স্বামী অনিলের মৃত্যুর পর তিন সন্তানকে লইয়া বড় বিপাকে পড়িয়াছিলেন রানি। হিউম্যান স্ক্যাভেঞ্জার, অর্থাৎ বালতি-বেলচা লইয়া মল পরিষ্কার করিবার পেশায় নিয়োজিত অনিলই ছিলেন পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য। ১৯৯৩ সালে এই প্রথাকে ‘অমানবিক’ আখ্যা দিয়া আইনক্রমে নিষিদ্ধ ঘোষণা করিয়াছিল সংসদ। তবু, অনিল এবং তাঁহার ন্যায় আরও অনেকেরই জীবিকার একমাত্র পথ ছিল এই মলবহন। অনিলের মৃত্যুতে পথে বসিবার দশা হইয়াছিল পরিবারের। সহায় হইল সোশ্যাল মিডিয়া। পিতার মৃতদেহের শিয়রের কাছে ক্রন্দনরত পুত্রের ছবি জনতার মর্ম স্পর্শ করে— এক সপ্তাহে সংগৃহীত হয় ৫৭ লক্ষ টাকা। এবং অঙ্কটি ক্রমবর্ধমান। জনতার নিকট সাহায্যের আবেদন কী বিপুল হইয়া উঠিতে পারে, তাহা ঠাহর করিতে পারেন নাই চিত্রগ্রাহক। জনতা শুধু শেয়ার করিয়া ক্ষান্ত হয় নাই, অর্থের বানে উপচাইয়া দিয়াছে রানির সংসার। যদিও, সোশ্যাল মিডিয়ায় অহরহ আবেগের বন্যা জানান দেয়— সহানুভূতির প্লাবন সহসা জাগিয়া উঠাই ট্রেন্ড।

এই আকস্মিকতা তৎক্ষণাৎ সঙ্কট দূরীভূত করিলেও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপে অন্তরায় হইয়া দাঁড়ায়। কেননা, নূতন সঙ্কট বাজারে উপস্থিত হইলে পুরাতনটিকে ভুলিয়া যাওয়াই রীতি। অনুমান করা চলে, সাময়িক করুণাধারায় রাজনীতির পেশাগত তাগিদ আছে। সুশীল সমাজের আছে বিবেক জাগরণের তাগিদ। প্রশ্ন উঠিতে পারে, জনতার প্রবল সাময়িক প্রতিক্রিয়ার চালিকাশক্তি কী? বন্যা কিংবা হিউম্যান স্ক্যাভেঞ্জিং-এর ন্যায় দুর্ঘটনা দীর্ঘ অনাচারের ফল, অতএব তাহার চিরস্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। সাময়িক সহায়তা স্বাগত। কিন্তু, তুবড়ির ন্যায় জ্বলিয়া উঠা আবেগ আলোকগতিতে উধাও হইয়া গেলে বাস্তব সমস্যাটির ইতরবিশেষ হয় না। সুতরাং, সচেতনতা ব্যতীত আস্ফালন নেহাতই শূন্যগর্ভ।

২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি হইতে হিসাব বলিবে, সেপ্টিক ট্যাঙ্ক এবং নর্দমা পরিষ্কার করিতে গিয়া প্রতি পাঁচ দিন অন্তর এক জন করিয়া কর্মীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটিয়াছে। মৃত্যুর ঘটনা তো বটেই, এই প্রথা বহাল রাখাই সভ্যতার লজ্জাস্বরূপ। ভারতের লজ্জা অধিক, কেননা, ‘হিউম্যান স্ক্যাভেঞ্জিং’ শব্দবন্ধ একমাত্র এই দেশের বর্ণভিত্তিক সমাজের ক্ষেত্রেই প্রচলিত। ২০১১ সালের জনশুমারি জানাইয়াছে, এই ঘটনার প্রায় আট লক্ষ প্রমাণ মিলিয়াছে। এবং ইহা দূর করিবার ক্ষেত্রে সমাজের সক্রিয়তা দুর্লভ। এই অমানবিকতা লইয়া যখন বহু বৎসর আন্দোলন করিতেছিলেন বেজ়ওয়াড়া উইলসন, নাগরিক সমাজ তখন ওয়াকিবহাল ছিল বলিয়া শুনা যায় নাই। অথচ একটি আবেগঘন চিত্র দেখিয়াই উজাড় করিয়া দিল তাহারা। বস্তুত, সমাজসেবায় কর্তব্যপালনের সুখ ব্যতীত আর কিছুই চাহে না জনগণ। অতএব তাহার প্রতিনিয়ত নূতন ঘটনার প্রয়োজন হয়। সোশ্যাল মিডিয়ার আগের যুগে উৎসাহের আয়ু ছিল ছয় মাস। বর্তমানে যোগাযোগের কল্যাণে ঘটনার ঘনঘটা সম্পর্কে অবহিত হওয়া সহজ— উৎসাহের আয়ুষ্কাল ঠেকিয়াছে সপ্তাহে। কবি বলিয়াছিলেন, পাষাণ-কারা ভাঙিতে করুণাধারা ঢালিবেন তিনি। দুর্ঘটনা ঘটিলেই জনগণের করুণার স্রোত বহিতে থাকে। তবে তাহা অন্ধত্ব ভাঙিতে নহে, আত্মতৃপ্তির নিমিত্ত।