কোনও প্রকল্পের মূল্য তত ক্ষণ প্রমাণিত হবে না, যত ক্ষণ না সেই প্রকল্পটি সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করা যায়। ভারতবর্ষের মতো বৈচিত্রপূর্ণ দেশে নানা ধরনের আইন পাশ করা হয়, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা করা হয়, কিন্তু তার সার্থক প্রয়োগ কতটা হয়? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা রাজনৈতিক মেরুকরণে আবদ্ধ হয়ে থাকি। বৃহৎ স্বার্থের দিকে না তাকিয়ে দলীয় স্বার্থটাই বড় হয়ে যায়। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তৈরি হয় হিংসার ছবি। ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে মত্ত হয়ে যাই আমরা। জ্বলন্ত সামাজিক সমস্যাগুলো হয়ে যায় উপেক্ষিত।

বর্তমানে বর্জ্য প্লাস্টিক পরিবেশের পক্ষে ভয়ঙ্কর ভাবে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকার মাধ্যমে আমরা এখন অবগত হয়েছি এই বর্জ্য প্লাস্টিকের অপকারিতা সম্বন্ধে। বিশেষ করে আমাদের প্রিয় শহর কলকাতার পরিস্থিতি একেবারেই ভাল নয়। বর্তমানে শহরে কঠিন বর্জ্য পদার্থকে কম্প্যাক্টর-এর মাধ্যমে আয়তনে ছোট করে ধাপা এবং গার্ডেনরিচের নিচু জমিতে ফেলা হয়। সেই কঠিন বর্জ্য পদার্থের কিছু অংশ পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং বাকি অংশ প্রাকৃতিক নিয়মে রূপান্তরিত হয় বিভিন্ন জৈব এবং অজৈব পদার্থে। কলকাতা শহরের কঠিন বর্জ্য ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে, কঠিন বর্জ্য ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে কলকাতা শহরে এই পদ্ধতি আর বেশি দিন চলবে না। তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হল স্থানাভাব। কলকাতা শহরের ধাপাতে প্রতি দিন প্রায় চার থেকে সাড়ে চার হাজার টন কঠিন বর্জ্য ফেলা হয়। তার মধ্যে পনেরো থেকে কুড়ি শতাংশ থাকে প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থ। আমরা জানি এই প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থ সহজে নষ্ট করা যায় না। একে একমাত্র পাইরোলাইসিস পদ্ধতিতে অর্থাৎ অক্সিজেনের অভাবে ৭০০ থেকে ৮০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে উত্তপ্ত করলে এর থেকে খনিজ তেল এবং বিদ্যুৎ তৈরি করা সম্ভব হয়। এই ধরনের প্লান্ট তৈরি করার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা নিয়েছে দিল্লি। দিল্লিতে কিছু কিছু মিউনিসিপ্যালিটিতে এই ধরনের প্লান্ট ব্যবহার করে বিদ্যুৎ তৈরি করা হচ্ছে। কলকাতা শহরের ক্ষেত্রে এই ধরনের প্লান্ট এখনও পর্যন্ত তৈরি করা হয়নি। ২০১৩ সালে এক বার উদ্যোগ করা হয়, কিন্তু মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায় অর্থনৈতিক পরিকাঠামো। কলকাতা শহরে কঠিন বর্জ্য পদার্থের ক্ষেত্রে উৎস থেকে পৃথকীকরণ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয় না, ফলে এই ধরনের প্লান্ট তৈরি করতে গেলে বিশাল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে শুধুমাত্র পৃথকীকরণের জন্য।

কঠিন বর্জ্যের ব্যবস্থাপনায় স্থানাভাব প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে কলকাতা পুরসভার এলাকায়। পাশাপাশি প্লাস্টিক জাতীয় পদার্থ ক্রমশ মিশছে আমাদের মাটিতে এবং নিকাশি খালগুলোতে। শুধু তা-ই নয়, তা দিনের পর দিন ক্ষতি করে চলছে আমাদের নিকাশি ব্যবস্থার। মাননীয় ফিরহাদ হাকিম মেয়র হওয়ার পরে উৎস থেকে জঞ্জাল পৃথকীকরণের পদ্ধতি চালু করার চেষ্টা করেন। কলকাতার বিধাননগরে এবং চেতলা ৮২ নম্বর ওয়ার্ডে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে এই পদ্ধতি চালু করার কথা বলেন তিনি, কিন্তু চেতলা ৮২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রকল্পের বিভিন্ন হোর্ডিং লাগানো হলেও তা এখনও সম্পূর্ণরূপে চালু হয়নি। কলকাতায় জঞ্জাল পৃথকীকরণ পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভাবে চালু করতে না পারলে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো কোনও মতেই করা সম্ভব নয়।

ইউরোপের দেশগুলো সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট-এর ক্ষেত্রে বিস্তর এগিয়ে গিয়েছে। জঞ্জাল পৃথকীকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন জৈব এবং অজৈব বর্জ্যকে প্রথমে আলাদা করে ফেলে সেই বর্জ্য পদার্থ থেকে জৈব সার, খনিজ তেল এবং বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে সক্ষম হয়েছে তারা। এই জায়গায় পৌঁছতে তারা প্রযুক্তি এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে বিচার করেছে, কারণ উৎস থেকে বর্জ্য 

পদার্থ পৃথকীকরণ পদ্ধতিতে নাগরিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের নাগরিকদের সচেতন করার উদ্দেশ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রাথমিক শিক্ষা স্তর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রচার চালানো হয়। শুধু তা-ই নয়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে ব্যবহার করে দেশের নাগরিকদের সচেতন করা হয়। লন্ডন কর্পোরেশনে দেখেছি তারা নাগরিকদের সহযোগিতা করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ‘অ্যাপ’ ব্যবহার করে। 

শহরে কোনও জায়গায় নোংরা পড়ে থাকলে তার ছবি তুলে ওই অ্যাপ-এর মাধ্যমে জানালে সংশ্লিষ্ট দফতর সঙ্গে সঙ্গে তার ব্যবস্থা করে। কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গকে বাঁচাতে গেলে আমাদেরও এ বিষয়ে উদ্যোগী হতেই হবে।