আমরা ভাবি হিংসার একটিই রং, লাল। তবু এক এক সময় হিংসার নানা দিক এবং জটিলতা আমাদের বিহ্বল করে। নানা প্রশ্ন তুলে ধরে। যত না প্রশ্নের সমাধান করে, তার চেয়ে বেশি নতুন প্রশ্ন। হিংসার রং তখন ধূসর।

পশ্চিমবঙ্গে তথাকথিত নির্বাচনী হিংসার কথা ভাবুন। ১১ এপ্রিল থেকে ১৯ মে সাত দফায় পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হয়েছে। বিশেষ পুলিশ পর্যবেক্ষক এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষকের মতে, মোটের উপর নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ছিল। ৬০,০০০ নির্বাচন বুথের ৮টিতে পুনর্নির্বাচন করতে হয়। প্রথম ছ’দফা নির্বাচনী পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনার সংখ্যা ছিল ৩৩৭। ৪২টি লোকসভা কেন্দ্রে দেড় মাস ধরে চলা নির্বাচনে এই সংখ্যা তেমন কিছু নয়। ইতিমধ্যে নির্বাচনে মারাত্মক হিংসা ঘটছে পশ্চিমবঙ্গের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে, এ নিয়ে প্রচার জোরদার হল। বামপন্থী-সহ অন্য সব দল দাবি তুলল, গোটা নির্বাচন করাতে হবে কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী দিয়ে। কেননা, তারা ‘নিরপেক্ষ’। আমি এর আগেও বলেছি, এই ভাবে কাশ্মীরি প্রকরণে নির্বাচন করানোর নীতিতে এখন গণতান্ত্রিক দলগুলোর সমর্থন আছে। শেষ পর্যায়ে রাজ্যে প্রায় ৭০,০০০ আধা সামরিক বাহিনী নামানো হল ৯টি লোকসভা কেন্দ্রে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে, হিংসার ব্যাপকতাকে সামলানোর জন্য।

ইতিমধ্যে ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ, এবং অন্যত্র বোমা ফাটানো, নৃশংস হত্যা এবং অসমে বহু লোককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা— এ সব কাগজে এল বটে, কিন্তু কাগজের মতে একে হিংসা বলা চলে না।

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার হিংসা

মনে রাখতে হবে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার সামরিকীকরণ হবে বেছে বেছে। তাই যেখানে শক্তি প্রদর্শন করতে হবে, বাধ্যতা জারি করতে হবে, সেখানে হিংসার পরিমণ্ডলের যুক্তি তুলে ধরা হবে। উত্তর ভারতীয় ইংরেজি প্রচারমাধ্যমের এ ব্যাপারে জুড়ি নেই। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নির্বাচন কমিশনের মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা সাংবিধানিক, এই যুক্তিতে গোটা সামরিকীকরণের প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের আচরণকে কোনও প্রশ্ন করা গেল না। আদালত বলল, সংবিধানের ৩২৪ নং ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা সীমাহীন এবং প্রশ্নাতীত। ভোটের সময় ‘নজর রাখা, দিক্‌নির্দেশ, নিয়ন্ত্রণ’— এই তিনটি ক্ষেত্রেই যে কোনও আকস্মিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের বাধাহীন ক্ষমতা। যদিও বিচারকবর্গ এ-ও জুড়ে দেন যে, ৩২৪ নং ধারা সদুদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য— পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের জন্য নয়।

কিন্তু এ তো কথার কথা। তার কারণ নির্বাচন কমিশনের উপর কোনও গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ নেই, কোনও যুক্তরাষ্ট্রীয় ভূমিকা এই কমিশনের গঠনে বা কাজে নেই। কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা মনোনীত এই কমিশন সংবিধানের ব্যাপকতম ব্যাখ্যা করেছে। ঠিক যে ভাবে নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বাহিনী ও আমলাবর্গের ভূমিকাও সীমাহীন। এমন আরও উদাহরণ আছে।

