Advertisement
২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

মেদিনীপুরে জগন্নাথ সড়কের টাকা দিলেন পোস্তার সুখময়

পুরীতে জগন্নাথ মন্দির দর্শনে যাওয়ার সোজা রাস্তা ছিল না। টাকা দিলেন কলকাতার ব্যবসায়ী। কিন্তু ইংরেজরা রাস্তা করল সেনা পাঠানোর সুবিধের জন্য। লিখলেন অতনু মিত্রসুখময় রায়ের দাদুর নাম লক্ষ্মীকান্ত ধর ওরফে নকু ধর। কলকাতা প্রতিষ্ঠাকালে বাঙালি ব্যবসায়ী ও ব্যাঙ্কারদের বসতি ছিল পোস্তায়। তাঁদের অন্যতম ছিলেন নকু ধর। লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে তাঁর বেশ হৃদ্যতা ছিল। ১৭৯৫ সালে মরাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অর্থের অনটন চলছিল।

 বর্তমান: এই রাস্তার আদিরূপই তৈরি হয়েছিল সুখময়ের টাকায়। নিজস্ব চিত্র

বর্তমান: এই রাস্তার আদিরূপই তৈরি হয়েছিল সুখময়ের টাকায়। নিজস্ব চিত্র

শেষ আপডেট: ০৮ মার্চ ২০১৯ ০৪:৫২
Share: Save:

বাড়ি তাঁর পোস্তায়। কলকাতার অন্যতম বাণিজ্যকেন্দ্র। নাম সুখময় রায়। তাঁর উদ্যোগে এবং অর্থে তৈরি হয়েছিল ‘জগন্নাথ সড়ক’। নির্মাণ সহায়তায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ব্রিটিশদের টাকা দিলেন এক বাঙালি ব্যবসায়ী। আর সেই টাকায় পুরীর জগন্নাথ মন্দির দর্শনের রাস্তা তৈরি হল। কিন্তু কেন? এর উত্তর পেতে হলে সুখময় রায়ের দাদুকে জানতে হবে।

সুখময় রায়ের দাদুর নাম লক্ষ্মীকান্ত ধর ওরফে নকু ধর। কলকাতা প্রতিষ্ঠাকালে বাঙালি ব্যবসায়ী ও ব্যাঙ্কারদের বসতি ছিল পোস্তায়। তাঁদের অন্যতম ছিলেন নকু ধর। লর্ড ক্লাইভের সঙ্গে তাঁর বেশ হৃদ্যতা ছিল। ১৭৯৫ সালে মরাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অর্থের অনটন চলছিল। লর্ড ক্লাইভের অনুরোধে ন’লক্ষ টাকা ধার দিয়েছিলেন তিনি। একবার ক্লাইভের দেওয়ানের প্রয়োজনে নকু ধর নিজের বিশ্বস্ত কর্মী নবকৃষ্ণকেই পাঠিয়েছিলেন। পরে এই কর্মীকে কোম্পানি ‘রাজা’ উপাধি দেয়। নবকৃষ্ণের বংশধরেরাই শোভাবাজার রাজবংশ নামে পরিচিত।

ক্লাইভ লক্ষ্মীকান্তকে ‘মহারাজা’ উপাধি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি অসম্মত হন। ক্লাইভ বার বার প্রস্তাব দিলে নকু ধর সেই উপাধি দৌহিত্র সুখময়কে দিতে অনুরোধ করেন। কোম্পানি তা-ই মেনে নিয়েছিল। অপুত্রক লক্ষ্মীকান্তের একমাত্র কন্যা পার্বতীর সঙ্গে বিয়ে হয় রঘুনাথ রায়ের। তাঁদের একমাত্র সন্তান সুখময় কলকাতার পোস্তায় রাজবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। কী ভাবে ইংরেজদের সঙ্গে নকু ধরের যোগাযোগ? গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ ১৮৯৯ সালের ১১ ডিসেম্বর ‘সম্বাদ ভাস্কর’ পত্রিকায় লেখেন, ‘একবার গঙ্গায় ডুবন্ত নৌকা থেকে এক গোরাকে উদ্ধার করে বাড়িতে এনে সেবা শুশ্রুষা করে বাঁচিয়ে ছিলেন নকু ধর। তারপর তার কাছেই ইংরেজি শিখেন। ইংরেজ সেই ইংরেজিতেই নকু ধরকে দোভাষী করিলেন’।

উত্তরাধিকার সূত্রে একমাত্র কন্যা পার্বতী পিতার অঢেল সম্পত্তির মালিক। তিনিও পিতার মতো দানশীল ও প্রজাদরদি ছিলেন। পুত্র সুখময়ও। তিনি কেন মেদিনীপুর থেকে পুরী যাওয়ার রাস্তা তৈরি করতে গেলেন হঠাৎ করে? তখন হাঁটা পথেই যেতে হত পুরী। পথও সোজা নয়। কলকাতা থেকে হাওড়ার উপর দিয়ে হুগলির গড়মান্দারন হয়ে মেদিনীপুর আসতে হত। তার পর সেখান থেকে দাঁতন হয়ে পুরী। তখন দাঁতনের কাছে চোর-ডাকাতদের খুবই উপদ্রব। তাছাড়া তীর্থকর আদায়ের নামে জুলুম চলত।

সুখময় জগন্নাথ দর্শনে যেতে চাইলেন। যাবেন পাল্কিতে চেপে। বিষয়টি তিনি সরকারকে জানালেন। বড়লাট ওয়েলেসলি ১৮০৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সুখময়কে ছাড়পত্র দিলেন। পথে কর্মরত কালেক্টর, প্রহরী, চৌকিদার কেউই তাঁর কাছে তীর্থকর আদায় করবে না। সুখময়ের বহর সংক্রান্ত একটি তালিকাও কর্মরত কালেক্টরকে পাঠানো হল। তাঁর এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য খড়খড়িযুক্ত ঝালর দেওয়া পালকি ১৫টি, উট একটি, কিছু ঘোড়া, রূপোর বাসন এক প্রস্ত, পিতলের বাসন ও কাপড় ৪০ বাক্স, মশলা চার বাক্স, অলঙ্কার ও অন্যান্য জিনিসপত্র চার বাক্স, দু’টি খাট, জমাদার-সহ বরকন্দাজ ১৫ জন, মশালচি সাত জন, দেওয়ান একজন, কেরানি দু’জন, বর্শাধারী চারজন, ভৃত্য সাতজন, নাপিত চারজন, হরকরা চারজন, ঝাড়ুদার একজন, সিপাহি দু’জন। তীর্থ শেষ করে তিনি ২০ মার্চ কলকাতা যাত্রা করেন। ফিরে সরকারকে জানান, তীর্থপথটি শোচনীয়। যাত্রীনিবাস নেই, নদীনালা পারাবারের জন্য সেতু নেই, পথে পানীয় জল নেই, শুধু তীর্থকরের জুলুম আছে।

সুখময় প্রস্তাব দিলেন ‘জগন্নাথ সড়ক’ তৈরির। কিন্তু দীর্ঘ রাস্তা বানানোর মতো অর্থ কোম্পানির কোষাগারেও নেই। সুখময়ের কলকাতা থেকে মেদিনীপুর হয়ে পুরী পর্যন্ত ‘জগন্নাথ সড়ক’ তৈরির প্রস্তাব লুফে নেন শাসকেরা। এই পথ নির্মাণের জন্য তিনি দেড় লক্ষ টাকা দান করতে চাইলেন। শর্ত দিলেন, রাস্তায় নির্মিত সেতুতে তাঁর এই দান পাথরের ফলকে বাংলা, সংস্কৃত ও ফারসি ভাষায় লেখা থাকবে। ১৮১০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর গভর্নর লর্ড মিন্টো সুখময়ের প্রস্তাবিত শর্ত মেনে চিঠি দিলেন। ৩ ডিসেম্বর কোম্পানির সচিব ডাউডেসওয়েল কাজ শুরুর কথা জানান। রাস্তার প্রথম অংশের জন্য সুখময় কথা মতো দেড় লক্ষ টাকা দেন বলে ও’ম্যালির ‘বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স মিডনাপুর’-এ উল্লেখ আছে। ১৮১২ সালে ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার ক্যাপ্টেন স্যাকভিলির তত্বাবধানে কাজ শুরু হয়। ১৮২১ সালে যোগ দেন ক্যাপ্টেন বাউটন। রাস্তা বরাবর ভগ্নপ্রায় দুর্গ ও মন্দিরের পাথর বিছিয়ে রাস্তার কাজ শুরু হল। মেদিনীপুর থেকে পুরী পর্যন্ত রাস্তার কাজ ১৮২৫ সালে সম্পূর্ণ হলে মেদিনীপুর থেকে উলুবেড়িয়া পর্যন্ত রাস্তার কাজ শুরু হয়। শেষ হয় ১৮২৯ সালে। সতের বছর নির্মাণের কাজ চলার পর তৈরি হল ওড়িশা ট্রাঙ্ক রোড। তীর্থযাত্রীদের বিশ্রামের জন্য দাঁতন, শ্রীরামপুর, ডেবরা, কোলাঘাট, চণ্ডীপুরে সরাইখানা তৈরি হয়। দাঁতনে বিঘে দশেক জমিতে এইরকম একটি সরাইখানার জন্য এলাকার নাম সরাইবাজার। বিশ শতকের গোড়ায় এটি ‘পুরী লজিং হাউস’ নামেও পরিচিত ছিল।

তবে, মেদিনীপুর বা হাওড়ায় নদীর উপর কোনও সেতু নির্মিত না হওয়ায় সুখময়ের নামে কোনও ফলক বসেনি। ওড়িশার বালেশ্বর জেলার তেঁতুলিয়া ও ফুলারে দু’টি ভগ্নপ্রায় সেতুর গায়ে বাংলা, সংস্কৃত ও ফার্সি ভাষায় লেখা পাথরের ফলক ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত দেখা গিয়েছে বলে পুরাতত্ত্ববিদ তারাপদ সাঁতরা ‘মেদিনীপুর: সংস্কৃতি ও মানবসমাজ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। ওড়িশা ট্রাঙ্ক রোড সম্পর্কিত একটি শিলালিপি ওড়িশা স্টেট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। ৩ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২ ফুট প্রস্থের কালো পাথরের ফলকে বাংলায় লেখা ‘কলিকাতা নিবাসী বৈকুন্ঠবাসি মহারাজা সুখময় রায় বাহাদুর এই রাস্তা এবং তন্মধ্যে সমস্ত সাঁকো নির্মাণ করেন পূর্বে দেড় লক্ষ টাকা প্রদানপূর্বক তৎকর্মে আপন সাহায্য প্রকাশ করিয়াছিলেন...তারিখ মহামারশ্চ সন ১৮২৬ সাল’। মুঘল সম্রাট শাহ আলম ১৭৫৭ সালে জনসেবা ও দানধ্যানের জন্য সুখময়কে ‘মহারাজ বাহাদুর’ উপাধি ও ‘চার হাজারি’ মনসবদারি দেন। এবং ঝালর দেওয়া পালকি ব্যবহারের অনুমতি দেন। ১৮১১ সালে পারস্যের রাজা শাহ একই উপাধি দেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও এই উপাধি স্বীকার করে নেয়। রাজা সুখময় ছিলেন বেঙ্গল ব্যাঙ্কের একমাত্র বাঙালি ডিরেক্টর।

হাওড়ার উলুবেড়িয়া থেকে পুরী পর্যন্ত প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার রাস্তা ও তার উপর সেতু তৈরির ইতিহাস মেলে বিভিন্ন নথিতে। তিনি ৫০ লক্ষ টাকা ইংরেজকে দিয়েছিলেন বলে মেদিনীপুরের জেলা কালেক্টর এইচভি বেইলি ‘মেমোরেন্ডাম অব মিডনাপুর’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। অতুল সুরের ‘৩০০ বছরের কলকাতা: পটভূমি ও ইতিহাস’ এবং বিনয় ঘোষের ‘কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত’ বইতেও এর উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কেন সুখময়ের প্রস্তাব লুফে নিয়েছিল? কারণ সেই সময়ে মেদিনীপুর থেকে কলকাতা যাওয়ার কোনও সোজাসুজি রাস্তা ছিল না। রাস্তা না থাকায় ওড়িশার বিদ্রোহী করদ রাজাদের দমন করতে ফৌজ পাঠানোর সমস্যা। ‘কোর্ট অব ডিরেক্টর’কে লেখা ১৮১১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির চিঠি থেকে জানা যায়, ‘ফৌজ আদান-প্রদানের দিক থেকে এই রাস্তা খুবই প্রয়োজন ছিল’। নিজের কীর্তি দেখে যেতে পারেননি রাজা সুখময়। ১৮১১ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি মারা যান।

লেখক শিক্ষক এবং প্রাবন্ধিক

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement

Share this article

CLOSE