‘প্রকৃত’ ধার্মিক কে?

অরিন্দম চক্রবর্তীর নিবন্ধের (‘ধর্মরক্ষার মানেটা বুঝতে হবে’, ১০-১) প্রেক্ষিতে লেখা আমার পত্রটির (‘ধর্ম রক্ষা’, ২৩-১) বিপক্ষে পূর্বায়ন ঝা তাঁর চিঠিতে (‘ধর্ম বুঝতে’, ১১-২) প্রশ্ন তুলেছেন, ‘প্রকৃত ধার্মিক’ আর ‘প্রকৃত চোর’, এই দুটিকে আমি কীভাবে এক মানদণ্ডে বসালাম।

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সৃষ্টিকাল থেকে যখনই ধর্মের অনুসারী কেউ অন্যায় করেন, তখনই সেই মানুষটিকে ‘অধার্মিক’ তকমা দিয়ে, ধর্মের জয়গান গেয়ে ধর্মকে রক্ষা করা হয়। অর্থাৎ, এমন ভাবে প্রচার করা হয় যেন ধর্মের কোথাও কোনও ভুল নেই, ব্যক্তিমানুষই ভুল করে। এই কায়দাটা খুব সূক্ষ্ম হলেও বহু পুরনো।

এই একই কায়দায় ‘প্রকৃত ধার্মিক’সহ ‘প্রকৃত মার্কসবাদী’, ‘প্রকৃত গাঁধীবাদী’, ‘প্রকৃত যুক্তিবাদী’, ‘প্রকৃত তৃণমূলী’, ‘প্রকৃত জনসংঘী’, ‘প্রকৃত ব্যবসায়ী’ ও ‘প্রকৃত চোর’ বিশেষণগুলির দ্বারা সংশ্লিষ্ট মতবাদ, দল, আদর্শ এবং পেশাকে আড়াল বা রক্ষা করা যায়। যেমন, আসারাম বাপু কিংবা বাবা রামরহিম সিংহকে ‘অধার্মিক’ তকমা দিয়ে তাদের প্রবর্তিত ধর্মকে রক্ষা করা যায়।

এ-ছাড়াও, ‘প্রকৃত ধার্মিক’ কখনও কথার ছলনা দিয়ে ধর্মকে রক্ষা করেন না। ‘প্রকৃত ধার্মিক’ কখনও বউ পেটান না। ‘প্রকৃত ধার্মিক’ কখনও প্রতিবেশীর সঙ্গে বা অন্য ধর্মের লোকের সঙ্গে বিবাদে জড়ান না। ‘প্রকৃত ধার্মিক’ কখনও কোনও দুর্নীতিও করেন না। ‘প্রকৃত ধার্মিক’ কখনও কাম ক্রোধ লোভ হিংসার দ্বারা পরিচালিত হন না। এই ভাবে বিচার করতে গেলে সারা বিশ্বে হয়তো এক জন মানুষকেও ধর্মপুস্তকে বর্ণিত সংজ্ঞায় ‘প্রকৃত ধার্মিক’ বলে ভূষিত করা যায় না। এ-ক্ষেত্রে ‘প্রকৃত’ ‘আসল’ ও ‘খাঁটি’ বিশেষণগুলির কোনও নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই বলেই সেটাকে আরও প্রসারিত করতে যাওয়া বোকা ব্যাপার।

‘ধর্ম’ মানুষকে সৃষ্টি করেনি, মানুষই ‘ধর্ম’কে সৃষ্টি করেছে। আদর্শচ্যুত মানুষকে ‘অধার্মিক’ তকমা দিয়ে মহৎ কিছু বাণীসমৃদ্ধ ‘ধর্ম’কে রক্ষা করা গেলেও, পৌরাণিক কাল থেকে আজ অবধি সারা বিশ্ব জুড়ে ঘটে চলা অগণিত ধর্মীয় হিংসার হাত থেকে কিন্তু মানবজাতির মুক্তি ঘটছে না।

কৃষ্ণ ঘোষ

সুভাষপল্লি, খড়্গপুর

বরং তুলে দিন

কয়েক দিন ধরে আনন্দবাজার পত্রিকায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ট-ওয়ান পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে প্রকাশিত নানা সংবাদ পড়লাম। মোট এক লক্ষ চল্লিশ হাজারের মধ্যে অকৃতকার্য ছাত্রের সংখ্যা অর্ধেকের বেশি, বি এসসি-তে কিছু কম। এই গণ-ফেলের কারণ অনেক। প্রথমত, পাঠ্য বিষয়গুলির নির্বাচন ছাত্রদের হাতে থাকে না, কলেজে যেগুলো আছে তার মধ্যে বেছে নিতে হয়। যেহেতু পছন্দের বিষয় নয়, ক্লাস করতে মন চায় না। অনাগ্রহে বই খুলতে ইচ্ছে করে না।

আগে নিয়ম ছিল দুটো বিষয়ে ফেল করলেও পাশ। নতুন নিয়মে, দুটো বিষয়ে ফেল করলে ফেল, একটাতে ফেল করলে পরের বছর ওই বিষয়ে আবার পরীক্ষা দিয়ে পাশ করার সুযোগ। এই গণ-ফেলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী উদ্বিগ্ন, তাই শিক্ষামন্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়কে পুরনো নিয়মে ফিরে যেতে নির্দেশ দিয়েছেন। মেরুদণ্ডহীন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাই মেনে নিয়ে নতুন করে ফল প্রকাশ করতে চলেছেন। যে-নিয়ম তাঁরা তৈরি করেছিলেন ছাত্রদের পাঠ্য বিষয়ে কিছু জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে, তা আর বলবৎ হল না। ছাত্ররা ফেল করেই তিন বছর পরে ডিগ্রি লাভ করে যাবে। শিক্ষাবিদরা উদ্বিগ্ন, কিন্তু রাজনীতির নেতানেত্রীরা ভেতরে ভেতরে খুশি, কারণ এই ছাত্ররাই হবে ভবিষ্যতের দলীয় কর্মী।

এ-ভাবে পাশ করা ছাত্ররা সহজে কোনও চাকরি পাবে না, দল চালাতে, দলের নানা কর্মসূচি রূপায়ণে এদের ভূমিকা থাকবে। অবরোধ, ভাঙচুর, রাস্তা রোকো ইত্যাদিতে বিরাট বাহিনীর প্রয়োজন, এরা সেই ভূমিকা পালন করবে। বরং সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক করে ফেলুক, ছাত্ররা কলেজে ভর্তি হবে, মাইনে দেবে, ইউনিয়নে চাঁদা দেবে, মিটিং মিছিলে যোগ দেবে, আর তিন বছর পর পাশের সার্টিফিকেট পাবে। ইউজিসি-কে বোঝাতে একটা লোকদেখানো পরীক্ষাব্যবস্থা রাখলেই হবে। নতুন শিক্ষক নিয়োগের দরকার পড়বে না, খরচও কমে যাবে। অধ্যাপক যাঁরা আছেন তাঁদেরও ক্লাস নেওয়ার প্রয়োজন থাকবে না। তাঁরা বরং দলের সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে যেতে পারেন, না চাইলে, পদত্যাগ।

ত্রিদিব মিশ্র

শান্তিনিকেতন

সুধীনের নিরীক্ষা

সুরস্রষ্টা সুধীন দাশগুপ্তকে নিয়ে স্মৃতিচারণায় (‘পূর্ব-পশ্চিম মিলেছিল তাঁর সুরে’, পত্রিকা, ৬-১) লেখা হয়েছে, দীর্ঘ দিনের বন্ধু শ্যামল মিত্রের বাড়ি এসেছিলেন ১৯৭৭-৭৮ নাগাদ, দুটো গান তোলাতে— ‘কাল তা হলে এই সময়ে আসব এখানে’ এবং ‘প্রেম করা যে এ কী সমস্যা’। প্রকৃত তথ্য হল, গান দুটি ১৯৭৪ সালে পুজোয় প্রকাশিত হয়, রেকর্ড নং ৪৫এন ৮৩৫৫৬।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করি, সুধীন দাশগুপ্তর সুর রচনার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে শ্যামল মিত্রের মূল্যায়ন— ‘সুধীনের মধ্যে যে বৈশিষ্ট্য বিশেষ ভাবে আমার চোখে পড়েছে তা হল, ও সব সময়ই একটা এক্সপেরিমেন্ট-এর মাধ্যমে সুরসৃষ্টির চেষ্টা করত। সেই জন্যই ওর সুরে এত বৈচিত্র ছিল। আমার মতে বাংলাদেশে সলিল চৌধুরীর পরে আধুনিক গানে যুগপৎ, সুরকার ও গীতিকার হিসাবে সুধীনেরই নাম করা চলে।’

উপরোক্ত গান দুটির ক্ষেত্রেও এই রকম পরীক্ষার কথা বলেছেন শ্যামলের পুত্র সৈকত— ‘সেই সময়েই প্রথম দেখেছিলাম ডবল ফ্লুট, ডবল গিটার-এর কী অসাধারণ ব্যবহার করেছিলেন সুধীনকাকু।’

গত বছর একটি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে সৈকত জানিয়েছিলেন, ১৯৬৭ সালের পুজোর বিপুল জনপ্রিয় পাশ্চাত্য আঙ্গিকের ‘এই শহরে এই বন্দরে’ গানটির সংগীতায়োজন সুধীন করিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার এক অর্কেস্ট্রা পার্টিকে দিয়ে। রেকর্ড হয়েছিল টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োতে। সাফল্য এখানেও।

চঞ্চল বন্দ্যোপাধ্যায়

কলকাতা-৩০

অ্যাপ ক্যাব

 গত ৯ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে ফেরার পথে রাত ১০টা নাগাদ আমি আর আমার বন্ধু একটি অ্যাপ ক্যাব ‌বুক করি। গাড়িতে ওঠার পরেই চালক আমাদের গন্তব্য জানতে চান এবং আমরা তাঁর হাবভাবে বুঝি, গন্তব্যস্থানটি দূরে হওয়ায়, তাঁর পছন্দ নয়। এর কিছুক্ষণ পরেই তিনি অভব্য ব্যবহার এবং ভাষা প্রয়োগ করতে শুরু করেন, নেহাতই অকারণে। চালকের আসল উদ্দেশ্য তখন আমাদের কাছে স্পষ্ট। যে ভাবেই হোক উত্ত্যক্ত করে তিনি আমাদের দিয়েই ট্রিপটি বাতিল করাতে চান। আমরা তাঁর ব্যবহারের প্রতিবাদ করায়, রাত প্রায় সাড়ে ১০টা নাগাদ সল্ট লেকের শুনশান রাস্তায় বার বার গাড়ি থামিয়ে ওই চালক আমাদের হুমকি দিতে থাকেন এবং নেমে যেতে বলেন। আমরা অত রাতে ওই নির্জন রাস্তায় নামতে অস্বীকার করি। এর পর চালক পুলিশের ভয় দেখাতে শুরু করেন, কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই। এর পর তিনি বলেন, আমরা নেমে না গেলে তিনি গাড়ি চালাবেন না এবং মাঝ রাস্তায় অনেকক্ষণ গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখেন। অগত্যা আমরা ওঁকে ট্রিপ ক্যানসেল করতে বলি, কিন্তু তাতে আসল উদ্দেশ্য সফল হবে না দেখে, সেটাও তিনি করতে রাজি হন না। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও আমরা ট্রিপ ক্যানসেল না করায় আর কোনও উপায় না দেখে চালক গাড়ি চালাতে বাধ্য হন এবং আমরা কোনও রকমে সারা রাস্তা ভয়ে কুঁকড়ে বাড়ি ফিরি। এই ঘটনা ওই অ্যাপ ক্যাব-এর ‌কর্তৃপক্ষকে জানাতে, তারা বলে, যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যদিও কী ব্যবস্থা, সে আর জানানো হয়নি।

কমলিকা চক্রবর্তী

কলকাতা-৭৮