Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৫ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

আজ পূর্ণ হল সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষ

আমি যত দূরেই যাই

অভীক মজুমদার
১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০০:০০

শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘ছড়ানো ঘুঁটি’-তে (২০০১) সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩) ‘অরণ্যে রোদন’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘‘সেই কবেকার ফেলে আসা/ পায়ের ধুলো/ ঘুমের মধ্যে আমাকে পেছন থেকে/ সামনে তাড়া করে।’’

প্রকৃতপক্ষে, পায়ে চলা পথের সঙ্গ-অনুষঙ্গে তাঁর সমস্ত কবিতা-গদ্য-ছড়া-কথাসাহিত্য মায় তর্জমাও গ্রথিত। ঘরের বদলে পথ। গৃহের বদলে রাস্তা। রাস্তাই তাঁর জীবন আর সাহিত্যের একমাত্র রাস্তা। পথ চাওয়াতেই তাঁর আনন্দ।

একটু লক্ষ করলে দেখা যাবে গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর গ্রন্থনামে ফিরে ফিরে আসে এই চলাচলের প্রসঙ্গ। হাঁটা আর হাঁটা। পা-তোলা পা-ফেলা। ‘পদাতিক’ দিয়ে শুরু। তার পর ‘যত দূরেই যাই’, ‘একটু পা চালিয়ে ভাই’, ‘যা রে কাগজের নৌকো’। এমনকি ‘একবার বিদায় দে মা’ বললেই অব্যক্ত ‘ঘুরে আসি’ কথাটা শোনা যায়। ‘জল সইতে’ বা ‘ছড়ানো ঘুঁটি’ নামেও তো সেই পথবিলাসের সুমধুর ইশারা। বদ্ধ, স্থাণু ঘরে তিনি নেই। ওই যে তিনি ওই যে বাহির পথে... না, রথে নয়। পদব্রজে।

Advertisement

হয়তো সে কারণেই তাঁর কবিতায় এত সমাসোক্তি অলঙ্কার, এত জড়ের স্থবির অস্তিত্বে প্রাণস্পন্দন। পথ জীবন্ত, পথের দৃশ্য জীবন্ত, গাছপালা তো বটেই, এমনকি পাথর-নদী-পাহাড় কিংবা রোদ্দুর-মেঘ-বৃষ্টি সবাই জীবন্ত চরিত্র। একটা জীবন এই সব হরেক প্রাণস্পন্দনকে সঙ্গে নিয়ে চলমান রইলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। গ্রিক শব্দ ‘অয়দিপাউস’ মূল ভাষার অর্থে ‘গোদা-পা’। আবার সফোক্লেস-এর নাটকে সেই নাম বহন করে অভিশাপ আর বিনষ্টি, দুর্ভাগ্য আর ভয়াবহ পরিণাম। পা সেখানে সর্বনাশের প্রতীক। কিন্তু সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সৃষ্টিতে বারংবার পা হয়ে ওঠে উজ্জীবনের দ্যোতনা, পায়ে চলা হল জীবনপার্বণের উল্লাস-উচ্ছ্বাস, আনন্দময় আয়ুযাপনের নিশান।

একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ভাষা, ভূমি আর ভবিষ্যৎ— এই তিনটি ‘ভ’-এর ওপর ভর করে তাঁর লেখালিখির জগৎ। আমার কিন্তু মনে হয়, তার সঙ্গে মিশে থাকে তিন ‘প’-এর দুনিয়া— পা, পথ আর প্রান্তিকতা!

তাঁর গদ্যগ্রন্থগুলির দিকে তাকালেও দেখি একই আলপনা। ‘যখন যেখানে’, ‘ডাকবাংলার ডায়েরি’, ‘নারদের ডায়েরি’, ‘আবার ডাকবাংলার ডাকে’ তো বটেই, ‘যেতে যেতে দেখা’, ‘টো টো কোম্পানি’ কিংবা ‘চরৈবতি চরৈবতি’ সরাসরি আনে চলমানতার সঙ্কেত। ‘ইয়াসিনের কলকাতা’ জুড়ে হেঁটে হেঁটে পথে ব্যান্ড বাজানো আর শহর চেনা, ‘অন্তরীপ বা হ্যানসেনের অসুখ’ উপন্যাসেও শেকড় ছিঁড়ে নতুন পরিবেশে যাওয়া। ‘কে কোথায় যায়’ সেই যাত্রার আর এক বিবরণ।

