সালটা ১৯৯১ কি ৯২। বিদ্যালয়ের   সপ্তম শ্রেণিতে গিয়েছি ইংরেজি পড়াতে। বেশিরভাগ ছাত্রই এসেছে গ্রাম থেকে। ইংরেজি ক্লাস মানেই তাদের কাছে ভয়ঙ্কর কিছু একটা। ছেলেরা বসেছিল নিষ্প্রাণ ছবির মতো। পরিস্থিতি লঘু করার জন্য বললাম, আজ একটা গল্প বলি। তার পরে অনেক দিন আগে পড়া পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলার একটি গল্প ওদের বললাম। গল্পটি অনেকটা এ রকম: ইংরেজ আমলে বঙ্গদেশে উচ্চপদে আসীন হয়ে এক সাহেব এসেছেন ইংল্যান্ড থেকে। তিনি একবর্ণ বাংলা বোঝেন না। আবার তাঁর খাস আর্দালি এক বর্ণ ইংরেজি বোঝেন না। সাহেব বলছেন, Open the door কিংবা Shut the door. সেই আর্দালি কিছুই না বুঝতে পেরে হাঁ করে চেয়ে থাকে। মহা সমস্যা। 

তখন এক শিক্ষক সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এসে সাহেবকে  ইংরেজিতেই বললেন, ‘‘যখন দরজা খুলতে হবে তখন বলবেন, ‘দেয়ার ওয়াজ এ কোল্ড ডে’, আর  দরজা বন্ধ করতে হলে বলবেন, ‘দেয়ার ওয়াজ এ ব্রাউন ক্রো’।’’ সাহেব তো অবাক। তবুও দেখা যাক কী হয়। এই ভেবে সেই শিক্ষকের কথা মতো সাহেব তাঁর আর্দালিকে দরজা খোলার সময় বললেন, ‘দেয়ার ওয়াজ এ কোল্ড ডে।’ কিন্তু সাহেবি উচ্চারণে তা দাঁড়াল, ‘দার ওয়াজ আ খোল্ড ডে’ এবং আর্দালি শুনলেন, সাহেব যেন বলছেন, ‘দ্বারওয়াজা  খোল দে’। একইরকম ভাবে ‘দেয়ার ওয়াজ এ ব্রাউন ক্রো’ সাহেবের উচ্চারণে গিয়ে দাঁড়াল, ‘দার ওয়াজ অা ব্রান ক্রও।’ আর্দালি শুনল, ‘দ্বারোয়াজা  বন্দ  কর।’ আদেশ পালিত হয়ে গেল ঠিক ঠিক ভাবে।

এই গল্পটি বলার পরে ক্লাসের ছেলেরা একেবারে আনন্দে মেতে উঠল। ক্লাস থেকে গুমোট ভাবটা উধাও হয়ে গেল। এই সময় খুব উজ্জ্বল চোখের রোগাটে এক ছাত্র আমাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘‘আচ্ছা স্যর, ওই সাহেবের মতো উচ্চারণ কি আমি কখনও করতে পারব?’’ বললাম, কেন পারবি না? চাইলে সব সম্ভব। ভয় না পেয়ে শুধু চর্চা করে যেতে হবে। যাকে তুই ভয় পাবি, তুই তো তার কাছ থেকে সরতে সরতে এক দিন অনেক দূরে চলে যাবি। দূর থেকে তাকে দেখে মনে হবে সে যেন ভয়ানক এক দৈত্য, আর ভয় না পেয়ে কাছে থাকলে তাকে মনে হবে সে যেন পরম আশ্রয়দাতা 

