আরও একটা ফাঁসি, মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আবার এক রাউন্ড বিতর্ক। পক্ষে ও বিপক্ষে অনেক বার শোনা সওয়াল-জবাব আর এক বার শুনে নেওয়া। তর্ক, পুনরাবৃত্ত হলেও, উপকারী। চিত্‌কার ও চালাকির মাত্রা বেশি হলে বিরক্ত লাগে বটে, কিন্তু জল বাদ দিয়ে দুধটা ছেঁকে নিতে পারলে দু’তরফের যুক্তি এবং প্রতিযুক্তিগুলিকে নতুন করে যাচাই করে নেওয়ার সুযোগ মেলে।

মৃত্যুদণ্ডের অনুকূলে যাঁরা, তাঁরা সাধারণত দু’ধরনের যুক্তি দিয়ে থাকেন। একটা যুক্তি ব্যবহারিক, আর একটা যুক্তি নৈতিক। ব্যবহারিক যুক্তি এই যে, মৃত্যুদণ্ডের ভয়ে অপরাধীরা নিরস্ত হয়, ফলে অপরাধ কমে। এটা সেই রকম একটা কথা, যা শুনলেই মনে হয়, হ্যাঁ, ঠিকই তো। মুশকিল হল, যুক্তি তো গানের সুর নয় যে, কানে ঠিক শোনালেই তাকে ঠিক বলে মেনে নেওয়া চলে। প্রমাণ চাই। প্রমাণের উপায় কী? যেখানে মৃত্যুদণ্ড, সেখানে কম অপরাধ, এমনটা দেখাতে পারলেই হয়? কিংবা যদি দেখানো যায় যে, একই জায়গায় মৃত্যুদণ্ড চালু করার ফলে অপরাধ কমেছে অথবা মৃত্যুদণ্ড রদ করার ফলে অপরাধ বেড়েছে, তা হলেই উপপাদ্য প্রমাণিত?

দুটো সমস্যা আছে। প্রথমত, এ বিষয়ে নানা দেশে বিভিন্ন সময়ে অনেক রকম গবেষণা হয়েছে, কিন্তু এক একটার ফল এক এক রকম। দ্বিতীয়ত, যদি সব সময়ে সব জায়গায় মৃত্যুদণ্ড ও অপরাধের বিপরীত সম্পর্ক দেখা যেত, তা হলেও কার্যকারণসূত্র প্রমাণিত হত না, কারণ অপরাধ কেবল দণ্ডের উপর নির্ভর করে না, আরও হাজারটা কারণে বাড়ে বা কমে অথবা একই থাকে। সুতরাং প্রমাণ যে কেবল মেলেনি তা-ই নয়, প্রমাণ অসম্ভব।

মৃত্যুদণ্ডবাদীরা বলবেন, একই যুক্তিতে তাঁদের কথা ভুল প্রমাণ করাও তো অসম্ভব, মৃত্যুদণ্ডের ভয়ে হয়তো সত্যিই অপরাধ কমে, কিন্তু অনেক সময়েই আর পাঁচটা কারণে সেই সুফল ধরা পড়ে না। ঠিক। মৃত্যুদণ্ডের পক্ষেই হোক বা বিপক্ষে, অপরাধ নিবারণের ব্যবহারিক যুক্তিটা প্রমাণের কোনও উপায়ই নেই। অতএব সেটি আসলে ব্যবহারের অযোগ্য। মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিতর্কে অপরাধ ও শাস্তি বিষয়ক দিস্তে দিস্তে পরিসংখ্যান নিয়ে ধস্তাধস্তি করে লাভ নেই।

নৈতিক যুক্তি, স্বভাবতই, অনেক বেশি জটিল। এবং নৈতিকতা বিভিন্ন ধরনের, বিভিন্ন মাত্রার হতে পারে। তবে নীতির দিক থেকে মৃত্যুদণ্ডের সমর্থকদের প্রধান প্রতিপাদ্য এই যে, অপরাধের নৃশংসতা একটা মাত্রা ছাড়ালে অপরাধী তার বেঁচে থাকার নৈতিক অধিকার হারায়। এই অভিমতের পিছনে থাকে আর একটি ধারণা: এ ধরনের পৈশাচিক অপরাধের পরেও যদি অপরাধীকে বাঁচতে দেওয়া হয়, তা হলে অপরাধ এবং শাস্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় না, ন্যায়বিচার ‘ক্লোজার’ বা সম্পূর্ণতা পায় না। ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ, খতিয়ে দেখা দরকার। খতিয়ে দেখা মানে প্রশ্ন করা।

প্রথম প্রশ্ন: ‘বেঁচে থাকার নৈতিক অধিকার’ কথাটার মানে কী? এই অধিকার কোথা থেকে আসে? তা কি শর্তাধীন? কী তার শর্ত? উত্তরটা বিশ্বাসনির্ভর। মৃত্যুদণ্ডের সমর্থক এক রকম উত্তর বিশ্বাস করেন, বিরোধী আর এক রকম। এমনকী দুটো বিপরীত বিশ্বাস থেকে বিরোধিতা সম্ভব। কেউ বলতে পারেন, নৃশংস অপরাধীর ‘মরে যাওয়ার নৈতিক অধিকার নেই’, তাকে হত্যা করে নয়, যত দিন সম্ভব বাঁচিয়ে রেখে যথোপযুক্ত শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে চলাই তার যোগ্য শাস্তি। মৃত্যুদণ্ডবাদীরাও অনেকে হয়তো মনে মনে সেটা চান, অন্তত তাঁরা যে তীব্র উচ্চারণে রাজপথে প্রকাশ্যে ফাঁসির আয়োজনে ফিরে যাওয়ার জন্য সওয়াল করেন, তাতে তেমনটাই মনে হয়। কিন্তু যুগটা অন্য রকম, অপরাধীরও নাকি আবার মানবাধিকার আছে, তাই ওঁরা অগত্যা একটা আপস করেন: নখগুলো যখন একটা একটা করে ওপড়ানো যাবে না, তখন, ঠিক আছে, ঝুলিয়েই দাও বরং।

আবার, কেউ বলতে পারেন, একটা মানুষ বেঁচে থাকার নৈতিক অধিকার হারালেই অমনি তাকে মেরে ফেলতে হবে কেন? বরং কঠোর অনুশাসনের পথে তাকে সংশোধন করা দরকার, যাতে সেই অধিকার সে ফিরে পায়। সংশোধনের কথা শুনলেই মৃত্যুদণ্ডবাদীরা ইদানীং ভয়ানক ক্রুদ্ধ হয়ে উঠছেন। কিন্তু রাগারাগি না করে তাঁরা দুটি কথা ভেবে দেখতে পারেন। এক, আমাদের বিচারব্যবস্থায় শাস্তি ব্যাপারটাকে সংশোধনের প্রকরণ হিসেবেই স্বীকার করা হয়েছে, যে কারণে এখন জেলকে বলে সংশোধনাগার। মৃত্যুদণ্ডে সংশোধনের কোনও অবকাশ নেই, সুতরাং এই দণ্ডটি গোটা বিচারধারায় ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম থাকতেই পারে, পাণিনিও তা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু ব্যতিক্রম সম্পর্কে সাবধান থাকা ভাল, কী ব্যাকরণে, কী আইনে। দুই, নৃশংস অপরাধীর সংশোধন হয় না, হতে পারে না— এ তত্ত্ব মেনে নিলে বুদ্ধ এবং অঙ্গুলিমালের কাহিনি নিষিদ্ধ করতে হয়, আর দস্যু রত্নাকরেরও বাল্মীকি হওয়ার উপায় থাকে না, জয় শ্রীরামের কীর্তি নিয়ে সাতকাণ্ড মহাকাব্যও লেখা হয় না।

মৃত্যুদণ্ডের নৈতিকতা সম্পর্কে দ্বিতীয় প্রশ্ন: ‘অপরাধ এবং শাস্তির ভারসাম্য’ বলতে ঠিক কী বোঝায়? সেই ভারসাম্য দিয়ে কী করেই বা ন্যায়বিচারের বৃত্তকে সম্পূর্ণ করা যায়? অপরাধী যে প্রাণগুলি নিয়েছে, তাকে ফাঁসি দিলে তাদের ফিরে পাওয়া যাবে না, সে দিক থেকে কোনও ভারসাম্যের প্রশ্ন নেই। কিন্তু, হ্যাঁ, অপরাধী যাঁদের স্বজনকে হত্যা করেছে, তাঁরা কিছুটা মানসিক শান্তি পেতে পারেন। সেই শান্তি এক ধরনের ভারসাম্য আনতে পারে, তার ভিত্তিতে বিচারের একটা সম্পূর্ণতাও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্তু এখানেও গোটা ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বাসের উপরে। ‘ওই পিশাচটার ফাঁসি হলে তবে আমি শান্তি পাব’, এটা একটা বিশ্বাস। অন্য রকম বিশ্বাসও থাকতে পারে, থাকতেই পারে। দুই কিশোর পুত্রের সঙ্গে গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টাইনসকে যে পিশাচরা জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছিল, তাঁর স্ত্রী, ওই দুটি সন্তানের জননী তাদের ক্ষমা করেছিলেন। সেটা তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। গ্লেডিস স্টাইনস স্পষ্ট ভাষায় এ কথাও বলেছিলেন যে, দেশের আইন তার নিজের পথে চলবে, সে বিষয়ে তাঁর কিছু বলার নেই। কিন্তু তাঁর নিজস্ব ধর্মবিশ্বাস তাঁকে ক্ষমা করতে শিখিয়েছে। অন্যের ধর্ম বা ধর্মহীনতা অন্য শিক্ষা দিতে পারে। কিন্তু সেটাই মোদ্দা কথা: মৃত্যুদণ্ডের ‘নৈতিক যুক্তি’ হিসেবে যে কথাগুলি বলা হয়, সেগুলি আসলে যার যার মতামত বা বিশ্বাস।

মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে বা বিপক্ষে দাঁড়ানোটা তাই শেষ পর্যন্ত নিজের নিজের বিশ্বাসের প্রশ্ন, যুক্তি দিয়ে মেটানোর ব্যাপার নয়। এ বিষয়ে বিতর্ক অনিবার্য ভাবেই অন্তহীন। এ খেলায় কোনও কিস্তিমাত নেই। তা হলে এই সওয়াল-জবাব চালিয়ে লাভ কী? লাভ আছে। খুব বড় লাভ। মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে একটা সমাজ কী ভাবছে, কী বলছে, কী ভাবে বলছে, সেটা ওই সমাজের উপরে আলো ফেলে, তাকে চিনতে সাহায্য করে।

এবং সেই কারণেই চার পাশের সমাজটাকে দেখে আজকাল আতঙ্ক হয়। যে কোনও বড় অপরাধ বা সন্ত্রাস ঘটনা ঘটলেই এখন এ দেশে ‘ফাঁসি চাই’ বলে শোরগোল শুরু হয়। মৃত্যুদণ্ডের নীতিগত বিরোধিতা করলে তার সমর্থকরা তীব্র স্বরে ‘তা হলে আপনি জঘন্য অপরাধীদের প্রশ্রয় দিতে বলছেন’ বলে আক্রমণ করেন। দেখেশুনে সন্দেহ হয়, এই সমাজের একটা খুব বড় অংশের কাছে অপরাধ ও শাস্তির ভারসাম্যের আসল মানেটা হল শোধবোধ। ফাঁসি চাই মানে আসলে বদলা চাই।

তবু নটে গাছটি মুড়োয় না। প্রশ্ন ওঠে: কেন এই প্রতিশোধের মানসিকতা? কেন এতটা হিংস্রতা? সেই হিংস্রতার পরতে পরতে শ্রেণি, জাতপাত, সম্প্রদায়ের মতো বিভিন্ন ধরনের বিভাজনই বা এ ভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে কেন? এটা কি আসলে গভীর অনিশ্চয়তায় নিমগ্ন, নিরাপত্তাবোধ হারিয়ে ফেলা একটা সমাজের বিপন্নতার পরিণাম? একে অন্যের হাত ধরে বেঁচে থাকার সমস্ত সংসাধন অতি দ্রুত হারিয়ে ফেলছি বলেই কি প্রতিহিংসায় এমন প্রবল বিশ্বাস? মনের গভীরে বুঝে নিয়েছি যে, কোথাও কোনও সংশোধনের অবকাশ নেই, শুশ্রূষার সুযোগ নেই, নিষ্ঠুর থেকে নিষ্ঠুরতর হয়ে ওঠা একটা পরিবেশে আমরা সম্পূর্ণ অ-সহায়, তাই কি এমন ফাঁসিবাদী হয়ে উঠলাম? জানি না।

তবে এইটুকু জানি যে, সমাজের এই ক্রমশ বাড়তে থাকা ‘কোনও কথা শুনতে চাই না, আগে চরম শাস্তি দাও’ মার্কা হিংস্রতা আমাদের রাষ্ট্রের পক্ষে খুব সুবিধেজনক। বন্দুক এবং ফাঁসিকাঠ দিয়ে মানুষের মন জয় করতে পারলে, সমাজের চোখে নিজেকে ‘শক্তিমান রাষ্ট্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে শাসকদের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়। গোঁফের ফাঁকে চতুরতাগুলিকে আড়াল করে তাঁরা বলতেই পারেন, ‘ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার।’