ছেলেবেলায় কলকাতাতে দুর্গাপুজোর চার দিন ছিল বছরের সব চেয়ে আনন্দের কয়েকটা দিন। কালীপুজোয় আরও দিন দুই ফুর্তি করা হত। আজ সত্তরোর্ধ্ব বয়সে পুজো আমার কাছে যেন এক বিভীষিকা। পাড়ার দুর্গাপুজোর উৎসব সাত দিনের বেশি চলে। কালীপুজো ১০-১২ দিন। উৎসবের দিনগুলি বাড়ি আটকে মেলার পর পর দোকান। ক্রেতা-বিক্রেতার কলরব। তার উপর সক্রিয় একাধিক লাউডস্পিকার, ল্যাম্পপোস্ট বরাবর। শব্দমাত্রা-সীমা ও সময়-সীমা শুধুই কাগজে-কলমে সরকারি খাতায় বোধ করি। শান্ত পরিবেশে নিজের বাড়িতেই সময় কাটাতে পারি না। ঘুমের ব্যাঘাত তো ঘটেই। কলকাতা ও শহরতলি জুড়ে যত বারোয়ারি পুজো, তার আশেপাশের বাসিন্দাদের কমবেশি এই কষ্টের মধ্যে কাটে। মা দুর্গা ও কালী যদি ভক্ত উদ্যোক্তাদের আশীর্বাদ ব্যতীত সুমতিও দিতেন, অনেকে উপকৃত হত।

সুমনশঙ্কর দাশগুপ্ত

কলকাতা-৬০

 

চাষি ও ফসল

‘চাষি ফসল বেচবেন কী করে’ (২৮-৯) শীর্ষক অভীক সাহার নিবন্ধটি পড়লাম। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে সহমত হয়ে ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের আরও কয়েকটি কথা জেনে নেওয়া যাক। ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (এমএসপি) কেন? চাষি ফসল উৎপাদন করবেন। উৎপাদিত ফসল বাজারে বিক্রি করে লাভ করবেন। কারণ দেশের অন্য নাগরিকদের খাবার দরকার। তাঁরা এই ফসল কিনে খাবেন। বাকি ফসলে মূল্যযোগ করে নানা সামগ্রী তৈরি করবে শিল্প। সেই সব সামগ্রী বিক্রি হবে। এই প্রক্রিয়ায় কিছু লোকের কর্মসংস্থান হবে। সরকারেরও কিছু আয় হবে। এখানে প্রাথমিক উৎপাদক হিসেবে চাষির দুটো গুরুত্বপূর্ণ দায় রয়েছে। এক, চাষির নিজের এবং পরিবারের পেট চালানোর দায়। আর দেশের অন্য মানুষজনকে খাওয়ানোর দায়। এ বার যদি কোনও কারণে বা বাজারের ওঠাপড়ায় চাষির ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখন সরকার ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিয়ে হাজির হবে চাষিকে বাঁচাতে। কারণ চাষি দেশকে রক্ষা করছেন খাবার এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী জুগিয়ে। এমএসপি ব্যবস্থাটা এই ভাবেই তৈরি হয়েছে, সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে।

এ বার আসা যাক তথ্যে। ভারতে মোট চাষি পরিবারের মাত্র ৬ ভাগ, তাঁদের কিছুটা উৎপাদন এমএসপিতে বিক্রি করেন। সরকারের ‘কমিটি অন রিস্ট্রাকচারিং ফুড ক্রপ ইন ইন্ডিয়া’র হিসেব এ কথা বলছে। সরকারি হিসেবে দেশে মোট পরিবারের ৫২ শতাংশ অর্থাৎ ১৩ কোটি ৫২ লক্ষ পরিবার চাষের কাজে যুক্ত। এর ৬ ভাগ মানে, মাত্র ৮১ লক্ষের কিছু বেশি চাষি পরিবার, তাদের ফসল এমএসপিতে সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারে। অর্থাৎ ভোটের বাজারে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের চমক সাধারণ মানুষের কাছে থাকলেও, বেশির ভাগ চাষি পরিবারে এর ভূমিকা প্রায় নেই।

দ্বিতীয়ত, মাত্র ২৫টি ফসলের ক্ষেত্রে সহায়ক মূল্য ঠিক করা হয়। এ ক্ষেত্রে যে সব ফসল অনেক দিন রাখা যায়, সেগুলিই এই মূল্যের তালিকায় রাখা হয়। সব্জি, ফল ইত্যাদি এখানে নেই। আবার এই তালিকায় যে ফসলগুলি রয়েছে তার মধ্যে মাত্র দু’টি ফসল— ধান এবং গম সর্বাধিক পরিমাণে সরকার কেনে।

ধান যে হেতু অন্যতম প্রধান ফসল, তাই এমএসপিতে সরকারের ধান সংগ্রহের বহরটা এ বার দেখে নেওয়া যাক। পশ্চিমবঙ্গে কমবেশি ১৬০ লক্ষ টন ধান উৎপাদন হয়। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ আর্থিক বছরের ফেব্রুয়ারি মাস অবধি সরকার ২৩ লক্ষ টন ধান সংগ্রহ করেছে। যেটা রাজ্যে উৎপাদিত মোট ধানের মাত্র ১৫ ভাগ। আর দেশে ধান ফলে ১১১০ লক্ষ টন। যার মাত্র ৩১ ভাগ বা ৩৫০.৩৮ লক্ষ টন সংগৃহীত হয়েছে এই একই সময়ে।

এখানে আরও একটি হিসেব লুকিয়ে আছে। আমরা আগেই দেখেছি, মাত্র ৬ ভাগ চাষি পরিবার থেকে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে ফসল সংগৃহীত হচ্ছে। এর অর্থ হল, ৯৪ ভাগ চাষি এর কোনও সুযোগ পাচ্ছেন না। আর এক সঙ্গে চাষির সংখ্যা, উৎপাদন এবং সংগ্রহের অনুপাত দেখলে বোঝা যায়, বড় এবং মাঝারি চাষিরাই এমএসপি-র সুযোগ বেশি পাচ্ছেন। প্রান্তিক বা ছোট চাষিদের জীবনে এর ভূমিকা সামান্যই।

অন্য বিষয়টি হল, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য সম্পর্কে সাধারণ ধারণা। একে ‘ন্যূনতম’ বলা হলেও, খোলা বাজারে ফসলের দাম কিন্তু এর থেকে কম। এটি এখন তাই ‘সর্বোচ্চ’ মূল্য। এ বিষয়ে বিভিন্ন জেলার চাষিদের বক্তব্য, এ বছর অর্থাৎ ২০১৭-১৮ আর্থিক বছরে খোলা বাজারে ধানের দাম বেশ ‘চড়া’। ফসল তোলার সময় ৬০ কেজি বস্তার ধানের দাম ছিল ৭০০ টাকা। এখন তা ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একটু ভাল ধান হলে ৮৫০ টাকা অবধি দাম উঠছে। অর্থাৎ কুইন্টাল প্রতি ১১৭০ টাকা থেকে ১৪২০ টাকা দরে ধান বিক্রি হচ্ছে। তা হলেই বুঝুন, চড়া বাজারেও ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের থেকে অনেকটাই কম দাম পাচ্ছেন চাষিরা। দেখা গিয়েছে, বাজারে কখনওই ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের ওপরে কোনও ফসলেরই দাম ওঠে না। অথচ কথা ছিল বাজারে বেশি দামে ফসল বিকোবে। যদি কোনও অসুবিধায় দাম কমে যায় তখন চাষিকে বাঁচিয়ে রাখতে সহায়ক দাম দিয়ে ফসল কিনে নেবে সরকার। এখানে যে কথাটি ওঠে তা হল— সব ক্ষেত্রেই উৎপাদিত সামগ্রীর দাম ঠিক করার ক্ষমতা রয়েছে উৎপাদকের। কিন্তু একমাত্র চাষিই তাঁর ফসলের দাম ঠিক করতে পারেন না।

আমরা জানি, ধার, খরা, অতিবৃষ্টি ইত্যাদি কারণে ফসলের দাম না পাওয়ায় এ যাবৎ কয়েক লক্ষ চাষি প্রাণ দিয়েছেন। তাই চাষিদের আত্মত্যাগের কথা ভুলে গেলে সঙ্কট তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।

সুব্রত কুণ্ডু

কলকাতা–১৭

কুসুমকুমারী

‘সেই ছেলে কবে’ (সম্পাদক সমীপেষু, ২-১০) প্রসঙ্গে এই চিঠি। কুসুমকুমারী দাসের লেখা কবিতা ‘আদর্শ ছেলে’ ১৩০২ বঙ্গাব্দে মুকুল পত্রিকার পৌষ সংখ্যায় (১ম ভাগ ৭ম সংখ্যা) মুদ্রিত হয়েছিল। শিবনাথ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় ১৩০২ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসে ‘মুকুল’ পত্রিকা প্রথম প্রকাশিত হয়। এটি প্রকাশ করার পিছনে ব্রাহ্মসমাজভুক্ত শিবনাথ শাস্ত্রীর কন্যা হেমলতা ভট্টাচার্য, গুরুচরণ মহলানবিশ-এর কন্যা সরলা মহলানবিশ, অন্নদাচরণ খাস্তগিরের কন্যা কুমুদিনী খাস্তগির এবং ভগবানচন্দ্র বসুর কন্যা লাবণ্যপ্রভা বসু উদ্যোগী ছিলেন। এই চার ব্রাহ্ম তরুণী ছাড়াও সক্রিয় ছিলেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার ও সাংবাদিক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। ‘মুকুল’ পত্রিকার প্রথম বছর আমরা যে ২৯ জন লেখক-লেখিকার নাম পাই তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবলা বসু, যোগীন্দ্রনাথ সরকার, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, কুসুমকুমারী দাস, জগদীশচন্দ্র বসু, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, দীনেন্দ্রকুমার রায় প্রমুখ। কুসুমকুমারীর পিতা চন্দ্রনাথ দাস ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করার জন্য স্বগ্রামচ্যুত হওয়ার ফলে কুসুমকুমারী পিতৃগৃহে বরিশাল শহরে থাকতেন। ১৯ বছর বয়সে পতিগৃহে এসে জ্ঞানচর্চার প্রশস্ত ক্ষেত্র পেয়েছিলেন। তাঁর স্বামী সত্যানন্দ দাস ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক ও এক সময়ে সমাজের উপাচার্য ছিলেন। ২০ বছর বয়সে বরিশাল থেকে ‘মুকুল’ পত্রিকায় কুসুমকুমারী কবিতা পাঠান। এ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম কবিতা ‘দাদার চিঠি’, ১৩০২ কার্তিক সংখ্যায় (১ম ভাগ ৫ম সংখ্যা) মুদ্রিত হয়, প্রথম দু’টি লাইন ‘‘আয় রে মনা, ভুলো, বুলি আয় রে তাড়াতাড়ি/ দাদার চিঠি এসেছে আজ, শুনাই তোদের পড়ি’’। এর পর ‘মুকুল’-এর ১৩০২ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণ সংখ্যায় (১ নম্বর ভাগ ৬ষ্ঠ সংখ্যা) তাঁর লেখা ‘খোকার বিড়াল ছানা’ কবিতাটি মুদ্রিত হয়। ‘মুকুল’-এর পরবর্তী সংখ্যায় ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়, যা আজও লোকের মুখে মুখে ঘোরে।

অসিতাভ দাশ

কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, নদিয়া

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু, 

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১। 

ইমেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়। চিঠির শেষে পুরো ডাক-ঠিকানা উল্লেখ করুন, ইমেল-এ পাঠানো হলেও।