এক বটগাছ।

ছেলেটি কী বুঝলো কে জানে, তার পর থেকে নিয়মিত অল্প অল্প করে চর্চা করতে শুরু করল। একটু একটু লেখা আর একটু একটু বলা। ফের তাকে এক দিন বললাম, লোকজন কথা বলতে বলতে যে ইংরেজি শব্দগুলো উচ্চারণ করে সেগুলোর দিকে খেয়াল  রাখবি। কাগজের ঠোঙা, পথচলতি সাইনবোর্ড, ট্রেন, বাসের টিকিট যা পাবি সেখানেই দেখবি কী লেখা আছে। নিত্য সংযোগ সৃষ্টি কর ইংরেজির সঙ্গে। ছেলেটি কথা শুনেছিল এবং সফল হয়েছিল। ওই ছেলেটির মতোই এতগুলো বছরে বহু ছাত্র ইংরেজিকে ভয় না পেয়ে তার সঙ্গে নৈকট্য স্থাপন করে গ্রাম্য প্রেক্ষাপট থেকেই মাথা উঁচু করে আজ সমাজের নানা স্তরে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কারও কারও ইংরেজিতে বাকপটুতা আমাকে রীতিমতো অবাক করে দেয়। আর তখনই মনের মধ্যে কে যেন মন্দ্রকণ্ঠে বলে ওঠে, ‘‘বীরের অভিধানে অসম্ভব বলে কিছু নেই।’’ 

এতগুলি কথার অবতারণা কিছু সাম্প্রতিক ঘটনার ঘনঘটায়, যেখানে ইংরেজিতে দুর্বলতা সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়, পায়ের তলার মাটিটা আলগা করে রাখে। স্বামীজীর মতে, প্রবল আত্মবিশ্বাসই বড় বড় কার্যের জনক, আর এই আত্মবিশ্বাসই  পারে ইংরেজিকে ভয় না পেয়ে তার উপর দখলদারি কায়েম করতে। এ বিষয়ে আমরা যাঁরা শিক্ষক তাঁদের দায়বদ্ধতা তো একেবারে আকাশচুম্বী। অনেক ইংরেজি শিক্ষককে বলতে শুনেছি,  ‘‘এমন নিম্নমানের ছাত্রদের ইংরেজি শেখানো মানুষের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়।’’ কিন্তু সত্যিই কি তাই? আমরা কি সত্যিই চেষ্টা করে দেখেছি? আমরা কি কোনও সহজ পন্থা উদ্ভাবন করার চেষ্টা করেছি আনন্দময় পরিবেশ সৃষ্টি করে ইংরেজির ভীতি দূর করতে? এমন পরিবেশ তৈরি করতে কি বিনিদ্র রাত্রি যাপন করেছি যেখানে ছাত্র-শিক্ষক একসঙ্গে গাইতে পারে, ‘‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে, ওগো বিদেশিনী।’’

শুধু গতানুগতিক পন্থায় এগোলে কখনোই সম্ভব নয় মানসিক ভাবে পিছিয়ে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদেরকে শিক্ষার উজ্জ্বল অঙ্গনে আনা। একান্ত প্রয়োজন নতুন নতুন উদ্ভাবন এবং নিরন্তর উৎসাহ প্রদান। প্রয়োজন কঠিনকে সহজ করে তোলার মেধাবী প্রয়াস। সেইখানেই তো ওস্তাদ শিক্ষকের যাবতীয় মুন্সিয়ানা। আর এটা তখনই সম্ভব যখন আমরা আমাদের দায়বদ্ধতা  সম্পর্কে নিরন্তর সচেতন থাকব।

বিগত শতাব্দীর বহরমপুরের এক বিখ্যাত শিক্ষকের কথা জানি যিনি সেই সময়ের পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের জন্য তখনকার সময়োপযোগী  ছন্দময় ছড়ায় ইংরেজি শেখাতেন। যেমন: Have ও Has কাদের পরে বসে এই নিয়ে  সমস্যা মেটাতে তিনি বলতেন : I, You আর যত plural-এর পরে,/Have বসে, এই কথা জানিবে অন্তরে।/I, Youছাড়া যত আছে Singular,/ তাহাদের পরে Has,জানো  সমাচার।’’ খুব সাধারণ ছেলেটিও বারবার আবৃত্তি করে শুদ্ধ ইংরেজি শিখে ফেলত। এমন অনেক ছড়া ছিল সেই আদর্শ শিক্ষকের ঝুলিতে এবং আজও তাঁর ছাত্ররা তাঁকে স্মরণ করেন সশ্রদ্ধচিত্তে। তাঁর ঋজু শিক্ষকসত্তা ছাত্রদের ইংরেজি শেখানোর ভার দায়স্বরূপ অর্পণ করেছিল তাঁর উপরে। আমরা কি পারি না এখনকার সময়ের উপযোগী এ রকম কিছু উদ্ভাবন করতে? এই ডিজিটাল ক্লাসের যুগে বিরাট সম্ভাবনার দুয়ার খোলা আছে যদি আমরা সত্যি করে আন্তরিক হই; যদি আমরা ভাবি, ইংরেজি শিখতে না পারার কারণে সমাজে মুখ থুবড়ে পড়া ওই ছেলে বা মেয়েটির দুর্ভাগ্যের জন্য আমিও দায়ী। ভাষা শিক্ষার জন্য প্রথম প্রয়োজন, সেই ভাষাটিকে  ভালবাসা, আর শিক্ষার্থীর মনে সেই ভালবাসা সঞ্চার করবার দায়িত্ব আমাদের, যাঁরা আজ শিক্ষার কাজে ব্রতী হয়েছি শিক্ষকতাকে ভালোবেসে।

শিক্ষার আলোক ছড়ানোর এই কাজটিকে যদি আমরা আমাদের অনিবার্য, অনন্য ও অন্তঃসলিলা কর্তব্য বলে মনে করতে পারি তবে ইংরেজি না জানার জন্য এই অসহায়তার চিত্র প্রকট হয়ে উঠবে না শহরে এবং মূলত গ্রামাঞ্চলে। শব্দ রূপে ছড়িয়ে আছে ভাষা আমাদের চারদিকে, পথে-ঘাটে, রেডিয়ো-টিভিতে, খবরের কাগজে, বিজ্ঞাপনের চমৎকারিত্বে, দৈনন্দিন কথাবার্তায়— সর্বত্র। শুধু সেগুলিকে সযত্নে আহরণ করতে হবে আর এই আহরণ করতে করতে এক দিন দেখব সেই বিদেশি ভাষা হৃদয়ের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। আমাদের পুস্তকগুলোও যেন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রয়োজনের সঙ্গে অনুবন্ধী হয়ে ওঠে। প্রতিটি বিষয়ে পরিভাষাগুলি যদি ইংরেজিতে থাকে তবে কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা বাংলা মাধ্যমে পড়লেও ইংরেজি শব্দগুলি সম্পর্কে অনেকটাই পরিচিত হতে পারবে যা পরবর্তী কালে তাদের উচ্চশিক্ষার সহায়ক হবে। ইংরেজি না জানাটা হীনমন্যতার বিষয় নয় কখনও, কিন্তু জানাটা অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয় যা জ্ঞান অঙ্গনে অগ্রগামী হতে সাহায্য করে, আর তার জন্য প্রয়োজন আনন্দের সঙ্গে নিরন্তর চর্চা।

পরিশেষে স্বামী বিবেকানন্দের জীবনের একটি ঘটনার কথা বলি। তিনি এক বার কাশীর দুর্গা মন্দির থেকে ফিরছিলেন। হঠাৎ এক পাল বানর তাঁর দিকে তেড়ে আসে। বিবেকানন্দ প্রথমে ভয় পেয়ে পিছন ফিরে পালানোর চেষ্টা করতেই এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী চিৎকার করে বললেন, ‘‘ভয় পাচ্ছ কেন? মুখোমুখি হও। রুখে দাঁড়াও।’’ বিবেকানন্দ ঘুরে দাঁড়াতেই বানরগুলো থমকে দাঁড়াল। তার পরে চলেও গেল দূরে। ঠিক এই  শিক্ষাই প্রযোজ্য আজ আমাদের জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে। জীবন থেকে ভয়ে পালিয়ে যাওয়া হয়, হতাশার আগুনে পুড়ে খাক হওয়া নয়; প্রয়োজন অকুতোভয়তার সঙ্গে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া— তা সে ইংরেজি শিক্ষা হোক বা অধিকারের মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা।

শিক্ষক, সারগাছি রামকৃষ্ণ মিশন উচ্চ বিদ্যালয়