Advertisement

নবান্ন অভিযান

সাত বছর আগের ‘ভুল’ থেকে শিক্ষা নিয়েছেন শাহ, ২০১৯ সালের কলেজ স্ট্রিটের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল না ভবানীপুরে

শাহের রোড শোয়ের সামনে-পিছনে জমায়েতের যা চাপ ছিল, তাতে শমীককে বার বার মাইকে ঘোষণা করতে হচ্ছিল, ‘‘আপনারা তাড়াতাড়ি এগিয়ে চলুন। না হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এগোতে পারছেন না। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।’’

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:৩৪
A scene from seven years back could have reoccurred in Kolkata, Did Amit Shah consciously averted

শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়ন পর্বের রোড শো-এ অমিত শাহ, বৃহস্পতিবার কলকাতায়। ছবি: পিটিআই।

সাত বছর আগে তাঁর রোড-শো ঘিরে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটেছিল কলকাতায়। সাত বছর পরে বৃহস্পতিবারেও তেমনই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত। কিন্তু অমিত শাহ সন্তর্পণে তা এড়িয়ে গেলেন।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল বেরোনোর পরে বিজেপির অন্দরে কাটাছেঁড়ার ঝড় উঠেছিল। দু’বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে ১২১ আসনে এগিয়ে থাকা দল কেন বিধানসভার ভোটে ৭৭ আসনে থেমে গেল, সেই কারণ খুঁজতে বসে চাপানউতরের ঘনঘটা তৈরি হয়েছিল। পাঁচ বছর আগের সেই সমস্ত ‘ভুল’ থেকে শিক্ষা নিয়ে বিজেপি ২০২৬ সালের ভোটে লড়তে নেমেছে। অতীতের ‘ভুল’ থেকে তিনিও যে শিক্ষা নিয়েছেন, বৃহস্পতিবার তা দেখালেন স্বয়ং শাহ।

বৃহস্পতিবার হাজরা মোড়ে জমায়েত এবং সংক্ষিপ্ত জনসভা করে একটি সুসজ্জিত ট্রাকে চড়ে রোড শো শুরু করেছিলেন শাহ। ট্রাকের মাথায় শাহের পাশে ভবানীপুরের বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু ছাড়াও ছিলেন রাসবিহারী, বালিগঞ্জ এবং চৌরঙ্গীর বিজেপি প্রার্থী যথাক্রমে স্বপন দাশগুপ্ত, শতরূপা এবং সন্তোষ পাঠক। ছিলেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। রোড শোয়ের সামনে-পিছনে জমায়েতের চাপ যেমন ছিল, তাতে শমীককে বার বার মাইকে ঘোষণা করতে হচ্ছিল, ‘‘আপনারা তাড়াতাড়ি এগিয়ে চলুন। না হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এগোতে পারছেন না। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। এই মনোনয়ন পর্ব সেরে তাঁকে অসম যেতে হবে।’’

রাস্তার দু’ধারের বাড়ির বারান্দা, জানালা, ছাদ থেকে অনেকেই শাহের দিকে হাত নাড়ছিলেন। মমতার নিজের পাড়ার এই পরিস্থিতি দেখে শাহের হাসিও চওড়া হচ্ছিল। কিন্তু ততক্ষণে মমতার বাড়ির গলি অর্থাৎ হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের মুখে তৃণমূলও পাল্টা জমায়েত করে ফেলেছে। পুলিশ ব্যারিকেডের কারণে তৃণমূল সমর্থকেরা শাহের যাত্রাপথে সরাসরি উঠে আসতে পারছিলেন না। কিন্তু লম্বা লাঠিতে ঝান্ডা লাগিয়ে পুলিশের মাথার উপর দিয়ে তা ওড়াচ্ছিলেন তৃণমূল কর্মীরা। কখনও ‘জয় বাংলা’, কখনও ‘দালাল-দালাল’ স্লোগানও তুলছিলেন। বিজেপি কর্মীরা সে সব দেখে পাল্টা তেড়ে যান। ‘চোর-চোর’ স্লোগান তোলেন। তৃণমূল কর্মীদের কাছে পৌঁছোনোর আগেই পুলিশের সঙ্গে বিজেপির ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যাচ্ছিল। পরিস্থিতি তখন যথেষ্ট উত্তপ্ত। একদিকে মমতার পাড়ার লোকজন। অন্যদিকে শাহের উপস্থিতিতে ‘উজ্জীবিত’ বিজেপি-র জমায়েত।

মমতার বাড়ির গলির মুখে পরিস্থিতি দফায় দফায় উত্তপ্ত হলেও অবশ্য শাহের ট্রাক আটকে যাওয়ার পরিস্থিতি তখনও তৈরি হয়নি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ট্রাকে চড়ে আলিপুরের সার্ভে বিল্ডিং পর্যন্ত পৌঁছোতে পারতেন। কিন্তু শাহ তা করেননি। হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের ৫০-৬০ মিটার আগে তিনি ট্রাক থেকে নেমে গাড়িতে উঠে যান। গাড়িতেই সার্ভে বিল্ডিং অভিমুখে যান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিরাট জমায়েত এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা রয়েছে বলে তিনি ট্রাকে চড়েই এগোতে পারতেন। কিন্তু তাতে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত। শাহ তা করেননি। বস্তুত, রাজ্য বিজেপি-র অনেকে মনে করছেন, শাহ তৃণমূলের ‘প্ররোচনা’ এড়িয়ে গিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির গলির মুখে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ‘অশান্তি’ হচ্ছে, এমন ছবি তিনি সচেতন ভাবেই তৈরি হতে দেননি।

বিজেপির রোড শো-এ কর্মী-সমর্থকদের জমায়েত।

বিজেপির রোড শো-এ কর্মী-সমর্থকদের জমায়েত। ছবি: সংগৃহীত।

সেই প্রসঙ্গেই বিজেপি নেতাদের মনে পড়ছে ২০১৯ সালের উত্তর কলকাতার ঘটনা। ১৪ মে উত্তর কলকাতা লোকসভা আসনের বিজেপি প্রার্থী রাহুল সিংহের সমর্থনে কলেজ স্ট্রিট, বিধান সরণিতে রোড শো করেছিলেন শাহ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রবেশপথের সামনে থেকেই অশান্তি শুরু হয়। অভিযোগ, সেখানে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের (টিএমসিপি) জমায়েত থেকে রোড শোয়ের উপর জলের বোতল, ইট-পাটকেল পড়েছিল। বিজেপির বিরাট মিছিলও ‘জবাব’ দিয়েছিল। শাহের ‘রথ’ তাতে থামেনি। কিন্তু ঠনঠনিয়া কালীবাড়ি পেরোতেই ফের গোলমালের আভাস মিলতে শুরু করে। বিদ্যাসাগর কলেজের সামনে আবার টিএমসিপি-বিজেপি কর্মীদের মধ্যে মারপিট শুরু হয়। শাহ থামেননি। বিদ্যাসাগর কলেজ পেরিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন। তবে শ্যামবাজার পর্যন্ত যাওয়ার কথা থাকলেও বিবেকানন্দ রোডের মোড়ের কাছে গিয়ে রোড শো শেষ করে দিয়েছিলেন তিনি।

বিজেপি-র একাংশের দাবি, শ্যামবাজার পর্যন্ত এগোলে আরও অশান্তির আশঙ্কা রয়েছে, শাহ এমন আঁচ করেছিলেন বলে বিবেকানন্দ রোডের কাছে থেমে যান। কিন্তু ততক্ষণে যা ঘটার ঘটে গিয়েছে। বিজেপি কর্মীরা বিদ্যাসাগর কলেজে ঢুকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙে দিয়েছেন বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি অভিযোগ করেন। বিজেপি পাল্টা দাবি করেছিল, গোলমালের সময়ে কলেজের প্রবেশপথ ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছিলেন টিএমসিপি কর্মীরা। বিজেপির কেউ সেখানে ঢুকতেই পারেননি! তৃণমূল নিজে মূর্তি ভেঙে বিজেপি-কে দোষ দিয়েছে বলেও দাবি করেছিল পদ্মশিবির। কিন্তু সে বিতর্ক বিজেপি-কে কিছুটা ‘পিছনের পায়ে’ ঠেলে দিয়েছিল। উত্তর কলকাতা লোকসভা কেন্দ্রের ফলাফলেও তার প্রভাব পড়ে। রাজ্যে বিজেপি ১৮টি লোকসভা আসন জিতে হইচই ফেলে দিলেও উত্তর কলকাতায় অতীতের চেয়ে বেশি ব্যবধানে তারা হেরেছিল।

অতীত থেকে তাঁর যে শিক্ষা নিয়েছেন, তা বিজেপি নেতাদের একাংশ এবার খোলাখুলিই বলছেন। যেমন ২০২১ সালে যে ভাবে তৃণমূল থেকে গন্ডা গন্ডা নেতাকে বিজেপিতে যোগদান করানো হচ্ছিল, এ বার সে ছবি তৈরি হয়নি। তৃণমূলত্যাগীদের অকাতরে টিকিট দেওয়ার রাস্তাতেও বিজেপি হাঁটেনি। দলে দলে খ্যাতনামীদের ডেকে এনে টিকিট বিলি করা হয়নি। সে বার সংগঠন না-গুছিয়েই হাঁকডাক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ বার তার উল্টো ছবি। হাঁকডাকের চেয়ে সংগঠনে বেশি মন দেওয়া হয়েছে। তবে সংশোধনের যাবতীয় প্রক্রিয়া যে শুধু ২০২১ সাল কেন্দ্রিক নয়, তা-ও স্পষ্ট। নইলে কি আর ২০১৯ সালের ‘ভুল’-এর পুনরাবৃত্তি এড়িয়ে যান শাহ!

সংক্ষেপে
  • প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
  • ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
Amit Shah Bjp Rally Suvendu Adhikari nomination filing West Bengal Politics Road Show
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy