Advertisement
০১ মার্চ ২০২৪
গোমূত্রের উপকার টের পেতে হলে কতখানি বুদ্ধি থাকা চাই

অচেনাকে ভয় পান বলেই

রক্ষণশীল বলতে কাদের বোঝায়? এক কথায়, যাঁরা আধুনিকতার দিকে যে কোনও পরিবর্তনকে অপছন্দ করেন, তার বিরোধিতা করেন, তাঁরাই রক্ষণশীল।

অমিতাভ গুপ্ত
শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ০৬:০০
Share: Save:

গোমূত্র পান করলেই ফুসকুড়ি থেকে ক্যানসার, সবই নিরাময় হয়; ডারউইনের থিয়োরি আসলে ভাঁওতা, মানুষ মোটেও বাঁদর থেকে আসেনি; অথবা, ময়ূর ময়ূরীর মিলন হয় চোখের জলে— এই কথাগুলোর উৎস, বুঝতেই পারছেন, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, অথবা তার মতবাদে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠী। যাঁরা এই কথাগুলো বলছেন, তাঁদের বুদ্ধির গোড়ায় বুঝভম্বুল বলে এই নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের রাজনীতি করেন, না কি সেই রাজনীতির কারণেই তাঁদের বুদ্ধির এমন দশা? প্রশ্নটা নিশ্চয়ই কখনও না কখনও মনে এসেছে। গত কয়েক বছরে স্নায়ু-মনস্তত্ত্বের গবেষণা এই ধাঁধার উত্তর দিয়েছে। রহস্য না বাড়িয়ে উত্তরটা গোড়াতেই জানিয়ে দিই। গবেষণা বলছে, সামাজিক-রাজনৈতিক ভাবে যাঁরা রক্ষণশীল— ইউরোপ-আমেরিকার রাজনীতিতে যাঁদের ‘কনজার্ভেটিভ’ বলা হয়ে থাকে, ভারতের প্রেক্ষিতে হিন্দুত্ববাদীরা— তাঁদের গড় ইনটেলিজেন্স কোশেন্ট বা বুদ্ধ্যঙ্ক উদারপন্থীদের গড় বুদ্ধ্যঙ্কের তুলনায় তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে কম।

রক্ষণশীল বলতে কাদের বোঝায়? এক কথায়, যাঁরা আধুনিকতার দিকে যে কোনও পরিবর্তনকে অপছন্দ করেন, তার বিরোধিতা করেন, তাঁরাই রক্ষণশীল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষিতে যেমন রক্ষণশীলতা মোটের ওপর গর্ভপাতবিরোধী, কালো মানুষের সমানাধিকারে অবিশ্বাসী। ভারতে যাঁরা সর্বক্ষণ সনাতন সংস্কৃতির গায়ে আঁচড় লাগার ভয়ে তটস্থ, তাঁরা রক্ষণশীল। তাঁরা মেয়েদের জিন্‌স পরার বিরোধী, সমকামীদের অধিকারের বিরোধী— উত্তর ভারতের বাসিন্দা হলে ইদানীং তাঁরা অন্যদের আমিষ ভক্ষণেরও বিরোধী। গোমাংস হলে তো প্রশ্নই নেই। স্বীকার করা ভাল, মনস্তাত্ত্বিক গবেষণাটি ভারতের রক্ষণশীলদের নিয়ে হয়নি, হয়েছে পশ্চিমি দুনিয়ার লোকদের নিয়ে। কিন্তু, রক্ষণশীলতার চরিত্র দুনিয়া জুড়েই এত এক রকম, যে তার কারণ দেশবিশেষে খুব আলাদা হবে বলে বিশ্বাস হয় না।

ব্রিটেনের নাগরিকদের ওপর একটি গবেষণা হয়েছিল দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে। প্রথমে দশ-বারো বছর বয়সি স্কুলছাত্রদের বুদ্ধ্যঙ্ক মাপা হয়েছিল একেবারে প্রামাণ্য পদ্ধতিতে। তার কুড়ি বছর পর, ফিরে যাওয়া হয়েছিল তাদের কাছেই। তখন তাদের বয়স ত্রিশের কোঠায়। তখন মাপা হয়েছিল তাদের রাজনৈতিক মতবাদ— কে উদারপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী, কারা রক্ষণশীল। আরও এক দফা মাপা হয়েছিল বুদ্ধ্যঙ্ক। দেখা গিয়েছিল, ছোটবেলায় যাদের বুদ্ধ্যঙ্ক অন্যদের চেয়ে কম ছিল— মন্দ লোকরা যাদের বলত একটু বোকা গোছের, বড় হয়ে তারাই রক্ষণশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী হয়েছে। এবং, বড় হয়েও বুদ্ধ্যঙ্ক অন্যদের চেয়ে কমই আছে। এই হিসাব যদিও গড়ের। রক্ষণশীল হলেই তাঁর বুদ্ধ্যঙ্ক উদারপন্থীদের চেয়ে কম হবে, সেই নিশ্চয়তা নেই। দুনিয়ায় অনেক অতি বুদ্ধিমান রক্ষণশীল আছেন। একেবারে গাছগাম্বাট উদারপন্থীর সংখ্যা অবশ্য খুব বেশি নয়।

