Advertisement
E-Paper

তুই এখন বড়ি ছুঁস না যেন!

নিতান্তই সহজ জৈবিক নিয়মের যে প্রক্রিয়া— পিরিয়ডস, ‘শরীর খারাপের’ সংস্কারে কী প্রবল আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা জীবনের নানান অনুষঙ্গে, তার খোঁজ নিচ্ছেন জিনাত রেহেনা ইসলামনিতান্তই সহজ জৈবিক নিয়মের যে প্রক্রিয়া— পিরিয়ডস, ‘শরীর খারাপের’ সংস্কারে কী প্রবল আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা জীবনের নানান অনুষঙ্গে

শেষ আপডেট: ১৬ মার্চ ২০১৯ ০৫:৫৯

তিনি এক কলেজের অধ্যক্ষ। বিয়ের দিন জীববিজ্ঞানে গবেষণারত বৌমাকে সতর্ক করেন ‘‘বাবুকে কিন্তু রাতে বিরক্ত করবে না। তোমার পিরিয়ডস চলছে।’’ পরিবারের একমাত্র ছেলে ‘বাবু’ বহুজাতিক সংস্থার ইঞ্জিনিয়র। এমন শিক্ষিত শাশুমা ঠিক সংখ্যায় ক’জন আছেন কেউ জানেন না। এ একান্ত অন্দরমহলের গোপন কথা। এখানে ক্যামেরা নেই। লাইট নেই। অ্যাকসনও নেই। আছে লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া কিছু হার মেনে নেওয়া মুখ।

যাঁদের স্পর্ধা শুধু ‘বাপের বাড়ি’ এসে নিজের মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলা। তার পর আর পাঁচটা অপমানের মত এই গ্লানিকে হজম করে নেওয়া। কিন্তু পিরিয়ডস তো একটি বায়োলিজিক্যাল ফ্যাক্টস। কোনও ধর্মীয় আদেশ, বা সাংস্কৃতিক বিজ্ঞাপণ নয়। তবে সেই রক্তাক্ত বৃত্তের কম্পাসে শুধুই এ সবের হাঁকডাক কেন? মিথোলজিক্যাল বিন্দু ধরেই কি চলবে অনন্তকাল প্রদক্ষিণ? মেয়েরা মহাকাশে চলে যায়। বিশেষ এক সময় ঠাকুরঘর কিন্তু মাড়ায় না। আচারে হাত দেয় না। অঞ্জলি বারণ। দেশের কিছু প্রান্তে মেয়েরা পায় নির্বাসনের জীবন। ঘরের বাইরে দিন কয়েকের জন্য ছুড়ে ফেলা হয়। পরিবারের বিরাট কর্মকান্ডের বাইরে আস্ত এক ‘মেয়ে’মানুষকে।

‘বন্ধ দরজা’ নীতির ভেতরে অশুদ্ধ ভাইরাস। ছোঁয়াছুঁয়ির এই খেলায় মূক, বধিরের মত জড়িয়ে সকলে। তবু উড়ছে মেয়ের স্বপ্নের ঘুড়ি। দমে যাচ্ছে আকাঙ্ক্ষার লাটাই। অবুও মৃত্যুহীন বিশ্বাস মেয়েদের। সবার এক ঈশ্বর! জিত হাসিলের তিনিই নায়ক। হালেই রাইখ জিতাবিচের ডকুফিল্মের অস্কার। ‘পিরিওডস-দ্য এন্ড অফ সেন্টেন্স’ কি সত্যিই শেষ লাইনের আঁচড় টানবে? নাকি পিরিয়ডসের সময় আরোপিত ‘সামাজিক সাজা’র বদল আনবে? উত্তরপ্রদেশের হাপুর গ্রাম নিয়ে তৈরি তথ্যচিত্র কি সত্যি মেয়েদের মুকুটে জুড়ে দেবে নতুন মুক্তির পালক? নিজেদের সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে কি মেয়েরা আবার আবিষ্কার করে ফেলবে এক অর্থনৈতিক স্বাধিকারের পথ? পিরিয়ডসের গ্লানি থেকে মুখ তুলে হাসতে পারবে কি কিশোরী? সংস্কার নাকি বিজ্ঞান? মেয়েদের সত্যিকারের ‘ফ্লাই’- ব্রান্ড ধারণ করার অপেক্ষা কতদিন!

একটি সভ্য দেশের এক দল কিশোরী বিদ্যালয়ে যায় অদৃষ্টের ভরসায়। তারা জানে না তাদের কখন মেনার্ক (আদ্যঋতু) শুরু হবে। আর হলে সে কি করবে? সে বিষয়ের কোনও ম্যানেজমেন্ট তার জানা নেই। বাড়িতে থাকলে গৃহবন্দি, অন্যত্র থাকলে পথবন্দি। সামাজিক ও চিকিৎসার দৃষ্টিকোণ থেকে মেনার্ক একটি মুখ্য ঘটনা। কেন না, এটি গর্ভধারণের সক্ষমতার সঙ্কেত। এক ফিমেলের মা হয়ে ওঠার সম্ভাবনার প্রথম সিঁড়ি। মেয়েদের বিভিন্ন বয়সে মেনার্কের অভিজ্ঞতা হতে পারে। একটি গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, ইস্তানবুল, তুরস্কের মেয়েদের মেনার্কের গড় বয়স ১২.৭৪ থেকে ১৪ বছর । এই কম বয়সি মেয়েদের উপর নিজের এমন এক দায়িত্ব নেওয়ার ভার এসে পড়ে, যে বিষয়ে তাঁর হাতে নেই তথ্য ও উপকরণ। আছে আতঙ্ক আর মুখ ভরা লজ্জা। পরিবারে নেই আগাম কোনও সতর্কতা। নেই খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর পাতের আয়োজন। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে নেই ভেন্ডিং মেশিন। নেই জল ও পৃথক বাথরুমের ব্যাবস্থা। পিরিয়ডকালীন ব্যবহারের অনুকুল টয়লেট। ঘটনার আকস্মিকতায় শুধু কপাল চাপড়ানো, এ বার কি হবে? ইউনিফর্মে দাগ পড়ে গেলে আর রক্ষা নেই! যে স্কুলের মাঠটায় প্রতি দিন খেলা আর হইহই চলে। আজ সেটা লজ্জা আর অপরাধবোধের ছায়াপথ। বিজ্ঞানের ভাষায় সদ্য ‘সাবালিকা’ হয়ে ওঠা মেয়ে নিজেকে মায়ের আঁচলের আড়াল করতে ব্যস্ত। সে বুঝে ফেলেছে জীবনের সবচেয়ে বড় লজ্জা পাওয়ার দিন এসে গিয়েছে। জামায় লাল দাগ দেখে ফেলা মানেই দেহ থেকে প্রাণপাখী উড়ে যাওয়া। অপমানে মরে যাওয়া। সেটা গোপন রাখতে কিশোরী মরিয়া। ঘরে ফিরে বাবা-কাকা থেকে নিজেকে লুকিয়ে চলা। এ এক বিরাট চাপের কাজ। যা প্রাকৃতিক ও বাস্তব, তার মাথা মুড়ে কালো পোশাক পরিয়ে ঢেকে দেওয়া। সত্যের সাথে লুকোচুরি। নৈতিকতার প্রলেপ দিয়ে ‘অন্তরাল’ উদযাপনের মহত্ত্ব বজায় রাখা। ‘শরীর খারাপ’ বা অসুস্থতার সঙ্গে পিরিয়ডসকে গুলিয়ে ফেলে এ নব্য অপলাপের জন্ম দেওয়া।

এক দল কিশোর ‘পিরিয়ডস’ শব্দ শুনে আকাশ থেকে পড়ে। একটু শহরের দিকের ছেলেরা পিরিয়ডস মানে গোপনীয় মেয়েলি ব্যাপার বোঝে। সেখানে তার সহযোগিতা ঠিক কি ধরনের হতে পারে, তা নিয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই। এক মাত্র হেসে যাওয়া বা মাথা নীচু করে লজ্জা পাওয়া ছাড়া অন্য কিছুর কথা সে শেখেনি। অন্য দিকে পিরিয়ডস-এর সময় মেয়েদের ওপর নেমে আসে নানা বিধিনিষেধ। ঠাকুর ঘর থেকে রান্নাঘর—এক লক্ষণরেখায় বেঁধে দেওয়া হয় চলাফেরা। খেলতে যাওয়া, স্নান করা, স্কুলে যাওয়া, বাইরের কোনও অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া বারণ। দিন চারেক পর মাথায় শ্যাম্পু দিয়ে চলে শুদ্ধ হওয়ার রেওয়াজ। প্যাডের খরচ কমাতে অনেক পরিবারে পুরান ব্যবহৃত কাপড় দিয়ে কাজ চালানো হয়। প্রকাশ্যে প্যাড কেনার ঝামেলা একটি সমস্যা। তারপর তা লুকোতে লুকোতে রাস্তা দিয়ে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসা আরেক হ্যাপা। তার পর তা পরিবারের সবার চোখ এড়িয়ে লুকিয়ে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। সবশেষে বাড়ির বাইরে ব্যাবহৃত প্যাড ফেলতে যাওয়া মানে এক কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। এই সাত দিনের ‘ঘেরাও’ এর জীবনে মেলে না কোনও নতুন বার্তা। দেওয়া হয় না কোনও আলাদা অ্যাটেনসন। পিরিওডসের সময় স্কুল না গিয়ে শুয়ে থাকতেই পরামর্শ দেওয়া হয় ঘরের মেয়েদের। বারণ করা হয় টক জাতীয় কিছু খেতে। চুল খুলে না রাখতে। এনে দেওয়া হয় পেটে ব্যাথার জন্য হোমিওপ্যাথিক ওষুধ। খাওয়া দাওয়ার প্রতি কোনও আলাদা যত্ন নেওয়া হয় না। শুধু গোপনিয়তা রক্ষায় দেওয়া হয় উৎসাহ। ৭২ বছরের জুবেদা বলেন, ‘‘আমাদের তো বড়ি দেওয়ার সময় হাত লাগাতে দেওয়া হত না ‘শরীর খারাপে’র জন্য বড়ি নষ্ট হয়ে যাবে বলা হত। এমনকি আচার, পাপড় নষ্ট হয়ে যাবে বলে বয়াম থেকে দূরে থাকতে বলা হত।’’ সাকিনা বিবি বলেন, ‘‘পিরিয়ডসের কাপড় বাইরে জঙ্গলের দিকে অনেক রাতে মেলে দিতাম। ভয় লাগত সাপ, শেয়াল যদি হেঁটে যায়! যদি কোনও রোগ হয়! সাত দিন পর মাথা মাটি দিয়ে পরিষ্কার করে বিছানা ধুয়ে তবে রেহাই পেতাম।’’ এখন এসেছে ন্যাপকিন। মেয়েরা কাজে যাচ্ছে সারা মাস বাইরে। সুরক্ষা ও সাহস দুই’ই অর্জন করেছে। কিন্তু পরিবারের আচরণে কি বদল এসেছে?

জুবেদার পুত্রবধূ চামেলি নির্দ্বিধায় জানান, ‘‘না না ভিড়তে না দেওয়ার রেওয়াজ এখনও চালু আছে। বড়ি দেওয়ার সময় বাড়ির সকলের সামনেই জানান দেওয়া হয়, ‘এই ! তুই এখানে আসবি না’ বলে।’’ যাকে বারণ করা হয়েছে তার ‘শরীর খারাপ নামের অশৌচ বা অপবিত্র অবস্থা চলছে বুঝে নিতে হয় তখন। পিরিয়ডসকে এক মেয়ের আত্মমর্যাদা ও বিশ্বাসের সাথে বেঁধে দেওয়া চলে এ ভাবেই। ভয়, অপরাধবোধ, অভিঘাত না অনুভব করলে যেন ‘প্রকৃত’ মেয়ে হয়ে ওঠা যায় না। আরোপিত কে সহজাত স্বীকৃতি দেওয়ার এই প্রক্রিয়া চলছেই।

শিক্ষিকা

Society Periods Woman Taboo
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy