এবছর আষাঢ়ের প্রথম দিবস থেকেই দেশ জুড়ে কিছু কিছু বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বর্ষাকাল এখনও ঠিক  আসেনি, কিন্তু এই প্রারম্ভিক বৃষ্টির মধ্য দিয়ে হয়তো তার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। অথচ এই সে দিনও ভারতীয় আবহাওয়া দফতর বলছিল, এ-বছর বৃষ্টির প্রত্যাশিত পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় ৮৮%-এর নীচে থাকবে।, স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের ৯০%-এর কম বৃষ্টি হলেই দেশে খরার অবস্থা ঘোষণা করা হয়। সেই নিরিখে, আবহাওয়া দফতরের আশঙ্কা ছিল, ছ’বছর পরে দেশে আবার একটা অনাবৃষ্টির অবস্থা তৈরি হতে চলেছে। আগেকার যুগে আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাসকে বিশ্বাস করা তো যেতই না, জোর দিয়ে অবিশ্বাস করাও যেত না। দিনকাল বদলেছে। আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি জানার জন্য নানা আধুনিক যন্ত্রপাতি বসেছে। সামনে কম্পিউটার ও অন্তরীক্ষে স্যাটেলাইটের সাহায্য নিয়ে এখন আবহাওয়াবিদ যা বলেন, তা অক্ষরে অক্ষরে না হলেও মোটের ওপর মিলে যায়। অতএব আবহাওয়া দফতরের শঙ্কাটা এখনও পুরোপুরি ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না।
এ লেখা আবহাওয়া দফতরের সাফল্য-অসাফল্য নিয়ে নয়, বর্ষার পূর্বাভাস নিয়েও নয়। এ লেখা ভারতীয় অর্থনীতির বৃষ্টি-নির্ভরতা এবং এই ব্যাপারে সরকারি নীতির অক্ষমতা নিয়ে। আমরা জানি, বৃষ্টি না হলে কৃষির ক্ষতি হয়, ধান-গম-শাক-সব্জির দাম বাড়ে, বাজার থেকে এ সব যাঁদের কিনে খেতে হয় তাঁরা অসুবিধেয় পড়েন। বিশেষত গরিব মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে, যেহেতু খাবারের পেছনে তাঁদের আয়ের সিংহভাগ চলে যায়। খাবারের দাম বাড়লে মূল্য সূচক বাড়ে, ফলে মজুরিও বাড়ে। মজুরি বাড়লে আবার দাম বাড়ে। পরস্পরের গতির ওপর ভর করে দাম ও মজুরির একটা ঊর্ধগামী যাত্রা শুরু হয়।  মজুরি ও দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকলে মুনাফা অনিশ্চিত, ফলে বিনিয়োগ ব্যাহত হয়।

এর প্রতিকারের জন্য সরকারের এক বিপুল শস্যভাণ্ডার আছে।  ধান-গমের আকাল দেখা দিলে, সরকার যদি ভাণ্ডার থেকে কিছু বাড়তি শস্য বাজারে ছাড়ে, কিংবা বাজার থেকে স্বাভাবিকের তুলনায় কম পরিমাণ শস্য সংগ্রহ করে, বাজারে ঘাটতি কমবে, খাদ্যশস্যের দামেও একটা লাগাম পরানো যাবে। আমাদের অভিজ্ঞতা কিন্তু বলছে, ধান-গমের দাম স্থিতিশীল রাখার কাজটা সরকার করতে উঠতে পারছে না।

স্মরণীয়, ২০০৯-১০ সালে একটা খরা হয়েছিল যার ফলে ওই বছর কৃষিপণ্যের, বিশেষ করে খাদ্যশস্যের, উৎপাদন অনেকটা কমেছিল। আগের বছরের তুলনায়, মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে গিয়েছিল প্রায় সাত শতাংশ, তার মধ্যে আবার ধানের উৎপাদন কমেছিল দশ শতাংশ। এর ফলে সাংঘাতিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছিল। প্রশ্ন হল, এই মূল্যবৃদ্ধি আটকানোর জন্য সরকার তার ভাণ্ডার থেকে বাড়তি শস্য বাজারে ছেড়েছিল কি? ছাড়লে সরকারি ভাণ্ডারে মজুতের পরিমাণ নিশ্চয় কিছুটা কমত। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, ওই বছর সরকারি শস্য-ভাণ্ডারে মজুতের পরিমাণ কমেনি তো বটেই, উল্টে বেড়ে গিয়েছিল। যে সংগ্রহ-মূল্যে সরকার কৃষকদের কাছে শস্য কেনে সেটাও সে বছর অনেকটা বাড়ানো হয়েছিল। বাজারে জোগান বাড়াতে চাইলে তো সরকারের নিজস্ব সংগ্রহ-মূল্য কমানো উচিত, যাতে বিক্রেতাদের পক্ষে বাজারে বিক্রি অধিক লাভজনক হয়। তা হলে সংগ্রহমূল্য বাড়ানো হল কেন? অর্থাৎ ২০০৯-১০-এর অনাবৃষ্টির সময় সরকারি ভাণ্ডার থেকে যথেষ্ট পরিমাণে শস্য বাজারে ছেড়ে বা বাজার থেকে কম শস্য কিনে খাদ্যশস্যের দামের ওপরে লাগাম পরানোর কাজটা করা হয়নি। কেন হয়নি জানা দরকার, যেহেতু, আশঙ্কা হয়, অতীতের পুনরাবৃত্তি অদূর ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।

দুটো কারণের কথা ভাবতে পারি। প্রথমত, উৎপাদন ও বিক্রি কম হলে দাম বাড়ার মধ্য দিয়ে বাজার থেকে একটা স্বাভাবিক নিরাপত্তা কৃষকরা পেয়ে থাকেন। কৃষকের আয় শুধু কতটা পণ্য বিক্রি করছেন তার ওপর নির্ভর করে না, কী দামে বিক্রি করছেন তার ওপরেও নির্ভর করে। পণ্য বিক্রি করে যে টাকাটা কৃষকের ঘরে ঢুকছে সেটা পণ্যের দাম ও বিক্রীত পরিমাণের গুণফল। খরা হলে বিক্রীত শস্যের পরিমাণ কমছে, কিন্তু দাম বাড়ছে। গুণফল বাড়বে না কমবে? অর্থনীতির তত্ত্ব বলবে, সাধারণ ভাবে খাদ্যশস্যের দাম বাড়লেও চাহিদা তেমন একটা কমে না, যেহেতু বেঁচে থাকার জন্য তা অপরিহার্য। অন্য ভাবে বললে, কৃষিপণ্যের জোগান যদি কমে, চাহিদাকে কমে গিয়ে সেই কম জোগানের কাছে আসতে গেলে দাম অনেকটা বাড়তে হবে। অর্থাৎ অনাবৃষ্টিতে জোগান কমলে, বাজারে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে দাম বাড়বে অনুপাতে আরও অনেক বেশি। ফলে, দাম এবং বিক্রীত পরিমাণের গুণফলটি বেড়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভবনা। অর্থাৎ বিক্রি কম কিন্তু দাম বেশি, দুটো মেলালে কৃষকের আয় কমছে না, বাড়ছে। অবশ্য এখানে মাঝারি এবং বড় কৃষকদের আয়ের কথাই বলছি যাঁদের বাজারে পণ্য বিক্রির সামর্থ্য আছে। এ দেশের অধিকাংশ কৃষক পণ্য নিয়ে বাজার অব্দি পৌঁছতে পারেন না, ফড়ে-ব্যবসায়ী-মহাজনদের হাতে পূর্বনির্ধারিত দামে ফসল তুলে দিতে হয়। বাজারে দাম বাড়লে এঁদের তেমন লাভ নেই। আর, অসংখ্য ভূমিহীন কৃষিজীবীকে বাজার থেকে শস্য কিনে খেতে হয়। দাম বাড়লে এঁদের বিরাট ক্ষতি।

এ বার ধরা যাক, খরার বছরে সরকার তার ভাণ্ডার থেকে শস্য এনে বাজার ভরিয়ে দিল, ফলে বাজারে দামও তেমন বাড়ল না। দাম বাড়ল না অথচ কৃষকের হাতে বিক্রি করার মতো পণ্যও কম। এই অবস্থায় মাঝারি ও বড় কৃষকদের আয় কমবে। অতএব বলা যায়, অংশত মাঝারি ও বড় কৃষকদের আয় রক্ষা করতে গিয়েই সরকার খরার বছরে ভাণ্ডার থেকে শস্য বাজারে ছেড়ে খাদ্যশস্যের দামে লাগাম পরাতে পারছে না।

কিন্তু মাঝারি ও বড় কৃষকদের স্বার্থই তো শেষ কথা নয়। খাদ্যশস্যের মূল্যবৃদ্ধি যেহেতু দেশের কোটি-কোটি গরিব মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে, রাজনৈতিক কারণে তাকে যে-কোনও সরকারই নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করবে। ২০০৯-১০ সালের ক্ষমতাসীন সরকারও নিশ্চয় এর ব্যতিক্রম ছিল না। তা হলে খরার বছরে সরকারি শস্যভাণ্ডার আরও স্ফীত হল কেন? বিশেষ করে খরার বছরে কেন সংগ্রহ-মূল্য বাড়ানো হল তার একটা আলাদা ব্যাখ্যা দরকার। সব মিলিয়ে মনে হয়, দামের ওপর লাগাম পরাতে না পারার একটা দ্বিতীয় কারণও ছিল।

রেশন ব্যবস্থা চালানোর জন্য, সেনাবাহিনীকে খাওয়ানোর জন্য, সম্ভাব্য মহামারী-বন্যা-ভূমিকম্পের মতো জরুরি অবস্থার মোকাবিলার জন্য সরকারকে ফি বছর কিছু খাদ্যশস্য সংগ্রহ করতে হয়। ২০০৯-১০ সালে সরকারি ভাবে জানা ছিল যে একটা খরা আসতে চলেছে। খরা এলে বাজারে শস্যের দাম বাড়বে, তাই প্রয়োজনীয় শস্য-সংগ্রহ নিশ্চিত করার জন্য সংগ্রহ মূল্য বাড়াতে হল। ফলে বেসরকারি ব্যবসায়ীরা অনেকেই ভাবলেন, সরকার যখন বেশি দাম দিচ্ছে, বাজারে দাম কবে বাড়বে তার জন্য বসে না থেকে ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সরকারকেই ফসল বিক্রি করে দেওয়াটা নিরাপদ। তা ছাড়া কিছু বড় ব্যবসায়ী, যাঁরা বাজার থেকে একটা সময়ে মাল কিনে অন্য একটা সময়ে বিক্রি করেন, বাজার প্রথম থেকেই চড়া থাকায় মাল কেনার জন্য যথেষ্ট নগদ জোগাড় করে উঠতে পারলেন না। ফলে যে ফসলটা তাঁরা মজুত করে রাখতেন সেটাও সরকারের ঘরে গিয়ে উঠল। সব মিলিয়ে আরও স্ফীত হল খাদ্যশস্যের সরকারি ভাণ্ডার। পাশাপাশি, সরকার ভাণ্ডার থেকে কিছু পরিমাণে বাড়তি শস্য বাজারে ছাড়ল বটে, কিন্তু পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে খুব বেশি বাড়তি সরকারি শস্য বাজারে পৌঁছতে পারল না। ফলে এক দিকে ফুলে উঠল সরকারি ভাণ্ডার, অন্য দিকে বেলাগাম বাড়তে থাকল শস্যের দাম।

২০০৯-১০-এর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা বুঝলাম, কৃষি উৎপাদনে ছোটখাটো ঘাটতি হলে সরকারি ভাণ্ডার দিয়ে হয়তো সামাল দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু বড় ধরনের অনাবৃষ্টি হলে সরকারি বণ্টন ব্যবস্থাটাই বিপথগামী হয়ে পড়ে, তখন তাকে দিয়ে আর মূল্যবৃদ্ধি সামলানো যায় না। অনাবৃষ্টির প্রেক্ষিতে আমরা যা যা বললাম, অতিবৃষ্টির ক্ষেত্রেও সেগুলো প্রযোজ্য হবে।

এ বার উল্টো চিত্রটা কল্পনা করা যাক। ধরা যাক, যথাযথ বৃষ্টি হয়েছে। মাঠে মাঠে ফসল আর ধরছে না। তা হলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? অতি ফলন হলে আমরা দেখেছি দাম খুব পড়ে যায়, চাষের খরচ ওঠে না, কৃষককে আত্মহননের পথ বেছে নিতে হয়। সে আর এক হাহাকার। তখন বাজারে দাম ধরে রাখতে গেলে সরকারকে অনেক বেশি কিনতে হবে। তার জন্য টাকা চাই। টাকা না থাকলে ছাপাতে হবে। টাকা ছাপিয়ে শস্য কিনতে গেলে আবার মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যবৃদ্ধি। সরকারি গুদাম যেহেতু সংখ্যায় সীমিত, বাড়তি শস্য জমানোরও সীমা আছে। অর্থাৎ ফলন কম হলেও বিপদ, বেশি হলেও।

উভয়সঙ্কট থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় খাদ্যশস্যের ফলন নিয়ন্ত্রণে রাখা। এবং এটা স্বতঃসিদ্ধ যে, ফলন নিয়ন্ত্রণে রাখতে গেলে বৃষ্টিনির্ভরতা কমিয়ে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। ভারতীয় কৃষি দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মোট যত জমিতে খাদ্যশস্যের চাষ হয় তার অর্ধেকেরও বেশি, ৫২.২%, সেচহীন। এদের সেচের আওতায় আনার জন্য অবিলম্বে ভাবনা-চিন্তা দরকার। আশার কথা, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী এ প্রয়োজনের গুরুত্ব স্বীকার করেছেন।

 

ইন্ডিয়ান স্টাটিস্টিকাল ইনস্টিটিউট, কলকাতায় অর্থনীতির শিক্ষক