁধী ও তাঁর ‘দলিত’ প্রশ্ন’’ (৩০-১) প্রসঙ্গে কিছু কথা। বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশের দূষণ সারা বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। আজ থেকে এক শতাব্দীরও আগে, ১৯০৯ সালে, গাঁধী মানুষের চাহিদা ও লোভের মধ্যে সীমারেখা টেনেছিলেন, যা জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশের দূষণ বিষয়ে আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের সময় সংযম ও যত্ন নেওয়ার কথা বলতেন এবং নিজে এ বিষয়ে কাজের মাধ্যমে উদাহরণ হয়ে ওঠেন। তিনি নিজের শৌচাগার পরিষ্কার করতেন এবং পরিবেশকে নির্মল রাখার চেষ্টা করতেন। আমদাবাদে থাকার সময়, জলের যতটা কম অপচয় হয়, তার চেষ্টা করতেন। অপরিচ্ছন্ন জল যাতে সবরমতী নদীতে না মেশে, সে জন্যও সচেষ্ট ছিলেন।

এর পাশাপাশি কয়েকটি ঘটনা— ১) ১৯৩৪ সালে বিহারে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়। প্রাণ হারিয়েছিলেন বহু মানুষ। সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা ৭২৫৩ জন। গাঁধী তখন ‘হরিজন’ পত্রিকায় একটি বিবৃতি দিয়েছিলেন, যাতে বলা হয়েছিল, ‘‘বিহারের বর্ণহিন্দুদের অস্পৃশ্যতা-পাপই ওই ধ্বংসলীলার মূল কারণ। রুদ্র বিধাতার কাছ থেকে পাপের শাস্তিরূপেই এমন ধ্বংসের কঠোর শাস্তি নেমে এসেছে।’’ বিবৃতিটি প্রকাশের পরই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ইউনাইটেড প্রেস’-এর মাধ্যমে একটি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন, যাতে তিনি বলেছিলেন, "...It is all the more unfortunate, because this kind of unscientific view of things is too readily accepted by a large section of our countrymen." কিন্তু মহাত্মা গাঁধী তাঁর পূর্বমত থেকে সরে আসেননি। বরং ফের বিবৃতি দিয়েছিলেন। ‘হরিজন’ পত্রিকায় Superstition Vs Faith নিবন্ধে গাঁধীজি লেখেন, তিনি যা বিশ্বাস করেছেন সেটাই বলেছেন। "... I have not the faith which Gurudev has ..." পরে নেহরুও তাঁর ‘আত্মজীবনী’তে লিখছেন, ‘‘বিহারের অধিবাসীদের অস্পৃশ্যতার শাস্তি হিসেবে ভূমিকম্প হয়েছে গাঁধীজির এই বক্তব্য পড়ে আমি স্তম্ভিত হই। এ রকম মন্তব্য সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। তাঁর এই মন্তব্যের প্রত্যুত্তরে রবীন্দ্রনাথ যা বলেছেন তার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত।’’

২) মার্গারেট স্যাঙ্গার (১৮৭৯-১৯৬৬), এক আমেরিকান লেখিকা, নার্স, জন্মনিয়ন্ত্রণকর্মী এবং যৌন শিক্ষাবিদ। ১৯১৬ সালের নিউ ইয়র্কে খুলেছিলেন আমেরিকার প্রথম পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র। তিনি মনে করতেন, জন্মনিরোধকই হচ্ছে নারীর মুক্তির সবচেয়ে নিরাপদ পথ। ১৯৩৫-এর নভেম্বরে ভারতে আসেন স্যাঙ্গার। ভারতের ১৮টি শহরে সফর করেছিলেন তিনি, কথা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, নেহরু, বডোদরার মহারাজা ও মহারানির সঙ্গে। বিষয়বস্তু ছিল— জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং নারীমুক্তি। ওই বছর স্যাঙ্গার গাঁধীজির সঙ্গে কথা বলার জন্য ওয়ার্ধায় আসেন। কথাবার্তার কেন্দ্রে ছিল জন্মনিয়ন্ত্রণ, পরিবার পরিকল্পনা ও যৌনতা। গাঁধীজি সে দিন বলেছিলেন, যৌনতা স্রেফ বংশরক্ষার জন্য। তার অন্য কোনও ব্যবহার ঈশ্বর ও মানবজাতির বিরুদ্ধে পাপ। অসংখ্য সন্তান উৎপাদন ভারতের মতো দরিদ্র দেশে অবশ্যই অন্যায়, যৌন সঙ্গম থেকে স্বেচ্ছায় বিরত থাকা তার একমাত্র সমাধান। কৃত্রিম উপায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ মানুষকে নিরর্থক যৌনতার দিকে ঠেলে দেবে। স্যাঙ্গার গাঁধীজির সঙ্গে সাক্ষাতের এক মাস পর Illustrated Weekly of India-তে লিখেছিলেন "What He Told Me at Wardha", যে লেখায় স্যাঙ্গার গাঁধীজির রক্ষণশীল মনোভাবের সমালোচনা করেছিলেন।

৩) সত্যাগ্রহের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে গাঁধী ১৩ অক্টোবর ১৯৪০ ‘হরিজন’ পত্রিকায় লিখেছিলেন, “ঈশ্বরকে মানুষ যে নামেই জানুক না কেন, তিনিই সত্যাগ্রহীর একমাত্র অস্ত্র; তাঁকে ছাড়া ভয়ঙ্কর অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বিরোধীর সম্মুখে সত্যাগ্রহী একেবারে বলহীন। অধিকাংশ ব্যক্তি দৈহিক বলের সম্মুখে সাষ্টাঙ্গে নতিস্বীকারপূর্বক আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু ভগবানকে যিনি রক্ষাকর্তা বলে স্বীকার করেছেন, তিনি প্রবলতম পার্থিব শক্তির সম্মুখেও সোজা দাঁড়িয়ে থাকবেন।’’

পরিবেশ নিয়ে গাঁধীজির ভাবনার সঙ্গে উপরের তিনটি ঘটনায় গাঁধীজির মতো বড় মাপের মানুষের মননে বৈজ্ঞানিক যুক্তিবোধ প্রাধান্য পায়নি। গাঁধীজির এমন গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সমসময়ের অনেকেই সমালোচনায় মুখর হয়েছিলেন।

নন্দগোপাল পাত্র

সটিলাপুর, পূর্ব মেদিনীপুর

 

খুড়োর কল

‘স্নাতক হলেই স্কুলে ইন্টার্ন’ (১৫-১) সংবাদ এবং ‘আশা-আশঙ্কা’ (১৭-১) পড়ে মনে হল, স্কুলে ইন্টার্ন ‘খুড়োর কল’-এর মতো। যে খুড়োর কলে এত দিন পার্শ্ব শিক্ষকদের বেঁধে রাখা হয়েছে, সেই কলকে আবার অন্য ভাবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা চলছে। ইন্টার্ন বলতে ঠিকা শিক্ষক, যা স্নাতকদের প্রতি এক অন্যায় এবং অমর্যাদাকর আচরণ। এখানে আবার শংসাপত্র দেওয়ার ব্যাপারটা যুক্ত করা হচ্ছে। এর মাপকাঠি কী হবে সেটা সবাই কমবেশি অনুমান করতে পারছেন। এমনিতেই স্কুলে রয়েছেন বিশাল সংখ্যক পার্শ্ব শিক্ষক, যাঁদের পূর্ণ শিক্ষকে উন্নীত করার আশা দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। এঁদেরই পাশে কাজ করবেন এই ইন্টার্নরা। কত ভাবে এই বর্গকে বাঁধা যায় তারই আয়োজন চলছে সরকারের তরফ থেকে। 