মূল কথা, সংবিধানের ব্যাপকতম অথচ বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে এক নতুন ক্ষমতাকাঠামো গড়ে উঠছে। আর এই ক্ষমতার যাথার্থ্য বা সঙ্গত ব্যাখ্যা গড়ে উঠছে এক নৈতিক দাবির ভিত্তিতে যে দেশ অশান্ত; পশ্চিমবঙ্গ অবাধ্য, দুর্বিনীত— হিংসা এই রাজ্যের বাতাসে। তাই নতুন ক্ষমতাকাঠামোকে পরাক্রমশালী হতে হবে। ক্ষমতায় নমনীয়তার আভা থাকবে না। সেই ক্ষমতা হবে প্রখর, পরাক্রমশালী। আইন বহির্ভূত কাজ ও অস্তিত্বগুলিকে দমন করা হবে তার কাজ।

উদীয়মান ক্ষমতাকাঠামো

এই নতুন ক্ষমতাকাঠামোর বৈশিষ্ট্যসমূহ লক্ষ করার মতো। কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করব। এক দিকে যেমন রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সামরিকীকরণ ঘটছে, অন্য দিকে তার নৈতিক সুরও চড়া হচ্ছে। এই সর্বভারতীয় এবং সর্বব্যাপী আগ্রাসী ক্ষমতা নির্দয় ভাবে দমন করবে সকল অবৈধ এবং অনৈতিক কাজকর্ম, সংগঠন, ব্যক্তিবর্গ, সম্পদ ভোগ ইত্যাদিকে। কেন জনপ্রিয়তাবাদীদের প্রতি এই নিষ্ঠুর ক্ষমতার এত ক্রোধ এবং আক্রোশ? কেনই বা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সর্বব্যাপী ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজের কোনও না কোনও এক ‘শত্রু’কে চিহ্নিত করতে হয়?

জনপ্রিয়তাবাদীরা আইন বহির্ভূত কাজ করে। কর ফাঁকি দেয়। অন্যায় ভাবে টাকা তোলে। অবৈধ প্রথায় পুঁজি সঞ্চয়কে সহ্য করে। আইনের শাসনকে বাধা দেয়। বিদেশি সন্দেহভাজনদের আশ্রয় দেয়। বহিরাগতদের প্রতি তারা নরম। জনপ্রিয়তাবাদীরা এই সব নানা কারণে সমাজের শত্রু। অর্থাৎ দেশ এবং জাতির শত্রু। নৈতিক মোড়ক এই সর্বব্যাপী ক্ষমতার এক প্রধান বৈশিষ্ট্য।

এর অর্থ এই নয় যে আইন বহির্ভূত কাজ বন্ধ হবে। উত্তরপ্রদেশ এক বড় দৃষ্টান্ত। কিন্তু, বেছে বেছে আইনের প্রয়োগ এবং সংবিধানের দোহাই হবে সামরিকীকরণের পদ্ধতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান, সমরবাহিনী এবং বিচারবিভাগীয় অনিশ্চয় আচরণ।

এই উদীয়মান ক্ষমতার দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হল: জাতি ও জাতীয়তাবাদের অভিভাবকত্ব। রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এই ক্ষমতাকাঠামোর লক্ষ্য হবে জাতির অভ্যন্তরে যত অপবিত্রতা আছে, তাকে দূর করা। জাতিকে পরিষ্কার এবং আবর্জনাশূন্য করা। এর জন্য প্রয়োজন হল সংখ্যালঘু এবং অন্য সকল সন্দেহজনক সম্প্রদায়, জনগোষ্ঠী, এবং ব্যক্তিবর্গকে নজরে রাখা, এবং পূর্ণ, শর্তহীন জাতীয়তাবাদে সম্মত হতে বাধ্য করা। দ্বিতীয় পদক্ষেপটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। তা হল, অপরিচিত আগন্তুক, অভিবাসী, শরণার্থী— এই গোটা গোষ্ঠীটিকেই দেশ থেকে বহিষ্কার করা। অসমে এরই সূচনা। এবং যে প্রদেশ বা রাজনৈতিক শক্তি এই গোষ্ঠীর প্রতি সদয় আচরণ করবে, মানবিকতা দেখাবে, তাদের অধিকারের কথা তুলবে, তাদেরকেই জাতির শত্রুরূপে চিহ্নিত করা। এরাই ‘সমাজের শত্রু’। কারা বিদেশিদের আশ্রয় দিচ্ছে? কারা নরম মনোভাব দেখাচ্ছে? কাদের সত্তর বছরের পুরনো কাগজপত্র নেই, যা দিয়ে প্রমাণিত হবে যে এরা এ দেশে থাকতে পারে? জাতিকে নির্মল করার কাজে কারা বাধা দিচ্ছে? যারা বাধা দিচ্ছে, তারাই জাতির শত্রু। তারাই সীমানা খুলে দেশকে বানভাসি করার ব্যবস্থা করছে।

তৃতীয় এবং শেষ যে বৈশিষ্ট্যের কথা এখানে উল্লেখ করব, তা হল ক্ষমতার এই উদীয়মান রূপের পরিমণ্ডলের এক নির্দিষ্ট চরিত্র। সর্বাঙ্গীণ সামাজিক যুদ্ধের পরিবেশ ব্যতিরেকে ক্ষমতা এই নতুন রূপ নিতে পারে না। তাই এক সামাজিক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে রাজনীতিকে প্রবাহিত হতে হবে, যেখানে এই ধরনের এক সর্বব্যাপী শক্তিমান শাসনের প্রয়োজন পড়ে। এই যুদ্ধ নাগরিক এবং বহিরাগতর মধ্যে, বিশেষ জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত অবস্থানের ভিত্তিতে সংগঠিত ক্ষমতা, যেমন সফটওয়্যার কর্মী-সমাজ এবং ডিজিটাল জ্ঞানভিত্তিক সমাজ, চিকিৎসক, বলিউডের মতো প্রবল অর্থশালী অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালক, প্রোডিউসার সমাজ ইত্যাদি। অথবা আইনশাস্ত্রজ্ঞান ভিত্তিক সমাজ বনাম অসংগঠিত সাধারণ মানুষ, নিত্যকার রুজি নির্ভর জীবননির্বাহী মানুষ, জনতা বা জনসাধারণ। এ ছাড়াও সামাজিক যুদ্ধ চলেছে নাগরিক এবং অভিবাসী শ্রমিকের মাঝে, ভ্রাম্যমাণ শ্রমজীবী বনাম স্থিতিশীল; ভাল চাকুরে, বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন খ্যাতনামা শ্রেণি বনাম অখ্যাত অনামী জনতা।

সামাজিক যুদ্ধ চলেছে জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে জাতি-বহির্ভূত শত্রুদের, সংখ্যাগুরু বনাম সংখ্যালঘু, হিন্দি-হিন্দু কেন্দ্রিক সমাজ বনাম বাকিদের মাঝে। সামাজিক যুদ্ধের এই পরিবেশ আগ্রাসী সর্বব্যাপী শক্তির বৃদ্ধিতে সহায়ক। তাই সামাজিক শত্রু চিহ্নিত করে, তাদের বিরুদ্ধে সমাজকে সমাবেশ করার মধ্যে দিয়ে ক্ষমতার এই নব রূপের উত্থান।

পুঁজির আদিম সঞ্চয়ের পুনরাবির্ভাবের যুগে আধিপত্যশালী রাজনীতির এই রূপ। এই রূপের কাছে সর্বাগ্রে মাথা নত করেছে এ দেশের বামপন্থীরা। তাদের মতো নিয়ম, আইন, নীতি-শিক্ষা— এ সব আর কে এত ভালবাসে?                               

(চলবে)