প্রশান্তচন্দ্র মহালনবীশ তৈরি করেছিলেন ভারতের পরিসংখ্যান ব্যবস্থা। বহু দিনের পরিশ্রমে ভারতের পরিসংখ্যান দফতর গোটা বিশ্বে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছিল। উন্নয়নশীল দেশে অর্থব্যবস্থা সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নিরপেক্ষ ভাবে নিয়মিত প্রকাশ করার ক্ষেত্রে ভারতের পরিসংখ্যান ব্যবস্থা মডেল হয়ে উঠেছিল। মোদী সরকার এই পরিসংখ্যান দফতরের যে ক্ষতি করেছে, তা অপূরণীয়। জিডিপি বৃদ্ধির হার রাতারাতি বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, জোর করে দেখানো হচ্ছে যে ইউপিএ আমলে বৃদ্ধির হার মোদী আমলের থেকে কম ছিল। এই নিয়ে বিতর্ক থিতু হতে না হতেই জানা গেল যে জাতীয় পরিসংখ্যান কমিশনের দুই সদস্য পদত্যাগ করেছেন, কারণ তাঁদের অনুমোদিত জাতীয় নমুনা সমীক্ষা দফতরের ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষের কর্মসংস্থান সংক্রান্ত রিপোর্ট সরকার প্রকাশ করেনি।

খবরটা ফাঁস হওয়ার পরে বোঝা গেল, কেন সরকার কর্মসংস্থান সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতে চাইছে না। দেশে বেকারত্বের হার ২০১৭-১৮ সালে হয়েছে ৬.১ শতাংশ, যা বিগত ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ। বিশেষত ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে বেকারত্ব ভয়াবহ। নরেন্দ্র মোদীর সরকার ক্ষমতায় আসার আগে, ২০১১-১২ সালে গ্রামীণ যুবতী এবং যুবকদের বেকারত্বের হার ছিল যথাক্রমে ৪.৮% এবং ৫%, যা ২০১৭-১৮ সালে বেড়ে হয়েছে যথাক্রমে ১৩.৬% এবং ১৭.৪%। একই সময়ে শহরের যুবতীদের বেকারত্বের হার বেড়েছে ১৩.১% থেকে ২৭.২% এবং যুবকদের ক্ষেত্রে এই হার ৮.১% থেকে বেড়ে হয়েছে ১৮.৭%। এই রিপোর্ট থেকে আরও দেখা যাচ্ছে যে শিক্ষিত যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়েছে। মোদী ২০১৪ সালের ক্ষমতায় আসার আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান হবে। তার পাঁচ বছরের মাথায় যদি এমন ভয়াবহ ছবি বেরিয়ে আসে, তাকে কি জনসমক্ষে প্রকাশ করা যায়?

একটা দেশের শ্রমশক্তি হিসেবে জনসংখ্যার কোন অংশকে ধরা হবে, তার নির্দিষ্ট মাপ রয়েছে: যত জন মানুষ কাজ করছেন এবং যত জন মানুষ কাজ খুঁজছেন, তাঁদের মোট সংখ্যাই দেশের শ্রমশক্তি। ভারতে জনসংখ্যার অনুপাতে শ্রমশক্তি ক্রমেই কমছে। ২০১১-১২ সালে এই অনুপাত ছিল ৩৯.৫%, ২০১৭-১৮ সালে কমে হয়েছে ৩৬.৯%। জনসংখ্যার কর্মক্ষম (১৫-৫৯ বছর বয়স যাঁদের) অংশের হিসেবে এই অনুপাত ২০১১-১২ সালে ছিল ৫৫.৯%, ২০১৭-১৮ সালে ৪৯.৮%। অর্থাৎ, আগের চেয়ে অনুপাতে কমসংখ্যক মানুষ এখন শ্রমের বাজারে আসছেন। তা সত্ত্বেও বেকারত্বের হার বাড়ছে। অর্থাৎ, দেশে যে পর্যাপ্ত চাকরি তৈরি হচ্ছে না, এটা তার অকাট্য প্রমাণ।

সরকার যে রিপোর্ট প্রকাশ করেনি, শুধু তার ভরসাতেই এই কথাগুলো বলছি না। ‘সেন্টার ফর মনিটরিং দি ইন্ডিয়ান ইকনমি’র হিসেব অনুযায়ী, শুধুমাত্র ২০১৮ সালে দেশে এক কোটি চাকরি কমেছে; ২০১৮-র ডিসেম্বর এবং ২০১৯-র জানুয়ারি মাসে দেশে বেকারত্বের হার ৭% ছাড়িয়ে গিয়েছে। প্রতি তিন মাস অন্তর রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক একটা সমীক্ষা প্রকাশ করে— দেশের অর্থনীতি নিয়ে ১৩টি শহরের মানুষের প্রত্যাশা কী, তা বোঝার জন্য। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকে কর্মসংস্থান বিষয়ে মানুষের প্রত্যাশা নিম্নগামী। ২০১৪ সালের জুন মাসে ৩০.২% মানুষ মনে করতেন যে কর্মসংস্থানের অবস্থা অতীতের তুলনায় খারাপ হয়েছে। কিন্তু ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৭.২%। অর্থাৎ, প্রতি দু’জন ভারতবাসীর মধ্যে এক জন বলছেন, অবস্থা খারাপ হচ্ছে। সদ্য ফাঁস হওয়া রিপোর্ট, সিএমআইই-র তথ্য এবং রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের সমীক্ষার ফল, সবই এক দিকে আঙুল তুলছে।

বেকারত্বের এই ভয়াবহ সঙ্কটের কথা সরকার মানতেই রাজি নয়। সরকারি অর্থনীতিবিদরা বলছেন যে আরও একটি সমীক্ষা করে তাঁরা নাকি দেখাবেন যে কর্মসংস্থান বেড়েছে। যে সমীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই তার ফলাফল জানা হয়ে যায়, তার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে কথা না বাড়ানোই ভাল। প্রধানমন্ত্রী বলছেন, যাঁরা পকোড়া ভাজছেন, তাঁরাও চাকুরিরত। অতএব চিন্তার কিছু নেই। পকোড়া-আখ্যান যে নিখাদ ভক্ত ছাড়া কেউই মানবেন না, সরকার সম্ভবত জানে। তাই প্রভিডেন্ট ফান্ড সংস্থায় (ইপিএফও) নতুন নথিকরণের ভিত্তিতে দাবি করছে যে দেশে কর্মসংস্থান বাড়ছে। নতুন কত কর্মসংস্থান অর্থব্যবস্থায় তৈরি হল তা এই পদ্ধতিতে মাপা সম্ভব নয়। কোনও সংস্থায় ২০ জন কর্মী নিয়োজিত হলে তবে ইপিএফও-তে নথিকরণ বাধ্যতামূলক। ধরুন, আপনার সংস্থায় ১৯ জন কাজ করেন। তা হলে আপনাকে শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড দিতে হবে না, ইপিএফও-তেও নথিভুক্ত করতে হবে না। এ বারে আপনি আরও এক জন শ্রমিক নিয়োগ করলেন, যার ফলে আপনার মোট শ্রমিকসংখ্যা হল ২০। এখন ২০ জন শ্রমিককেই ইপিএফও-তে নথিভুক্ত করতে হবে। তাই, ইপিএফও নথিকরণ তথ্য দেখলে দেখা যাবে ২০ জন নতুন শ্রমিক নথিভুক্ত হল, অথচ নতুন কর্মসংস্থান হল মাত্র এক জনের। এই তথ্যের ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের যথার্থ পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। 

সরকারি চাকরির সংখ্যাও মোদীর জমানায় কমেছে। সংবাদে প্রকাশ, কেন্দ্রীয় স্তরে পাবলিক সার্ভিস কমিশন, রেল, স্টাফ সিলেকশন কমিশন ইত্যাদির অন্তর্গত নতুন চাকরির সংখ্যা ২০১৪-১৫ সালে ছিল ১.১৩ লক্ষ, যা ২০১৭-১৮ সালে কমে হয়েছে ১.০১ লক্ষ। আবার কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় ২০১৩-১৪ সালে নতুন চাকরি হয়েছিল ১৬.৯১ লক্ষ, যা ২০১৭-১৮ সালে কমে হয়েছে ১৫.২৩ লক্ষ। শুধুমাত্র ব্যাঙ্কের অফিসার বাদ দিয়ে বাকি প্রায় সব ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীয় সরকারি চাকরি কমেছে। এই পরিস্থিতিতে ভরসা সেই অকৃত্রিম ‘জুমলা’। হঠাৎ ঘোষণা করা হল যে সরকারি চাকরিতে সাধারণ বর্গের অন্তর্গত অর্থনৈতিক ভাবে অনগ্রসরদের জন্য ১০% সংরক্ষণ হবে। যেখানে সরকারি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান লাগাতার কমছে, সেখানে ১০% সংরক্ষণ অর্থহীন। বিশেষত যখন আট লাখ টাকার কম বার্ষিক আয় হলেই আপনি গরিব বলে বিবেচিত হয়ে যাবেন। 

এই আমলে গালভরা কথা অনেক হয়েছে। কাজের কাজ সেই তুলনায় যৎসামান্য। দেশে বিনিয়োগ প্রায় হচ্ছে না, কৃষি গভীর সঙ্কটে, সরকারি চাকরি প্রায় নেই। এই অবস্থায় নোট বাতিল এবং জিএসটি অসংগঠিত শিল্পের বিপুল ক্ষতি করেছে। অসংগঠিত ক্ষেত্রে যে হেতু নগদনির্ভর লেনদেন হয়, নোট বাতিলের পরে বহু সংস্থা বন্ধ হয়ে যায়, বহু মানুষের চাকরি চলে যায়, পরিযায়ী শ্রমিকরা গ্রামে ফিরে আসতে বাধ্য হন। তাঁরা এখনও চাকরির সন্ধান করে চলেছেন। অন্য দিকে, জিএসটি ছোট ব্যবসায়ীদের কোমর ভেঙে দেয়। এই জোড়া ধাক্কায় মোট কত মানুষ কর্মহীন হলেন, সেই পরিসংখ্যান কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পক্ষে গৌরবজনক হবে না। 

পাঁচ বছর আগে মোদী দেশের যুবসমাজকে খোয়াব দেখিয়েছিলেন যে তিনি ক্ষমতায় এলেই কর্মসংস্থানের সমস্যা দূর হবে, বছরে 

এক কোটি চাকরি হবে। পাঁচ বছর পরে দেখা যাচ্ছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সঙ্কুচিত হয়ে চলেছে। বিরোধীরা কি কোনও বিকল্প নীতির সন্ধান দিতে পারবেন? 

ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়, কলকাতা-য় অর্থনীতির শিক্ষক