কবি সুভাষের জীবনটাও তো নিরন্তর অভিযাত্রা। এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে, এক মতাদর্শ থেকে অন্য মুক্তিতে, সঙ্ঘশাসন থেকে ব্যক্তি-প্রতিবাদে। আবার, একটু ঝুঁকি নিয়ে বলা চলে, নিষ্প্রাণ তত্ত্বকাঠামো ভেঙে প্রাণবন্ত মানবিকতায়। হয়তো কথাটা ভুলই বললাম। সুভাষের লেখাপত্র পড়লে দেখা যাবে, মানবিক নানা অনুভূতিতরঙ্গ দিয়ে তিনি সর্বদাই খাঁচাবন্দি তত্ত্বব্যাখ্যানগুলিকে ধাক্কা মেরে গিয়েছেন। ঘনিয়ে উঠেছে, তার ফলে, নানা আকারের রক্তমেঘ। এই প্রক্রিয়াটিও সুভাষ চালিয়ে গিয়েছেন। দমেননি। পার্টি এবং তার মধ্যমেধার হাতে অপমানিত হয়েছেন বারংবার, ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন তার চেয়েও বেশি। অর্থকষ্ট, অসম্মান, অনটন কাঁধে নিয়েই কন্যাদের পালনের দায়িত্ব নিয়েছেন, বৈভবহীন অনাড়ম্বর জীবন কাটিয়েছেন আর বইয়ের নাম দিয়েছেন ‘ফকিরের আলখাল্লা’। সে-ও তো পথে পথে ‘সহজিয়া’ গান শোনানোর বৈরাগী মূর্তি!

‘সহজিয়া’ শব্দটাই হয়তো সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে অনুধাবনের মূল চাবিকাঠি। হাজার বছরের পুরনো বাংলা বই ‘চর্যাপদ’ সেই ‘সহজিয়া’র উৎসমুখ। বাইরে সহজ, কিন্তু অন্তরে মুক্তিসাধনার সূক্ষ্ম ইশারা। বাউল ফকির দরবেশ কর্তাভজা আউলিয়া চিস্তি-র বিশাল বাহিনী যুগ যুগ ধরে এ দেশের পথে-সড়কে সেই বার্তা ছড়িয়ে চলেছে। সুভাষকে, মনে হয়, তারই উত্তরসূরি। তাঁর ‘মুক্তিসাধনা’ কি তত্ত্ববন্দি পার্টি প্রযোজিত? ‘লাল ঝান্ডা’র তলায় তলায়, সেই কোন যুগে এ তবে কেমন ইঙ্গিত?

‘‘রং-বেরঙের টুকরো কাপড়। জোড়া দিলে হয় বাউলের আলখাল্লা। নিজেদের মধ্যে তাদের যত বৈসাদৃশ্যই থাকুক, বাউলের জীবনই তাদের এক জায়গায় মিলিয়ে দেয়।

‘‘এ বইতেও যদি পায়ের ধুলোয় সেই অমিলের মিল পাওয়া যায়, তা হলেই লেখক খুশি।’’

যে মূঢ় তত্ত্বান্ধরা ভাবছেন, এ হল উত্তরকালের ‘পার্টি-বিতাড়িত’ ‘জনবিচ্ছিন্ন’ ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ ‘নষ্টভ্রষ্ট’ সুভাষ, তাঁদের সবিনয়ে জানাই, এ লেখার তারিখ ৮.৫.১৯৬০। ‘যখন যেখানে’ বইয়ের ভূমিকা।

শেষ জীবনে তিনি আরও স্পষ্ট, আরও অন্তর্ভেদী। পা পথ আর প্রান্তিকতা কেমন অনায়াসে মিশিয়ে দিচ্ছেন মুক্তিসাধনার ‘সহজিয়া’ ঘরানায়— ‘‘চালের বাতায় গুঁজে রেখে এসেছি/ গাজীর পট/ শিকের ওপর তোলা রইল গুপীযন্ত্র/ কালের হাত সেখানে পৌঁছতে না পৌঁছতে/ আমি ফিরে আসব।/... ফুলছে ফুঁসছে ঢেউ—/ এক বার তুলছে মাথায়/ এক বার ফেলছে পায়ে।/ ও মাঝির পো,/ দরিয়া আর কত দূর?/ ঘর বার সমান রে বন্ধু/ আমার ঘর বার সমান/ পায়ের নীচে একটুকু মাটি/ পেলাম না তার সন্ধান/ আমার সেই পোষা পাখি/ আকাশের নীল রঙে আঁকি/ যত্নে বুকে করে রাখি/ তবু কেন সে করে আনচান/ আমার ঘর-বার সমান’’(‘জল সইতে’, ১৯৮১) কিংবা, ‘‘নীচে তাকালে জল থই থই বন্যা/ ক্ষেত জ্বলছে খরায়/ চুনি কোটালের মা দাঁড়িয়ে/ নেহার বানুর কন্যা/ সারি সারি বন্দুকধারী/ সেলাম দেয় বুলেটপ্রুফ গাড়ি/ হেলিকপ্টার পায়ের ধুলো/ দিল যখন দীঘায়/ জানো কি মা, ঠিক তখনই বাউলগুলো. দুয়োরে এসে কী গায়—’’ (‘একবার বিদায় দে মা’, ১৯৯৫) সেই বহুস্তরিক ‘মুক্তি-সন্ধানী’ সুভাষ, সেই অপমানিত কিন্তু পরাক্রমশালী কলমের অধিপতি সুভাষ, সেই মহাবিশ্বজগতের প্রাণচাঞ্চল্যে স্নাত সুভাষ, সেই পথপদাবলির কীর্তনিয়া সুভাষ, লোকালয় আর লোকালয়হীন ভূখণ্ডবাসীদের আশা-নিরাশার বীণকার সুভাষের শতবার্ষিকী! আজ, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, শতবর্ষ পূর্ণ হল তাঁর।

আমরা, যারা তাঁর উত্তরকালে দেখছি সেই একই ভাবে ‘‘রক্তে পা ডুবিয়ে হাঁটছে/ নিষ্ঠুর সময়,/ সারা পৃথিবীকে টানছে/ রসাতলে/ এখনও আকাশচুম্বী ভয়’’— তারা কি এক বার সর্বান্তঃকরণে অভিবাদন আর কুর্নিশ জানাব না এই মহামানবিক স্রষ্টাব্যক্তিত্বকে? বাংলা ভাষা, বাংলার সংস্কৃতি আর বাংলা জনমানবকে যিনি আশ্চর্য মমতায় ছুঁয়ে থাকতে চেয়েছেন, সেই কবিকে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করা আমাদের সকলেরই দায়। দেশ, সমাজ আর সমকালকে তিনি মিশিয়ে দিয়েছেন বহমান ব্যক্তিসঙ্কটের সঙ্গে।

তাঁর গ্রন্থে-পঙ্‌ক্তিতে-রচনায় অনশ্বর মুক্তিসাধনাকে আমাদের প্রণাম, তাঁর ‘মানুষ-রতন’ বন্দনাকে আমাদের সমর্থন। একেবারে আটপৌরে, সাধারণ্যে মুখে মুখে ফেরা শব্দ-বাক্যকে তিনি জাদুবলে অলৌকিক করে দিয়েছেন। বিবৃতিকে এক মোচড়ে বানিয়ে দিয়েছেন নভশ্চর। তাঁর শতবার্ষিকীর সানন্দ আয়োজন প্রকৃতপক্ষে বাংলার সমবেত সঙ্কল্প। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে চাই আমাদের যাপনে, বেদনায়, সংশয়ে, রোমাঞ্চে, বিশ্বাসে, অঙ্গীকারে, অনুসন্ধিৎসায়। তাঁর বেদনার আকাশগঙ্গা আমাদের বুকে বুকে ঢেউ তুলুক।

‘‘আমার চোখের পাতায় লেগে থাকে/ নিকোনো উঠোনে/ সারি সারি/ লক্ষ্মীর পা/ আমি যত দূরেই যাই।’’

আসুন আজ আমরা এক মরমি মহাকায় কবির সামনে নতজানু হই। রংমশাল জ্বলে উঠুক আকাশে।

আরও পড়ুন

Advertisement