Advertisement
২৩ এপ্রিল ২০২৪

উত্তর-পূর্ব ভারত ও ইনার লাইন

‘বেঙ্গল ইস্টার্ন ফ্রন্টেয়ার রেগুলেশনস’-এ ইনার লাইন বা অভ্যন্তরীণ রেখাকে নির্ধারণ করা হল। এতে ভর করে ভারতবর্ষের সীমান্ত নীতি তৈরি করা হল। লিখছেন গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়অরুণাচল, আসাম, মণিপুর, মেঘালায়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরাকে (পরে সিকিম অন্তর্ভুক্ত হয়) নিয়ে গঠিত বিরাট উত্তর পূর্ব ভারত।

ইনার লাইন পারমিট সংক্রান্ত আন্দোলন। মণিপুর। ফাইল ছবি

ইনার লাইন পারমিট সংক্রান্ত আন্দোলন। মণিপুর। ফাইল ছবি

শেষ আপডেট: ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ০০:১১
Share: Save:

৩৭০ ধারার বিলুপ্তির পরে সমর্থন এবং ক্ষোভের আবহে কয়েকটি প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। তেমনই একটি প্রশ্ন হল, তা হলে কি ইনার লাইন পারমিটও বিলুপ্তির পথে?

অরুণাচল, আসাম, মণিপুর, মেঘালায়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরাকে (পরে সিকিম অন্তর্ভুক্ত হয়) নিয়ে গঠিত বিরাট উত্তর পূর্ব ভারত। এলাকা প্রায় ২,৫৫,০৮৩ বর্গকিলোমিটার। ভারতের ৬৩৫টি জনজাতির মধ্যে ২১৩টি জনজাতি এখানে বসবাস করেন এবং ভারতের ১৬৫২টি ভাষার মধ্যে ৩২৫টি ভাষা বলা হয় এই উত্তর পূর্ব ভারতে।

উত্তর পূর্ব ভারতের জনজাতিদের প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি ‘হিল ট্রাইব’ অর্থাৎ যাঁরা পাহাড়ে বাস করেন এবং দ্বিতীয়টি ‘প্লেন্স ট্রাইব’, যাঁরা ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় এবং কাছাড়ের সমতল ভূমিতে বাস করেন। এই দুই জনজাতির ভাষা এবং সংস্কৃতি একদম আলাদা। গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া (১৯১৯)-এর ধারা এঁদেরকে অনুন্নত শ্রেণি হিসেবে অবিহিত করে, পরে ১৯৩৫ সালে তাঁদের নতুন নামকরণ করা হয় (এক্সক্লুডেড ক্লাস) এবং সব আদিবাসীদের এক প্রকার এক ঘরে করে দেওয়া হয়। এখন দেখে নেওয়া যাক এর ইতিহাস।

ফেব্রুয়ারি ১৮২৬ সালে (ইয়ান্ডাবো ট্রিটি, বার্মা এবং ব্রিটিশ এর মধ্যে) পুরো অসম রাজ্য ব্রিটিশের অধীনে আসে এবং বেঙ্গল প্রভিন্সের অন্তর্ভুক্ত হয়। মণিপুর ব্রিটিশের আশ্রিত রাজ্য হিসাবে পরিগণিত হয় এবং সব শেষে যুক্ত হয় কাছাড়, ১৪ অগস্ট ১৮৩২ সালে। অহম সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে, পাহাড়ের বিভিন্ন উপজাতিরা সমতলে এসে লুটপাঠ শুরু করে বলে অভিযোগ উঠতে থাকে।

আঙ্গামিজ উপজাতি যারা দক্ষিণ-নাগা পর্বতমালায় বাস করত এবং জেলিয়াংরংস যাঁরা দক্ষিণ-পশ্চিমে থাকত তারা উত্তর কাছাড়ের সমতলভূমিতে ব্যবসা করার জন্য আসতে শুরু করে এবং ক্রমে তারা অসমের নগাঁও পর্যন্ত পৌঁছে যায়। কিন্তু দেখা গেল এই আদিবাসীরা, বাণিজ্য ছাড়াও মাঝে মাঝেই ‘হেড হান্টিং’, অপহরণ এবং ক্রীতদাস প্রথাতে (সিলেট অঞ্চলে এটি লাভজনক ব্যবসা ছিল) মেতে উঠল। এই সব অপরাধ বন্ধ করার জন্য, আসালু (উত্তর কাছাড় জেলা) অঞ্চলে বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ চৌকি বসানো হল কিন্তু তাতেও এই জনজাতিদের আটকানো গেল না। ১৮৫৪-১৮৬৫ সালের মধ্যে ১৯ বার আঙ্গামিজ উপজাতি ব্রিটিশদের আক্রমণ করে, যাতে ২৩২ জন ব্রিটিশ নাগরিক মারা যান। এ ছাড়াও, ১৮৫৪ সালে তারা (১৩০ কিলোমিটার ভিতরে এসে) কাছাড়ের ‘বালাধন’ চা বাগান আক্রমণ করে ম্যানেজার ব্লিথ এবং ১৬ জন কুলিকে মেরে বাগানে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। এর ফলে, ১৮৭০ সাল নাগাদ অসমের সমতলভূমি ছেড়ে পাহাড়ের উপজাতির উপরে ব্রিটিশেরা আক্রমণ শুরু করে আধিপত্য স্থাপনের জন্য। ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক কৌশল এবং রণনীতির সামনে আদিবাসীরা পিছনে হাঁটতে বাধ্য হয়। ব্রিটিশেরা ধীরে ধীরে ৪১টি চা বাগান ও ২২টি রিজার্ভ ফরেস্ট নিজেদের দখলে নিয়ে অসম বেঙ্গল রেলওয়ে লাইন বসানোর ভাবনাও শুরু করে দেয়। ১৮৬০, ১৮৭০ এবং ১৮৯৮ সালের মধ্যে কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার জনজাতির জমি অসমের অন্তর্ভুক্তি করে ব্রিটিশরা বস্তুত তাদের কোণঠাসা করে ফেলে এবং নিজেদের সুবিধামত ইনার লাইন বা ডিস্ট্রিক বাউন্ডারি করতে শুরু করে দেয় ।

শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্রিটিশরা জনজাতিদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে এবং তাদের উপরে কর বসানো শুরু করে। কিন্তু অচিরেই ব্রিটিশরা বুঝতে পারল যে এই সংঘর্ষের এক স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন একটি পরিপূর্ণ নীতি। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশেরা এটাও উপলব্ধি করল যে জনজাতিদের নিজস্ব অনেক সমস্যা আছে সুতরাং সর্বসাধারণের জন্য যে নিয়ম সেটি মোটেই এদের ওপর লাগু করা যাবে না। তাদের সমাজ ব্যবস্থা, বিভিন্ন রকম আচার-উপাচার এবং তাদের ধর্ম বা প্রথা এই সাধারণ আইনের পরিপন্থী। নানাবিধ সমস্যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে এই আদিবাসীদের মনেও একটা অসন্তোষ দানা বেঁধেছিল যা আগে বিপ্লবের আকার নিয়েছিল (১৮৩১ সালে সিংভূমে (হস) এবং ১৮৪৬ সালে খন্ডসের বিদ্রোহ)। অবশেষে বলা হয়, উপজাতি সংরক্ষণের কথা মাথায় রেখে তাদের জন্য বিশেষ ‘নন রেগুলেশন’ বা বিধি নিয়মহীন এলাকা স্থাপনের মাধ্যমে কিছু সরল নিয়মাবলী তৈরি করা হল এবং সরাসরি তাদের ডেপুটি কমিশনের অধীনে রাখার সিধান্ত নেওয়া হল। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল যে ১৮৩৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহেরও একই ভাবে সমাধান করা হয়।

এ ভাবেই উৎপত্তি হল ‘বেঙ্গল ইস্টার্ন ফ্রন্টেয়ার রেগুলেশনস’ (রেগুলেশন নম্বর ফাইভ অফ ১৮৭৩) এবং যার অধীনে ইনার লাইন বা অভ্যন্তরীণ রেখাকে নির্ধারণ করা হল। এটি মূলত প্রশাসনিক পদক্ষেপ ছিল যাতে ভর করে ভারতবর্ষের সীমান্ত নীতি তৈরি করা হল। পাহাড়ের উপজাতি এবং সমতলভূমির মানুষেরা যাতে নিরাপদে থাকতে পারে সেটাই ছিল ব্রিটিশদের মুখ্য উদ্দেশ্য। যদিও অনেক ভারতবাসী এই নীতিকে দুর্ভাগ্যজনক এবং দুরভিসন্ধিমূলক বলে মনে করেন। তাঁদের মতে এটি ছিল পাহাড়ের মানুষদের সমতল থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার একটি প্রয়াস।

১৯১০ সালে, বেঙ্গল প্রভিন্স -এর লেফটেন্যান্ট গভর্নর ল্যান্সেলেট হেয়ার বললেন, “আমাদের এক ইনার লাইন (আইএল) এবং একটি আউটার লাইন (ওএল) আছে। যেখানে আইএল পর্যন্ত আমরা সাধারণ প্রশাসনিক নিয়মে চলি কিন্তু আইএল এবং ওএল দু’টিই রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে চালাই। এর অর্থ হল, আমাদের রাজনৈতিক অফিসারেরা একটি বাঁধনমুক্ত এবং কখনও বা শিথিল বিচার ব্যবস্থা অবলম্বন করে। এবং সীমান্তবাসী উপজাতিদের থেকে যাতে সবরকম ঝামেলা এড়ানো যায় তার জন্যই আমাদের নাগরিকদের একটি অনুমতিপত্র প্রয়োজন হবে যদি তারা ইনার লাইন অতিক্রম করতে চায়।”

লেখক: প্রাক্তন অধ্যক্ষ, বিধানচন্দ্র কলেজ আসানসোল

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

অন্য বিষয়গুলি:

North East India Inner Line Permit
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE