চোখ-কানকে অবিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে, অথচ যা বাস্তব তাকে তো এড়িয়ে যাওয়া যায় না। গোটা দেশে দারিদ্র ও জনশোষণ সত্ত্বেও, যাঁদের এ বিষয়ে সর্বাধিক তৎপর হওয়ার কথা সেই বামপন্থীদের এখন সত্তা টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম অবস্থা। বামপন্থী অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সমাজসচেতন মানুষজন এখনও সিপিআই(এম)-এর দিকে তাকিয়ে। সম্ভবত এই কারণে যে, একদা এই দলের নেতারা প্রচুর ত্যাগের মধ্য দিয়ে গেছেন, আর্থিক-সামাজিক বিশ্লেষণে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, সাধারণ লোকের মধ্যে মিশে তাঁদের দুঃখলাঞ্ছনার কথা কান পেতে শুনেছেন, তাঁদের নিয়ে আন্দোলনে নিজেদের ব্যস্ত রেখেছেন।
সে-সব এখন ইতিহাস। আর্থিক উদারীকরণ ও তার পরিচালনা সম্বন্ধে দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টি যে নীতি গ্রহণ করেছে তাতে উপরতলার দশাংশ মানুষ হয়তো স্বপ্নাতীত ঐশ্বর্য অর্জন করেছে, এবং গরিবদের পিষ্ট করে আরও কত মুনাফা অর্জন সম্ভব সেই সূক্ষ্ম শিল্পকলায় নিজেদের ক্রমশ দক্ষতর করে তুলেছে।

অন্য দিকে বাম শক্তি দুর্বল থেকে দুর্বলতর। যন্ত্রীকরণের ফলে পরিষেবা শিল্পে জীবিকার পরিসর ক্রমশ সংকুচিত, নব্য আর্থিক নীতির ফলে গ্রামাঞ্চলে সরকারি ঋণের ব্যবস্থা প্রায় শূন্যে গিয়ে ঠেকেছে, পাশাপাশি শিল্পক্ষেত্রে সাধারণ ও গরিব মানুষের ব্যবহার্য যে-সব পণ্যের উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল, তা ক্রমশ হ্রাসপ্রাপ্ত, অর্থাৎ দেশের অভ্যন্তরে কোনও ব্যাপক বাজার গড়ে ওঠেনি। এর ফল, শিল্প তথা কৃষি উৎপাদনে করাল ছায়া। গত ত্রিশ বছরে অনবচ্ছিন্ন ভাবে লোক নিয়োগ কমেছে, বেকার সমস্যা ভয়াবহ। যখন চোখের সামনে দেখা যায় প্রায় সমস্ত দলের নেতানেত্রীরা শিল্পপতি ও ধনী-কৃষকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কোটি-কোটি টাকা আত্মসাৎ করে যাচ্ছে, তখন সাধারণ মানুষের বিবেকবুদ্ধি ঘোলাটে হয়ে যায়।

বামপন্থীরা এই প্রবণতা রোধ করতে শোচনীয় ভাবে অক্ষম, তাঁরা চার দিকের অবস্থা দেখে ক্রমশ এই পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। এর পরোক্ষ প্রমাণ— তাঁদের আত্মনির্ভরতা নিম্নমুখী। নতুন করে শপথ নিয়ে গরিব মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, তাঁদের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করার পণ নিয়ে আন্দোলনের কথা বামপন্থী চেতনাসম্পন্ন মানুষজনেরই ভাবা কর্তব্য, অথচ এটাও তাঁদের বুদ্ধির বাইরে যে, অতীতে যে ধরনের বামপন্থা গঠন করা হয়েছিল, এখন তা অচল। পূর্বতন কয়েক পর্বে সম্পন্ন ঘরের ছেলেমেয়েরা আত্মত্যাগের শপথ নিয়ে গরিবদের মধ্যে শ্রেণিচেতনা উদ্বুদ্ধ করায় নিজেদের নিযুক্ত করেছিলেন, এবং অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু মানসিকতা বদলায়। মাত্র পঞ্চাশ বছর আগেই ঘরের ছেলেরা বনে গিয়েছিল ভারতের গ্রামে-গ্রামে বিপ্লবী চেতনা উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে; সেই সব সন্তানেরা কোথায় হারিয়ে গিয়েছে। নতুন প্রজন্মের চিন্তা একান্ত নিজস্ব সত্তাকে ঘিরে। ‘গরিবরা আছে, তা কী আর করা যাবে, আমরা তো নিজেদের স্বার্থটা আগে দেখব?’ এই মানসিকতা সারা উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত সত্তা জুড়ে।

তবু ইতিহাসের শিক্ষা তো উপেক্ষা করা যায় না। আমরা একটা সাময়িক অস্পষ্টতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তা থেকে বেরিয়ে আসতে নতুন করে বাম-নীতির পুনর্গঠন প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গে যে বামফ্রন্ট অতীতে গঠন করা হয়েছিল তা এখন হাস্যকর পর্যায়ে উপনীত, পুরনো বাম দলগুলি এখন নামফলকে সীমিত। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে-সব বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল, বামপন্থী নিশ্চয়তার বিরুদ্ধেও, তার সঙ্গে বর্তমান বাম সংগঠনগুলির কোনও যোগ নেই।

