শামিম আহমেদের ‘তিনি রাষ্ট্র তিনিই মহা ভারত’ (রবিবাসরীয়, ২-৯) পড়ে মনে প্রচুর প্রশ্ন জাগল।

১) শামিম লিখেছেন, কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুন উপবাসক্লিষ্ট জরাসন্ধকে গুপ্ত উপায়ে হত্যা করলেন। কিন্তু মহাভারতে আছে, কৃষ্ণ জরাসন্ধকে প্রস্তাব দেন, তিনি কাকে তাঁর সঙ্গে যুদ্ধের জন্য নির্বাচন করতে চান? যদিও মল্লযুদ্ধের প্রস্তাব জরাসন্ধই দিয়েছিলেন এবং তিনি ভীমকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রূপে নির্বাচন করেন। ১৪ দিন যুদ্ধের পর জরাসন্ধ নিহত হন। এ কখনওই গুপ্তহত্যা নয়।

২) তিনি লিখেছেন, বহু রাজা শিশুপালকে সমর্থন করলেন। সেই সব নৃপতিদের ভীষ্ম শৃগাল ও শিশুপালকে সারমেয় বলে গালি দিলেন। কিন্তু মহাভারতে উল্টো আছে। শিশুপাল ভীষ্ম, কৃষ্ণ-সহ সকল পাণ্ডবকে শৃগাল, সারমেয়-সহ নানা অসম্মানজনক বিশেষণ প্রয়োগ করে গালমন্দ করেছেন।

৩) তিনি লিখেছেন, কৃষ্ণ অর্জুনের সারথি হলেন, যা ক্ষত্রিয়ের পক্ষে নিন্দনীয়। কিন্তু এক জন দক্ষ রথচালক যে কোনও ক্ষত্রিয়ের/রাজার সারথি হতে পারেন। আবার কৃষ্ণ তো রাজাও নন এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও অস্ত্রধারণ করবেন না বলেই অঙ্গীকার করেছিলেন। তাতে তাঁর সারথি হওয়া কী ভাবে ক্ষত্রিয়ের পক্ষে নিন্দনীয় হতে পারে তা বোধগম্য হল না।

৪) তিনি লিখেছেন, কৃষ্ণ ও অর্জুন এক সঙ্গে মদ্যপান করছেন, সেই সময় সেখানে এলেন সঞ্জয়, আসবপানে মত্ত কৃষ্ণ সঞ্জয়কে বললেন... মহাভারতে আছে, যুদ্ধের ঠিক আগে সন্ধি ও দৌত্য প্রস্তাব নিয়ে পাণ্ডবদের কাছে আসেন সঞ্জয় ও তিনি সভায় যুধিষ্ঠিরের কাছে তাঁর প্রস্তাব দেন। কৃষ্ণ আর অর্জুন মদ্যপান করে মত্ত অবস্থায় সঞ্জয়ের সঙ্গে কথা বলছেন, এই তথ্য মহাভারতের কোথায় আছে?

৫) তিনি লিখেছেন, যুধিষ্ঠির যে পাঁচটি গ্রাম চেয়েছেন তার তিনটি হল কুশস্থল, মাকণ্ডী, অবিস্থল। কিন্তু অবিস্থল নামক কোনও গ্রাম তিনি চাননি, বৃকস্থল গ্রাম চেয়েছিলেন।

৬) তিনি লিখছেন, কৃষ্ণ একটি ভারী পাথর দিয়ে একলব্যের মাথা গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই তথ্যের উৎস জানতে পারলে ভাল লাগবে।

অজয় সাহা

শান্তিপুর, নদিয়া

 

লেখকের উত্তর:

১) কৃষ্ণ ইন্দ্রপ্রস্থে বলছেন, সজ্জিত সৈন্য প্রবল শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করবে না, বুদ্ধিমানের এই নীতি আমি জরাসন্ধের ক্ষেত্রে পোষণ করি (সভাপর্ব)। ব্যূঢ়নীকৈরতিবলৈর্ন যুধ্যেদারিভিঃ সহ। ইতি বুদ্ধিমতাং নীতিস্তন্মাপীহ রোচতে।। আমরা প্রথমে সজ্জিত হয়ে ছদ্মবেশ ধারণ করে শত্রুর ভবনে প্রবেশ করব, তার পর তাকে একা পেয়ে আক্রমণ করে অভীষ্ট লাভ করব: প্রতিচ্ছন্নাশ্চ সন্নদ্ধাঃ প্রবিষ্টাঃ শত্রুসদ্ম তৎ। শত্রুমেকমুপক্রম্য তং কামং প্রাপ্নুয়াম হ।। ভগবান কৃষ্ণ, ভীম ও অর্জুন ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে উপবাসক্লিষ্ট জরাসন্ধের যজ্ঞগৃহে অদ্বার দিয়ে ঢুকলেন। চৈতকস্য গিরেঃ শৃঙ্গং ভিত্বা কিমিহ ছদ্মনা। অদ্বারেণ প্রবিষ্টাঃ স্থ নির্ভয়া রাজকিল্বিষাৎ।। ছদ্মবেশে অদ্বার দিয়ে প্রবেশ করে শত্রুকে বধ করাকে গুপ্তহত্যা বলা যায়।

২) ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে শিশুপাল সম্পর্কে বলছেন, “তুমি ভীত হইও না, কুকুর কি কখনও সিংহকে বধ করতে পারে?...নরব্যাঘ্র শ্রীকৃষ্ণ যাহাদিগকে সংহার করিতে ইচ্ছা করেন, তাহাদের এইভাবেই বুদ্ধিবিপর্যয় ঘটিয়া থাকে।’’ (দ্রষ্টব্য: ভীষ্ম চরিত্র, মহাভারতের চরিতাবলী, সুখময় ভট্টাচার্য, আনন্দ ১৪০১ বঙ্গাব্দ)। এই বইতে উল্লিখিত হয়েছে, ভীষ্ম অন্যান্য বিরুদ্ধ রাজাদের (যারা শিশুপালের পক্ষে) শৃগাল বলছেন (দ্রষ্টব্য: কৃষ্ণ চরিত্র)।

৩) “ক্ষত্রিয়ের পক্ষে সারথির কর্ম গৌরবের নহে, পরন্তু নিন্দনীয়।” (তদেব, কৃষ্ণ চরিত্র)।

৪) উদ্যোগপর্বে আছে,
উভৌ মধ্বাসবক্ষীবাবুভৌ চন্দনরূষিতৌ। ৫৯/৫।

৫) অবিস্থল পাণ্ডবদের চাওয়া পাঁচটি গ্রামের অন্যতম। মহাভারত ৫/৩১/১৯, ৫/৭০/১৫, ৫/৮০/৮১, ৫/৭২/২৫৯৫, ৫/৮২/২৮৭৭। দ্রষ্টব্য: পুরাণকোষ, প্রথম খণ্ড (২৪০ পৃষ্ঠা), নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, সাহিত্য সংসদ ২০১৭।

৬) একলব্য শ্রীকৃষ্ণের হাতে নিহত হন। মহাভারত-৭/১৮২/১৭-২০, হরিবংশ ৭/১৫৫/৪৯-৫২। আনন্দ নীলকান্তন তাঁর বই ‘অজয়—রাইজ় অব কলি’ (বুক-২) গ্রন্থে এই হত্যার বিবরণ দিয়েছেন।

 

আরও কিছু

শামিম আহমেদের নিবন্ধটি পড়ে মনে হল, কৃষ্ণের সমগ্র কর্মজীবনকে একটি পৃষ্ঠার মধ্যে ধরতে গিয়ে লেখক যে সংক্ষিপ্তকরণ করেছেন, তাতে কৃষ্ণচরিত্রে বেশ কিছু বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। সেই দিকে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য এই চিঠি।

১) মহাভারতের আদিপর্বে ‘রাজ্যলাভপর্বাধ্যায়’ অংশে বর্ণিত আছে, ধৃতরাষ্ট্র ভীষ্মের সম্মুখে পাণ্ডবগণকে খাণ্ডবপ্রস্থে গিয়ে বসবাস করতে বলেন। পাণ্ডবরা কৃষ্ণকে অগ্রবর্তী করে খাণ্ডবপ্রস্থে আসেন এবং ‘ইন্দ্রপ্রস্থ’ নির্মাণ করে সেখানে বসবাস শুরু করেন। এর পরে ‘অর্জুনবনবাসপর্বাধ্যায়’, তার পর ‘সুভদ্রাহরণপর্বাধ্যায়’, তার পরে ‘খাণ্ডবদাহপর্বাধ্যায়’। অর্থাৎ খাণ্ডব বন দহনের সঙ্গে ইন্দ্রপ্রস্থ নির্মাণের সম্পর্ক নেই। তাই ‘অরণ্য ধ্বংস করে জনপদ গড়ে তোলার ইঙ্গিত’ এখানে খাটে না। আর ‘কৃষ্ণের পরামর্শে দগ্ধ বনের উপর গড়ে উঠল ইন্দ্রপ্রস্থ নগর’, এই তথ্যও সত্য নয়।

২) মহাভারতের বনপর্বের ‘অর্জুনাভিগমনপর্বাধ্যায়’ থেকে জানা যায়, কৃষ্ণ শাল্ব রাজার সৌভনগর নষ্ট করতে যান, ‘শাল্বনগরের অধিপতি সৌভের’ সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাননি।

৩) লেখকের মতে, উপপ্লব্য নগরে ফিরে বাসুদেব পাণ্ডবদের বলেন, ‘‘সাম, দান, ভেদ, দণ্ডনীতি সব প্রয়োগ করেছি কিন্তু যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব নয়।’’ প্রকৃতপক্ষে কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে বলেছিলেন, ‘‘মহারাজ, আপনাদের জন্য আমি কৌরবসভায় সাম, দান ও ভেদনীতি অনুসারে বহু চেষ্টা করেছি, কিন্তু কোনও ফল হয়নি। এখন চতুর্থ নীতি ‘দণ্ড’ ছাড়া আর কোনও পথ দেখি না।’’ অর্থাৎ চতুর্থ নীতি ‘দণ্ড’ হল যুদ্ধ। সেটি দূত হিসেবে কৃষ্ণ প্রয়োগ করলেন কখন?

৪) দুর্যোধন শকুনির পুত্র উলূককে দূত হিসেবে পাণ্ডব শিবিরে পাঠান এবং যুধিষ্ঠির, কৃষ্ণ, ভীম প্রমুখকে যে সব কটু কথা বলতে হবে তাও শিখিয়ে দেন। দুর্যোধন কৃষ্ণকে ‘কংসের ভৃত্য’ বললেও ‘গোবধকারী’ কথাটির উল্লেখ পাইনি।

সুরঞ্জিৎ সিংহ

কলকাতা-১০২

 

লেখকের উত্তর:

১) অগ্নির অরুচি সারানোর জন্য খাণ্ডব বন পোড়ানো হয়। বন পোড়ানোর পর যে ছ’জন বেঁচে ছিলেন তাঁদের মধ্যে এক জন ময় দানব। তিনি কৃতজ্ঞতাবশে অর্জুনকে জানান যে প্রত্যুপকারে তিনি কিছু করতে চান। অর্জুন বলেন, তুমি কৃষ্ণের জন্য কিছু করো। শ্রীকৃষ্ণ ময়কে বলেন, তুমি যুধিষ্ঠিরের জন্য অননুকরণীয় সভা নির্মাণ করো। তখন ময় দানব সেই স্থানে প্রাসাদ নির্মাণ করেন। সেই জন্য বলা হয়েছে, কৃষ্ণের পরামর্শে দগ্ধ বনের উপর গড়ে উঠল ইন্দ্রপ্রস্থনগর। মহাভারতের সভাপর্বে আছে।

২) সৌভ, সৌভাধিপতি, সৌভপতি, শাল্বরাজ, শাল্ব সম অর্থে প্রয়োগ রয়েছে। মহাভারত—৩/১৫/১৯; ৩/১৬/১; ৩/১৭/১, ২৮, ৩১।

৩) ‘দণ্ডনীতি’ মানে রাজনীতি। দণ্ড কেবল যুদ্ধ নয়। সাম দান প্রভৃতি
প্রয়োগের পর অযুধ্যমান কৃষ্ণ বাধ্য হয়ে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিলেন। দণ্ডনীতির মধ্যে আপস, কূটনীতি প্রভৃতিও অন্তর্গত। এই নীতিগুলি মহারণের পূর্বে গ্রহণ করা হয়েছিল।

৪) শ্রীকৃষ্ণকে প্রতিপক্ষ সুযোগ পেলেই নারীবধকারী (পুতনাকে মেরেছিলেন বলে) এবং গোবধকারী (অরিষ্টকে হত্যা করেন বলে) বলে গালাগাল করতেন। শিশুপাল থেকে শকুনিপুত্র উলূক প্রত্যেকেই। মূল মহাভারতে এমন স্লেজিং-এর প্রচুর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট,
কলকাতা-৭০০০০১।

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও

 

ভ্রম সংশোধন

‘বিজ্ঞান কেন্দ্রের শিলান্যাস’ (রাজ্য, পৃ ৫, ১৪-৯) শীর্ষক খবরে মঞ্চে কেন্দ্রীয় কৃষিবিজ্ঞান কেন্দ্রের প্রধান ছিলেন লেখা হয়েছে। তা নয়। এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।