আর একটি বিষয়ও বিচার্য। যে সরকার অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাশ-ফেল তুলে দেওয়ার প্রশ্নে নিজেদের শিক্ষার অধিকার আইন ২০০৯-এর একনিষ্ঠ অনুসারী হিসাবে তুলে ধরেছিল, তারা কি ভুলে গেল যে শিক্ষক প্রশিক্ষণ ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ সম্ভব নয়? আবার ওই আইনেই রয়েছে, প্রতি স্কুলে ৩০ জন ছাত্র পিছু এক জন শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। এই আইনকে প্রায় সর্বত্র মোটা দাগে অমান্য করা হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যা ‘স্কুল সার্ভিস কমিশন’-এর মাধ্যমে হয়ে থাকে, তাকে এই ইন্টার্ন ব্যবস্থা অবশ্যই বিড়ম্বিত এবং বিলম্বিত করবে।

গৌরীশঙ্কর দাস

সাঁজোয়াল, খড়্গপুর

 

ঠিকা শ্রম

সম্পাদকীয় ‘আশা-আশঙ্কা’ (১৭-১) প্রসঙ্গে এই চিঠি। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন নামের মোড়কে ঠিকা শ্রমের অনৈতিক ব্যবহার আজ বহু প্রসারিত। অসংঘটিত ক্ষেত্র তো ছাড়, সংঘটিত ক্ষেত্রে, এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠান বা অফিসেও দেশের ভয়াবহ বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে চলছে ঠিকা শ্রমের অপপ্রয়োগ। 

প্যারাটিচার, সিভিক ভলেন্টিয়ার ইত্যাদি গালভরা নামের শিক্ষিত ঠিকা শ্রমিকরা একই কাজে নিযুক্ত স্থায়ী কর্মীদের এক ভগ্নাংশ বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা দফতর আবার এতেও সন্তুষ্ট নন। এ বার প্যারাটিচারদের চেয়েও কম পারিশ্রমিকে ইন্টার্ন হিসাবে স্কুলগুলোতে পড়াবেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাশ-করা যুবক-যুবতীরা! 

উৎপাদন আর পরিষেবার ক্ষেত্রেও ছবিটা এক। সরকারি বা বেসরকারি সংঘটিত ক্ষেত্রে প্রায় সর্বত্র উৎপাদন ব্যবস্থা আজ ঠিকা শ্রমনির্ভর। শ্রমিক কল্যাণমুখী কন্ট্রাকটর লেবার (রেগুলেশন অ্যান্ড অ্যবলিশন) অ্যাক্ট আইনটি ১৯৭০ সাল থেকে কার্যকর আছে। ঠিকা শ্রমিকের স্বার্থরক্ষা ছাড়াও আইনটির মূল উদ্দেশ্য এর নামেই নিহিত আছে— উৎপাদন আর সেবা ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন কাজে ঠিকা শ্রমের অবলুপ্তি, আর ওই কাজে নিযুক্ত ঠিকা শ্রমিকদের ধাপে ধাপে মূল কর্মদাতার অধীনে স্থায়ীকরণ। 

আইনটির সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে ছবিটা কেমন? নিয়মিত কাজে ঠিকা শ্রমের অবলুপ্তি দূরস্থান, এর অভিমুখ এখন বিপরীত দিকে। 

এ ছাড়া নতুন কর্মসংস্থানের চেষ্টাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আজকের স্থায়ী ভাবে নিযুক্ত দক্ষ শ্রমিক কাল অবসর নিয়ে ঠিকা শ্রমিক হিসাবে একই কাজ করে যাচ্ছেন! একটা কেন্দ্রীয় সরকারি শিল্পসংস্থা তো আবার তাদের একটা ছোট কারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে একটিও স্থায়ী শ্রমিক না রেখে একশো শতাংশ ঠিকা শ্রমিক দিয়ে। 

শ্রমিকনেতারা কী ভাবছেন?

বুদ্ধদেব চট্টোপাধ্যায়

কুলটি, পশ্চিম বর্ধমান

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।