সম্প্রতি রামনবমী উপলক্ষে যা ঘটেছে তার প্রেক্ষিতে কেউ বলছেন এটা বাংলার সংস্কৃতি নয়, কেউ বলছেন বাংলা এ সব বরদাস্ত করবে না। কিন্তু প্রশ্ন হল, বাংলার সংস্কৃতির ধারক কে? কিছু দিন আগে এক বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ সাংবাদিককে জিগ্যেস করেন, ‘শঙ্খ ঘোষ কে? লেখেন-টেখেন?’ আর এক নেতা বলেন, ‘অমর্ত্য সেন দেশের জন্যে কী করেছেন?’ এই নেতার কথায় যেমন ঝাঁজ, লাঠিখেলাতেও তেমন প্যাঁচ। লাঠিখেলা দেখে আর এক নেতা হুঙ্কার ছাড়েন, ‘আমি চ্যালেঞ্জ করছি, আড়াই মিনিটে ওর কব্জি ভেঙে দেব।’ এঁরাই দাবি করছেন যে, সংস্কৃতির বাহক এঁরাই। ‘বাংলা এ সব বরদাস্ত করবে না’— এমন নিশ্চয়তা কোথায়? দেখা যাচ্ছে, এক যা করে দুই তা-ই করে। সে হনুমান জয়ন্তী হোক, কিংবা রামনবমী। এ সব অতি-উৎসবের লক্ষ্য হল মানুষকে মোহাচ্ছন্ন করা, নেশাগ্রস্ত করার মতোই। এই সব লোক টুরিস্টের মতো আসে কিন্তু কিছু দিনের মতো বিষিয়ে দিয়ে যায় বাংলার যুবমানসকে আর সরল বিশ্বাসীদের।

তরুণকুমার ঘটক  কলকাতা-৭৫

 

জোর করে

রামনবমী পালন হল, আর যা-ই হোক উৎসবের আমেজ অনেক কম ছিল। বরং ছিল কিঞ্চিৎ ভীতির পরিবেশ। মিছিল শেষ হলে বিকেলের পর সংবাদমাধ্যম আর সোশ্যাল মিডিয়ায় টুকরো-টুকরো সম্প্রীতির ছবি দেখতে পেলাম। প্রতিটাই যেন ফটোশুট করার জন্য করা, প্রতিটার কেন্দ্রবিন্দু ফেজ টুপি। কোথাও যেন জোর করে সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা। আমাদের বাংলায় সম্প্রীতি প্রমাণ করতে রামনবমীর মিছিলে ফেজ টুপি পরে শরবত খাওয়াতে হয়নি কোনও দিন। এত কিছুর পরও হিংসা ঘটল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদের মূর্তি ভাঙা হল। পরের বার সত্যিকারের সম্প্রীতির দিকে নজর দিতে হবে, শরবতের দিকে নয়।

সেখ মহম্মদ আসিফ  হলদিয়া

 

অস্ত্র প্রতীক

‘এ কোন রাম, কাদের রাম?’ (২৭-৩) শীর্ষক প্রতিবেদনে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘...তুলসী তাঁর রামকথায় রামকে শুধু বীর বানাতে যাননি, রাম কেন পুরুষোত্তম তাই তাঁর মরমি বিবরণে বর্ণিত হয়েছে। যুদ্ধবিগ্রহ আছে বটে, তবে রামায়ণকে আমার কখনওই বীরগাথা বলে মনে হয়নি।’ লেখকের এই উপলব্ধির সঙ্গে সহমত। প্রশ্ন হচ্ছে, রামনবমীর মিছিলে অস্ত্র প্রদর্শন হয় কেন? তা রামকে বীর হিসাবে দেখাবার উদ্দেশ্যে বোধহয় নয়। রাবণের অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র এক প্রতীক হিসাবে প্রদর্শিত হয়। উত্তর ভারতে রামনবমীতে অস্ত্র হাতে মিছিল নুতন কিছু নয়। তা ছাড়া ভারতে অন্য ধর্মীয় মিছিলেও অস্ত্র প্রদর্শন দেখা যায়। সবই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয় ঘোষণার উদ্দেশ্যে। কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে নয়। এখন যদি কেউ তাতে রাজনীতি ঢোকায়, সেটা তাদের কদর্য মনোভাবের পরিচয়।

মিহির কানুনগো  কলকাতা-৮১

 

সাবালক হলে?

শীর্ষেন্দুবাবুর মতো, আজ আপামর শান্তিকামী পশ্চিমবঙ্গবাসীর মনে প্রশ্ন জেগেছে রামনবমীতে সশস্ত্র মিছিলের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। এই প্রসঙ্গে শিশু অধিকার কমিশনের চেয়ারপার্সন মন্তব্য করেছেন, নাবালকদের হাতে অস্ত্র দেওয়া আইনসিদ্ধ নয়। সাবালকের সশস্ত্র মিছিলও কি আইনসিদ্ধ এবং এর জন্য কি কোনও রকম প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যায় না?

অশোক দাশ  রিষড়া, হুগলি

 

ফাঁদ পাতা হচ্ছে

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের নিবন্ধটি পড়লাম। রামচন্দ্রের বনবাসপথ নিয়ে তাঁর অনবদ্য পূর্ব-রচনাটিও আমাদের মনে পড়ে। লেখক ব্যক্তিগত ভাবে ধর্মাচরণকারী বলেও তাঁর এই রচনার স্বতন্ত্র তাত্পর্য আছে। রামনবমী নিয়ে রাজ্যে অভূতপূর্ব হিংসায় তিন জনের প্রাণ গেল। শঙ্খ ঘোষ কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসকদলের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিলেন। মূলস্রোতী সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমগুলিতেও তার প্রতিফলন দেখা গেল।

আমরা জানি, কেন্দ্রের শাসকদলটি ঐতিহ্যগত ভাবেই সমাজে ধর্মগত মেরুকরণ ঘটিয়ে ক্ষমতালাভে বদ্ধপরিকর। ১৯৯২ সাল থেকে তারা ধারাবাহিক ভাবে সাম্প্রদায়িকতার অস্ত্রে শান দিয়ে ক্ষমতা দখলে সচেষ্ট। ত্রিপুরায় মূলত সেই মন্ত্রেই তারা বামেদের পতন ঘটিয়েছে। এর পরে বিজেপি মরিয়া হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের রাজপাট-দখলে। এখানেও তাদের হাতের তাস সাম্প্রদায়িকতাই। সে কারণেই তারা রামনবমীর দিনটি অব্যর্থ নির্বাচন করেছে। আগে ‘হিন্দু-সংহতি’ নামে একটি সংগঠনও প্রশাসনের নিঃস্পৃহতায় শহরের প্রাণকেন্দ্রে অস্ত্রবাহিত জমায়েত করেছে। সবই ওই ক্ষমতালাভের কর্মসূচি। বিস্ময়ের যে, কেন্দ্রের শাসকদলের মতো রাজ্যের শাসকদলটিও একই দিনে পাল্টা অস্ত্র-মিছিল করেছে। সাম্প্রদায়িকতা যে সাম্প্রদায়িকতা দিয়েই রোখা যায় না, তা-ই সৃষ্টি করে দাঙ্গার পটভূমিকা, সে বিষয়েও সচেতন করেছেন শঙ্খ ঘোষ। কেননা, রাজ্যে গুজরাতের মতো একটি দাঙ্গা বাধাতে পারলেই বিজেপির মেরুকরণ-প্রচেষ্টা সফল হবে। আমরাও নিজেদের অগোচরে সেই ফাঁদেই পা দিচ্ছি।

গত কয়েক দিনে সামাজিক ভাবেও যে প্রশ্নটি সামনে আসছে: মুসলমান ও শিখদের অস্ত্র-শোভাযাত্রা রাজ্যে নিষিদ্ধ না-হলেও হিন্দুদের সশস্ত্র শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ হবে কেন। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এত দিন এমন প্রশ্ন সামাজিক মনে কখনওই ওঠেনি। ঠিকই, এত দিন ওঠেনি বলে আজ এ প্রশ্ন উঠতে বাধা নেই। কিন্তু, প্রশ্নটির মধ্যেই কি উত্তরটি নিহিত নেই? প্রশ্নটি করতে শেখাল কারা? একটি রাজনৈতিক দল, যারা ঘোষিত ভাবেই মুসলমানবিরোধী, যারা রাজনৈতিক কর্মসূচি মেনে বাবরি মসজিদ ধূলিসাৎ করেছিল, যারা মুসলমানের বাড়ির ফ্রিজারে গোমাংস রাখার অজুহাতে মানুষ খুনকে প্রশ্রয় দেয়।

এই নিরীহ উত্তরে অনেকে খুশি হবেন না। তাঁরা দাবি করবেন, মুসলমান বা শিখদের মতো অস্ত্রমিছিল করার। তাঁরা ভেবে দেখবেন না, মহরম বা গুরুনানক তিথিতে তরোয়াল বা কৃপাণের শোভাযাত্রা কোনও রাজনৈতিক দলের নিশানায় শুরু হয়নি। তা দীর্ঘকালীন ধর্মীয় প্রথা। সবচেয়ে বড় কথা, ওই দু’টি শোভাযাত্রার কারণে কোনও দিন কোথাও তিনটি তরতাজা প্রাণ যায়নি। যাওয়ার কথাও নয়। কেননা, মহরমের অস্ত্রমিছিল মোটেই হিন্দুবিরোধী নয়। তা নিছকই শিয়া-সুন্নি যুদ্ধের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় প্রতীকী প্রদর্শন। সেই তাজিয়া আসলে তো শোকের উদ্‌যাপন। মহরম আদতে আত্মনিগ্রহের পরাকাষ্ঠা, যা আমরা গাজনের উদ্‌যাপনে দেখে থাকি।

অন্য দিকে, হিন্দুদের শোভাযাত্রায় অস্ত্রবহন নিষিদ্ধ, তা একেবারেই সত্যের অপলাপ। আমরা তো বহুকাল ধরেই কুম্ভমেলায় শাহিস্নানের দিনগুলিতে দেশের সাধকসম্প্রদায়কে সপ্রহরণ শোভাযাত্রা করতে দেখি। তাঁরা সে দিন নিজেদের প্রহরণগুলিরও পুণ্যস্নান করান। সে ক্ষেত্রে প্রশাসনের কোনও নিষেধাজ্ঞাও থাকে না। থাকার কথাও নয়। কেননা, ওই সব অস্ত্র কোনও ভাবেই সাম্প্রদায়িক লক্ষ্য নয়। ওই অস্ত্রের ঝনৎকারে কখনও প্রাণহানি হয়নি কুম্ভমেলায়। সেখানে বিভিন্ন সময় যে রক্তপাত, তা হিন্দু-মুসলমানের সংঘর্ষে নয়, শৈব-বৈষ্ণবের দ্বৈরথে।

রামনবমী বা মহরম উপলক্ষে বাংলার নানা প্রান্তে দুই সম্প্রদায়ের লাঠিখেলা আজও দুর্লভ নয়। সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’ উপন্যাসে বিহারে মহরমের অনবদ্য মিলনচিত্রের কথা সকলেরই মনে আছে। সে সব তথ্য হিন্দুত্ববাদীদের কোনও কাজে লাগে না।

গৌতম ঘোষদস্তিদার  কলকাতা-১১৮

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।

ই-মেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়