দেশে বেকারত্বের ভয়ানক চেহারাই নাকি এ বারের নির্বাচনের প্রধান প্রশ্ন। কী করে নতুন শিল্প আসবে, নতুন কী প্রশিক্ষণ দিলে কাজ পাবেন তরুণ-তরুণীরা, ভোটের মরসুমে সেই তর্ক চলছে। কেউ প্রশ্ন করছেন না, যে সব শিল্পে বহু বছর ধরে প্রচুর শ্রমিক কাজ করছেন, সেগুলিতে কি নিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ বজায় রাখা যায়? তেমন শিল্পে শ্রমিকের রোজগার, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় কি?

প্রশ্নগুলো উঠছে না বলেই আড়ালে রয়ে যাচ্ছে চটকলের দুর্দশা। হাওড়া জুট মিলে এপ্রিলের গোড়া থেকে প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রাপ্য টাকার দাবিতে আন্দোলন করছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। আজকের পশ্চিমবঙ্গে শ্রমিক আন্দোলন সে ভাবে সহানুভূতি পায় না, চটকলের ধর্মঘট ‘ঝুটঝামেলা’ ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু সরকারি পরিসংখ্যানকে তো তাচ্ছিল্য করা যায় না। একটি চিঠির উত্তরে ‘এমপ্লয়িজ় প্রভিডেন্ট ফান্ড অর্গানাইজ়েশন’ প্রেরিত তথ্য বলছে, চুয়াল্লিশটি চটকলে শ্রমিকদের বকেয়া প্রভিডেন্ট ফান্ডের পরিমাণ ২২৭ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে আদায় করা গিয়েছে মাত্র আট কোটি টাকা। অবসরের পর শ্রমিকদের প্রাপ্য ‘গ্র্যাচুইটি’ বাকি প্রায় হাজার কোটি টাকা। কয়েক হাজার শ্রমিক গ্র্যাচুইটি না পেয়ে মারা গিয়েছেন। পেনশন পাচ্ছেন না অগণিত শ্রমিক। অনেকের মতে, শ্রমিকের সঞ্চয়ের টাকাটা পুঁজি হিসেবে খাটাচ্ছেন চটকল মালিকরা। 

সমস্যা, মজুরি নিয়েও। সম্প্রতি বেতন ও ডিএ বৃদ্ধির দাবি করে শ্রমিক ইউনিয়নগুলি ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল। তখন কেন্দ্রের বস্ত্রমন্ত্রক জানায়, বস্তা তৈরি করার মাথাপিছু মজুরি দৈনিক পাঁচশো বিয়াল্লিশ টাকা ধরা হয়। কেন্দ্রের বরাত অনুসারে বস্তা তৈরি করলে সেই হিসেবেই মজুরি পাঠানো হয় চটকলে। অথচ রাজ্যের কোনও চটকলে শ্রমিকের বেতন দৈনিক পাঁচশো টাকার বেশি নয়। আন্দোলনের পর রফা হয়েছে, মজুরি বাড়বে দৈনিক দু’টাকা, তা-ও স্থায়ী কর্মচারীদের। বরং নানা ধরনের শ্রমিক, নানা স্তরের বেতন চালু রাখা আছে চটকলে। কম মজুরির জন্য আজকাল শ্রমিকও মেলে কম।

অথচ কর্মসংস্থানের নিরিখে পাটশিল্পের বিকল্প এ রাজ্যে বেশি নেই। এই মুহূর্তে রাজ্যে আটান্নটি চালু চটকল রয়েছে। ৪১০০০ স্থায়ী কর্মী কাজ করেন, অস্থায়ী ও অন্যান্য শ্রেণির কর্মী মিলিয়ে মোট শ্রমিকের সংখ্যা দেড় লক্ষেরও বেশি, যদিও এঁদের অনেকেরই নাম লেখা থাকে না নথিতে। প্রায় চল্লিশ লক্ষ কৃষক পরিবার পাট চাষের সঙ্গে যুক্ত। পাট দিয়ে তৈরি হস্তশিল্প, কুটিরশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যাও অন্তত পাঁচ লক্ষ। তেরোটি চটকল বন্ধ হয়েছে, শ্রমিকের সংখ্যা কমেছে, কিন্তু চটের উৎপাদন কমেনি। আধুনিকীকরণের দৌলতে উৎপাদন বেড়েছে। 

এই উৎপাদনের সবটা বিক্রিও হয়ে যাচ্ছে। কারণ পাটের চাহিদা কমেনি, বরং বাড়ছে। প্রধান ক্রেতা অবশ্যই ভারত সরকার। কিন্তু প্লাস্টিকের অপকার নিয়ে সচেতনতার (কোনও কোনও ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা) সঙ্গে সঙ্গে বেসরকারি ক্ষেত্রেও চটের চাহিদা বাড়ছে। আজ দেশের মধ্যে চটের বস্তা ছাড়াও, পাটের তৈরি গালিচা, ব্যাগ, জামাকাপড় ইত্যাদি পাটজাত পণ্যের চাহিদা চড়া। তার বাজার ছ’হাজার কোটি টাকার, রফতানির পরিমাণ দু’হাজার কোটি টাকা। এর অধিকাংশই পশ্চিমবঙ্গের উৎপাদন।

পাটশিল্পকে সাধারণত ধুঁকতে থাকা শিল্প বলেই মনে করা হয়। অথচ ঘটনা হল, পাটের যত চাহিদা তত উৎপাদন করে উঠতে পারছে না চটকলগুলো। এই বছর কেন্দ্র খাদ্যমন্ত্রক নির্দেশ দিয়েছে, চাল, গম প্রভৃতি খাদ্য শস্য ভরার জন্য একশো শতাংশ বস্তা হবে চটের। চিনির বস্তার কুড়ি শতাংশ হতে হবে চটের। ১৯৮৭ সালের ‘জুট প্যাকেজিং মেটিরিয়ালস’ আইন অনুসারে, চিনি, সিমেন্ট, সার, সব কিছুর জন্যই কেবল চটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক। কিন্তু চটকলগুলি যথেষ্ট বস্তা সরবরাহ করতে পারে না, এই কারণ দেখিয়ে সার ও সিমেন্ট সেই 

শর্ত থেকে মুক্তি পেয়েছে। এখন চিনিও সেই পথে পা বাড়িয়েছে।

অতএব প্রশ্ন ওঠে, এই অসামঞ্জস্য কেন? পাটশিল্প বিশাল ও শ্রমনিবিড়, দেশের ভিতরেই তার সুরক্ষিত বাজার, চাহিদাও যথেষ্ট। অথচ চাষি পাটের চাষ ছেড়ে দিচ্ছে, শ্রমিক চটকল ছেড়ে দিচ্ছে, চটকলের উৎপাদনে ঘাটতি থাকছে। এ রাজ্যে তেরোটি চটকল বন্ধ। এক এক বছর এমনও দেখা গিয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গের চাষি দাম না পেয়ে রাস্তায় পাট ফেলে পুড়িয়ে দিচ্ছেন, আর চটের বস্তা দাবি করে রাস্তায় নেমেছেন মধ্যপ্রদেশের চাষি, কারণ চটের বস্তা না থাকায় সরকার তাঁদের ফসল কিনতে নামছে না।  

এ বছরও কেন্দ্র কমপক্ষে সাড়ে ছ’হাজার কোটি টাকা খরচ করবে চটের বস্তা কিনতে। এই টাকা যাতে চটকল শ্রমিক, পাটচাষি, সকলের মধ্যে লেনদেন হয়, তার জন্য নজরদারি চালাতে চায় বস্ত্রমন্ত্রক। এমন নজরদারির কারণ কি? অভিযোগ উঠেছে যে, অল্প দামে পুরনো ও ব্যবহৃত চটের বস্তা আমদানি করে, সেগুলোতে খাদ্যশস্য ভরে কেন্দ্রকে সরবরাহ করছে চটকলগুলো। এই ধরনের প্রতারণার তদন্তে সিবিআইকেও নামতে হয়েছে। বাইরে প্লাস্টিক-লবির চাপের সঙ্গে জুড়ছে সরষের ভিতরের ভূত — পাটশিল্পের অভ্যন্তরে প্রতারণা। ফলে একটা সম্ভাবনাময় শিল্প নষ্ট হতে বসেছে। 

ধানের বাজারে ফড়েদের দাপট কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। তা নিয়ে অনেক প্রচার, অনেক বরাদ্দ। অথচ রাজ্যের প্রধান বাণিজ্যিক ফসল পাট, এবং অন্যতম প্রধান শিল্প চটশিল্প, কার্যত ফড়ে ও ফাটকাবাজের দখলে। এরাই সীমাহীন লাভের লোভে এই শিল্পকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছে। চটকল শ্রমিকেরা একটি অনুন্নত উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করেন, কর্মস্থলে দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেই। আহত হলে কর্মশক্তি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন, মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণ পান না। চটশিল্প লাভজনক হলে পরিবেশ বাঁচত, শ্রমিকও বাঁচত। আক্ষেপ, পাটশিল্পের পুনরুজ্জীবনের প্রতিশ্রুতি পশ্চিমবঙ্গের কোনও দলের ইস্তাহারে প্রাধান্য পায়নি।