Advertisement
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
প্রবন্ধ ২

নিজেকে অতিক্রম করার বিদ্যা ও চেতনা

কলাহান্ডি বাস্তবিকই হতদরিদ্র এক অঞ্চল। কিন্তু দীর্ঘ এবং নিরন্তর আগ্রাসনের শিকার হয়েও সেখানকার মূলবাসী মানুষ যে ভাবে বেঁচে আছেন, তা এক অন্য উন্নয়নের শিক্ষা দিতে পারে আমাদের।আকৈশোর জেনে এসেছি কলাহান্ডি মানে দুর্ভিক্ষ, এখনও দূরদর্শনে কলাহান্ডি উঠে আসে ইথিয়োপিয়ার হাড়-জিরজিরে, অপুষ্টিতে মুমূর্ষু, ঊনমানবের পাশে। ভারতের কেতাবি সমাজবিদ্যায় দুর্ভিক্ষের মানচিত্রে কলাহান্ডির সেই যে ১৮৫৬ থেকে অবস্থান, তার আর নড়চড় নেই। ব্যুৎপত্তিগত অর্থে কলাহান্ডি মানে কালো হাঁড়ি। কথাটা সদর্থক অর্থে ব্যবহৃত: ঘন অরণ্যে ঘেরা অঞ্চলটি লৌকিক জবানে কাব্যের ‘ঘনশ্যাম’-এরই প্রতিরূপ।

সময় বদলায়, দৃশ্য? কলাহান্ডি, ওডিশা, অগস্ট ১৯৯৫

সময় বদলায়, দৃশ্য? কলাহান্ডি, ওডিশা, অগস্ট ১৯৯৫

কুমার রাণা
শেষ আপডেট: ১৮ অগস্ট ২০১৫ ০০:০৩
Share: Save:

আকৈশোর জেনে এসেছি কলাহান্ডি মানে দুর্ভিক্ষ, এখনও দূরদর্শনে কলাহান্ডি উঠে আসে ইথিয়োপিয়ার হাড়-জিরজিরে, অপুষ্টিতে মুমূর্ষু, ঊনমানবের পাশে। ভারতের কেতাবি সমাজবিদ্যায় দুর্ভিক্ষের মানচিত্রে কলাহান্ডির সেই যে ১৮৫৬ থেকে অবস্থান, তার আর নড়চড় নেই। ব্যুৎপত্তিগত অর্থে কলাহান্ডি মানে কালো হাঁড়ি। কথাটা সদর্থক অর্থে ব্যবহৃত: ঘন অরণ্যে ঘেরা অঞ্চলটি লৌকিক জবানে কাব্যের ‘ঘনশ্যাম’-এরই প্রতিরূপ। এখনও, এক দিকে বাসিন্দাদের উৎখাত করে নবতর ভূম্যধিকারের প্রতিষ্ঠা, অন্য দিকে বক্সাইট, ম্যাঙ্গানিজ, গ্রাফাইট, লোহা, কোয়ার্ট্‌জ সমৃদ্ধ অঞ্চলে শিল্পায়নের ছদ্মবেশে বিধ্বংসী আগ্রাসনের পরও এ জেলার মোট ভূখণ্ডের এক-তৃতীয়াংশ অরণ্য বেঁচে আছে। আর বেঁচে আছে লুণ্ঠিত, অপমানিত, প্রান্তিকতার কিনারায় পৌঁছে যাওয়া কলাহান্ডির, একদা মূলবাসী কন্ধ, গোন্ড, ভুঞিয়া, পরজা, পাহাড়িয়া-সহ প্রায় অর্ধশত আদিবাসী গোষ্ঠীর সমৃদ্ধ লোককাব্যিক ঐতিহ্য, বৃহদ্ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরম্পরায় যা রত্নখনিবিশেষ।
কলাহান্ডির এই দুর্ভিক্ষপীড়িত ছবিটার অন্তরাল থেকে যখন সেই মণিমাণিক্যগুলো আমাদের চোখের সামনে ঝলসে ওঠে, তন্নিষ্ঠ গবেষকের বিনয়ী শ্রমসিদ্ধ প্রচেষ্টায়, আমরা মুহূর্তে চমকে উঠি, এবং পরমুহূর্তেই ভাবতে বাধ্য হই, এই বিপুল বৈচিত্রগুলোকে অবহেলা করে, কখনও বা ঘৃণা করে, ভারতবর্ষ তার বৃহত্ত্বের কী বিপুল ক্ষতিসাধন করে চলেছে। মহেন্দ্র কুমার মিশ্রের গবেষণা-গঠিত বই ওরাল এপিক অব কলাহান্ডি এমনই এক বিরল কাজ। এবং যে ক্ষণে ভারতীয় রাষ্ট্রনীতি প্রখর বাস্তববাদী, গবেষণা-প্রকাশনা-বিশুদ্ধ জ্ঞানচর্চা ‘কল্পনাবিলাস’ মাত্র, শিক্ষার অর্থ হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যবসাদারির প্রশিক্ষণ, ‘বাস্তববাদ’-এর সেই বিপুল বিক্রমের মুখে দাঁড়িয়েও যে কেউ কেউ ভারতীয় বৃহত্ত্বের চর্চাটা চালিয়ে যাচ্ছেন, সেটা বাস্তবিকই আশ্বাস জাগায়।
ইতিহাস জানাচ্ছে, তেল নদী উপত্যকা জুড়ে একদা মৌর্য যুগের সমসাময়িক যে মহাকান্তার রাজ্য গড়ে উঠেছিল, বিবর্তনে তা-ই দক্ষিণ কোশল, তিরিকলিঙ্গ হয়ে বর্তমান কলাহান্ডি, যা ১৯৪৮-এর ১ জানুয়ারি ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়। অবশ্য মৌর্য যুগ থেকেই বাণিজ্যসূত্রে এই এলাকায় বহিরাগতদের বসত, কিন্তু, ঔপনিবেশিক বিস্তৃতির আগে পর্যন্ত তা জনবিন্যাসে তেমন প্রভাব ফেলেনি, বহিরাগতরাও আত্মীভূত হয়ে গেছেন। যেমন, মগধ অঞ্চল থেকে আসা গোপালক ও জলবাহক গৌড়রা। এঁদের মধ্যে গীত একটি উপাখ্যানে এই মিশ্রণের স্পষ্ট প্রতিফলন: রামেলা নাম্নী গোপবধূ, স্বামী কটরাবাইনার অনুপস্থিতিতে রাজধানীতে পসরা নিয়ে যান। রাজার কাছে তাঁর সৌন্দর্য বর্ণিত হলে পর তাঁর আদেশে রামেলা বন্দিনি হন, স্বামী রাখাল ও ষণ্ডবাহিনী নিয়ে রাজধানী আক্রমণ করে তাঁকে উদ্ধার করেন। গ্রামে ফিরে রামেলাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয় এবং সতীত্বের প্রমাণ দিয়ে তিনি পুনরায় সংসারে স্থিত হন। কিন্তু তার পর এই কাহিনি আর রামেলার বিসর্জন বা পাতালপ্রবেশ পর্যন্ত গেল না। এখানে আত্তীকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত: আদিবাসীবহুল এই ক্ষেত্রে এখনও স্ত্রী-পুরুষ অনুপাত কাঁটায় কাঁটায় এক— প্রতি হাজার পুরুষ পিছু এক হাজার নারী; সেখানে কাহিনিটিকে রামেলাকে ত্যাগ করা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া মস্ত ঝুঁকির ব্যাপার হত।

সারা কলাহান্ডি জুড়ে এমন অসংখ্য লোককাব্যের ছড়াছড়ি, ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন কথক ও গায়ক-গায়িকা: কন্ধদের মধ্যে বোগুয়া, মারাল; গোন্ডদের মধ্যে পারগাণিয়া, গৌড়দের ঘোগিয়া, বানজারাদের ভট, ডোমদের বিরখিয়া। আর আছে নানা গোষ্ঠীর অতি সমৃদ্ধ সব গাথা: পূরজা, জনম খেনা, ভীমা সিদি, নাগমতী, রাজফুলিয়া, মেরাম্মা, খরটমল, বড়খেনা, জাতি জনম। গোষ্ঠীতে গোষ্ঠীতে আদানপ্রদানের মধ্য দিয়ে সে সব কাহিনি ও গীত গড়ে তুলেছে এক বৃহত্তর লোকসাহিত্যের পরম্পরা।

উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যায় যে কোনও জনজাতীয় গোষ্ঠীতে পাওয়া সৃজনকাহিনিগুলোকে, সমুদ্র থেকে মৃত্তিকার আহরণ, মৃত্তিকা থেকে পৃথিবী, পক্ষী বা পক্ষিণী এবং মানবমানবীর সৃষ্টির কথাকল্প। গোষ্ঠী ও ভূগোল ভেদে সে কথার নানা সংস্করণ। কিন্তু মূল কাহিনিতে একটা মৌলিক সাযুজ্য নিয়ে সে পরম্পরা নানা আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে যেমন, তেমনই আবার হিন্দু জাতিব্যবস্থায় নিম্ন বা মধ্য অবস্থানের ডোম বা গৌড় বা তেলিদের মধ্যেও বহমান। প্রসঙ্গত, একই বৈচিত্র আমরা পাই আমাদের অঞ্চলে সাঁওতাল, মুন্ডা, মাহলি, কামার, মাহাত, ওরাওঁদের মধ্যেও।

মহেন্দ্রর মনে হয়েছে যে, ‘কলাহান্ডির লোকসাহিত্যের ধারা সেখানকার ইন্দ্রাবতী নদীর ধারার মতো সদা বহমান।’ এ ধারা ইন্দ্রবতীর চেয়েও বলশালী: সভ্য ভারতের উন্নয়নপ্রত্যাশী বাঁধ ইন্দ্রাবতীর ধারাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে, শত শত বসত ডুবিয়ে সে বাঁধে ধাক্কা খাওয়া জলোচ্ছ্বাসে শোনা যায় জীবিকাচ্যুত, গৃহহীন, ছিন্নমূল মানুষের হতাশ্বাস, নির্মাণের ছদ্মবেশে ধ্বংসের অভিজ্ঞান।

আর, এই ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে, সম্মুখে দৃশ্যমান, ক্ষতবিক্ষত করাল এক ভবিষ্যৎকে প্রতিহত করার ঐকান্তিক প্রয়াসে এই আদি ধরিত্রীর মূলবাসীরা স্মরণ করে চলেন তাঁদের নানা সংগ্রামের কাহিনি। আবার, এরই মধ্যে তাঁরা স্মরণ করে চলেন কন্ধমেলি গীত-এর মধ্য দিয়ে, তথাকথিত আধুনিকতার আগ্রাসনে মূলবাসীদের ভূমিচ্যুত হওয়ার করুণ বাস্তব। কন্ধদের মধ্যে মেড়িয়া নামক নরবলি প্রথার অবসান ঘটানোর নামে ব্রিটিশদের প্রত্যক্ষ মদতে রাজা নামক তাদের স্থানীয় প্রতিভূ কন্ধদের আদিকাল থেকে চলে আসা ভূমি-ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে বিজাতীয়রা হয়ে ওঠে জমিদার এবং শাসক। ব্রিটিশ প্রতিনিধি ম্যাকফারসন উচ্ছ্বসিত হয়ে লেখেন, ‘রাজা ফতে সিং দেও মস্ত একটা কাজ করেছেন।’ সেই মস্ত কাজটা কী ভাবে হয়েছিল, তার বিশদ এক বর্ণনা পাওয়া যায় মার্চ ১৯৮৫-তে সোশ্যাল সায়েন্স প্রোবিংস নামক, তখনও সজীব, সমাজবিজ্ঞান চর্চার পত্রিকার এক সংখ্যায়। মার্কসীয় সমাজবিজ্ঞান চর্চা তখনও জ্ঞানানুশীলনে অক্লান্ত। বালগোবিন্দ বাবু ‘প্রবলেমস অব সেমিফিউডালিজম: দ্য স্টাডি অব অ্যান ওড়িয়া ভিলেজ’-এ দেখাচ্ছেন, কী ভাবে তাঁর সমীক্ষাকৃত এই গ্রামটিতে স্থানীয় আদিবাসী গোষ্ঠী অধিকারভুক্ত জমি কলাহান্ডির রাজা এক ব্রাহ্মণ পরিবারের হাতে তুলে দেন। শুধু একটা গ্রামই নয়, এবং কেবল ব্রাহ্মণরাই নয়, গোটা এলাকা জুড়ে জমির মালিক হয়ে ওঠে বহিরাগত কুলথা, আঘারিয়া, কুর্মিরাও। এর বিরুদ্ধে রান্দো মাঁঝির নেতৃত্বে যে বিদ্রোহ হয় এবং নিষ্ঠুর ভাবে অবদমিত হয়, তারই কাহিনি বর্ণিত হয় ‘কন্ধমেলি গীত’-এ।

মহেন্দ্রকুমার মিশ্র কলাহান্ডির মানুষ, তিনিও সেই প্রবঞ্চক ‘অপর’দের উত্তরসূরি। কিন্তু কলাহান্ডির মৃত্তিকা, জলবায়ু, প্রতিবেশের সঙ্গে শিক্ষিত জ্ঞানপিপাসা তাঁর মধ্যে এমন এক সংবেদনশীল একত্ববোধ সঞ্চারিত করেছে, যার প্রেরণায় তিনি বছরের পর বছর কলাহান্ডির গিরিশ্রেণির অভ্যন্তরে জনজাতীয় আবাসগুলোতে ঘুরে ঘুরে, বিপুল অধ্যবসায়ে সংগ্রহ করেছেন বঞ্চনা ও তার বিরুদ্ধে টিকে থাকার ধারাবাহিক স্মৃতিমালা। বহু পরিশ্রমে লব্ধ তাঁর সৎ জ্ঞানচর্চাকে তিনি এমন এক ঔজ্জ্বল্যে নিয়ে যেতে পেরেছেন, যেখানে জনজাতীয়দের এক দ্বাদশবর্ষীয় পবিত্র অনুষ্ঠানে, যাতে অন্য কারও উপস্থিতি একান্ত ভাবে নিষিদ্ধ, সে অনুষ্ঠানও তাঁকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, তাঁর বিদ্যাচর্চাগত পবিত্রতা তাঁর অপবিত্র ‘অপর’ পারিবারিক পরিচিতিকে মুছে দিয়েছে।

কলাহান্ডির দুর্দশা নিয়ে সন্দেহ নেই: প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পরিবার দরিদ্র, এক-তৃতীয়াংশ লোক নিরক্ষর। নারীদের মধ্যে এ হার দুই-তৃতীয়াংশ। আর সেই ‘সুযোগে’ বছরের পর বছর নানান দারিদ্র-দূরীকরণ কর্মসূচি চলে, যার সুফলগুলো ভোগ করে নেয় চতুর সেই দখলদারদের উত্তরাধিকারীরা। জমি গেছে, অরণ্য গেছে, পাহাড়ও যাচ্ছে। যে আদিবাসীরা টিকে আছেন, তার পিছনে মস্ত এক শক্তি বোধহয় তাঁদের স্মৃতি, যা তাঁদের লোকসাহিত্যে বিস্তৃত। সেগুলো শুধু মনোরঞ্জনের জন্য গীত কথামালা নয়, তার মধ্যে আছে এক-একটা সমাজের নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের কাহিনি, আছে তাঁদের বেঁচে থাকার সেই চাবিকাঠির সন্ধান, যা ভারতবর্ষের প্রকৃত উন্নয়নেও দিকনির্দেশ করতে পারে। এগুলো বাদ দিয়ে যে ভারতবর্ষ বলে কিছু হয় না, সেটা বোঝার প্রয়াস, ব্যবসাদারি উচ্চশিক্ষার কাছ থেকে আশা করা অন্যায়। কিন্তু, যে বহুধাবিস্তৃত বামপন্থী, বিশেষত মার্কসবাদী সমাজবিজ্ঞান চর্চা একদা বালগোবিন্দ বাবুর মতো অসংখ্য গবেষককে উজ্জীবিত করেছিল, সেই আদর্শঋদ্ধ বিদ্যাচর্চা কি ভারতের এই বৃহত্ত্বের মধ্যে নিজের স্থান খুঁজবে না?

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement

Share this article

CLOSE