বামেরা শাসকের বিরোধে ব্যস্ত, নিজেদের সমালোচনায় নয়
আত্মরক্ষার ঢাল পদ্মবন
হাবভাবটা অনেকাংশে এ রকম— আপাতত তৃণমূলকে হটানোর ‘পবিত্র’ কাজটা বিজেপি করে দিক। তার পর যথাসময়ে সম্প্রীতির সাচ্চা দূত হয়ে আমরা মঞ্চে পুনরবতীর্ণ হব। 
cpm

একদা পরিচিত এক ভদ্রলোকের কথা ইদানীং খুব মনে পড়ে। মানুষটি এক সময় নকশাল আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। পরে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। নব্বইয়ের দশকে মুক্ত অর্থনীতির প্রভাবে চার পাশটা যখন দ্রুত বদলে যেতে থাকল, তাঁকে দেখতাম দামি ব্র্যান্ডের জিনিসপত্র কেনার দিকে ভারী ঝোঁক। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী জীবনযাত্রার মান ঠিক করবেন, তাতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু প্রাক্তন নকশাল সেরা দাম দিয়ে বাজার থেকে সেরা জিনিসটি তুলে আনতে পেরে প্রকাণ্ড শ্লাঘা অনুভব করছেন দেখে কেমন একটু লাগত। প্রশ্ন করলে চমৎকার একটি যুক্তি দিতেন তিনি। বলতেন, পুঁজিবাদকে তার চরম সীমায় পৌঁছে দিতে না পারলে সমাজতন্ত্র আসবে না। তিনি কেনাকাটা করে আসলে সেই দায়িত্বই পালন করছেন। গ্যাট চুক্তি আর ডাঙ্কেল প্রস্তাব বাতিল করার ডাক দিয়ে সুবিধা যখন হলই না, তখন এ ভাবেই সমাজতন্ত্রের পথ সুগম করতে হবে। 

এই মুহূর্তে এ রাজ্যের বামপন্থীদের— আরও নির্দিষ্ট করে বললে সিপিএম সমর্থকদের— একটা বড় অংশের মতিগতি নজর করলে এই যুক্তিটারই প্রায় একটা সমান্তরাল ব্যাপার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। ওঁরা যেন মানসচক্ষে দেখতে পেয়েছেন, এখন বিজেপিকে ভোট দিলেই আখেরে লাল ঝান্ডার অচ্ছে দিন ফিরিয়ে আনতে সুবিধা হবে! হাবভাবটা অনেকাংশে এ রকম— আপাতত তৃণমূলকে হটানোর ‘পবিত্র’ কাজটা বিজেপি করে দিক। তার পর যথাসময়ে সম্প্রীতির সাচ্চা দূত হয়ে আমরা মঞ্চে পুনরবতীর্ণ হব। 

স্বধর্মে স্থিত থাকার অভ্যেসটা এ রাজ্যের বামপন্থীরা অন্তত অনেক দিনই খুইয়ে বসে আছেন। ফলে এই আচরণে আজকাল আর বিস্ময় জন্মায় না। বস্তুত সিপিএম কর্মী-সমর্থকের একটা বৃহৎ অংশের সঙ্গে আজও পাঁচ মিনিট কথা বললেই বোঝা যায়, ২০১১-কে তাঁরা এখনও অবধি হজম করে উঠতেই পারেননি। তাঁরা বিশ্বাস করেন, তাঁদের পরাজয়টা খুবই অন্যায্য হয়েছে। তৃণমূল জমানায় অপশাসনের যে কোনও ঘটনায় তাঁদের চোখমুখ তাই ‘দ্যাখ কেমন লাগে’-উল্লাসে জ্বলজ্বল করে ওঠে। যেন রাজ্যবাসী একটা গর্হিত কাজ করে ফেলেছিলেন, বিধাতা স্বয়ং তার শাস্তি দিচ্ছেন। এমতাবস্থায় বিজেপির বাড়বাড়ন্ত তাই বামেদের চোখে প্রায় নবযুগ আনবার একটা পড়ে-পাওয়া সম্ভাবনা বলে প্রতিভাত হচ্ছে। জয় পাওয়া বা নিদেনপক্ষে দ্বিতীয় হওয়া কঠিন হবে মনে হলেই সংশ্লিষ্ট আসনগুলিতে স্থানীয় স্তরে নির্দেশ চলে যাচ্ছে, কোন বোতামটা টিপতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সিপিএম সমর্থকদের কথালাপ দেখলে বোঝার জো নেই, এ বারের ভোটে মূল লড়াইটা মোদীর বিরুদ্ধে না দিদির বিরুদ্ধে। ডিমভাতের রসিকতা, শতরূপ ঘোষের মধ্যমা কিংবা সূর্যকান্ত মিশ্রর বহুচর্চিত টুইট একেবারেই আকাশ থেকে পড়েনি।  

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

প্রশ্ন হল, এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? সিপিএম-পন্থীরা একযোগে তৃণমূলের দিকে আঙুল তুলবেন। এ রাজ্যকে বিরোধীমুক্ত করার উদগ্র মত্ততায় শাসক দল যে তাণ্ডব চালিয়েছে, তা অস্বীকার করার কিছু নেই। বহু বাম কর্মী যে নিছক আত্মরক্ষার তাগিদেই পদ্মবনে আশ্রয় নিয়েছেন, তা-ও সত্য। কিন্তু একমাত্র সত্য নয়। বামেরা যদি শাসক-রোষে বিলুপ্তই হয়ে যেতেন, তা হলে বছর বছর ব্রিগেড সাফল্য উদ্‌যাপন করতেন কাদের নিয়ে? ভোট শতাংশের হিসেবই বা কষতেন কিসের ভিত্তিতে? বাম নেতৃত্ব তো একান্তে এ-ও বলতেন যে, পালাবদলের পরে বেনোজল বেরিয়ে গিয়েছে। এখন যা পড়ে রয়েছে, তা খাঁটি সোনা। এ বার কি তবে সেই সোনারই কিছুটা বিজেপিতে লগ্নি করছেন কমরেড? 

বিজেপির স্বাভাবিক প্রতিপক্ষ বলে নিজেদের চিহ্নিত করে থাকেন বামেরা। অথচ এ রাজ্যে কয়েক বছর ধরে শাসকের বিরুদ্ধে ক্ষোভ আর মেরুকরণে লাগাতার গেরুয়া ইন্ধন মিলে যে বিপজ্জনক বাতাবরণ তৈরি হয়ে চলেছে, তার প্রতিরোধে আগুয়ান হতে সে ভাবে দেখা যায়নি ওঁদের। এমনকি প্রায় রোজ এক বার করে রাজ্যে এসে মোদী-অমিত শাহ যা খুশি বলে যাচ্ছেন! বামেদের জোরালো প্রতিবাদ বিশেষ শোনা যাচ্ছে না।  

কী শোনা যাচ্ছে তবে? ৩৪ বছর ধরে এ রাজ্য কেমন ছায়াসুনিবিড় শান্তির নীড় ছিল আর মমতা কী ভাবে একা হাতে খাল কেটে কুমির আনলেন, সেই কাহিনি চর্চিত হচ্ছে দিনের পর দিন। রাজ্যে বিজেপির উত্থানে তৃণমূল নেতৃত্বের ভূমিকা অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিচার্য। কিন্তু দোষারোপের খেলায় নামতে গিয়ে ইতিহাসকে চুনকাম করে দেওয়াটাও তো কাজের কথা নয়! 

কে না জানে, ভঙ্গ বঙ্গদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং সাম্প্রদায়িক অশান্তির শিকড় অতি গভীর, জটিল এবং ব্যাপ্ত। সেটা ১৯৪৬-৪৭ সালে শুরু হয়নি, শেষও নয়। এই রাজ্যের বামফ্রন্ট জমানার প্রসঙ্গই যদি ধরি, ১৯৯২-এর স্মৃতি, কার্ফু-কবলিত কলকাতার দিনরাত্রি ভুলে যাওয়ার কথা নয়। তসলিমা নাসরিনকে ঘিরে বিক্ষোভ সামাল দিতে সেনা তলব এবং পত্রপাঠ তসলিমা বিদায়— ২০০৭-এর ঘটনা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের রিপোর্ট অনুযায়ী, শুধু ২০১০ সালেই এ রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ ঘটেছিল ২১টি। 

তথ্য-তালাশ না-হয় ছেড়েই দেওয়া গেল। এ রাজ্যে গেরুয়ার শক্তিবৃদ্ধিকে কি আদৌ তার জাতীয় প্রেক্ষিত থেকে বিচ্ছিন্ন করে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? বামের ৩৪ বছরের সঙ্গে কি আজকের সময়ের তুলনা চলে? বাম জমানাকে তো পাঁচ বছর বাজপেয়ীর শাসন ছাড়া কেন্দ্রে বিজেপির মোকাবিলাই করতে হয়নি! বাজপেয়ী তাঁর শাসনকালে আজকের মতো করে বিদ্বেষের মন্ত্র-কে পুঁজিও করেননি। আজ মোদী-অমিত শাহ যে ভাবে বাংলাকে তাঁদের স্থির নিশানায় রেখেছেন, বাম শাসকদের কি তার সমতুল্য পরিস্থিতি দেখতে হয়েছে? হয়নি। বাম আমলের সিংহভাগ কেটে গিয়েছে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন, নিউজ় চ্যানেল ছাড়াই। 

এক সময় নিত্য আক্ষেপ শোনা যেত বাম শাসকদের মুখে— মমতা বিরোধী রাজনীতির স্বার্থে রাজ্যের উন্নয়নকেও আটকে দিচ্ছেন! আজ যখন মেরুকরণের থাবা তার নখ বার করছে, বামেরা কোন দায়িত্বশীল ভূমিকা নিচ্ছেন, বোঝা ভার। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকেও অগত্যা শেষ লগ্নে সাবধানবাণী শুনিয়ে বলতে হচ্ছে, তপ্ত কড়াই থেকে আগুনে ঝাঁপ দেবেন না! 

আরও একটা কথা থেকে যায় এর পরেও। এ রাজ্যে মমতার শাসনের বয়স আট। এখানকার নবগঠিত বানর-সেনাদের বয়স নিশ্চয় আটের বেশি! তাঁরা তার মানে মুখ্যত বাম জমানারই সন্তান! তো, ৩৪ বছর ধরে বামপন্থী সংস্কৃতির কোন ভিত তবে রচিত হল, যা আট বছরেই ধূলিসাৎ? সংখ্যালঘুদের প্রকৃত বন্ধুর কর্তব্য যদি বামেরা পালন করেই থাকেন, তবে সাচার কমিটির রিপোর্ট অমন অন্ধকারাচ্ছন্ন হল কেন? 

আত্মসমীক্ষণ ছাড়া নবযুগ আসবে না কমরেড। সেটা করবেন, না কি পটকায় আগুন দেবেন, সেটা আপনাদেরই ঠিক করতে হবে।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত