Advertisement
৩০ নভেম্বর ২০২২
সম্পাদকীয় ১

বিবিধের মাঝে

নির্বাচন শেষ হইয়াছে, নির্বাচন-পরবর্তী উত্তেজনাও থিতাইয়া আসিতেছে। উল্লাস শোক উদ্‌ভ্রান্তি ইত্যাদি অভিব্যক্তির বিস্তীর্ণ ও সুগভীর সমুদ্র মন্থন করিয়া বাঙালি আবার ক্রিকেট সিরিয়াল গ্রীষ্মাবকাশ ইত্যাদিতে মনোনিবেশ করিতেছে।

শেষ আপডেট: ০৯ জুন ২০১৯ ০০:০২
Share: Save:

নির্বাচন শেষ হইয়াছে, নির্বাচন-পরবর্তী উত্তেজনাও থিতাইয়া আসিতেছে। উল্লাস শোক উদ্‌ভ্রান্তি ইত্যাদি অভিব্যক্তির বিস্তীর্ণ ও সুগভীর সমুদ্র মন্থন করিয়া বাঙালি আবার ক্রিকেট সিরিয়াল গ্রীষ্মাবকাশ ইত্যাদিতে মনোনিবেশ করিতেছে। কিছু কিছু অনতিবিবেচিত চর্চা লইয়া ফিরিয়া ভাবিবার সময়ও মিলিতেছে। এমনই একটি ঈষৎ অবিবেচিত দাবি আজকাল হাটেবাজারে পথেঘাটে সঞ্চরমাণ— তাহা হইল, সেই অতীত কালের পর ভারত এত দিনে আবার একটি রাজনৈতিক ঐক্য পাইল, যে ঐক্যের রূপকার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কেবল নির্বাচনের পর বলা ভুল, নির্বাচনের আগেও তাঁহার দলের একাংশ তাঁহাকে সম্রাট অশোকের সহিত তুলনা করিয়াছিল। এই দাবির বর্তমান সঙ্গতি-অসঙ্গতির প্রশ্ন সরাইয়া রাখিয়া অতীত পরিপ্রেক্ষিতটি এক বার ভাল করিয়া বিচার করিয়া দেখা জরুরি। বোঝা জরুরি, সত্যই ভারত নামে আসমুদ্রপর্বত ভূখণ্ডটি শেষ কখন কোন আমলে এ হেন রাজনৈতিক ঐক্যের মুখ দেখিয়াছিল। ইহা খামখা ইতিহাসচর্চা নহে, কেননা এই সূত্রে ভারতীয় ভূখণ্ডের কয়েকটি গোড়ার সত্যও উঠিয়া আসিতে পারে, এবং সেই সত্যসন্ধান আজিকার বাস্তবের উপরও কিছু আলোকপাত করিতে পারে।
বিদ্যালয়পাঠ্য ইতিহাসের ছাত্রছাত্রীও জানেন যে সেই প্রাচীন যুগের বর্ণনাতেও দক্ষিণ ভারতের ইতিহাস সর্বদা একটি পৃথক অধ্যায়ে পড়িতে হয়, কিছুতেই তাহাকে মৌর্য, গুপ্ত, পাল ইত্যাদি অধ্যায়ের পরিসরে আঁটানো যায় না। গুপ্তযুগের স্বর্ণময়তা শেষ হইলেই অবধারিত ভাবে একটি নূতন অধ্যায়ে ঢুকিতে হয়, দাক্ষিণাত্যের চোল রাজাদের বৃত্তান্ত জানিবার জন্য। সত্যই রাজারাজড়াদের বিজয়গাথার মাধ্যমেই মানবেতিহাস জানা আবশ্যিক কি না, সে গূঢ় তর্ক সরাইয়া আপাতত চলতি ধারাকেই মান্য ধারা ধরিয়া লওয়া যাক। লক্ষণীয়, মহাপরাক্রান্ত ভারতীয় সম্রাটরাও দক্ষিণ ভারতকে বশে আনিতে পারেন নাই বলিয়াই তাহাকে আলাদা অধ্যায়ে রাখিতে হয়। অশোক বা আকবরের সময় নাকি ইহার ব্যতিক্রম ঘটিয়াছিল: পুরাপুরি না হইলেও অনেক দক্ষিণ অবধি তাঁহাদের পরাক্রম বিস্তার পাইয়াছিল। সত্যই কি তাহাই? কী সেই পরাক্রম, যাহাকে ইতিহাসে ‘সাম্রাজ্য’ বলিয়া গৌরবান্বিত করা হয়? ইতিহাসবিদরা জানাইয়াছেন যে, কোনও কালেই ভারতের সমাজ, অর্থনীতি— এমনকি রাজনীতি— একচ্ছত্রের অধীনে আনা সম্ভব হয় নাই। যখন আপাত ভাবে এ দেশ এক সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে, তখনও আসলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল বহুলাংশে স্বশাসন উপভোগ করিয়াছে, বশ্যতা থাকিয়াছে কেবল আলঙ্কারিক, মূলত প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত। এত বড় একটি দেশের পক্ষে রাজনৈতিক ঐক্যে গ্রথিত হওয়া মুখের কথা নহে, তদুপরি দেশের বিভিন্ন অংশে ভাষার সহিত সংস্কৃতি, এবং দৈনন্দিন জীবনচর্যা, এতটাই পৃথক যে তেমন কোনও ঐক্য এমনকি শাসকরাও চাহেন নাই।
লক্ষণীয়, ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়িয়া ভারতের জাতীয়তাবাদী নেতারা যখন স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখিতেছিলেন, তাঁহাদের অনেকেই ভারতের এই বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাসটি মাথায় রাখিয়াছিলেন, সেই মতো জাতীয়তাবাদের আদর্শটিকে রূপ দিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। স্বনামধন্য বাঙালি রাজনীতিকরা ছিলেন এই কাজে অগ্রগণ্য। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ বলিয়াছিলেন, ভারতের ঐক্য আসলে একটি ‘আলগা’ ঐক্য, অনেকগুলি ক্ষুদ্র প্রাদেশিক সত্তার উপর নির্মিত হালকা ‘বৃহত্তর ভারতীয় জাতীয়তা’র চেতনা। বিপিনচন্দ্র পাল বলিয়াছিলেন, এই আলগা ঐক্যের কারণেই ভারতের জাতীয় চেতনায় ছিল ‘চক্রবর্তী রাজা’র ধারণা, যিনি বিকেন্দ্রিত এক ভূমিখণ্ডের উপর খানিক উপরিতলের আবরণের বাহক, প্রতিটি প্রদেশের সত্তা সেখানে পৃথক ও বিশিষ্ট, এবং সেই বিশিষ্টতা ও পার্থক্য সর্বতোভাবে রক্ষণযোগ্য, ‘নারায়ণ’-এর ন্যায়, যে নারায়ণ-এর অর্থ, বিবিধতাসম্পন্ন এক মানবতার নীতি। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও রাজনৈতিক ঐক্য বলিতে বুঝিতেন, বিশ্বলোকের মতো বিস্তৃত বৈচিত্র্যময়তার সাধনা। অর্থাৎ সে কালে জাতীয়তাবাদের উদার ভাবকল্পটিতে হিন্দুত্বের পদ ও ভাব অনেক সময়ই অলঙ্কার-রূপে ব্যবহার হইত। এ কালে অবশ্য, জাতীয়তা তাহার মহৎ ব্যঞ্জনা হারাইয়া, যুগপৎ উদারতা ও প্রসারতার আদর্শ খণ্ডন করিয়া, সঙ্কীর্ণতার সাধনা হইয়া বসিয়াছে। মনে হয়, দূর অতীতের ইতিহাসের সহিত একান্ত না সম্ভব হইলে, এই বাস্তবকে অন্তত নিকট অতীতের জাতীয়তাবাদী চিন্তার সহিত মিলাইয়া দেখিলে কিছু উপকার পাওয়া যাইতে পারে।

Advertisement

যৎকিঞ্চিৎ

এ চেঁচিয়েছে ‘জয় শ্রীরাম’। তাই ও পুকারিছে ‘জয় হো’, ‘জয় বাংলা’, ‘জয় হিন্দ’। তখন এ আবার ঠিক করেছে, ‘জয় মা কালী’। কালে কালে ‘জয় শ্যামা, জয় শ্যামাপ্রসাদ’ স্লোগান দিলেও আশ্চর্যের কিছু নেই। অন্য দলও এ রাজ্যে আছে। তারাই বা এই লগ্নে ‘জয় মার্ক্স, জয় এঙ্গেলস’-এর অ্যাঙ্গল ছাড়বে কেন? এই ভাবে ‘জয় নেতাজি’, ‘জয় চারু’, ‘জয় কানু’, ‘জয় র‌্যাডিকাল মানবেন্দ্র’, আরও ছেষট্টি রকম জয়জয়কার চলুক। এই ফাঁকে ‘জয়জয়ন্তী’ রিলিজ করে দিলে, সুপারহিট!

Advertisement
(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.