সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয় হিন্দু নাগরিকের মনে ভগবদ্‌গীতার একটি প্রসঙ্গ বোধ হয় ছবির মতো চেতনে-অবচেতনে মাঝে মাঝেই ভেসে ওঠে। গীতায় কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন, যখন ধর্মের গ্লানি উপস্থিত হয়, অধর্মের অভ্যুত্থান হয়, তখনই ধর্ম রক্ষার জন্য অবতার রূপে তিনি আবির্ভূত হন। এই অবতারেরা একক মহিমায় ভাস্বর। তবে মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ পর্যন্ত না-মানুষী ও আধা-মানুষী অবতারে নাগরিকদের ততটা মতি নেই, রামে আছে, কৃষ্ণেও আছে। রাম আর কৃষ্ণ চেহারায় মানুষ, তবে নানা অতিরঞ্জিত কাহিনিতে পড়ি, কাজে-কর্মে তাঁরা এক্কেবারে পাকা ম্যাজিশিয়ান ও প্রযুক্তিবিদ। 

দূরদর্শনের দৌলতে বিশ্বরূপ-দেখানো কৃষ্ণমূর্তি তো এক সময় রবিবারের দুপুরে ভারতীয় জনমানসে ভেলকি লাগিয়ে দিয়েছিল। রামায়ণের জাদু-সিরিয়াল তখন কিছু দিন হল সবে শেষ হয়েছে। রবিবারে ‘মহাভারত’-এর শুভাগমন ঘটেছিল। মহাভারতের কৃষ্ণ সেই বিশ্বরূপ-দেখানোর দৃশ্যে সে-কালের স্পেশাল-এফেক্টে আকাশ স্পর্শ করেছিলেন। গ্রহ-তারা-চাঁদ-সূর্য তাঁর মুখ দিয়ে গলগল করে ঢুকছে ও বাইরে আসছে। আমজনতা ভাবছেন যদি এমন এক জন অবতার সত্যি আসতেন। ‘রোজ কত কী ঘটে যাহা তাহা এমন কেন সত্যি হয় না আহা!’ যাবতীয় অধর্ম তিনি এক লহমায় গিলে ফেলবেন। চাকরি জুটবে, খাওয়া-পরা জুটবে, রাজনৈতিক অপশাসন ও দুর্নীতির অবসান ঘটবে। শুধু চাই এমন এক জন অবতারমার্কা একনায়ক। এই অবতারপুরুষ একনায়করা তখন শুধু সিরিয়ালে আসতেন— সংখ্যাগরিষ্ঠের ভারত একমনে, একজোটে ‘রামায়ণ’ ‘মহাভারত’-এর টিভি নির্মিত সিরিয়াল রূপ পরমপ্রসাদের মতো গিলত। সে রূপের জনপ্রিয়তা নেহরুর ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’-র টিভির জন্য তৈরি হিন্দিরূপ ‘ভারত এক খোঁজ’-এর চাইতে ঢের বেশি ছিল। স্বাভাবিক। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ইতিহাসকল্প ‘কৃষ্ণচরিত্র’ গ্রন্থে বিশ্বরূপ দেখানোর অলৌকিক দৃশ্যের সত্যতা স্বীকার করেননি। তাতে কী? ভারতের সন্ধানে ইতিহাসের জটিলতায় পথ হাঁটার চাইতে একনায়ক অবতারের স্বপ্নে মশগুল হওয়া সোজা। সর্বরোগহর স্বপ্নাদ্য বটিকার মতোই সর্বপাপহর অবতারকল্প একনায়ক। জ্যালজেলে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে দেওয়ালে চিটিয়ে দিলেই কেল্লা ফতে।

এই একনায়কের সুখস্বপ্ন ভারতীয় জনতা আজও মনে মনে লালন করেন। রাজনীতির কারবারিরা স্বপ্ন উস্কে দিয়ে সুযোগ গ্রহণ করেন। একনায়কের ও প্রশাসনিক কাঠিন্যের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে নেতারা ছলে-বলে জনসমর্থন আদায় করতে চান। ভারতবর্ষে স্বাধীনতার পরে সত্তর দশকে উনিশ মাসের যে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল তার উপকারিতা প্রসঙ্গে জনতার অনেকেই সে দিন উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। সে ভাবেই তাঁদের মগজ-ধোলাই করা হয়েছিল। জরুরি অবস্থা আর না চাইলেও সুকঠিন একবগ্‌গা অতিসক্রিয় রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি অনেকেরই এখনও মোহমুগ্ধতা আছে। বিশেষ করে যদি এই রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠিন্যের সঙ্গে দেশের নিরাপত্তা, জয়-পরাজয়, দুর্নীতি-দমন ইত্যাদি প্রসঙ্গ যোগ করে দেওয়া হয় তা হলে সমর্থনের পালে হাওয়া প্রবলতর হয়। 

কিন্তু কেন্দ্রীয় ক্ষমতাতান্ত্রিকতা ও অবতারকল্প একনায়কত্বের বদলে গণতান্ত্রিক আদর্শ বজায় থাকলে কি দেশের মঙ্গল হত না? হত। তবে গণতান্ত্রিক আদর্শ বজায় রাখতে গেলে সব ক্ষেত্রেই জনগণের সক্রিয় সচেতন অংশগ্রহণ জরুরি। কী তাঁদের নাগরিক অধিকার, এবং কী তাঁদের প্রাপ্য, এই সচেতনতা সেই নাগরিকদেরই থাকে যাঁরা আত্মমর্যাদাপরায়ণ, যাঁরা নিজেদের সামর্থ্যে বিশ্বাসী। সেই আত্মমর্যাদাবোধ যখন তলানিতে যায়, তখন আর গণতান্ত্রিক আদর্শ বজায় থাকে না। আত্মমর্যাদাবোধশূন্য মানুষ পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন। আর এই পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি যখন ক্রমশই দুর্নীতিপূর্ণ ও সঙ্কীর্ণ হয়ে যায় তখন দেউলে নাগরিকরা স্বপ্ন দেখেন ‘উপকারী’ একনায়কের। আসবেন তিনি আসবেন। ভারতবর্ষের আঞ্চলিক ও সর্বভারতীয় দলগুলি তাই গণতন্ত্রের আদর্শ পালনের কথা বলার চাইতে অবতারকল্প কোনও রাজনৈতিক মুখকেই ইস্তাহারে তুলে ধরতে চায়। বিবেকানন্দ উনিশ শতকের পাশ্চাত্য গণতান্ত্রিক আদর্শের বিচ্যুতি দেখে ফুট কেটেছিলেন, ‘‘ও তোমার পার্লামেন্ট দেখলুম, সেনেট দেখলুম, ভোট ব্যালট্‌, মেজরিটি, সব দেখলুম, রামচন্দ্র; সব দেশেই ঐ এক কথা। শক্তিমান পুরুষেরা যে দিকে ইচ্ছে সমাজকে চালাচ্ছে, বাকিগুলা ভেড়ার দল’’... (‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’)। সন্দেহ নেই, আত্মমর্যাদাবোধহীন, আত্মবিশ্বাসহীন নাগরিক সমাজ গড্ডলিকা-প্রবাহেই গা-ভাসাতে চায়। সেই জনতাই একনায়ক সন্ধানী যাঁরা হতাশ, নিজেদের ওপর বিশ্বাস হারিয়েছেন। শাস্ত্রে বলেছে অবতার একা আসেন না, সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে আসেন। ‘সাঙ্গোপাঙ্গাস্ত্র পার্ষদম্‌’ অর্থাৎ ‘সাঙ্গোপাঙ্গে অবতীর্ণ হয়ে পৃথিবীতে।’ তার পরেই ম্যাজিক শুরু। সাঙ্গোপাঙ্গরা নেমে পড়বেন, ঠাস ঠাস দ্রুম দ্রুম—সদল অবতারের হাতে পাপীদের নাশ, সাধুদের পরিত্রাণ। স্বপ্নের মৌতাত হতাশ মনে জমে ওঠে।

জনগণের আর এক চেহারা অবশ্য হতে পারে। সে চেহারা গড্ডলপ্রবাহের নয়, বিবেকানন্দ তাকে ‘প্রজাপুঞ্জ’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন তাঁর ‘বর্তমান ভারত’ রচনায়। লিখেছিলেন, ‘শক্তির আধার প্রজাপুঞ্জ।’ ‘ভেড়ার দল’ কখন ‘প্রজাপুঞ্জ’ হয়ে ওঠে? আত্মমর্যাদাবোধ জাগলেই এই রূপান্তর সম্ভব। সেই আত্মমর্যাদাবোধ আসলে আত্মশ্রদ্ধা। সেই আত্মশ্রদ্ধার কথা ছিল কঠোপনিষদের নচিকেতার কাহিনিতে। উপনিষদের এই কাহিনি বিবেকানন্দের খুব প্রিয়। উপনিষদের গল্প গীতার থেকে প্রাচীন। সেই গল্পে নচিকেতার বাবা যজ্ঞ করে নাম কিনতে চাইছিলেন। ব্রাহ্মণদের তাই গোসম্পদ দান করছিলেন তিনি। নচিকেতা খেয়াল করে দেখলেন এই গরুগুলি আর ঘাসও খাবে না, দুধও দেবে না। তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না। কারণ যাঁদের দান করা হচ্ছে তাঁরা দানসামগ্রীর গুণগত মান বিচার করতে অসমর্থ। বাবার কাজে বিরক্ত নচিকেতা প্রশ্ন করলেন, আপনি আমাকে কাকে দান করলেন? নচিকেতার বাবা প্রথমে কথার জবাব দেননি। বাচাল ছেলের কথায় জবাব দেওয়ার কী আছে? বার কয়েক এমন প্রশ্ন করায় শেষে বিরক্ত হয়ে পুত্রকে বললেন, ‘আমি তোমায় যমকে দান করলাম।’ বোঝাই যাচ্ছে এ কথার কথা। আমরা অনেক সময় রেগে গিয়ে বলি  ‘যমের বাড়ি যা’ আর যমকেও দিয়ে থাকি অখাদ্য জিনিস। সে জন্য বাংলায় ‘যমের অরুচি’ বলে একটা কথা চালু আছে। নচিকেতা অবশ্য বাবার কথাকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি সোজা হাজির হন যমের বাড়ি। তবে যাওয়ার আগে বার বার একটা কথাই ভাবছিলেন। ‘পিতা আমাকে কেন যমের নিকট প্রেরণ করলেন?’ ভাবলেন তাঁর পিতার এ কাজ করা ঠিক হয়নি। সবচেয়ে অধম যা তাই আমরা যমকে দিয়ে থাকি। নচিকেতা ভাবলেন তিনি সর্বাপেক্ষা উত্তম না হলেও সর্বাপেক্ষা অধম নন। 

নচিকেতার এই ভাবনা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আত্মশ্রদ্ধা ও আত্মমর্যাদাবোধ না থাকলে এমন কথা ভাবা যায় না। বাবা তাঁকে যতই ‘ফেলনা’ ভাবুন ফেলনা তিনি নন এই বিশ্বাস ছিল বলেই তিনি মৃত্যুর রাজা যমের সঙ্গেও তর্ক করতে পেরেছিলেন। প্রজা ও নাগরিকরা যদি নচিকেতার মতো তর্কপরায়ণ আর আত্মশ্রদ্ধার অধিকারী হন তা হলে আর একনায়কের স্বপ্নে মশগুল হবেন না। নিজেদের অধিকার তাঁরা আদায় করে নেবেন। বিবেকানন্দের ভাষায় প্রজাপুঞ্জই তখন হয়ে উঠবেন শক্তির আধার। 

উপনিষদের তর্কশীলতা গ্রহণ করব, আত্মবিশ্বাসী হব, না কি অবতারের স্বপ্নে মশগুল হয়ে একনায়ককল্প জননেতার খোঁজ করব, তা কিন্তু ভারতীয় নাগরিকদেরই বেছে নিতে হবে। নচিকেতার পথটি দুর্গম ও দীর্ঘ। যাত্রাপথে আত্মবিশ্বাস বজায় রাখা চাই, সহজে দমে গেলে চলবে না। অবতারের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে পরিত্রাণ চাইলে সহজে অনেক কিছুই মিলতে পারে, তবে তা কিছু দিনের জন্য। দীর্ঘ যাত্রায় অবতারদের নিয়ে অনেক সমস্যা। পুরাণের অবতারেরা সাধুদের পরিত্রাণ করেই বিদায় নেন। রামায়ণ আর মহাভারত দুই মহাকাব্যের শেষেই অবতারেরা বিদায় নিয়েছেন। বাস্তব রাজনীতিতে কিন্তু অবতারকল্প একনায়ক ক্ষমতায় বহাল থাকতেই চান, কিছুতেই প্রজাদের সমর্থ প্রজাপুঞ্জ হয়ে উঠতে দেন না তাঁরা। পৃথিবীর ইতিহাস তার নানা সাক্ষ্য বহন করছে। সে সাক্ষ্য বড় ভয়ঙ্কর, মর্মন্তুদ। সুতরাং সাধু সাবধান!  

 

(লেখক- অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বিশ্বভারতী)