যুগাবসান হল। অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রয়াণে এই বাক্যই ব্যবহৃত হচ্ছে বার বার। নেহাৎ আলঙ্কারিক কিন্তু নয় এই শব্দগুলো। অটলবিহারী বাজপেয়ীর ক্ষেত্রে নিতান্ত সৌজন্যমূলক ভাবে শব্দগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে না। অটলবিহারী নিজেই যেন একটা যুগ ছিলেন। এক দিকে কট্টরবাদী রাজনীতির কুশীলবরা, অন্য দিকে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের সমর্থকরা— দুই বিপরীত মেরুর রাজনীতির দিকে দু’হাত প্রসারিত করে যেন ভারসাম্যের রজ্জু-সফর করেছিলেন তিনি। সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন জীবনের শেষ কয়েকটা বছরে। তবু ভারতবাসী জানত, তিনি রয়েছেন, এই ভারতের বাতাসেই তিনি শ্বাস নিচ্ছেন, শতাধিক কোটি ভারতবাসীর সঙ্গেই রোজ শ্বাস নিচ্ছেন। সেই স্পন্দন থেমে গেল চিরতরে। অতএব আক্ষরিক অর্থেই একটা যুগের পদধ্বনি থেমে গেল যেন।

আরও একটা অর্থে যুগান্ত ঘটেছে অটলবিহারীর প্রয়াণে। অটলবিহারী বাজপেয়ী ভারতীয় রাজনীতির একটা স্বর্ণযুগের প্রতিনিধিত্বও করতেন। স্বাধীনতার সংগ্রাম দেখেছিলেন সে যুগের রাজনীতিকরা। স্বাধীনতা উত্তর পরিস্থিতিতে নতুন ভারত, প্রগতির ভারত, উদীয়মান ভারত গড়ে তোলার জন্য স্বপ্ন দেখেছিলেন তাঁরা। গোটা জীবন সমর্পিত ছিল তাঁদের। আদর্শের কাছে, নৈতিকতার কাছে, বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে শিখেছিল ভারতীয় রাজনীতির ওই প্রজন্মটা। সে ঘরানার শেষ যে ক’জন ছিলেন আজকের ভারতে, অটলবিহারী সেই হাতে গোনাদেরই একজন।

সদ্য স্বাধীন ভারতে এক দিকে সদর্পে উড্ডীন ছিল কংগ্রেসের পতাকা। অন্য দিকে ক্রমশ গৌরবান্বিত হচ্ছিল বামপন্থী ঝান্ডা। রাজনীতির এই দুই ধারাতেই বরেণ্য, মহিমান্বিত ব্যক্তিত্বদের যূথবদ্ধ উপস্থিতি ছিল। কিন্তু এই দুই ধারার বাইরে আরও একটা ধারা ভারতীয় রাজনীতিতে নিজের অস্তিত্ব জাহির করতে শুরু করেছিল সে সময়ে— হিন্দুত্ববাদী ধারা। সে ধারার প্রবাহও শুরু হয়েছিল স্বাধীনতার আগেই। তবে স্বাধীন ভারতে আরও সশক্ত অস্তিত্ব নিয়ে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছিলেন হিন্দুত্ববাদীরা। সাফল্য অনেক পরে এসেছে। কিন্তু প্রায় গোড়া থেকেই ভারতীয় রাজনীতির হিন্দুত্ববাদী ধারাতেও কয়েকজন মহীরূহ-প্রমাণ ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল। অটলবিহারী বাজপেয়ী তাঁদেরই অন্যতম। অটলবিহারী বাজপেয়ী তাঁদের প্রত্যেকের চেয়ে আলাদাও। সারা জীবন হিন্দুত্ববাদের প্রবাহে হেঁটেও সাম্প্রদায়িক উগ্রতার চর্চা থেকে নিজেকে অনেক দূরে সরিয়ে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন তিনি।

আরও পড়ুন: ভারত রত্নহীন, চলে গেলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী

ধর্ম বা সম্প্রদায় বা জাতপাত-ভিত্তিক রাজনীতি উগ্রতার চর্চাতেই স্বস্তি বোধ করে। কিন্তু অটলবিহারী বাজপেয়ী সে সবের থেকে অনেক দূরে ছিলেন। ১৯৮০ সালে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠা। অটলবিহারী বাজপেয়ী সে দলের প্রথম সভাপতি। লালকৃষ্ণ আডবাণী, মুরলী মনোহর যোশীদের মতো কট্টরবাদীদের নেতৃত্বে দেশের নানা প্রান্তে মাথা তুলছে তখন উগ্র হিন্দুত্ব। চঞ্চল-অস্থির সময়। আডবাণীর ‘রামরথের’ যাত্রাপথের দু’পাশে সাম্প্রদায়িক ঝঞ্ঝা। অযোধ্যায় রাম মন্দির গড়ার দাবি ক্রমশ তীব্রতর হচ্ছে। নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় পৌঁছে চূড়ান্ত আঘাত হানছে উগ্র হিন্দুত্ববাদ। ধসে পড়ছে বাবরি মসজিদ। কিন্তু হিন্দুত্বের সেই উগ্র কণ্ঠস্বরের রমরমার ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে অটলবিহারী বাজপেয়ীর মুখমণ্ডলে সে দিনও স্মিত হাস্য, কণ্ঠস্বরে সে দিনও কোমলতা, শব্দ চয়নে সে দিনও অদ্ভুত প্রশান্তি, আবেগে সে দিনও সমগ্র জাতি।

সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা আপনার ইনবক্সে পেতে চান? সাবস্ক্রাইব করতে ক্লিক করুন

এর মূল্য কি অটলবিহারী বাজপেয়ীকে চোকাতে হয়নি? হয়েছিল। নিজের দলেই হয়ত বেশ খানিকটা একা হয়ে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। সামনের সারি থেকে হয়ত কিছুটা সরে গিয়েছিল তাঁর মুখ। তবু বিশ্বাসে অটল ছিলেন, লক্ষ্যে স্থির ছিলেন, অবস্থানে অনড় ছিলেন। নিজের ভাবনার প্রতি সেই অপার আস্থা, নিজের বিবেকের প্রতি সেই অটল দায়বদ্ধতাই কিন্তু শেষ পর্যন্ত অটলবিহারীকে পৌঁছে দিয়েছিল অভূতপূর্ব উচ্চতায়। দেশের রাজনীতিতে যখন টালমাটাল সময়, গোটা দেশে যখন অনুভূত হচ্ছে নেতৃত্বের শূন্যতা, সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলোকে দুর্বল করে যখন দিকে দিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উত্থান, তখন অটলবিহারী বাজপেয়ীতেই আস্থা রেখেছিল ভারত। বিভিন্ন মতামতের একগুচ্ছ রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন তাদের রাজনৈতিক ঘরানা, বিভিন্ন তাদের প্রত্যাশা, কোথাও কোথাও পরস্পর বিরোধিতাও। কিন্তু সবাই একমত হয়ে সে দিন নেতা মেনেছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ীকে, তাঁর মধ্যেই আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল বিভিন্ন শিবির।

সবটাই কি মহিমান্বিত? গোটা রাজনৈতিক জীবনটাই কি দৈব প্রভায় আলোকিত বাজপেয়ীর? তেমনটাও তো সম্ভব নয়। বস্তুত তেমনটা ঠিক মানবিকও নয়। কিন্তু সুদীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রাপথে জীবনের চেয়েও যেন বড় হয়ে উঠেছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী। এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যেতে সমর্থ হয়েছিলেন নিজের ভাবমূর্তিকে, ছোটখাটো মানবিক ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো যাকে স্পর্শ করতে পারে না।

আরও পড়ুন: শ্রীঅটলবিহারী বাজপেয়ী (১৯২৪-২০১৮)

ন্যায়কে ন্যায়, অন্যায়কে অন্যায় বলার সক্ষমতা সম্ভবত আজন্ম লালন করেছিলেন নিজের মধ্যে। সেই কোন ১৯৭১ সাল। সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের ঘোর প্রতিপক্ষ ইন্দিরা গাঁধীকে ‘দুর্গা’ বলে সম্বোধন করতে দ্বিধান্বিত হননি বিন্দুমাত্র। আর এই সে দিন ২০০২ সাল। দাঙ্গাবিধ্বস্ত গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে প্রকাশ্য সাংবাদিক সম্মেলনে ‘রাজধর্মের’ শিক্ষা দিতেও পিছপা হননি। বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যে রাজনৈতিক উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অটলবিহারী বাজপেয়ী, তা খুব সহজে অর্জিত হয়নি। বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, তাঁর প্রয়াণে কেন শোকস্তব্ধ হয়ে গেল গোটা দেশ।

অটলবিহারী বাজপেয়ীর নশ্বর অস্তিত্বটা আর রইল না। কিন্তু অটলবিহারী বাজপেয়ী পুরোদস্তুরই রইলেন। তাঁর রাজনীতি রয়ে গেল, তাঁর গোটা রাজনৈতিক জীবন এক শিক্ষা বা এক দৃষ্টান্ত হয়ে রয়ে গেল। ২০০২ সালে যে পরামর্শ দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদীকে, সে পরামর্শ আজ ১৬ বছর পরেও সমান প্রাসঙ্গিক। সে দিন শুধু গুজরাতের জন্য প্রাসঙ্গিক ছিল রাজধর্মের সে বাণী। আজ গোটা ভারতের জন্য প্রাসঙ্গিক। অটলবিহারীর দূরদর্শিতার এর চেয়ে অকাট্য দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে?

দূরদর্শিতাকে সম্মান করতে কি আমরা প্রস্তুত? অটলবিহারী বাজপেয়ীর দেওয়া শিক্ষাকে পাথেয় করার কথা কি ভাবছেন তাঁর উত্তরসূরিরা? উত্তরের অপেক্ষা রইল।