এখানেই কতকগুলি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। প্রথমত, যে বাম দলটির এখনও ন্যূনতম বিশ্বাসযোগ্যতা আছে, মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি, প্রথমেই তার বিধিবিধান এবং প্রথাগত আচরণিক অভ্যাসে পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলে লাভ নেই, বামফ্রন্ট সরকারের ত্রিশোর্ধ্ব বয়সকালে এই বৃহত্তম পার্টিটি সম্পূর্ণ গোল্লায় গিয়েছে, অন্তত পশ্চিমবঙ্গে। যে-কেউ এই দলের সদস্য হতে পারে, এবং দল যখন শাসনক্ষমতায় ছিল, বহু অসাধু ব্যক্তি এ দলের সদস্যতা জাহির করত। স্বভাবত, এরা এখন তৃণমূল-বিজেপিতে। বলতে মাথা হেঁট হয়ে আসে, সিপিআই(এম)ও টাকার বিনিময়ে যে কোনও অন্যায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মুখ বুজে সহ্য করে নিয়েছে। জনতার সঙ্গে দূরত্ব ক্রমশ বাড়ল, প্রমাণ সিঙ্গুরে, নন্দীগ্রামে।

অথচ তার পরেও প্রাদেশিক নেতাদের মধ্যে কোনও হেলদোল নেই, তাঁরা এখনও স্বপ্ন দেখছেন, বিপ্লব-ফিপ্লব দেরাজে তোলা থাক, আবার কী করে সরকারে ঢুকে দলগত ও ব্যক্তিগত সুবিধাদি বর্ধন করা সম্ভব। এ ভাবে আর কিছু দিন চললে এ দলটিও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, এবং গরিবদের পাশে দাঁড়িয়ে লড়াই করার জন্য কোনও প্রতিষ্ঠানই থাকবে না।

এ সম্ভাবনা, অথচ, অনেকেরই বিবেক মানতে চাইবে না, তাঁদের কাছে বাংলার সিপিএম নেতাদের কংগ্রেস-আসক্তি হাস্যকর। বাংলার নেতারা প্রায় জোর করে গোটা পার্টির উপর এই স্বপ্নটি চাপিয়ে দিয়েছেন: সবাই তো মেনে নিয়েছে যে, বিজেপি কংগ্রেসরও চেয়ে বড় বিপজ্জনক ব্যাপার, দুই পার্টিকে এত দিন আমাদের দল সমতার আসনে বসিয়ে এসেছে, এটা পুরোপুরি ঠিক নয়, আসুন এই অমানবিক বিজেপি দলটিকে উৎখাত করি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। তার পর আর্থিক বৈষম্য, শ্রমিক শোষণ, ইত্যাদি নিয়ে ভাবা যাবে।

এঁরা যে আগাগোড়া ভুল বলছেন, তা কিন্তু দলের বর্তমান সদস্যদের কাছেও স্পষ্ট হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ যে ক’টি ভোটাভুটি হয়েছে তা থেকে পরিষ্কার যে, পুরনো কথায় চিঁড়ে আর ভিজবে না। আশা, আগামী জুনেই হায়দরাবাদে পার্টি কংগ্রেসে এই প্রতিজ্ঞা দৃঢ়তর হবে এবং যাঁরা কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে গদিতে ফেরার সুখস্বপ্ন দেখছেন তাঁদের ধরাশায়ী করা সম্ভব হবে।

কিন্তু তার পরেও বড় প্রশ্ন থেকে যায়, লেখার শুরুতেই যার ইঙ্গিত করা হয়েছে। পার্টি কংগ্রেসের প্রধান চিন্তা হওয়া উচিত, কী করে গরিব মানুষদের সংগঠন নতুন করে গড়ে তোলা যায়। কৃষির চেহারা পালটেছে, শিল্পেরও। এবং পরিষেবা ক্রমশ অর্থব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এই তিনটি উৎপাদন ক্ষেত্রেই গরিবদের কী করে আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ করা যায়, তা নিয়ে কথা বলা দরকার। কথা বলা দরকার বাম-চিন্তা-সম্পন্ন সকলের সঙ্গে— যাঁদের একদা নকশালপন্থী বলে দূরে সরিয়ে রাখা হত তাঁদেরও মধ্যে এক ধরনের নতুন চিন্তার প্রশ্ন ক্রমশ উত্থিত হচ্ছে, সুতরাং তাঁদের সঙ্গেও কথা বলতে হবে, কথা বলতে হবে দলিতদের ভেতর থেকে উঠে আসা তেজি, রাগী যুবসম্প্রদায়ের সঙ্গে। পার্বত্য রাজ্যে যে মানুষরা ভারতীয় সৈন্যদের হাতে নিপীড়িত হচ্ছেন তাঁদের দাবি ও পরামর্শ শুনতে হবে। যে শ্রেণি বা বর্ণ, যে ধর্মই হোক না কেন, সব নিষ্পেষিত মানুষকে বামপন্থী চিন্তার আলোকে একত্রিত করতে হবে, শেষ পর্যন্ত বামপন্থাই যে তাঁদের মুক্তির উপায়, ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়গত প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে যে কেবল বিভেদের সৃষ্টি হবে, ভুল বোঝাবুঝি বৃদ্ধি পাবে— তাঁদের মধ্যে এই সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

যথার্থ স্বাদেশিকতার ব্যাখ্যায়, তাই, বিজেপির ভাবনার বিরুদ্ধে মানুষের সংগঠন দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করতে হবে। বিজেপি যা বলতে চাইছে তা যে আসলে দেশকে নানা পরস্পরবিরোধী ভগ্নাংশে পরিণত করার সূত্র, বিজেপি-বিরোধিতা যে আসলে দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা, তা মানুষের উপলব্ধিগত করতে হবে। কৃষিতে, শিল্পে, পরিষেবার মাধ্যমে বাম সংগঠনগুলিকে এই প্রচারে অনড় থাকতে হবে। যে কোনও নির্বাচন এই প্রচারকে ব্যাপকতর সুযোগ দেবে মাত্র। নির্বাচনে জয়পরাজয় অপ্রাসঙ্গিক, একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নীতির ভিত্তিতে সব সম্প্রদায়-শ্রেণি-গোষ্ঠীর মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা।