বাঙালি আবেগে শান দিয়ে ফের বিজেপির বিরুদ্ধে তোপ দাগলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। জানালেন, রথে চেপে বিজেপি যেমন পশ্চিমবঙ্গে আসছে, তেমনই উল্টোরথে চেপে বিদায় নেবে। রাজ্যের ভোটারদের হেনস্থা, বাঙালিকে অপমান এবং ভেদাভেদ সৃষ্টির অভিযোগে বিঁধলেন পদ্মশিবিরকে। রায়নার সভা থেকে বিজেপির সঙ্গে সিপিএম-কেও একই বন্ধনীতে ফেলে আক্রমণ শানান তিনি।
গত বৃহস্পতিবার হাজরার সভা থেকে অমিত শাহ জানান, ভোটের সময়ে ১৫ দিন তিনি পশ্চিমবঙ্গেই থাকবেন। এ বার নাম না করে তা নিয়েই শাহকে নিশানা করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। সমাজমাধ্যমে অভিষেক লেখেন, “ভোটের আগে এই ১৫ দিন যাঁরা পশ্চিমবঙ্গে কাটাচ্ছেন, ৪ মে-র পরের দিনই তাঁরা এখান থেকে উধাও হয়ে যাবেন। পরের ভোট না আসা পর্যন্ত তাঁদের আর দেখাই পাওয়া যাবে না।”
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার পর্বে সুসজ্জিত প্রচারগাড়িতে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ‘পরিবর্তন যাত্রা’ করেছে বিজেপি। সেই ‘পরিবর্তন যাত্রা’র পর্ব মিটেছে গত ১৪ মার্চ ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সমাবেশে। ঘটনাচক্রে, তার ঠিক পরের দিনই রাজ্যে ভোট ঘোষণা হয়। নির্বাচন ঘোষণার পরে রবিবারই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে সভা করলেন মোদী। এ বারের ভোটের মনোনয়ন পর্বেও সুসজ্জিত গাড়িতে প্রার্থীদের নিয়ে রোড শো করতে দেখা যাচ্ছে বিজেপির নেতৃত্বকে। আসছেন দিল্লির নেতারাও। মনে করা হচ্ছে, বিজেপির এই কর্মসূচিগুলিকেই কটাক্ষ করে অভিষেক বলেছেন, ‘রথে চেপে এসেছে এবং উল্টোরথে চেপে বিদায় নেবে।’
রবিবার পূর্ব বর্ধমানের রায়নায় জনসভা করেন অভিষেক। সেখানে তৃণমূল সরকারের কাজের খতিয়ান তুলে ধরেন তিনি। জানান, রায়নার বাসিন্দাদের মূলত দু’টি প্রধান দাবি রয়েছে—হিমঘর এবং দমকলকেন্দ্র। রাজ্যে তৃণমূল চতুর্থ বার সরকার গঠন করার পরে এই দু’টি দাবিই অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সমাধান করা হবে বলে আশ্বাস দেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। একই সঙ্গে ‘ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতি’ করার অভিযোগ তোলেন বিজেপির বিরুদ্ধে। জনসভা থেকে অভিষেক বলেন, “বিজেপি নেতাদের কাছে আমার অনুরোধ, ধর্মের ভিত্তিতে লড়াই করবেন না। আপনারা যদি লড়াই করতে চান, তবে মানুষের জন্য করা কাজের ভিত্তিতে লড়াই করুন।” রায়নাবাসীর জন্য গত ১২ বছরে বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকার কী করেছে, সেই কাজের রিপোর্ট কার্ড পেশ করারও চ্যালেঞ্জ দেব তৃণমূল নেতা। তিনি বলেন, “আমি আমাদের উন্নয়নমূলক কাজের ভিত্তিতে ওদের হারানোর কথা দিচ্ছি, না হলে আমি আপনাদের আর মুখ দেখাব না।”
বিজেপি-কে আক্রমণ শানিয়ে অভিষেক বলেন, “এটা কেবল তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের লড়াই নয় বরং মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াই। তৃণমূল কংগ্রেস জিতলে আপনাদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, কিন্তু বিজেপি কোথাও জিতলে আপনারা আপনাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন।”
রায়নার সভা থেকে বিজেপি এবং সিপিএম-কে দৃশ্যত একই বন্ধনীতে রেখে নিশানা করেন অভিষেক। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের বিজেপি-কে বিঁধে বলেন, “এটা সেই দল, যারা এসআইআর থেকে শুরু করে অন্যান্য জনবিরোধী সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশিকা নিয়ে এসেছে। ওদের ভোট দেওয়ার অর্থ হবে পরোক্ষভাবে সিপিএম-এর হার্মাদদের ফিরিয়ে আনা।” রাজ্যে তৃণমূল সরকারে আসার আগে বাম জমানার শেষ পর্বের কথাও উল্লেখ করেন অভিষেক। পূর্ব বর্ধমানেরই হিজলনা গ্রাম পঞ্চায়েতের কথা তুলে ধরেন তিনি। অভিষেক বলেন, “আমার মনে পড়ছে, সিপিএম-এর সেই নিপীড়ন ও অত্যাচারের কথা। সেই একই গুন্ডারা এখন শুধু তাদের জার্সি বদলে বিজেপিতে যোগ দিয়েছে এবং ওরা এখন আবার সেই একই অন্ধকার দিনগুলো ফিরিয়ে আনতে চায়।”
আরও পড়ুন:
একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর নিয়ে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং বাঙালি আবেগকে ‘অস্ত্র’ করেও বিজেপিকে একহাত নেন অভিষেক। তৃণমূলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতার আক্রমণ, “এসআইআর-এর মাধ্যমে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার গোপন অভিসন্ধি নিয়ে ওরা এসেছে। ওরা যে গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল, সেই অধিকারের কাছেই ওরা পরাস্ত হয়ে ফিরে যাবে। ওরা এসেছিল বিভেদের বীজ বুনতে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের সম্প্রীতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতার কাছে হেরে গিয়ে ওরা ফিরে যাবে।”
অভিষেকের দাবি, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে অপমান করার জন্য এসেছে। সেই মানুষদের কাছেই বিজেপি প্রত্যাখ্যাত হবে বলে আক্রমণ শানান তিনি। সমাজমাধ্যমে তিনি লেখেন, “ওরা আমাদের মনীষীদের নিয়ে উপহাস করতে, আমাদের ভাষাকে অপমান করতে, আমাদের সংস্কৃতিকে খাটো করতে এবং আমাদের খাবারকে নিষিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালাতে এসেছে। ওরা চরম ঔদ্ধত্য নিয়ে এসেছে। কিন্তু মাথা নিচু করে, বশ্যতা স্বীকার করে ফিরে যাবে।”