বুদ্ধ্যঙ্ক মাপার পদ্ধতিকে মানুষের বুদ্ধিবিচারের কাজে কতখানি গুরুত্ব দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে তর্ক আছে। তাতে ঢোকার প্রয়োজন নেই। যেহেতু প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই একই পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল, অতএব এটুকু নিশ্চিত যে সেই পরীক্ষায় কার কতখানি বুদ্ধি, তা যদি না-ও জানা যায়, কার বুদ্ধি কম আর কার বেশি, সেই তুলনামূলক ক্রমান্বয়টুকু পাওয়া যাবে। সেটাই যথেষ্ট। মোদ্দা কথা, রক্ষণশীলদের বুদ্ধ্যঙ্ক, অতএব বুদ্ধি, তুলনায় কম।

এই তথ্যটা ছিল জিগ্স পাজলের মাঝখানের খুঁজে না পাওয়া টুকরো। বুদ্ধির তারতম্যের তথ্যটি বসিয়ে নিলেই বোঝা যায়, কেন কেউ রক্ষণশীল রাজনীতিতে বিশ্বাসী হন। কিন্তু, সেই কথায় যাওয়ার আগে, আসুন, নিজেদের কাছে একটি শপথ করি— পাড়ার চায়ের দোকানের আড্ডায় যে খোকনবাবু প্রতি দিন মুসলমানদের গাল পাড়েন, তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করব না, বরং সহানুভূতিশীল হব। রক্ষণশীল হিন্দুত্ববাদী হওয়ার পিছনে যে বুদ্ধ্যঙ্কের ভূমিকা আছে, সে কথা ভুলে যাব না।

উদারপন্থী হওয়ার পূর্বশর্ত— মনের দরজা-জানালা খোলা রাখতে হয়। মুসলমানদের প্রতি গ্রহণশীল হতে গেলে গোড়ায় মুসলমানদের সঙ্গে মেলামেশা করতে হবে, উঁকি দিতে হবে তাদের অন্দরমহলে। নোবেলজয়ী মনস্তাত্ত্বিক ড্যানিয়েল কানেম্যান বলবেন, সে বড় কঠিন ব্যাপার। কানেম্যান লিখেছিলেন, মানুষের মাথার মধ্যে দুটো ভাগ আছে— একটা ভাগের নাম সিস্টেম ওয়ান, অন্যটা সিস্টেম টু। দুটো দু’রকম ভাবনার ব্যবস্থা। প্রথম ব্যবস্থায় ভাবনার জন্য বাড়তি কোনও পরিশ্রম করতে হয় না— দুই যোগ দুই দেখলে মন আপনা থেকেই বলে দেয়, উত্তরটা চার, তার জন্য আর বাড়তি চেষ্টার দরকার নেই। কিন্তু, ৩৭৮২-কে ৬৯৭ দিয়ে গুণ করতে বললে কাজে নামতে হবে সিস্টেম টু-কে। মাথা খাটিয়ে কষতে হবে। অন্য ভাবে বললে, যে ভাবনা মন নিজে থেকেই ভেবে নেয়, সেটা সিস্টেম ওয়ানের রাজত্ব; আর, যে ভাবনার জন্য মাথাকে ভাবাতে হয়, সেটা সিস্টেম টু-র এলাকা। মানুষের মন চরিত্রগত ভাবে অলস, আর সিস্টেম টু-কে কাজে লাগাতে গেলে পরিশ্রম করতে হয়। ফলে, সিস্টেম ওয়ানের ওপর ভরসা করে যত দূর যাওয়া যায়, মন তত দূরই যেতে চায়।

অচেনা কোনও জিনিসে যে বিপদের আশঙ্কা আছে, আদিম যুগের স্মৃতি থেকে সেই কথাটি আমাদের মগজে অনপনেয়। অচেনা জিনিস, ঘটনা বা লোক দেখলেই সিস্টেম ওয়ান বিপদসংকেত পাঠাতে থাকে। গড়পড়তা হিন্দুর কাছে মুসলমানরা যেহেতু অচেনা, তাঁদের ক্ষেত্রেও সিস্টেম ওয়ান বিপদসংকেত পাঠায়। আমেরিকার সাদাদের সিস্টেম ওয়ান যেমন পাঠায় কালো মানুষের সান্নিধ্যে এলে। যাঁদের বুদ্ধ্যঙ্ক কম, তাঁদের ঝামেলা হল, সিস্টেম টু-কে কাজে লাগানোর মতো শক্তি মগজে বেশির ভাগ সময়ই থাকে না, ফলে সিস্টেম ওয়ানের ওপর ভরসা করে বাঁচাই অভ্যাস হয়ে যায়। মুসলমান বা সমকামী বা কালো মানুষকে দেখলে সিস্টেম ওয়ান যে বিপদবার্তা পাঠায়, তাতে সাড়া দেওয়া ছাড়া এঁদের আর কিছু করার থাকে না।

অপেক্ষাকৃত বেশি বুদ্ধ্যঙ্কের মানুষরা সিস্টেম টু-কে কাজে লাগাতে পারেন। সিস্টেম ওয়ানের তাড়নাকে যুক্তি দিয়ে প্রতিহত করতে পারেন। রক্ষণশীল আর উদারবাদী রাজনীতির মূল ফারাক হল— রক্ষণশীলদের প্রায় সব অবস্থানই মানুষের আদিম প্রবৃত্তির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, আর উদারপন্থীদের অবস্থানের সঙ্গে আদিম প্রবৃত্তির বিরোধ বহু ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ। বুদ্ধ্যঙ্কের জোরে যাঁরা সিস্টেম ওয়ানের ওপর সিস্টেম টু-র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, আদিম প্রবৃত্তিকে হারাতে পারেন যুক্তির জোরে, তাঁরা উদারপন্থী অবস্থানে পৌঁছন। আর, বুদ্ধ্যঙ্কাল্পতায় ভোগা দুর্ভাগারা রক্ষণশীল থেকে যান। ‘নতুন’ ধারণা, ‘নতুন’ জিনিস, ‘নতুন’ লোক— সব কিছুতেই বিপন্ন বোধ করার মধ্য দিয়ে এগোতে থাকে রক্ষণশীল রাজনীতি।

আর এক গবেষণা বলছে, মানুষের মনে বিপন্নতার বোধটি যথেষ্ট জাগিয়ে দেওয়া গেলে রক্ষণশীলদের দিকে সমর্থন বাড়তে থাকে। কারণটা বোঝা কঠিন নয়— রক্ষণশীলতার সঙ্গে নিজের পরিচিত ঘেরাটোপে থাকতে পারার মানসিক আরামের যোগ অতি জোরদার। ফলে, বিপন্নতা তৈরি করতে পারলেই মানুষ সেই ঘেরাটোপে আশ্রয় খুঁজতে চায়, ফলে রক্ষণশীলদের দিকে ঝোঁকে। যারা আগে ততখানি রক্ষণশীল ছিল না, তারাও ক্রমে গোঁড়া হতে থাকে। ‘আজ ঠেকাতে না পারলে মুসলমানরা এসে হিন্দুদের ঘরের সব মেয়েকে তুলে নিয়ে যাবে’, অথবা ‘পাকিস্তানের হরেক অন্যায়ে ভারত বিপন্ন’— এই গোত্রের সব প্রচার গত বছর পাঁচেকে ভারতে কেন এতখানি বেড়়েছে, বোঝা কঠিন নয় মোটেই।

সেই সিস্টেম ওয়ানের খেলা। কিসের মধ্যে প্রকৃত বিপদ কতখানি, মগজ খাটিয়ে তা বিচার করার আলস্য বা অপারগতা। রক্ষণশীল মানেই কম বুদ্ধ্যঙ্ক, বা কম বুদ্ধ্যঙ্ক মানে রক্ষণশীল— এই সরলীকরণের মধ্যে না গিয়েও বলা চলে, বুদ্ধির বিচারে এক জন গড়পড়তা রক্ষণশীলের পক্ষে কোনও ক্লাসে, বা ক্লাবঘরে, বা তর্কে বা লোকসভায় সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নিতান্ত কম।

প্রশ্ন হল, তেমন সব লোকের হাতে দেশের হাল ছেড়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমানো ঠিক হবে কি?

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement

Share this article

CLOSE