প্রায় তিনশো আসনে নানা স্থানীয় দলই বিজেপির মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী
আঞ্চলিক দলের দীর্ঘ ছায়া
নরসিংহ রাওয়ের পর দেবগৌড়া আর গুজরালের দু’বছরেরও কম টেকা যুক্তফ্রন্ট সরকার আর অটলবিহারী বাজপেয়ীর ছ’বছরের এনডিএ জোট সরকারের শাসনের শেষে মনমোহন সিংহের প্রধানমন্ত্রিত্বে কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরল বটে, কিন্তু সেই পুরনো দাপটে নয়।
United Alliance

সমবেত: আনন্দ শর্মা, অরবিন্দ কেজরীবাল, শত্রুঘ্ন সিন‌্হা, চন্দ্রবাবু নায়ডু, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শরদ পওয়ার এবং ফারুক আবদুল্লা। ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

তরোয়াল চালাতে চালাতে এগিয়ে চলেছে যুদ্ধে জেতার স্বপ্নে মগ্ন ঘোড়সওয়ার সৈন্য। শত্রুদের মাথা কাটতে কাটতে এক সময় তার নিজের মাথাই কাটা পড়ল। তবু সেই মুণ্ডহীন কবন্ধ যোদ্ধাটি তরোয়াল চালাতে চালাতে এগিয়ে চলেছে... — নানা দেশ ও সংস্কৃতির (ধর্মীয় সংস্কৃতিরও) বীরগাথায় এমন অতিকথা প্রায়শ প্রজন্মপরম্পরায় ছেয়ে থাকে। আমাদের দেশের ক্ষমতাচ্যুত অথচ স্বভাবে উড্ডীন নেতানেত্রীদের দেখলেও এমনটা মনে হয়— অনেকটা ‘জলসাঘর’-এর জমিদার বিশ্বম্ভরের মতো। জমিদারি চলে গিয়েও যাঁর মেজাজটা যায়নি। যেমন, রাহুল গাঁধীর কংগ্রেসের। স্বাধীনতার পর থেকে নেহরু-গাঁধী পরিবারকে আঁকড়ে চলা ১৩৪ বছর বয়সি দেশের এই প্রাচীনতম দলটি স্বমহিমায় ছিল ইন্দিরা গাঁধীর মৃত্যু অবধি। তার পর সেই মৃত্যুকে সামনে রেখে ১৯৮৪-তে রাজীব গাঁধীর সরকার, আর নিহত রাজীবের স্মৃতি মূলধন করে ১৯৯১-তে ক্ষমতাসীন নরসিংহ রাওয়ের কোনও মতে পাঁচ বছর চালিয়ে দেওয়া সরকার।  

তার পর থেকে শুরু হওয়া জোট রাজনীতির যুগে কংগ্রেসের আর একক ভাবে ক্ষমতায় আসা হয়নি। নরসিংহ রাওয়ের পর দেবগৌড়া আর গুজরালের দু’বছরেরও কম টেকা যুক্তফ্রন্ট সরকার আর অটলবিহারী বাজপেয়ীর ছ’বছরের এনডিএ জোট সরকারের শাসনের শেষে মনমোহন সিংহের প্রধানমন্ত্রিত্বে কংগ্রেস ক্ষমতায় ফিরল বটে, কিন্তু সেই পুরনো দাপটে নয়। ২০০৪-এ ভোটবিজ্ঞানীদের মুখে ছাই দিয়ে বাজপেয়ীর বদলে যে কংগ্রেস ক্ষমতায় এল, তার মুখ্য কৃতিত্ব সনিয়া গাঁধীর। ইন্দিরা গাঁধীর এই বুদ্ধিমতী জ্যেষ্ঠ বধূমাতা বুঝলেন যে পুরনো ‘দিন গিয়াছে’। ১৯৭০-এর, এমনকি ১৯৮০-র দশক আর ফিরবে না। তার প্রধানতম কারণ, এক দিকে জাতপাত ও আঞ্চলিকতা ভিত্তিক আঞ্চলিক দলগুলির বহুত্ববাচক উত্থান, অন্য দিকে ‘হিন্দুত্ব’কে হাতিয়ার করে বিজেপির ক্রমশ উঠে আসা। তাই, বিজেপির প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে, ২০০৪-এ সনিয়া (তখন কংগ্রেস সভানেত্রী) নিজে এনডিএ-র বাইরে থাকা ছোট-বড় সব আঞ্চলিক দলের দরজায় দরজায় ঘুরেছিলেন। এমনকি পায়ে হেঁটে রামবিলাস পাসোয়ানের বাড়ি পৌঁছেছিলেন, তাঁকে বুঝিয়ে ইউপিএ জোটে আনতে।

কিন্তু এই বাস্তববোধ বাকি কংগ্রেসিদের মধ্যে কোথায়? তাঁদের অনেকেই বসে আছেন অহমিকা-আচ্ছন্ন নিজস্ব গজদন্তমিনারে। ভাবছেন, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়ের পর বাকি রাজ্যগুলিতেও কংগ্রেস সমর্থনের ঢল নামবে। ফলে, দিল্লিতে শীলা দীক্ষিতরা অরবিন্দ কেজরীবালের ‘আপ’-এর সঙ্গে সমঝোতার প্রস্তাবকে পাত্তা না দিয়ে নিজেরাই সব ক’টি আসনে লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন! দিল্লির আছে সাতটি লোকসভা আসন, যা অনেক ছোট রাজ্যেরও নেই! অথচ, কংগ্রেস-আপ সমঝোতা না হওয়ার কারণে এই সাতটির অধিকাংশই বিজেপির ঝুলিতে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। 

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

অন্য দিকে, বিজেপির যে শরিকদের সঙ্গে সমস্যা ছিল, যেমন মহারাষ্ট্রে শিবসেনার সঙ্গে, তা মিটেছে। অসমে, মাসখানেক আগেও, জাতীয় নাগরিকত্ব আইনকে কেন্দ্র করে যে অসম গণতান্ত্রিক পরিষদ এনডিএ ছেড়ে গিয়েছিল, তারাও ফিরে এসেছে। বিহারে নীতীশের জেডিইউ, রামবিলাসের এলজেপি-র সঙ্গে সমঝোতা নরেন্দ্র মোদীর দল আগেই পাকা করে ফেলেছে। আর উল্টো দিকে উত্তরপ্রদেশে অখিলেশের সমাজবাদী পার্টি (সপা) ও মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি-র (বসপা) ‘মহাগঠবন্ধন’-এ কংগ্রেস না থাকায় নিশ্চয়ই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে বিজেপি, কারণ যদি সপা-বসপা-র সঙ্গে কংগ্রেসরও কিছু আসনের সমঝোতা হত, তবে আদিত্যনাথের প্রদেশে বিজেপির অবস্থা শোচনীয় হত। এই জোট যে হল না, তাতে অবশ্যই মায়াবতীর একগুঁয়েমি আছে, কিন্তু সামগ্রিক বিচারে এটাও অস্বীকার করা যাবে না যে, কংগ্রেসও তার অহং ছেড়ে প্রয়োজনে মাথা ঝোঁকাতে শেখেনি। তুলনায়, সম্পর্কের নানা ওঠাপড়া সত্ত্বেও এখনও অবধি যে কর্নাটকে দেবগৌড়া-কুমারস্বামীর জেডিএস-এর সঙ্গে জোট অটুট রয়েছে, তা কংগ্রেসের পক্ষে স্বস্তির কথা। তবে, বিহারে লালু-তেজস্বী যাদবের আরজেডির সঙ্গে দলের টানাপড়েন চলছেই— লালুপুত্র তেজস্বী কংগ্রেসকে ‘অহঙ্কারী’ বলেছেন!

জোট ভাঙাগড়ার পাশাপাশি যে দলবদলের পালা শুরু হয়েছে, তাতেও কিন্তু প্রাথমিক ভাবে বিজেপি এগিয়ে। সবচেয়ে অস্বস্তি এল, যখন কংগ্রেসের প্রবীণ মুখপাত্র, একদা সনিয়ার প্রধান সহযোগী, টম ভড়াক্কন বিজেপিতে যোগ দিলেন। উল্টো দিকে, উত্তরাখণ্ডের প্রাক্তন বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী, বিসি খান্ডুরি-র (যাঁর সঙ্গে বিজেপির দূরত্ব বাড়ছিল) পুত্র মনীশ খান্ডুরির সম্প্রতি কংগ্রেসে আসা অবশ্য উচ্চবর্ণের আধিপত্যময় এই পার্বত্য রাজ্যে কংগ্রেসের শক্তি বাড়াবে। আবার, ইউপি-তে জেডিএস-এর সাধারণ সম্পাদক, দানিশ আলির বিএসপি-তে যোগদান বুঝিয়ে দেয়, দেশের সবচেয়ে বড় রাজ্যের রাজনৈতিক জল কোন দিকে গড়াচ্ছে।    

এ কথা ঠিক, কংগ্রেস-প্রধান রাহুল গাঁধী দেশের এ-মাথা থেকে ও-মাথা চষে ফেলছেন। তিনিই দলের ‘স্টার’ প্রচারক। সম্প্রতি তিন রাজ্যে জয়ের পিছনে তাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য। যে ভাবে তিনি কৃষি ঋণ ও রাফাল বিমান কেনাবেচায় অনিল অম্বানীকে সুবিধা পাওয়ানোর বিষয়টিকে সামনে এনে জনসমর্থন পেয়েছেন, তা নিশ্চয়ই তাঁর পুরনো ‘নাবালক’ (সমাজমাধ্যমে ‘পাপ্পু’) ভাবমূর্তি অনেকটাই ভেঙে দিয়েছে। কিন্তু এক লাফে প্রত্যাশাও বেড়ে গিয়েছে। তা পূরণ করতে গেলে কিন্তু পুরনো চর্চা আর অভ্যাসের কাঠামো ভেঙে এগোতে হবে। কৃষিঋণ মকুব সম্পন্ন চাষিদের ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ দিতে পারে, দীর্ঘমেয়াদি সুরাহা দিতে পারে না। তেমনই, ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’ স্লোগানটিও, পুলওয়ামা হামলা এবং ‘সার্জিকাল স্ট্রাইক’-এর পর বিজেপির বাগাড়ম্বরের মতোই, ক্রমশ ঝাঁজ হারাচ্ছে। বিজেপি কিন্তু ইতিমধ্যে বাণিজ্যিক প্রচার সংস্থা মারফত দু’টি স্লোগান— ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’ এবং ‘আপনা মোদি আয়েগা’— পেয়েছে, যা স্মার্ট মিডিয়ায় ভাল ‘খাবে’। 

এই সব খামতি পোষাতে দল প্রিয়ঙ্কা গাঁধী বঢরাকে মাঠে নামিয়েছে। রাগা-র চেয়ে বছর দেড়েকের ছোট বোন প্রিয়ঙ্কা চলনে-বলনে-চেহারায় তাঁর ঠাকুরমা ইন্দিরার স্মৃতি উদ্রেককারী। যে ভাবে তিনি ইউপি-র ময়দানে নেমেই সাড়া ফেলেছিলেন, তাতে অনেকের আশা ছিল তিনি নিজে ভোটে দাঁড়িয়ে দলকে নেতৃত্ব দেবেন। এখনকার ভোটের বাজারে ‘নিজে দাঁড়ানো’র গুরুত্ব অনেক। তাতে ভোটাররা বোঝেন যে নেতা/নেত্রী রাজনীতিতে ‘সিরিয়াস’। কিন্তু কিছু দিন পরেই বোঝা গেল, তিনি কেবল ভোটে প্রচার করবেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। গুজরাতে করলেনও। যাতে বোঝা গেল, তাঁর বক্তব্যে সেই হৃদয়বিদারী শেল নেই, যাতে শত্রুশিবির থরহরিকম্প হবে আর সমর্থকরা উজ্জীবিত। ফলে, এ বারে দলে যোগ দিয়েও বোধ হয় (তাঁর স্বামী রবার্ট বঢরা-র বিরুদ্ধে কেন্দ্রের তদন্তের কারণে?) ‘তুরুপের তাস’ হয়ে উঠতে পারলেন না। 

তবে কি বিজেপি/এনডিএ এ বার ফাঁকা মাঠে গোল দেবে? সেটাও বোধ হয় ঘটবে না। এবং এ ক্ষেত্রে কোনও কোনও সমীক্ষায় বিজেপিকে যে সংখ্যা দেওয়া হচ্ছে, তার চেয়ে কম করে ১৫-২০টি আসন কম পাওয়ার সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে, অন্তত এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে। দেশের নানা নির্বাচন-গবেষক ও প্রবীণ সাংবাদিক বন্ধুদের সঙ্গে বার বার কথা বলে এই ধারণা হয়েছে। এর মধ্যে দশটি বড় রাজ্যের ২২৪টি লোকসভা আসনের মধ্যে কংগ্রেস গত নির্বাচনে পেয়েছিল মাত্র ২৯টি আসন, ১২৯টি আসনে তারা দ্বিতীয় স্থানে ছিল। এই আসনগুলিতে যত বেশি সংখ্যায় দল প্রথম স্থানে উঠে আসতে পারবে, তার মধ্যেই নিহিত তার সাফল্যের চাবিকাঠি। 

কিন্তু এই যে বিজেপির বিরুদ্ধে জাতীয় দল হিসেবে কংগ্রেসকেই দেখার সাধারণ প্রবণতা, তার বাইরেই বোধ হয় এ বার মোদীকে আসল বেগ পেতে হবে, আঞ্চলিক দলগুলির কাছ থেকে। এ যেন মহাপরাক্রমী ‘গলিয়াথ’ বনাম অনেক ক’টি ‘ডেভিড’-এর লড়াই! দেশের আটটি বড় ও মাঝারি রাজ্যের ২৮৪টি আসনে বিজেপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী উত্তরপ্রদেশে এসপি-বিএসপি জোট, বিহারে আরজেডি, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস, ঝাড়খণ্ডে জেএমএম, ওড়িশায় বিজেডি, অন্ধ্রে টিডিপি, তেলঙ্গানায় টিআরএস, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে। 

এত শত প্রতিদ্বন্দ্বীর মাঝে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও যদি বিজেপি একক গরিষ্ঠ দল এবং এনডিএ সর্ববৃহৎ জোট হয়, তবে হয়তো রাষ্ট্রপতি তাদেরই সরকার গড়তে ডাকবেন। যদি ব্যবধানটা ১০-১৫ আসনের হয়, তবে সব ‘ম্যানেজ’ করে নমো-ই শেষ হাসি হাসবেন। যদি ব্যবধানটা ২৫-৩০ বা তার বেশি হয়? সেটা ২৩ মে-র পরবর্তী গল্প!  

বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক

ঋণ: আশিস রঞ্জন ও ভারত ভূষণ

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত